চন্দনা সেনগুপ্ত

শুভ বিদায়

চন্দনা সেনগুপ্ত

প্রিয় ভাই শিব প্রাসাদ , তুমি আর নেই  দুনিয়ায়,
কত তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেললে
এই জীবনের স্বাদ।
তোমাকে হারানোর বেদনা, অন্তহীন, ভাষাহারা,
কাউকে বোঝানো যাবে না।
ছিলে তুমি সকলের প্রাণের চেয়েও প্রিয়।
মনে জাগে দুঃখ ও খেদ,
কেন যে হল এ বিচ্ছেদ !
'আত্মনির্ভর' স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারও মুখাপেক্ষী
ছিলে  না কোনোদিনও !
কারো দ্বারস্থ, হও  নি কখনো !
পরিবারের প্রত্যেক সদস্য তোমার স্নেহে প্রেমে
শ্রদ্ধায় তৃপ্ত, ছোটদের ছিলে তুমি সতত নমস্য।
তোমার সহজ সরল উদার মনোভাব, -
সর্বদা সাকারাত্মক, খেলোয়াড়ের স্বভাব।
আজ শুধু মনে পড়ে যায়, সংসার সংগ্রামে
ছিল কত নির্ভীক, সৎ পথে চলে যেতে ঠিক ঠিক সদাই,
মানো নি তো নি কোনো বাধাই  !
রক্ষা করে, আগলে ধরে, আদর ভরে -
এতদিন যারে রেখেছিলে কাছে,
সেই জীবন সঙ্গিনী একাকিনী আজ
এখানেই পড়ে আছে।
এটাই যে প্রকৃতির রীতি, বিধাতার অমোঘ বিধান।
না চাহিলেও মেনে নিতে হয় -
দেহের খাঁচা ত্যাগ করে যায়, -
সকল মানব প্রাণ।
জীবাত্মা তব মিলায়েছো আজ পরমাত্মার সাথে -
মুক্তির ক্ষণে ঈশ্বরের আশীষ ঝরুক যাত্রা পথে।

আমার প্রিয় ভাই শিবু

চন্দনা সেনগুপ্ত

খোলা চিঠি এক অসাধারণ সুদক্ষ গোলরক্ষক কে :-

একেবারে মায়ের জঠরে থাকতেই শিশু খেলোয়াড় পেটের মধ্যে এমন পা চালাতো, লাথি ছুঁড়তো যে মা ‘বিদ্যুতরানী’ অস্থির হয়ে পড়তেন। বাবা বলতেন হাসতে হাসতে – “ভালো ফুটবলার হবে গো তোমার ছেলে। মোহনবাগানের ক্লাবে খেলতে নামবে একদিন”। ভবিষ্যতে দেখা গেল যে সত্যিই ছেলেটা স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় ক্লাবে এবং পরে দিল্লীর বড় বড় নাম করা দলে বল পায়ে নিয়ে সারা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে “গোল রক্ষক” হিসাবে খুব নাম যশ হল তার। খেলা দেখে নর্দান রেলের বড় বাবু ও কোচ বাড়ি এসে চাকরী দিলেন তাঁকে।

বাবার মৃত্যুর পর এই দক্ষ খেলোয়াড় আমাদের শিবু নিজের চেষ্টায় ও পরিশ্রমের জোরে সংসারে অর্থ সাহায্য করতে লাগল অতি অল্প বয়স থেকে। তাঁর যমজ বোন দূর্গা ও পরের দুই ছোট বোন জয়া বাচ্চু এবং অসুস্থ মায়ের প্রতি কর্তব্য করতো সে অন্য দাদাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

মা কে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বোনেদের ছোট ছোট চাহিদা মেটানো, বৌদিদের ও ভাইপো ভাইঝিদের আন্তরিকভাবে যেকোন ব্যাপারে সাহায্য করা, বিনোদন করা ছিল তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ।

পরিবারেও সে যেন গোল রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলতো। তাই শেষ সময়ে অত্যন্ত সুষ্ঠভাবে দুই কন্যার বিবাহ, নাতি নাতনির প্রতি যথাযথ কর্ত্তব্য পালন করে সে আমাদের পরিবারের নাট্যমঞ্চ হতে বিদায় নিল সকলের আগে।

কোভেট-১৯ দানবটা সজোরে ‘বল’ মেরে গোল করবার চেষ্টা করেও সফল হল না। আমাদের ছোট ভাই সেই বল তথা করোনা ভাইরাসের পদাঘাত বুকে ধরে নিল নিজের। গোল রক্ষকের সক্রিয় ভূমিকায় সে অন্তিম শ্বাস পর্যন্ত অভিনয় করে গেল। তাই আজ শিবু প্রসাদ তোমাকে স্যালুট ও সশ্রদ্ধ নমষ্কার জানাই।

স্বর্গীয় বাসুদেব সেনগুপ্ত শ্রীরামপুর গ্রাম, ভগীরথপুর থানা, মুর্শিদাবাদ জেলা নিবাসী পরবর্তী কালে ভারতের রাজধানী দিল্লী প্রবাসী একজন অতি সজ্জন উদার, পরপোকারী মানুষ ছিলেন। তৎকালীন লাহোরের এক মেডিকেল স্কুল থেকে পাশ করে দিল্লীর “চাঁদনীচকের” বিখ্যাত বাঙালি ডাক্তার অনিল সেন এর কাছে কাজ করতেন তিনি। যুদ্ধের বাজারে অনেকগুলি ছেলেমেয়ে ‘কাশ্মিরী গেট তথা গন্ধ নালার মন্দিরওয়ালা গলিতে তাঁর বাস ছিল। নন্দ, আরতি, মঞ্জুর পরে তাঁর পুত্র গোবিন্দ জন্মায়। কিন্তু মাত্র ৭ বছর বয়সেই ‘মেনেঞ্জাইটিস’ রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। তারপর নিতাই মঙ্গল ও শংকর জন্মায়। অর্থাৎ এই ছয়জন পুত্র কন্যা নিয়ে যখন তিনি অতি দরিদ্রতার মধ্যে কোনোরকমে দিনগত পাপক্ষয় করছেন, তখন ভারত স্বাধীন হয়। তাঁর ওই গ্রামটি সেই সময় পাকিস্তানে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গুজব রটেছে। সীমান্ত ভাগে বিচ্ছিন্ন বিভক্ত দুই দেশের সব জাতি ধর্ম ও বয়সের লোকেরা বিভ্রান্ত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আনন্দ কীভাবে যে দেশের মানুষ উপভোগ করবে, ভিটে মাটি হারানোর দুর্ভাবনাগ্রস্থ লোকেরা কখন কোথায় কোনদিকে পা বাড়াবে বুঝতে পারছে না।

রাজধানী দিল্লীতে হিন্দু মুসলমানের হানাহানি, মারামারি, হিংসা, দ্বেষ তখন চরমে উঠেছে। জাপানে নিউক্লিয়ার বোমের ভয়াবহতা হিরোশিমার আক্রমণের বিভীষিকা প্রত্যেক দেশের মানুষকেই আতংকিত করে দিয়েছে। দিল্লী শহরেও বোমা পড়তে পারে সেই ভয়ে দলে দলে লোক বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কোন রকমে প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়েছে।

বাসুবাবুও ঐ ছয় সন্তানসহ তাঁর শ্রীরামপুরের ভিটায় মা সুশীলা বালা দেবীর কাছে এসে হাজির হলেন। বেশ কয়েকবছর কেটে গেল। বাসুদেব বাবুর স্ত্রী বিদ্যুৎরানী আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। পুজোর সময় ঠাকুর দালানে দেখে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর পেটের আকার এতো বড় যে আত্মীয় ও প্রতিবেশী গণ চিন্তিত হলেন। বিজয়ার দিন সিঁদুর খেলা খেলে এসে হাঁসফাঁস করতে লেগেছেন তিনি, গোয়ালের পাশে খড়ের গাদার ওপর শতরঞ্চি চাদর পেতে আঁতুর ঘর তৈরী করলেন – শাশুড়ী বৌ মিলে। ডাক্তার স্বামী বাড়ি নেই, রোগীর খবর নিতে, ওষুধ ইনজেকশন পথ্যের ব্যবস্থা করতে অন্য গ্রামে গেছেন। তখনকার দিনে আমাদের বঙ্গদেশে মেয়েদের প্রসবকালে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

একাদশীর দিন সকাল থেকে উঠল ভীষণ বেদনা। তারমধ্যেও সংসার গুছিয়ে রেখে বৌমা ঢুকলেন আঁতুড়ঘরে একা। শাশুড়ী মাতা পাড়ার ছেলেকে পাঠালেন পাশের গ্রামে ‘ভগীরথপুর’ থেকে ‘দাই মা’ কে ডাকতে। দাই মা জানালেন, তিনি দুপুরের আগে আসতে পারবেন না, বাড়ির বাচ্চাদের জন্য ভাত রান্না করে, ভিজে কাপড় শুকোলে তারপরে আসতে পারবেন। গরীব দাই মা কত প্রসূতির প্রাণ বাঁচিয়েছেন, গ্রামে কত শিশু তাঁর হাতে নির্বিঘ্নে জন্ম গ্রহণ করলো কিন্তু সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাঁর। দারিদ্রের ভারে জর্জরিত মহিলার কাছে মাত্র একখানি শাড়ী, যা পরে তিনি বাইরে যেতে পারেন। আজ সকালে ওটি কেচে ফেলেছেন আর শতছিন্ন একটি কাপড় জড়িয়ে তিনি উনুনে ঘুঁটে সাজাচ্ছিলেন। বললেন, – “গিন্নি মা কে বলো খুব ব্যাথা উঠলে বৌমাকে আঁতুড়ে নিয়ে যেতে, আর গরম জল, নরম পুরোনো কাপড় সব ঠিক করে রাখতে। আমি একটু পরেই ছুটতে ছুটতে এসে যাব”।

কিন্তু পেটের মধ্যে তখন বৌমার খেলোয়াড় সন্তান পা চালাতে শুরু করে দিয়েছে, সেকি দাই মা, ডাক্তার, নার্সদের অপেক্ষা করবে? বাইরের জগতে তাকে ঠিক সেই সময়ে বেরিয়ে আসতে হবে, বিধাতা তার জন্য যে ‘শুভক্ষণ’টি ঠিক করে রেখেছেন। অতএব শুরু হল নাটকের চরম মূহুর্ত্ত। বৌমার একটা আর্তনাদ শোনা গেল – “মা মাগো বাঁচাও আমায়” আর যে সহ্য করতে পারছেন না তিনি। শাশুড়ী দেখে প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, কিন্তু ভীষণ তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি ছিল তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা শক্ত বেতের ঝুড়ি বৌমাকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বৌমা এই ঝুড়িটা বুকের তলায় ধরে জোর দাও জল ভেঙে গেছে, মাথা বেরিয়ে এসেছে। দম দাও, দম দাও ধৈর্য হারিও না”। ঝপ করে সুন্দর ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান বেরিয়ে এল, মায়ের জরায়ু থেকে। কিন্তু তারপরেও আবার ভীষণ জোরে তীব্র যন্ত্রনার ঢেউ উঠল।

শাশুড়ী মা চিৎকার করে উঠলেন, “হাল ছেড়ো না বৌমা, আর একটি বাচ্চা আসছে। বৌমা বৌমা শক্ত হও, জোর দাও – পরেরটাকে বেরিয়ে আসতে দাও,” এক হাতে সদ্য প্রসব হওয়া নবজাতটা সরিয়ে দিলেন মা।

ঠাকুর কী অসাধারণ অদম্য প্রাণ শক্তি তাঁকে দিয়েছেন আজ। যমজ দুই সন্তানের মা, যেমন করেই হোক একা একাই দুটি শিশুকে তাঁর দেহ থেকে আলাদা করতে পেরে – প্রচন্ড উত্তেজনায় আবেগে হাঁপিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে রইলেন, সারা চাদর রক্তে লাল। পরেরটি এক অপরূপা কন্যা।

শাশুড়ী মা আনন্দে কাঁদছেন, আর উঠোনে, ঘরে জমা হওয়া প্রতিবেশী কে চিৎকার করে বলছেন, ওগো তোমরা শাঁখ বাজাও আমার ঘরে শিব দূর্গা এসেছেন, আজ একাদশীর দিনে। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাঁপাতে হাঁপাতে ‘দাই মা’ এসে হাজির। নাড়ী কাটা বাচ্চাদের পরিষ্কার করার কাজগুলি আনন্দের সঙ্গে সমাধা করলেন।

একটু বড় হতে দেখা গেল সত্যিই তার পায়ে জাদু আছে। বল খেলতে সে ভীষণ ভালোবাসে। ১৯৬৮ সালে যখন তার বাবা হটাৎ হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন, তখন মাথায় যেন বাজ পড়ল তাদের ঐ পরিবারের ওপর। ‘কিরোরী মাল’ কলেজে পড়া কালেই শিবুর ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ হল এবং দিল্লীর বিভিন্ন ফুটবল ক্লাব তাকে নিয়ে মাতামাতি করতে লাগল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মতন দলের বিরুদ্ধেও খেলবার সুযোগ পেল সে জীবনে, এবং খেলার জোরেই “নর্দান রেলওয়ে” তে টিকিট চেকারের পদে নিযুক্ত হল সে। পরবর্তীকালে সেখানে ক্যাপ্টেন ও পরে কোচ হয়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করল।

শুধু যে খেলায় ভাল ছিল তা নয়, তার মধুর ব্যবহারে পরিবারের সব সদস্য, প্রতিবেশী চাকুরী ক্ষেত্রে বন্ধু বান্ধব, প্রথমে কাশ্মিরী গেটে ও পরে লক্ষ্মী নগরের সমস্ত বাঙ্গালী ক্লাবের সব সদস্যরা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।

শিবুর ওপরে তিন দাদা ও তিন দিদি ছিলেন কিন্তু কোনদিন সে কারোর কাছে হাত পাতে নি, মুখ ফুটে কিছু চায় নি, সদা সর্বদা তার মুখে হাসি লেগে থাকতো। নিজে পছন্দ করে অতি সুন্দর স্নিগ্ধ স্বভাবের সহজ সরল ভক্তিমতী কন্যা নীলিমাকে বিবাহ করে সে কোনো পণ না নিয়ে এবং তাদের কোনো প্রকার খরচ না করিয়ে। পত্নীও পেয়েছে সে অত্যন্ত সুলক্ষণা, সুগৃহিনী, দুঃখে কষ্টে জীবন সংগ্রামের সহধর্মিনী। দুই কন্যা ও জামাতারাও ঈশ্বরের কৃপায় অত্যন্ত সুযোগ্য এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। সরস্বতীর মতন গুনবতী নাতনি ও গণপতির মতন মঙ্গলদায়ক এক নাতিকে নিয়ে তার পরিপূর্ণ সুন্দর পরিবার। –

সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছিল, হটাৎ কোথা থেকে “করোনা ভাইরাস” এসে তাকে আক্রমণ করল এবং এক অতি পুন্যদিনে সে সজ্ঞানে স্বর্গারোহন করল প্রকৃত সাহসী কুশল এক খিলাড়ির মতন।

শিবপ্রসাদ সেদিন কাউকে সঙ্গে না নিয়ে একাই চড়লো অ্যাম্বুলেন্স-এ এবং কোন আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ছাড়াই অন্তিম যাত্রায় শয়ন করল নির্ভীক ভক্ত পথিকের মতন।

তাঁর পুন্য আত্মার শেষ কৃত্য শ্রাদ্ধানুষ্ঠানটিও সম্পন্ন হল আর এক পুন্য একাদশীতে। তাঁর বিদেহী আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে বিলীন হয়ে শান্তিধামে বিরাজমান এবং সেখান থেকেই তাঁর সারা পরিবারের ওপর বর্ষণ করে চলেছে স্নেহাশীর্বাদ – এ কথা আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।

Leave a comment