চন্দনা সেনগুপ্ত
তিন বছরের আফিফকে আব্বু একটা কাঠের ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। সেটার ওপর বসে দুলে দুলে সে, খাবার খায়। পাশে বসে, আম্মি তাঁকে বইয়ের ছবি দেখায়। পশু, পাখী, কীটপতঙ্গ ও মাছের সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে গেছে। এখন সে আরও অনেক নতুন নতুন বন্ধুর সঙ্গে মুলাকাৎ ও দোস্তী করতে চাই।
নানাজী সেদিন এসে তাকে যখন কোলে তুলে আদর করতে চাইলেন, তখন সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল – “দেখছো না, আমি একন কত্তো বলো হয়ে গেছি। ঘোলার পিতে চলে বেলাই”। ‘ড়’ কে স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারে না কিন্তু তার ভাবখানা এমন যেন বিশ্ব জয় করে ফেলবে।
ঘোড়া যখন আব্বু আনেন ঘরে,
আফিফবাবু হাততালি দেয়, আনন্দ না ধরে।
মনে মনে জাল বোনে সে, কল্পনার –
স্বপ্নপরী চোখের পাতা ভরে।
টগবগ-টগবগ-টগবগ করে
দোস্ত ঘোড়াটার পিঠে চড়ে
ছোট্ট খোকা বেড়াতে যায়
বিশাল নদী পদ্মা পারে।
আম্মা তাকে চেনান কত,
হাতি, হরিণ, জেব্রা শত,
বনে থাকে বাঘ, ভাল্লুক, গন্ডার আর জিরাফ যত, –
সবাইকে সে চেনে।
জলে থাকে, ঝাঁকে-ঝাঁকে, সাঁতার কাটে
নদীর বাঁকে, –
রুই, কাতলা, মাগুর পাঁকে,
নাম তাহাদের জানে।
এখন ঘোড়া চলছে ছুটে,
ফুলের থোকা আছে ফুটে, –
মৌমাছি আর প্রজাপতি ছুটছে তাদের পানে।
এখন সে তো আঁকতে পারে, –
উড়ছে যারা অনেক দূরে –
মেঘের কোলে সারে সারে সেই পাখীদের ছবি।
নৌকা যেমন বেড়ায় ভেসে, –
মাছ পাখীরা অনায়াসে, –
জলের মধ্যে হওয়ার দেশে –
ঘুরে বেড়ায় দেখেছে সে, –
তাদের অনেক ছবি।
বালির ধারে নদীর পাড়ে, থামলো ঘোড়া এসে।
হঠাৎ সেথায় কে যেন এক ছোট্ট প্রাণী তারে
ডাকলো ভীষণ মোটা স্বরে –
গলাটা ফ্যাঁস ফ্যাঁসে।
“গ্যাঙোর, ঘ্যাঙর গ্যাঙ – আমরা কোলা ব্যাঙ, –
জলেও থাকি, ডাঙায় ঘুরি,
সরু সরু ঠ্যাঙ।
দোস্ত হতে চাও মোদের তুমি”?
বলল ভালোবেসে।
তোমাদেরকে কি নাম দেব,
ডাকবো গো কি বলে?
ঘোড়া থেকে নামল আফিফ
বেজায় কৌতূহলে।
আমাদেরকে “উভয়চর” যে বলেই সবাই জানে।
মোদের মধ্যে দীর্ঘজীবী ‘কচ্ছপ’কেই মানে।
ঐ দেখো সে এসে গেছে, –
ভাব করতে তোমার সনে, –
ঐ যে গো এই খানে।
বললে আফিফ ঘাবড়ে গিয়ে, –
“ওরে বাব্বা ! তুমি আবার কে গো?
তোমার পিঠে শক্ত এমন, খোলায় ঢাকা দেহ কেমন !
দেখে আমার ভয় লাগছে –
পালাই, আমি মাগো।
কচ্ছপটা বলল ডেকে তাকে –
মোটা গলায় হেঁকে, –
“সোনা ছেলে, বন্ধু পেলে ভয়টা কিসের
ওগো?
তোমায় আমি কামড়াবো না –
ঘোড়াটাকেও তড়পাবো না,
আমার সঙ্গে হেথায় এসে একটু কাজে
লাগো”।
আফিফ শুধায় তাকে –
“কি কাজ করছো গো তুমি?
অমন করে খুঁজছো কাকে
বালির মধ্যে কাদার ফাঁকে
জলেও যাচ্ছো নামি”?
কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল কচ্ছপটি, –
“গর্ত্তে আমি ডিম পেড়েছি চার
পাচ্ছি না তা, দেখছি যে বার বার”।
আফিফ তার ছোট ছোট হাত দিয়ে মাটি সরিয়ে খুঁজতে লাগল, নতুন বন্ধু মা কাছিমের ডিম। ঘোড়াও তার পায়ের খুর দিয়ে পাথর বালি সরিয়ে দেখতে দেখতে, – দেখতে পেল সেই ডিমগুলো। কচ্ছপ তাকে অনেক অনেক সুকরিয়া ও সেলাম জানালো। আমার ভালো করে বালি দিয়ে ঢেকে রাখলো তাদের। আমার এই খোলাটা আছে বলে, কেউ আমাকে সহজে মারতে পারে না। আমি ঐ খোলার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। এই জন্য অনেকদিন বাঁচবার সুযোগও পাই। কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বড় আর একটা উভয়চর প্রাণী আছে। দাঁত তার কোর্টের মত। জলেও থাকে, ডুব সাঁতারে এধার থেকে যায় ওধারে, আর ডাঙায় উঠে চুপিসাড়ে যাকে পায় তার ঠ্যাঙ ধরে টেনে নিয়ে যায় জলে, তারপর খুব আরাম করে খেয়ে আবার নদীর কাদায় শুয়ে সূর্যের রোদ পোহায় চোখ বুজে। ভীষণ চালাক সে।
হঠাৎ ঐ দিকে দেখি সত্যি সত্যিই একটা কুমীর বেরিয়ে আছে চার পায়ে। কাঁটা কাঁটা দাগ তার গায়ে আর মুখে কত দাঁত।
“ওরে বাবারে আফিফ, পালাও পালাও ভাগো”।
এক নিমেষে কচ্ছপ আর ব্যাঙেদের দল জলে ঝাঁপ দিল। আর আফিফ ও তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুট লাগলো বাড়ির দিকে।