চন্দনা সেনগুপ্ত
আমার প্রিয় কবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের জীবন বাঁশির সুরে আপ্লুতা তাঁর প্রাণ মন সর্বদাই সেই সুর ধারায় যেন সিক্ত হয়ে থাকে। রাধাভাবে বিভোর সাধক – গায়ক বৈষ্ণব কাব্যকারের মতন তাই কখনো গেয়ে ওঠেন – “মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে”।
আবার কখনো একাকী বসে উদাস প্রাণে ভাবতে থাকেন, “বাঁশি কি আশায় ভাষা দেয় আকাশেতে, সেকি কেহ বোঝে। সব কথা সবাই বোঝে না, কিন্তু অনুভব করে, তাই গভীর তত্ত্ব কথা, অসীম কালের চিরন্তন সত্য জ্ঞান কবির মনে যখন প্রতিভাত হয়, তখন তিনি লেখেন, – “নিত্যকালের গোপন কথা বিশ্ব প্রাণের ব্যাকুলতা আমার বাঁশি দেয় এনে দেয় আমার কানে”। আর সেই বাঁশির সুর – সুমধুর অপার্থিব ধুন কানের ভিতর দিয়ে যখন তাঁর মরমে প্রবেশ করে – তখন তিনি তাঁর জীবন দেবতাকে প্রশ্ন করেন, – “কেন শুধু বাঁশরীর সুরে ভুলায়ে লয়ে যাও দূরে?
কার আহ্বানে দূরে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্ত্তে আবার মনে বোধ হয় সংশয় জাগে, দিশাহারা কবি তাই দ্বিধা ভরা কণ্ঠে কাকে শুধান – “সখি ওই বুঝি বাঁশি বাজে বনমাঝে”। কিন্তু একটু পরেই তার উপলব্ধি হয়, – যে না বনে নয়, মনেই বেজেছে বাঁশি, তখন ভক্তি প্রেমের রসধারায় স্নাত হয়ে সাধক কবি গেয়ে ওঠেন, –
“পরানে বাজে বাঁশি, নয়নে বহে ধারা, দুঃখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা”।
অপুরূপা এই মধুময় পৃথিবীর রূপ রস গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়ে এই বংশী ধ্বনি বার বার ধ্বনিত করে এক মোহময় আনন্দ সংগীত। শ্রী রাধার মতন আকুল হয়ে মুগ্ধ কবি তখন সেই আনন্দ গানের তানে লীন হয়ে যান, – আর প্রিয় জনকে ডেকে বলেন, – “ওগো শোনো কে বজায়, – বনফুলের গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়। অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি, চুরি করে হাসি খানি, কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে, বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে।
এখানে ভক্ত প্রাণের আকুলতা, ঈশ্বর প্রেম সবই যেন ওই বাঁশের ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলির মধ্যে অবলীলায় খেলা করে। বাদকের অঙ্গুলি স্পন্দনে, মুখ নিঃসৃত ফুঁ এর হওয়ার কারণে অনুরণিত ধ্বনি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভাবনার দ্যোতনা জাগায়। তাই দেখি যখন শরৎকালের ধান ক্ষেতে রোদ্রছায়া লুকোচুরি খেলায় মত্ত তখন ফসল ফলানোর আনন্দে অধীর ধরণী মায়ের বুকে গানও বাজে বাঁশির সুরে। দূর দেশী কোন রাখাল যখন বটের ছায়ায় বসে সারাবেলা খেলা করে, বাঁশি বজায় তখনো সে মগ্ন হয়ে শোনে মাঠের গান। ঘরে তার যেমন মন টেঁকে না, কবিও তেমনি ধান ক্ষেতের ধারে শোনেন পৃথিবীর গান, বাঁশরীর ধুনে, “মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশি হলো ঘরেতে আজ কে রবে গো”? অথবা – “যেথায় তরু তৃণ যত, মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতন, তখন আমরা বুঝতে পারি যে এই বাঁশি শুধু এক বাঁশ গাছের ডাল কেটে বানানো বাদ্যযন্ত্র নয়, এখানে প্রকৃতি প্রেমিক কবি বলতে চেয়েছেন অন্য গভীর কথা।
মাটি তার বুকের অমৃত সুধা বৃক্ষের মধ্যে স্ফুরিত প্রাণশক্তি জাগরিত করে, তাঁর অপার আনন্দ সংগীত তথা আত্মার বাণী ঘোষিত হয় এই অপূর্ব ধ্বনি সম্বলিত বাঁশরীর মাধ্যমে কবিগুরু নিভৃতে বসে যখন সাধনারতো – আত্মার শান্তি, প্রাণের আরাম ও চিরন্তন মিলনে জাগে একান্ত আকৃতি। তিনি গান ধরেন –
“দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলেম অনেক সুরে –
গানের পরশ এল আপনি তুমি রইলে দূরে।
শুধাই যত পথের লোকে, এই বাঁশিটি বাজালো কে –
নানান নামে ভোলায় তারা নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে”।
তাঁর ঈষ্টদেবতা বাহির ছেড়ে যখন ভেতরেতে আসন পেতে বসেন তখন কবি শান্ত সমাহিত চিত্তে তদ্গত হয়ে বলতে থাকেন, – “তোমার বাঁশি বাজাও আসি আমার প্রাণের অন্তঃপুরে”।
যখন তাঁর ধ্যান ভগ্ন হয়, ধ্যানী যোগী ত্যাগী সাধক তখন শোনেন পথের আহ্বান সাধক ফকির বাউল তাঁর প্রাণের মানুষ যে প্রাণেই আছেন একথা জানলেও বার বার বাহির পেইন পা বাড়িয়ে দেন। সন্ন্যাসীর ব্রত উদযাপনে আল্লাতালার নাম শোনার মন্ত্র গ্রহনে তিনি চির পথিক। আর মাঠে ঘুরতে ঘুরতে তিনি স্বগতোক্তি করেন, “বেলা কখন যায় গো বয়ে, আলো আসে, মলিন হয়ে, পথের বাঁশি যায় কি কয়ে, বিকালবেলায় মুলতানে।
আমরা জানি এবং মানি, যে সেই পথে পথে থাকে পাথর ছড়ানো। আর তাতে ঈশ্বরের বাণী বাজে ঝর্ণা ধারার মতন। তাই তিনি পরম আনন্দে কবিতা রচনা করেন, – “আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো, তাই তো তোমার বাণী বাজে ঝর্ণা ঝরানো।
আমার বাঁশি তোমার হাতে, ফুটোর পরে ফুটো তাতে, তাই শুনি সুর এমন মধুর পড়ান ভরানো”।
পথ চলার আনন্দে, বাঁশরীর লয় তাল সুর ছন্দে তিনি সর্বদাই মাতোয়ারা। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে শ্রীরাধা যেমন উন্মনা, পাগলিনী প্রায় পথের বাধা না মেনে ছুটে চলেন অভিসারে, আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথও তাঁর জীবন দেবতা ব্রহ্ম-ঈশ্বরের প্রতি অহরহ ধাবমান, তার অভিসার অন্তহীন। তাই সর্বদা স্বীকার করেন, – “পথিকেরা বাঁশি ভরে সুর আনে সঙ্গে করে, তাই যে আমার দিবানিশি সকল লয় রে কাড়ি।
এখানে শুধু পথ নয় পথের সাথী যাত্রীদের কথাও শোনা যায় কারণ বাঁশির মধ্যে থেকে নিঃসৃত ভিন্ন ভিন্ন রাগ রাগিণীর মধ্যে বাজে মানুষের জীবনের ছোট ছোট হাসি গান, তুচ্ছ মান অভিমান, প্রেম প্রীতি, সুখ দুঃখের কথা তাই তখন বাঁশি শোনায় মানবতার গাথা। আমাদের বাঙালীর কবি তখন হয়ে ওঠেন বংশীবাদক বিশ্বকছব, যার সুরে, গানে, কোথায়, ভাবে ও আবেগে আজ সারা জগৎ প্লাবিত। কিন্তু গুরুদেবেরও গুরু যিনি প্রতি শুভ মুহুর্ত্তে তাঁকে সুরের দীক্ষা দিতে থাকেন তিনি মনুষ্য দেবতা বা অলৌকিক সত্তা নন, তিনি হলেন এক পৃথিবী তথা প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন শক্তির মধ্যে যে অনন্ত আনন্দের কথা দিন রাত ব্যক্ত হচ্ছে তা আমরা শুনতে পাই কবির গানের মধ্যে, বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি সে কি সহজ গান, সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান।
সেই কান তৈরী হয়ে গেলে কবির সাথে এই অতি নির্বোধ, ভাষা ছন্দহীন জ্ঞান হারা লেখক স্বীকারোক্তি করেন কবিরই গানে হৃদয় আমার প্রকাশ হল, অনন্ত আকাশে বেদন বাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে।
বাঁশি আনন্দ গান শোনাতে শোনাতে আবার করুন সুরে বিষাদ পূর্ন ধুন তোলে মাঝে মাঝে। কারণ যে অন্তরের ধনকে কবি পেতে চান, তা তো সহজে ধরা দেয় না। তাই শূন্য ভবনে বিরহী হিয়া কখনও কখনও কেঁদে ওঠে।