চন্দনা সেনগুপ্ত
কারো মৃত্যু হয়ে গেলে কি তাকে আর ‘চিঠি’ লেখা যায় না? মন কে জিজ্ঞেস করলাম বারে বারে। কেন যায় না, সে তো এখন অদৃশ্যভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে কাগজ বা কলমে লেখার পরে তাকে সরকার তৈরী এক মাধ্যমের দ্বারা অর্থাৎ পোস্টাপিসের টিকিট লাগিয়ে পিয়ন বন্ধুর দ্বারা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতাম। পরে সে ভাবে পত্র পাঠানোর রেওয়াজ আজকাল উঠে গেল, কম্পিউটার, মোবাইলের বিশেষ কম্যুনিকেশন-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট-এর সুবাদে ‘ই-মেলে’ মেসেজে পাঠানোর পদ্ধতি চালু হল। সেখানে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করার খুব সুবিধা। চিঠিটি তো দুটি মনের সংযোগ সেতু। কিন্তু মানুষ মরে গেলে আর চিঠির কি দরকার! কারণ সেই অন্য মানুষটি তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না, – এটাই তোমাদের সকলের – অর্থাৎ যে কোন মানুষের ধারণা।
আমার হৃদয় ও আত্মা বলে অন্য কথা। আত্মা তো মরেনি, তাহলে সেই অবিনাশী বিদেহী তো আমার জীবাত্মার একেবারে খুব নিকটে আসতে পারেন। তাকে ছুঁতে হয়ত পারবে না আমার পার্থিব সত্তা, কিন্তু তিনি যদি আমার অন্তরের ভাষা বুঝতে পারেন, আমার আকুল আবেগ – ভাবনাকে জানতে পারেন, তাঁর সম্বন্ধে আমার কতটা শ্রদ্ধা – ভালোবাসা – স্নেহ – প্রীতি সর্বদা প্রবাহিত হয়ে চলছে, তাকে ‘অনুভব’ করতে পারেন, তাহলে তো আমার স্বার্থকতা।
কেউ কেউ হাসবেন। Critic এর দল বিনা বিচারেই মতামত দেবেন – অনুভব আর উপলব্ধি তো জীবন্ত মানুষ করে – মৃত্যুর পরে সে তো অনন্তে বিলীন হয়ে গেল, তোমার কথা শুনে তার লাভ?
আমি বলব – লাভ ক্ষতির হিসাব তো করিনি, শুধু ব্যক্ত করতে চেয়েছি আমার ব্যাকুল বেদনা। তাই এই পত্র রচনা। তার হয়ত আর কোন ফারাক পড়বে না, তিনি হয়ত আমাকে ফিরে উত্তর দিতেও আসবেন না, কিন্তু আমার আত্মা শান্তি পাবে, মুক্তি পাবে আমার অন্তঃ নিহিত সত্য বোধ। –
এই কয়েকমাসে ‘করোনার’ প্রবল প্রতাপে বহু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। প্রথমেই তাঁদের প্রতি আমার প্রণাম জ্ঞাপন করি। চীন দেশে জন্মগ্রহণ করে এই ভয়ানক রোগের দানব প্রথমে সেখানে অসংখ্য লোককে আক্রমণ করে মৃত্যু লোকে পাঠালো। তারপর সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেল, আমেরিকা, ইতালি, ব্রাজিল, ইউরোপে এবং ধীরে ধীরে আমাদের ভারতবর্ষের প্রতিটি শহরে – নগরে – গ্রামে-গঞ্জে। আফ্রিকার জঙ্গলে আদিবাসীদের মধ্যে ও ছড়িয়ে গেল সেই অদ্ভুত কোভিড-১৯। প্রায় একবছর পূর্ন হল, এখনও তার মুখের শিকার হয়ে চলেছে কত যে বৃদ্ধ – শিশু – নর-নারী বিশেষ করে যাঁরা – বিভিন্ন হাসপাতালে সেবারত ডাক্তার, নার্স, গবেষক এই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার ‘ভ্যাকসিন’ বানাবার চেষ্টা করছেন, – যাঁরা অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন, মৃত্যু পথ যাত্রীদের অন্তিম সংস্কার করছেন, তাঁরা শত সাবধানতা নেওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুলোকে যেতে বাধ্য হচ্ছে ঐ ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণু সংক্রমিত হয়ে। তাঁদের পরিবারের মানুষ প্রিয়জনদের সহকর্মীদের স্বান্তনা জানিয়ে – সাহস জুগিয়ে পত্র রচনা করে চলেছি – মনের খাতায়।
এছাড়াও অনেকে যাঁরা কোভিড ১৯ এর জন্য নয় কিন্তু পরোক্ষোভাবে – তার প্রতাপে Lockdown হওয়ার জন্য সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় – সু-চিকিৎসা, ওষুধ পথ্যের অভাবে অসময়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন – তাঁদের উদ্দেশ্যেও সমবেদনার বার্তা পাঠাই আমার অলিখিত সব চিঠির মাধ্যমে। –
আজ মনে হল, আমরা সবাই তো এখন মহা শ্মসানের ধারে মোহনার কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময় অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে যেসব মানুষের চলে যাওয়া হৃদয়কে মুচড়ে দিয়ে গেল, সেই কয়েকজন ব্যক্তিকে লেখা চিঠিগুলি যদি লিপিবদ্ধ করে যাই তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা জানবে এই সময়টা আমাদের এই যুগের সব দেশের, সব জাতের সাধারণ মানুষকে কতটা আলোড়িত করে তুলেছিল। তাদেরকে লেখা পত্র লেখনী এটি।
১) প্রথমে একজন দিল্লীর বন্ধু শিবানন্দ গুপ্ত, ২) নিজের দেশের সমাজ সুধারক আর্য্যসমাজের সন্ন্যাসী “ভাপা শ্যাম রাও”, ৩) সুদূর আফ্রিকার ডাক্তার সোমালিয়া বাসী ডঃ হাওয়া আবেদি, ৪) আমার প্রিয় পরিবারের সদস্য পার্থ গুপ্ত, ৫) আমার প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শেষে ৬) ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদা।
প্রথম চিঠি শিবানন্দ গুপ্ত মহাশয়কে
প্রিয় শিবানন্দ,
সুন্দর, সতেজ, হাস্যোজ্জ্বল, সহৃদয় এক বুদ্ধিমান বিচক্ষণ মানুষ ছিলে তুমি। এখনো প্রৌঢ়ত্বের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা দিয়ে মা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে টাটা কোম্পানির সুদক্ষ কর্মবীরের দায়িত্ব পালন করে চলেছিলে তুমি। এতো আনন্দ শান্তি নিরাপত্তা ছিল তোমার সংসারে যার কোন তুলনা করা যায় না। শত্রু ছিল না কোন মিত্র স্বজন তোমার প্রেম প্রীতি ভালোবাসা সিক্ত হয়ে সর্বদা তোমার ও তোমার পরিবারের দিকে তাকিয়ে থাকতো। মা, কন্যা ও পত্নীকে কোনদিন বুঝতেই দাওনি দুঃখ কাকে বলে।
কিন্তু একদিন হল ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট,এটাকে অন্য লোক কোন দুর্ঘটনা মনেই করবে না কিন্তু তোমার জীবনে মোটর সাইকেল সরাতে গিয়ে কোমরে আঘাত পাওয়া একটা বিরাট বড় চাবুকের আঘাত আনলো জানি। ওই ব্যাথার উপশম করতে গিয়ে ধরা পড়ল সেই মারণ রোগের অত্যাচার ও বিস্তারের কথা, – তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত।
পৃথিবীতে তখন সেই ভয়ঙ্কর দানবের চেয়েও এক দুর্দমনীয় পিশাচী রোগ ‘করোনা’ ভাইরাস তার তান্ডবলীলা দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। তাই হাসপাতালে ডাক্তার নার্সরা ল্যাবের পরীক্ষকের সামনে শুধু ঐ ভীষণ কোভিড ১৯ এর রুগীদের ভিড়। অন্য যে কোন রুগী হলেন একেবারে উপেক্ষিত।
শিবানন্দ তুমিও সুচিকিৎসা অর্থাৎ ঠিক সময়ে Ray বা Chemotherapy কিছুই পেলে না। অসহায় প্রিয়জনের চোখের সামনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে। বহু কষ্টে অর্জিত ধন সম্পত্তি এবং সেবা করার মতন তিনজন মমতাময়ীর ছয়খানা হাত ও ছয়খানা ব্যাকুল নয়ন সর্বদা তোমাকে আগলে রাখলেও শেষ রক্ষা হল না তোমার। লকডাউন-এর মধ্যে গৃহবন্দী নির্ভেজাল খাঁটি, সৎ সাহসী এক মানুষের দেহের শক্তি ক্রমশঃ শুষে নিতে লাগল ঐ ক্যান্সারের রক্তবীজ দানব। তুমি সকলকে ছেড়ে চলে গেলে সেই অনন্ত লোকে। তোমার মা পুত্র শোক সহ্য করতে না পারায় তার কিছুদিনের মধ্যেই তোমার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন, তাঁর আত্মাও মিলিত হল সেই শান্তিময় পরমাত্মার সঙ্গে।
নিজের লোকের শোক প্রশমিত হয় যখন আরও অনেকের তরতাজা প্রাণ ভালোভাবে ওষুধ পথ্য অপারেশন এর সুযোগ না পেয়ে চলে গেছে এই ২০২০ সালে তাদের কথা জানতে পারলে। তোমার ও তোমার পরিবারের নিকট ও দূরের আত্মীয়স্বজন, অফিস বা সব প্রিয় প্রতিবেশীদের সমবেদনা জানাবার উপায় না পেয়ে আমার এই খোলা চিঠির অবতারণা। স্বান্তনা দেবার ভাষা নেই, তোমার স্নেহধন্যা কন্যাকে। শুধু বলব সে তো তবুও সময় পেয়েছিল, তাকে পিতা প্রস্তুত না করলেও নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতন শিক্ষা, দীক্ষা ও যোগ্যতা দিতে পেরেছেন, – কিন্তু সুদূর সোমালিয়ার চাকুরীরত একজন অত্যন্ত উৎসাহী প্রাণবন্ত যুবকের হঠাৎ চলে যাওয়ার কথা ভাবো তো – তা হলে তোমার পরিবারের মানুষের মনের চাঞ্চল্য কমতে পারে। আমার কাকা আশীষ গুপ্তের পুত্রের কথা তোমায় স্মরণ করতে বলি।
জীবিকার প্রয়োজনে তরুণী পত্নী ও এক শিশুপুত্র ও বৃদ্ধ মা বাবাকে দেশে ফেলে রেখে সেই রাজন গুপ্ত আফ্রিকায় অফিসে চলে গিয়েছিল। সেখানে নানাভাবে সে কাজে ব্যস্ত রাখতো নিজেকে। রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামীজীদের কাছে গিয়ে নানান সমাজসেবা মূলক কাজে মেতে থাকতো। স্ফূর্তিতে ভরপুর ছিল সে। যখন সুদূর চীন দেশের কোভিড ১৯ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আফ্রিকার ঘন অরণ্য ভেদ করে আদিবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেখানের মানুষেরাও রেহাই পেলেন না। মাত্র কয়দিনের জ্বরে শ্বাস কষ্টে সে বিনা চিকিৎসায় স্বজন বান্ধব হারা অবস্থায় একাকী মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েও নিজের অবিনাশী অচ্ছেদ্য আত্মাকে তার সুন্দর সুঠাম যৌবনের সমস্ত শক্তি সমৃদ্ধ দেহের খাঁচায় আর আটকে রাখতে পারল না। সে বিনা কোনও ভূমিকায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক অভিমুন্যর মতন মৃত্যুর দেবতার সামনে আত্মসমর্পণ করল। তাঁর পরিবারের মানুষ জানতেও পারল না কখন কেমন করে তার জীবন নাট্যমঞ্চের যবনিকা পতন হয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্যে দশরথ রাজার তীরে বিদ্ধ ‘শ্রবণ কুমারের’ জন্য অন্ধ পিতা মাতা যেভাবে স্বান্তনা লাভ করেছিলেন, আমরাও সেই ভাবে কবিগুরুর ভাষায় বলব – “যাও রে অনন্ত ধামে – মোহ মায়া পাসরি দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি”। তার পরিবারের অসহায়তা বৃদ্ধ মা বাবা, তরুণী স্ত্রী ও কিশোর পুত্রের কথা ভাবলে তোমার স্ত্রী ও কন্যা হয়তো মনে জোর পাবেন। ভাববেন তাদের জীবন তো পিতা শিবানন্দ অনেক সুরক্ষিত করে গেছেন।
অন্ধ্র প্রদেশের Vepa Shyam Rao ২১শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। Law এবং management পাশ করে কলকাতায় প্রফেসর হয়ে কাজে যোগ দেন। আর্য্য সমাজের দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাবধারায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন নাম হল স্বামী অগ্নিবেশ। আজকের পত্র আমি তাঁকে লিখতে উদ্যত হয়েছি কারণ ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি স্বর্গ লাভ করেছেন দিল্লীতে।
দ্বিতীয় চিঠি স্বামী অগ্নিবেশকে
শ্রদ্ধেয় স্বামীজী,
প্রথমেই আপনার চরণে শতকোটি প্রণাম জানাই। আপনি আর ইহজগতে নেই, আমার মতন হাজার হাজার নর-নারীর মনে কিন্তু আপনি অমর হয়ে আছেন। শত সহস্র শিশু শ্রমিককে আপনার কৃপা লাভে ধন্য করেছেন, সে কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি। তাদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে মানুষ হবার সুযোগ পেল, যারা হরিয়ানার ‘Stone Quaries’ মাত্র পাঁচ টাকার Bonded Lebourer ছিল, তোমার হাতের ছোঁওয়ায় তারা মুক্তি পেল, তারা তোমাকে ভগবান মনে করে। সিল্ক ফ্যাক্টরিতে বা Tannery তে বিষাক্ত ক্যামিক্যাল এর মধ্যে কাজ করতে করতে মালিকের মার খেতে খেতে Beast of Burden এর মতন জীবন কাটিয়েছে তাদের হৃদয় মন্দিরে তোমার মূর্ত্তি আজ জ্বল জ্বল করে কারণ তুমি তাদের উদ্ধার কর্ত্তা।
আমরা তখন গৃহবধূ, শিক্ষিকা, মা হয়ে তোমায় প্রণাম জানাচ্ছি দূর থেকে। লক্ষ্ণৌতে কার্পেট ফ্যাক্টরিতে যে পাঁচ থেকে আট বছরের শিশুগুলির হাত পা বেঁকে গিয়েছিল, দিনরাত ছোট ছোট হাতে তারা কার্পেট বুনে যেত। শিশুদের সঙ্গে পিতামাতারাও ছিল বন্দি। সেই সব দলিত শ্রমিকদের অভিশপ্ত অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য তুমি যে কত সংগ্রাম করেছো – তার পরোক্ষ দর্শক আমরা।
‘দাসত্ব প্রথার’ মতন আমাদের স্বাধীন ভারতেও যে বহু শিশু এখনো ছোট ছোট আঙুলে বিড়ির কারখানায় দিনরাত কাজ করে তাদের আঙুলে ঘা করে ফেলেছিল, কেউ তা লক্ষ্য রাখেনি। তুমি নিজে উকিল ছিলে তাই আইনের দরজায় হাজির হয়েছো, তর্ক-বিতর্কের দ্বারা বিচারকদের মনে দয়ার সঞ্চার করতে, সমস্ত দেশবাসীকে, ওই সব ভূমিহীন বন্দি শ্রমিকদের জাগ্রত ও সচেতন করতে। উঁচু জাতির ধনী লোকেদের কাছে তাই তুমি ছিলে চরম শত্রু আর গরিবদের পরম বন্ধু, তুমি সক্রিয় হয়েছিলে আমাদের মতন মধ্যবিত্ত ছা পোষা, গৃহী মানুষের কাছে এক আদর্শ সন্ন্যাসী। হিন্দু ধর্মের সবরকম কুসংস্কার বর্জিত এক দরদী আর্যপুত্র।
১৯৮১ সালে একদিন কচি ছেলেটি কে বুকে জড়িয়ে আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে ভাবছি যে আমরা যদি এই শহরে না জন্মে ঐ গ্রামের দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করতাম, তাহলে তো আমাদের অবস্থাও ঐ রকম হতো। দূরদর্শনে তো তখন এখনকার মতন এতো খবর পাওয়া যেত না, সাংবাদিকেরাও এত সাহসী বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি। সব সত্য তথ্য আমরা জানতেও পারতাম না। কিন্তু সেদিন যখন খবর কাগজে বা টিভি তে সংবাদ বেরুলো তোমার জয়লাভের তখন আনন্দে চোখে জল এসে গেল। আমরা জানতে পারলাম স্বামী অগ্নিবেশ ‘The Bonded Labourer – Liberation Front তৈরী করে, অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করেছেন এবং জমি ফ্যাক্টরিতে বন্দি শ্রমিকদের উদ্ধার করতে উদ্দ্যত হয়েছেন, কোর্টের কেসেও তিনি জয়ী হয়ে প্রায় ১,৭৮,০০০ লোকের জীবনে মুক্তির আলো দেখাতে সফল হয়েছেন তখন আনন্দে এই তরুণী মায়ের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। এই এক লক্ষ আঠাত্তর হাজারের মধ্যে ছাব্বিশ হাজার ছিল শিশু ও কিশোর যাদের স্কুলে যাওয়ার বা নতুন ধরনের সব প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হল। তারপর থেকে নতুন আশায় আনন্দে তারা নতুন করে বাঁচবার পথ খুঁজে পেল।
স্বামীজী, তুমি ব্রাহ্মণদের মতন কোন দেব-দেবীকে মানতে না বলে হিন্দু পন্ডিতদের কাছে ছিলে অবজ্ঞার পাত্র-ব্রাত্য। অহিংসার পূজারী গান্ধিজী, ও সাম্যের মতবাদ প্রচারে বিশ্বাসী কার্লমার্ক্স এর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে Vedic – Socialism আনতে চেয়েছিলে আমাদের ভেদাভেদপূর্ন সমাজে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই তোমার ভালোবাসার পাত্র ছিল।
আমার মনে পড়ে ছত্তিশগড়ের সেই জঙ্গল রাজের হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নকশালদের কার্যকলাপের একটি ঘটনা। একবার তারা যখন কিছু পুলিশ কর্মীকে ধরে নিয়ে যায়, তখন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে তুমি সেই গভীর অরণ্যে তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং ২০ মাইল দূরের গভীর জঙ্গলে উগ্রবাদীদের সঙ্গে বসে বার্ত্তালাপ করে তাদের মধ্যে শান্তির বাণী শুনিয়ে পাঁচজন পুলিশ কর্মচারীকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলে। পুতুল পুজোর বিরোধী রাজা রামমোহন দয়ানন্দের মতন নিরাকারবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই বহু গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে।
‘নবেল শান্তি’ পুরষ্কার পাওয়ার জন্য সেদিন কিন্তু আমাদের দেশের নেতারা কখনো তোমার নাম পাঠায়নি। দেশের সর্বোচ্চ যে সব সম্মানীয় উপাধি আছে – ‘পদ্মভূষণ’, ‘ভারতরত্ন’ দেবার কথাও কেউ ভাবতে পারেনি, কারণ তুমি কোন দলের অন্যায়কে মেনে নিয়ে বা নিজের স্বার্থে যশের লোভে কোন কাজ করোনি। দেশের উচ্চবিত্ত – উচ্চবর্ণের – ক্ষমতাশালী বহু মানুষের তুমি শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। গুন্ডা দিয়ে তোমার কাজ ভন্ডুল করা হয়েছে। তোমাকে এবং তোমার অনুগামীদের মারধর করে রাস্তা বন্ধ করে উদ্ধার কার্য বন্ধ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা এই পৃথিবী থেকে সরাতে চেয়েছে। হতাশ হলেও, দুঃখ পেলেও হাল ছাড়োনি তুমি। এই ৮০ বছর বয়সে বহু অভিমান, অভিযোগ, নৈরাশ্য বুকে নিয়ে এই কোভিড-এর সময় দিল্লীর ‘লিভর হাসপাতালে’ তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে। বিদেশের ম্যাগাজিনে তোমার খবর পড়ে গভীর শোকাচ্ছন্ন মন শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফেলে প্রার্থনা করল, আবার যেন দুঃখী ও অসহায়ের মাঝে ফিরে আসো তুমি, জন্ম নাও আমার সন্তানের ঘরে। স্বামী অগ্নিবেশ প্রণাম তোমায়। –
“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে
তুমি ধরায় আসো, সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো
পাগল ওগো, ধরায় আসো।”
স্বামীজী,
তোমাকে আমার বিবেকানন্দের আর এক প্রতিনিধি মনে হত, যদিও তুমি রামকৃষ্ণ মিশনের মতন কালীপুজো, দুর্গাপুজো করোনি, তাদের মতাদর্শের বা গোষ্ঠী পরিচালনার সঙ্গে তোমার সম্পূর্ণ অমিল ছিল, কিন্তু তবুও মনে হয় – বিবেকানন্দ – নেতাজিরা – ভবিষ্যৎ ভারতে তোমার মতন নেতা – সৎ সাহসী, নিঃস্বার্থ কর্মবীরদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। আমি ঠাকুর ও শ্রীশ্রী মা এবং স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত হয়েও মনে করি এখন তোমার মতন হাজার হাজার ত্যাগী, নির্লোভী সন্ন্যাসীদের বড় প্রয়োজন। দুঃস্থ, পতিত, দলিত তথা যে কোনও অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য নরেন তাঁর গুরুভাই ও ভক্তদের উদ্বুদ্ধ করতেন। ঘটা করে পুজোর ঘন্টা শঙ্খ ধ্বনি নয় এবার “মানব পূজারীদের” আহ্বান জানাতেন তাঁরা। বড় বড় মন্দির মসজিদ গুরুদ্বারে অথবা তার তোরণ নির্মাণ, পাথর কিম্বা সুবৃহৎ ধাতব মূর্ত্তি বানিয়ে অর্থ নষ্ট না করে এই চরম দুঃসময়ের দিনে হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক, হস্তশিল্পী, জমাদার-ঝাড়ুদার, ঘরের কাজের চাকর, পথে পথে ফল সব্জি বিক্রেতা, সব নিম্ন মধ্যবিত্ত বা অভাবগ্রস্থ অনাহারে বিনা চিকিৎসায় জীর্ণ শীর্ণ হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য তরুণ সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতেন বিবেকানন্দ। আশীর্বাদ করতেন ‘স্বামী অগ্নিবেশ’-এর মতন দরদী ব্যক্তিদের কারণ তাঁর মতে –
“বহু মুখে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা
খুঁজিছ ঈশ্বর –
জীবে প্রেম করে যেই জন,
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
তৃতীয় চিঠি এক বিদেশিনী কে
পরম শ্রদ্ধেয়, Respected Late ‘Hawa Abdi’- আফ্রিকার ‘সোমালিয়ায় মোগাদিস্যুতে’ ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে জন্ম লাভ করেছিলে তুমি নিজের দেশের এক অসম্ভব দুঃসময়ে। মাত্র তেরো বছর বয়সে অন্তঃসত্তা হয়েছিলে child marriage এর শিকার হয়ে। আর কিশোরী শরীরের ওপর পাশবিকতার লালসার অত্যাচার সহ্য করতে পারোনি তুমি, তাই সন্তানের মৃত্যু হয় তোমার জঠরে। নিজের মা কেও তুমি দেখেছো অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। অন্তঃস্বত্তা নারীর প্রসব যন্ত্রনা ভোগ করা বা পৃথিবীতে পুত্র কন্যাকে নিয়ে আসার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে সোমালিয়ার হাজার হাজার মায়ের জীবনে আনন্দ ও শান্তির বার্ত্তা বহন করে আনতে চেয়েছো তুমি। তাই স্বামী পরিত্যক্ত (মুসলমান সমাজের কন্যা) হয়েও তুমি অসীম সাহস দেখাতে পেরেছো মাত্র ১৭ বছর বয়সে। পিতার অনুমতি নিয়ে ‘রাশিয়ায়’ ডাক্তারি পড়তে গেছো বহু বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। শুধু সাধারণ ডাক্তার নয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হবার মতন উচ্চতর শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে নিজের দেশে ফিরে এসেছো।
ডাক্তার মা, এরপরে তুমি শুধু বাচ্চা প্রসবের দায়িত্ব নাওনি সমাজ সুধারকের ভূমিকাতেও কাজ করতে শুরু করেছো।
আমরা যারা তোমার থেকে অনেক দূরে, সুদূর ভারতবর্ষে বাস করি তারা তোমার কথা অনেক পরে জানতে পেরেছি। আর যতই জানছি মুগ্ধ, বিস্মৃত, হতবাক হচ্ছি।
মা গো, –
তোমার অসীম কৃপায় ধন্য হয়েছেন তৎকালীন বহু বিপ্লবী, সোমালিয়ার সমাজ ও রাজনীতিতে গৃহহীন জঙ্গলে আশ্রয়কারী বহু আহত গুলিবিদ্ধ তরুণ যুবককে তোমার ছোট্ট হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সাহসের ভরে অপারেশন করে গুলি বের করে, রক্তপাত বন্ধ করে প্রাণ বাঁচিয়েছো তুমি। তখন কেউ কেউ অবাক হয়ে গিয়েছিল তোমার কুশলতা ও দক্ষতা দেখে। মেয়ের প্রসব করার হাসপাতালে শত শত সৈনিক তোমার হাতের সেবা পেয়ে পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।
জঙ্গলের মধ্যে একটি পুরো গ্রামকে ঘর বানিয়েছো তুমি। ৯০,০০০ মহিলা থাকেন সেখানে, তাঁদের পুরুষেরা বেশির ভাগই মারা গেছেন বা উগ্রবাদী হয়ে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
সেই সময় তোমার দুটি কন্যা রত্ন জন্মায়। তাদেরও তুমি তোমার পথের অনুগামিনী করেছো। তোমার সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারাও ডাক্তারি পাশ করে সুচিকিৎসক হয়ে যোগ দিয়েছেন তোমার হাসপাতালে। গ্রামের মেয়েরা পড়াশোনা শিখে নার্স হয়ে সেবাকর্মের যজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ধন্য তোমার শিক্ষা। এখানে তুমি সবাইকে শেখাতে পেরেছো “Sitting is empty, Working is plenty” তোমার ঠাকুমার এই বাক্যটি সর্বদা মনে রেখে কর্মযোগীর মতন কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলে তুমি।
তোমার প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা জানাই। ১৯৯০ সালে কত যোদ্ধাকে পথ থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে তুমি, সে কথা পড়েছিলাম কোন পত্র বা পত্রিকায়। ২০১১ সালের চরম দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে উদ্দ্যত হয়েছিলে তুমি। পুষ্টি যুক্ত “শরগুন ঘাসের” বা মিলেটের রুটি খাওয়াতে দেখা গেছে তখন তোমায় অভুক্ত মানুষদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে। কারন তুমি জানতে শরগুন ঘাসে অনেকরকম নিউট্রিয়েন্ট থাকে।
তোমার গ্রামে নারী ও শিশুরা নির্ভয়ে বাস করে। মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী হলেও কোনরকম গোড়ামি বা কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দাওনি তুমি। তাই ২০১০-এ একবার এক Islamic Militantsরা তোমার ওপরে ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায় এবং তোমার ঐ সুন্দর সাজানো বহু কষ্টের তৈরী হাসপাতালে আক্রমণ চালিয়ে ভেঙে চুরে তছনছ করে দেয় সব যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটর।
কোন পুরুষ সেই গ্রামে নারী নির্যাতন করতে সাহস পান না। তাহলে তাকে সব মেয়েরা মিলে বন্দি করে রাখে এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। এটা তোমার নিয়ম তৈরী করা আছে ওখানে। ৭৩ বছর বয়েসে ৫ই আগস্ট কোভিড-এর দুঃসময়ে তুমি ইহলোক ছেড়ে চলে গেলে। অত্যন্ত দুঃখে ভেঙে পড়েছে সমস্ত ‘মোগাদিস্যুর’ মানুষ, আমরাও তোমায় প্রণাম, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই।
চতুর্থ চিঠি নিজের ভাইকে
স্নেহের ভাই বাচ্চু, –
কোভিড ১৯ আক্রমণের ২ মাস আগে আমার স্বর্গীয় পিতা ডঃ কল্যাণী প্রসাদ গুপ্তের শতবর্ষ জন্ম উৎসব উদযাপনের জন্য বাঁকুড়ায় গিয়েছিলাম, তখনই তোর সাথে আমার শেষ দেখা।
আকাশ ভরা সূর্য্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ – আমাদের মনে এক অপূর্ব আনন্দ ও উন্মাদনা জাগিয়েছিল, আমার মন নেচে উঠেছিল তোর গানের তালে। সেই ছোটবেলার দিনগুলোকে আবার ফিরে পেয়েছিলাম আমরা।
তুই শান্তিনিকেতন থেকে আসতিস এবং আমি বেথুন স্কুলের হোস্টেল থেকে। গরমের ছুটিতে, পুজোর ও বড়দিনের সময়ে আমাদের পূর্ন ভবনের গোল ঘর নাচে, গানে, নাটকে, আবৃত্তিতে মুখর হয়ে যেত – সঙ্গে থাকতো মায়ের উদ্দাত্ত কণ্ঠস্বর ও হারমোনিয়াম বাজনা।
ছোট ভাই সিদ্ধার্থ তখনও গিটার বাজাতে বা গান গাইতে শুরু করেনি। সুর লহরীতে ভাসতেন বাবা, গনুদাদা বা আগত অনেক আত্মীয় স্বজন। কখনও ‘বাল্মীকি প্রতিভার’ সব গানগুলো ছাড়া গলায় একাই গাইতে পারতিস তুই।
ডাকাতদের অভিনয় দেখাতিস নেচে নেচে –
“প্রাণ নিয়ে তো সঠকে ছি রে – – –
ওরে বরা – – – ।
মোহরদী, নীলিমাদির গল্প শুনতাম আমরা তোর কাছে। সলিল চৌধুরী সবিতা চৌধুরীর গান শুনতে কেমন করে হোস্টেলের পাঁচিল ডিঙিয়ে তোরা বীরেন দা, কণিকা দি (মোহর দি)র বাড়ির আসে পাশে ঘুরে বেড়াতিস – সেই সব গল্পে মোহিত হয়ে থাকতো তোর এই ছোড়দি ভাই।
আমার খুব মনে হত সুযোগ পেলে তুইও ‘দেবব্রত বিশ্বাসের’ মত বড় শিল্পী হবি। তোর গলার ভরাট আওয়াজ ও গায়কী ঢঙটা ঠিক ওনার মতোই ছিল।
স্কুল পাশ করে ‘সংগীতভবনে’ কিম্বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকের জগতে যদি ভর্তি করা হত তোকে তাহলে হয়ত বড় একজন গায়ক বা অভিনেতা রূপে তোর আত্মপ্রকাশ ঘটতো। কিন্তু তা হয়নি।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে একটি গান শুধু পূর্ববঙ্গ নয় পশ্চিমবঙ্গেও ভীষণ ভাবে গাইতে শোনা যেত। “শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে – – -” সেই গান তোর গলায় শুনে গায়ে কাঁটা দিতো আমার। মনে হত সব ছেড়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিতে চলে যাই। বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে একটা নতুন দেশ গঠনের ঘটনা, তাজা তাজা প্রাণের বলিদান ও হাজার হাজার মানুষের গৃহ ত্যাগের খবর নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠতাম আমরা দুই ভাই বোন। ভাবতাম আমরাও এই সমাজের জন্য কিছু কাজ করব – শিল্প, সাহিত্য, সংগীতের সাধনায় নিজেদের প্রাণ মন ঢেলে দেব। কিন্তু না, অদৃষ্টের চাকা আমাদের অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। তুই ওষুধের দোকানি ছা পোষা মধ্যবিত্ত ও আমি সংগ্রামী এই প্রবাসিনী গৃহবধূ হয়ে দুই বিপরীত ধর্মী পরিবেশে খুবই সাদামাটা জীবনে বন্দি হয়ে গেলাম।
থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় —- দোকানে দোকানে ওষুধ বেচা, বাজার করা, ছেলেকে স্কুলে এবং সে ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পরও মেডিকেল কলেজে পৌঁছানো। স্নেহশীল পিতা – দায়িত্বশীল স্বামীরূপে, সহৃদয় পিতা রূপে দিনের পর দিন একই গতে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার আবর্তে ঘূর্ণায়মান তোর সময় কেটে যেতে লাগল। সেই সব বয়ে চলা সময় যখন একই ঢেউয়ের তালে তাল মেলায় তখন তবুও একটা ছন্দ হয়ত থাকে কিন্তু স্ত্রীর – জীবন সঙ্গিনীর অসুস্থ হওয়া এবং বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ায় সেই মন্দাক্রান্তা ছন্দের লয় হঠাৎ সব ওলোট পালট করে দেয়। সবাই ভাবে ঐ ছা পোষা নির্ভেজাল সাদাসিধা মানুষটি এবারে একেবারে ভেঙে পড়বে। কিন্তু তোর হৃদয়ের প্রেমিক শিল্পী সত্ত্বা যেন একটা কাজ খুঁজে পায়। একজন মহিলা নার্সের মতন ঐ রুগ্ন পত্নীর পাশে বসে সেবায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্রতকে বুকে চেপে ধরলি তুই ভাইটি। তাও তো তাকে রক্ষা করতে পারলি না।
বাচ্চু, তোর দিনগুলো কিন্তু এক অসাধারন অন্য অনুভবে উপলব্দ্ধিতে এরপর থেকে – অন্য এক জগতে উন্নীত করে দেয় তোকে। ওষুধের ব্যবসা তোর লাটে উঠেছে, নিজস্ব পুঁজি শেষ হয়ে গেছে – কিন্তু ছেলের মাইনের টাকায় সংসার চলতে আরম্ভ হলে আর্থিক স্বাধীনতা হারিয়ে ছেলের অধীনস্থ হতে হতে ক্রমশঃ নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়ে গেলি তুই। স্ত্রী বিয়োগে পুত্রের প্রতি মোহ আরও বাড়তে শুরু হল। হীনমন্যতা ও হতাশায় ভুগতে লাগলি তুই।
সর্বদা পাশে থাকার, কথা বলার মানুষটিকে হারিয়ে দিশাহারা একাকী একেবারে অসহায় হয়ে গেলি তুই। আমরা ভাই বোনেরা তোর ছোট বেলার সঙ্গী বন্ধুরা কেউ কিছুই করতে পারলাম না।
জীবনের সংগ্রাম একদিকে মানুষ চিনতে শেখালো আমাদের। বাস্তব জগতের নানা সমস্যার সমাধা করতে গিয়ে আমরা হয়ত দৈহিক – মানসিক ও আবেগের ভারসাম্য ক্রমশঃ হারিয়ে ফেলতাম, কিন্তু সমস্ত দুঃখ আবার ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতাম। প্রবাসে বাস করে আমার একটা সুবিধা ছিল, নানা জাতের, নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষের প্রভাব। কিন্তু কূয়োর ব্যাঙের মতন শুধু বাঁকুড়ার গন্ডিবদ্ধ জীবনে তুই আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলতে লাগলি তোর সাহস তথা মনের জোর। নানান ‘সাইকোসোমাটিক’ রোগে ধরল তোকে। শিশির বিন্দুর মতন অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালো লাগা, ইচ্ছেগুলোও দ্বন্দ্ব – দায়বদ্ধতা এবং প্রকাশ করতে না পারা ক্রোধের উত্তাপে শুকিয়ে গেল, উবে গেল। অনেকবারই –
তোর ছোড়দিভাই সর্বদা তোকে বাঁচাতে, ঐ নৈরাশ্য থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছে, নিয়ে আসতে চেয়েছে নিজের বাড়িতে – নিজের সুন্দর শান্তিময় স্নেহছায়ায় – গল্প কথা গানে এবং ভ্রমণের লোভ দেখিয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। সেই হানিমুনের নামে একবার স্বস্ত্রীক তুই এসে হরিদ্বার, হৃষিকেশ ঘুরে গেলি, পরে কিশোর পুত্র কে নিয়েও একবার এসে ঘুরে গেলি দিল্লী। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় খুব তাড়াতাড়ি বার্দ্ধক্য এসে গেল তোর মধ্যে। যখনই কথা বলি শুধু হতাশা, হাহাকার ও নৈরাশ্য ভরা দীর্ঘশ্বাস, আমাকে বড্ড ব্যথিত করতো।
একবার ভাইফোঁটায় বাচ্চু ভাইকে ফোঁটা দেব – আনন্দে রাখব – কিছুদিন মনের সুখে সেবা করব – যা খেতে ভালোবাসে বা শরীরের প্রয়োজনীয় সেই সব ফল/মূল/মাছ/মাংস খাওয়াব এই আশা বুকে নিয়ে খুব জোর লাগলাম। ট্রেনের টিকিটও কাটা হল। কিন্তু পারিবারিক ও শারীরিক সমস্যা তোকে বাধ সাধল। শেষ দিনে টিকিট ক্যানসেল করে দিলি তুই।
খুব দুঃখ পেয়েছিলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি। আবার উঠে পড়ে লেগেছিলাম আমাদের বাবার জন্ম শতবর্ষের উৎসব উদযাপনের বাহানায় আবার আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে একত্রিত করে একটা আনন্দ সমারোহ করতে।
২০১৯ সালের ২০শে অক্টোবর সেই অনুষ্ঠানে তোকে দিয়ে গান গাওয়ালাম। আত্মীয় বন্ধু শহরের ১০০ জন বিদগ্ধ দর্শক, বাবার ছাত্র ছাত্রী ও পরে আমাদের ছেলে বৌমারাও শুনলো সেই গান। তোকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তোর আত্মবিশ্বাস জাগানোর জন্য ৭০ বছরের ছোড়দি সেই পার্থ গুপ্তের গানে নাচও করে ফেললো আনন্দের তোড়ে ভেসে গিয়ে। তোর বাড়ি গিয়ে জামাইবাবু নির্মলদা ও আমি অনেক counselling করলাম। কথা দিলি আবার তুই গান-বাজনা ভ্রমণের আনন্দে জুটে যাবি। কোভিড ১৯ এর করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরু হল তার মাত্র ২/৩ মাসের মধ্যেই।
গৃহবন্দী হয়ে বন্ধু-বান্ধব – বাইরের খোলা হাওয়া – দ্বারকেশ্বর নদীর ধার, রাজগ্রামের তাঁতীপাড়ার সহজ সরল মানুষ, বাড়ির অনতি দূরের ভৈরব স্থান – স্টেশনে ছেলের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় প্লাটফর্মে কুলিদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠা – চা চপ খাওয়া – প্রতিবেশী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাড়ি গিয়ে ঘরেলু আড্ডায় সময় কাটানো সব বন্ধ হয়ে গেল তোর। ভাগ্যলক্ষী যখন মানুষকে ত্যাগ করেন, তখন বোধহয়, ধন দৌলতের চেয়ে বেশী মানুষ তার নিরাপত্তা ও শান্তি কে হারিয়ে ফেলে।
কেউ অবজ্ঞা না করলেও সর্বদা মনে হয় – আমাকে এরা বোধহয় আর সহ্য করতে পারছে না। আমি চলে গেলেই ভালো হয়। বাঁচার ইচ্ছে হারিয়ে যাওয়ায় ঠাকুরও হয়তো তোর মিনতি শুনলেন। অতিরিক্ত ডায়াবিটিস, আর্থারাইটিস, রক্তের উচ্চ চাপ তো ছিলই তার সঙ্গে যুক্ত হল নার্ভের রোগ, হাত পা কাঁপা। বিষাদ ভাবনা তোকে মাত্র ৬৫/৬৬ তেই ৮০/৮৫ র মতন বার্ধক্য যন্ত্রনায় অস্থির করে মৃত্যু দেবতাকে খুব তাড়াতাড়ি ডেকে আনলো। তারওপর দুই চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে এলো তোর। তাই এই পরপারের অন্তিম যাত্রা তোকে সব ব্যাথা বেদনা ক্লেশ এবং নৈরাশ্য থেকে মুক্তি দিল – তা জেনে হয়ত আমি মনকে স্বান্তনা দিলাম সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে। কিন্তু কোভিড দানবের অত্যাচার না হলে হয়তো আমাদের আবার দেখা হতো। তাই পরোক্ষভাবে এবারেও সারা দোষ ঐ গৃহবন্দী দশা সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসের ওপর ন্যস্ত হল।
আমি তোকে গতবছরে অনুরোধ করেছিলাম বন্ধ ওষুধের দোকানটি পরিষ্কার করে ওখানে একটি সংগীত বিদ্যালয় খুলতে। তুই বসে বসে শুনবি। অন্যান্য গানের নাচের বা গিটার তবলার মাস্টারমশাইরা এসে সময় ধরে শেখাবেন। নতুন নতুন ছাত্র-ছাত্রী-শিশুদের-কিশোর-কিশোরীর কলকাকলিতে ভরে উঠবে তোর গৃহের অঙ্গন। সংগীতের মূর্ছনায় তোর রোগ ও শোক উপশম হবে।
কিন্তু সে ইচ্ছে আর পূর্ণ হল না। “তোমার অসীমে” গানটা প্রায় গাইতিস, আমিও আজ তাই গুরুদেবের কথা শুনিয়ে তোর চিঠিটার ইতি টানছি। এই ভারতবর্ষের ঘরে বসে এখন যদি ইন্টারনেটের সুবাদে কানাডা আমেরিকার মানুষের সঙ্গে চাক্ষুস দেখে বার্তালাপ করতে পারা যায়, তাহলে এই চিরন্তন আত্মা এখন যেখানেই থাকুক না কেন ঠিক এই চিঠির শব্দ অনুধাবন করতে পারবে। আমার জীবাত্মা তোমার পরমাত্মায় লীন হওয়া বিদেহী সত্ত্বাকে নিশ্চয়ই পরশ করতে পারবে। কারন তুমি তো এখন সেই অনন্তধামে দেবলোকে বিচরণ করছো। তাই মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে।
বাচ্চু ভাই – আত্মা অবিনাশী, আমরাও তাই বলি – “হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, যাহা কিছু সব আছে আছে আছে, নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারি নিশিদিন কাঁদি তাই।” কিন্তু এখন সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসায় তরণী এ কর্ণধার।
পঞ্চম চিঠি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে লেখা_ _ _
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সমীপেষু –
সামনে থেকে কখনও কি দেখেছি তোমায়? আলাপ পরিচয় হয়েছিল আমাদের? না বোধহয়। কিন্তু বাড়ির একজন প্রিয় সদস্যের মতন অত্যন্ত চেনা, অত্যন্ত প্রিয় ছিলে তুমি।
অপুর সংসার থেকে বেলাশেষে, হীরক রাজার দেশে, ফেলুদা কোনটাতেই তুমি অভিনয় করো নি এমন একাত্ম হয়ে গিয়েছিলে, যে ওরা সবাই আমাদের মনের মানুষ হয়ে গিয়েছে। তোমার শেষরক্ষা নাটকের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার কিশোরী মন। ‘ঝিন্দের বন্দির’ ময়ূর বাহনের সঙ্গে ‘তিন ভুবনের পারে’ নায়কের কোন মিল ছিল না, কিন্তু তোমার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, চরিত্র রূপায়ণের ক্ষমতা – প্রতিভা – সমস্ত বাঙালীর মনকে আপ্লুত করেছে। ৮৫ বছর কম নয়। জীবনের এই যাত্রা কালে কত মানুষের সম্পর্কে এসেছো তুমি, আমি ‘লক্ষ্মীপুরুষ’ গল্পটি লেখার পর থেকেই ভেবেছি যদি কখনও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই গল্পে বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন।
ও হ্যাঁ মনে পড়েছে সামনে থেকে কবে কোথায় তোমার চেহারা দেখেছি। ১৯৭৩ সালে যখন শান্তিনিকেতনে এম এ পড়ি তখন সত্যজিৎ রায়ের “অশনি সংকেত” এর শুটিং চলছিল কাছেই একটি গ্রামে। আমরা ক্লাস কেটে সেখানে পালাতাম, শুধু তোমায় দেখবো বলে। যেমন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালন ক্ষমতা ও কৌশল তেমনি এক বাচ্চা ছেলের মতন – বাধ্য ছাত্রের মতন তোমার তাঁকে অনুসরণ করা।
ভীষণ ভাল লেগেছিল আমাদের। বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতাকে দেখে হিংসে হত – ও তো আমাদের মতন এক সাধারণ মেয়ে, ও কি করে চান্স পেল, তোমার সঙ্গে নায়িকার রোল করতে – – – আহা আমাকেও যদি নিতেন জীবন ধন্য হয়ে যেত। সত্যজিৎ রায়ের সেট এর আসে পাশে ঘুরে বেড়াতাম সেই জন্য। তখন দেখেছি তোমার কাজের কি নিষ্ঠা। ‘কোভিড’ এর আক্রমণেও আক্রান্ত হলে তুমি সেই অভিনয়ের শুটিং করতে গিয়ে। এই বয়সে গৃহবন্দী থাকতে পারলে না। কাজের নেশা ও অর্থের প্রয়োজন তোমাকে বাধ্য করল। সারা জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী পত্নী ক্যান্সারে ভুগছেন, এবং এই রোগ যার পরিবারে আসে তাদের অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে যান। যে নাতি তোমায় সুখময় সাচ্ছন্দপূর্ণ জীবন দিতে সমর্থ হত সেই নাতি সেই কবে মোটর বাইক দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। তার চিকিৎসার দায়িত্বও তোমার ওপর ছিল, তাই তোমার মনের মধ্যে কত বড় ঝড় চলছিল, তা হয়তো তোমার সহকর্মীরা বুঝতে পারেনি।
সংগ্রামের মধ্যেও অটুট থাকার শিক্ষা দিয়ে গেলে বাঙালী জাতটাকে। কমিউনিস্ট মানসিকতার ছিলে বলে অনেকেই তোমার নিন্দায় সোচ্চার হত। কিন্তু ঐ সাম্যবাদী মন তোমাকে কোন আদর্শের কাছে মাথা নত করতে দেয়নি। কোন অন্যায় দেখলেই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছ, মিছিলে হেঁটেছ সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তোমার শেষ যাত্রায় তাই সব রকম লোকেরাই যোগ দিয়েছে, কোভিড-এর ভয় উপেক্ষা করে। আমরা প্রণাম জানিয়েছি সুদূর প্রবাসে থেকে।
তিন ভুবনের পারে, কোন স্বর্গের দ্বারে
প্রতীক্ষামান তুমি এখন !
জানি না আমরা কেউ।
শুধু মানি ‘কোভিড দানবটা’ যতই অত্যাচার –
উৎপীড়ণ করুক, জব্দ করতে পারেনি,
স্তব্ধ হয়ে গেছে তোমার যুদ্ধ ক্ষমতা দেখে।
সারা পৃথিবীর করোনায় আক্রান্ত
মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তুমি পাঞ্জা লড়ে
মৃত্যুকে চল্লিশ দিন ধরে
ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছো।
আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম – অবাক হয়ে
সেই রণক্ষেত্রের দিকে।
ভাবছিলাম এই বুঝি খবর আসবে –
তুমি ছাড়া পেয়েছো হাসপাতাল থেকে।
একটা রোগ দমন করলেও আর এক
রক্ত-বীজ দানব যে তোমার দেহ পিঞ্জর
কে একেবারে জীর্ন করে ফেলেছিল, তা
জানতাম না আমরা।
আত্মা অবিনাশী – সে তাই আর থাকতে পারল না,
আবার ফিরে গেল পরমাত্মার সঙ্গে
মিলনের আনন্দে স্বর্গ লোকে।
তোমার মন মাতানো হাসি, প্রাণ জুড়ানো
কথা ও বাচিক শিল্পীর অসাধারন
প্রভাব বুকে নিয়ে বাঙালী বেঁচে রইল।
অমরত্ব পেলে তুমি আমাদের মনে।
শ্রদ্ধায় আপ্লুত স্মৃতি শুধু ধরা রইল
আমাদের প্রাণে।
ষষ্ঠ ও শেষ চিঠি ডঃ অমলেশ চৌধুরী – প্রখ্যাত জীব বিজ্ঞানী মেরিন বায়োলজিস্ট – আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মন্টুদাকে
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
দাদা, আপনার কোভিড-এ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাইনি আমরা, শেষ দিনে যে সে আপনাকে মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে একবারে পরাস্ত করবে, সে খবর যখন পেলাম তখন ভীষণ দুঃখ, ক্রোধ, অভিমান জন্মালো ভগবানের ওপর। কেন যে তিনি ঐ করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯ কে দমন করতে পারছেন না, বুঝতে পারছি না। ঈশ্বরের নিষ্ঠূরতার শিকার হচ্ছে কতশত ভালো ভালো প্রাণ। সারা বিশ্ব আজ কাঁপছে, কাঁদছে ও হাহাকার করে উঠছে। ভ্যাকসিন বেরিয়েছে শুনেছি কিন্তু কত দিনে সেই ওষুধ ইঞ্জেকশনে বিষে বিষে বিষক্ষয় করতে সমর্থ হবে জানি না। মানুষ বড়ই অসহায়, নিরুপায়। তার ক্ষমতা কোথায় এই বিশাল শক্তিশালী রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করার। দুর্গাপূজায় হিন্দুরা আকুলভাবে ডেকেছিল মা কে। ঈদের দিন মুসলমান জনতা তাদের আল্লাহর দুয়া মেগেছিল, ২৫শে ডিসেম্বর সারা রাত খৃষ্টানেরা খ্রিষ্টকে স্মরণ করে ঈশ্বরের কাছে একান্তভাবে প্রার্থনা করেছিল, এইবার তো তুমি এই ধরার মানুষকে রক্ষা করো প্রভু। কিন্তু কারো মনোকামনা, ব্যাকুল মিনতি, আকুল আবেগে ঐ ভগবানের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সারাটি বছর ধরে যে তান্ডবলীলা চলেছে তৃতীয়বার সারা আমেরিকা, ইউরোপে আবার তার প্রচন্ড প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে তা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শেষ দিনে ‘পাপিয়ার’ আর্তনাদ শুনতে পেলাম আমেরিকার থেকে – “বাবাকে নিয়ে গেল কোভিড। মা ও হাসপাতালে।”
শ্রীচরণেষু
দাদা, ১৯৭৪ সালে বিয়ে হয়ে প্রথম যখন সেনগুপ্ত পরিবারে এলাম তখন আপনার মাসি আমার মা (শাশুড়ী মাতা) আমায় জানালেন তাঁর পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, সহজ সরল সদস্য মন্টু। অর্থাৎ আমার “ভাসুর” প্রিয় বিজ্ঞানী, নিরাহংকারী স্নেহশীল ‘ডঃ অমলেশ চৌধুরী’ – আমার জীবনে একজন বিশেষ অনুপ্রেরণা উৎসাহ ও স্নেহ প্রদানকারী ব্যক্তি।
যখনই সোদপুরে সেই বিরাট বাগানঘেরা বাড়িতে গেছি, আপনার নিচের তলার আলমারীতে থরে থরে সাজানো নানান সামুদ্রিক জীব এবং মানুষের ভ্রূণ, হাড় কঙ্কাল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি আমি। আমার বিজ্ঞেনের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ও কৌতূহল, নানান প্রশ্ন আপনাকে খুব আনন্দ দিতো। অন্যদিকে দিদিভাই দীপ্তি চৌধুরীর আপ্রাণ চেষ্টায় গড়ে তোলা একটি ‘শিশুপাঠশালা’। কত সুন্দর করে দেওয়ালে দেওয়ালে রকমারী জন্তু জানোয়ারের ছবি, ফুল, পাখি আঁকা – নানান চার্ট পেপারে ছোট ছোট অক্ষরে বা A B C D র সঙ্গে লেখা নানান সব ছড়া, রঙের আঁকিবুকি আমার মনকে বিশেষভাবে আকর্ষিত করত। আমি দমদমে থাকলে হয়তো আপনার ঐ পাঠশালার একজন সক্রিয় শিক্ষিকা হয়ে উঠতাম। নাচে, গানে, নাট্য খেলায় আপনার গৃহের আঙ্গনটি মুখরিত করে দিতে পারতাম। কিন্তু আপনার প্রিয় ভাই “মঙ্গল” (শ্রী নির্মল প্রসাদ সেনগুপ্ত) দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রান্সফার হয়ে দিল্লী চলে এসেছেন তাই সোদপুরের বাড়ি আপনার ও দিদিভাইয়ের স্নেহচ্ছায়া থেকে দূরেই থাকতে হল আমাকে। কিন্তু দুই ছেলেকে নিয়ে বার বার গেছি আমি আপনার কাছে, যাতে সেখানে গিয়ে আপনার কাছে আমার ছেলেরা বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শেখে। পড়াশোনাকে ভালোবেসে জীবনে আপনার মত যশস্বী কিন্তু নিরাভিমানী শান্ত স্নিগ্ধ হতে পারে। তারাও আমার মতন নানান কথা গল্পে প্রশ্নে আপনার গবেষণার কাহিনী শুনতে আপনাকে অতিষ্ঠ করে তুলতো। তাদের আপনি আপনার গবেষণারত ছাত্রদের সঙ্গে একবার সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে পাঠালেন। ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে তারা গভীর জঙ্গলে ছোট ছোট নদীর খালে বিলে ঘুরে মাছ – কচ্ছপ কুমীরের দেখা পেয়ে ভীষণ আনন্দে বিগলিত হয়ে গিয়েছিল।
ছোট ছেলে তো বায়োলজি তে প্রাকটিক্যাল প্রজেক্ট করবার জন্য কোথায় কোন বাজারে গিয়ে দুটো কচ্ছপের ছোট ছোট বাচ্চা কিনে আনলো। আপনি নিজে সঙ্গে গিয়ে সেগুলি কিনতে সাহায্য করেছিলেন। ওরা সারা রাতদিন খট খট করে ঘরে ঘুরে বেড়াতো। ওদের প্রত্যেকটি movement নিয়ে study করতে এবং project বানাতে আপনি ওর বন্ধু, শিক্ষকের মতন সাহায্য করেছিলেন। আপনি যখন ঐ ১৬ বছরের ছেলের সঙ্গে বসে আলাপ আলোচনা করতেন ‘মেরিন বায়োলজি’ সম্পর্কে ওকে অনেক প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিতেন তখন ও ভীষণ খুশি হত, এবং আপনাকেও ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু মনে হত। রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে আমি বারে বারে দেখতে থাকতাম আপনার সঙ্গে আমার ছেলের ঐ আন্তরিক খোলা মেলামেশা, হাসি ঠাট্টা – ঐ সব সামুদ্রিক জন্তু জানোয়ারদের গল্প অক্টোপাসের camoflage – আট হাত পা ও রঙের বাহার নিয়ে সমুদ্রের জগৎকে তোলপাড় করার কথা, shark বা whale এর পার্থক্য monitor lizard বা house lizard এর তফাৎ নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হত আবার আমি যদি পড়তে পারতাম। আপনার ক্লাশে zoology অনার্সে ভর্তি হতে পারতাম।
আপনার দুই মেয়েই বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল। ভীষণ বুদ্ধিমতী ও শান্ত স্বভাব তাদের। পরবর্তীকালে ‘পাপিয়া’ আমেরিকার (কলম্বিয়া) ইউনিভার্সিটিতে সায়েন্টিস্ট হল তখন আমি আপনার ভাই আপনি ও দিদিভাই চারজনে মিলে নিউইয়র্কের ঐ ল্যাব-এ তার কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। আনন্দে আমাদের সকলের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরে ছিল। আমি কবিতা লিখে রেখে এসেছিলাম তার টেবিলের ওপরের এক নোটিস বোর্ডে। গর্বিত হয়েছিলাম আমরা। সেই সময়কার আরও একটি বিশেষ “ঘটনা” আপনার প্রতি আমার মনকে আরও শ্রদ্ধায় আপ্লুত করে দিয়েছিল। আজকের খোলা চিঠিতে সেই কথা ব্যক্ত করার জন্যই লেখা।
পাপিয়া আবিরের (পাপিয়ার স্বামী) staten Island এর ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিউইয়র্কের কাছে নতুন গৃহে প্রবেশ করেছে। আপনারা দুজনে সোদপুর থেকে এসেছেন, আমরাও ক্যালিফোর্নিয়ায় ছেলেদের বাড়ি থেকে পৌঁছে গেছি সেখানে। নাতি দেবায়নকে নিয়ে খুব আনন্দে হৈ চৈ করে সময় কাটাচ্ছি চার জনে। নানারকম রান্না করে খাওয়াচ্ছি আমি আপনাদেরকে। একদিন ওদের ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে বাড়ি- গাড়ি – টাকা – পয়সা – চাকরি ইত্যাদির আলোচনায় মশগুল আমরা, হটাৎ দেখলাম আপনি উঠে চলে গেলেন। বাগানের বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কান পেতে কার যেন ডাক শুনতে লাগলেন। আমিও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি, সেদিকে লক্ষ্য নেই আপনার। কাকে যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গাছের ডালে ডালে পাতার ফাঁকে। পড়ন্ত সূর্যের রৌদ্রের কিরণ আপনার শিশুর মতন সরল মুখে এক ঝলক রক্তিম আভা মেখে দিয়েছে। আপনি আপন মনে খুঁজে চলেছেন একটা ‘পোকাকে’, যার নাম “শিকাডা”। যার ডাক শুনে ঐ আরাম কেদারা সরস আলোচনা ছেড়ে আপনি একা বাগানে বেরিয়ে এসেছেন। আমি তার সম্বন্ধে একটু কৌতহল প্রকাশ করায় কী খুশি আপনি।
“শিকাডা” পোকার সম্বন্ধে কত information যে আমাকে বিস্তারিত ভাবে দিতে লাগলেন, তার যেন কোন শেষ নেই – আমি যেন এক রিসার্চ স্টুডেন্ট, – zoology এর ছাত্রী। ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। একটা পোকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে চান আপনি India তে। ওখানের রিসার্চে ব্যস্ত গবেষক ছাত্রদের দেখাবেন ভারতীয় পোকা ও আমেরিকার পোকাদের মধ্যে কি কি পার্থক্য। কখন কখন কিভাবে ওরা একমাস ধরে নিজেদের বন্ধু খুঁজতে ঐ ভাবে অনেকটা ঝিঁ – ঝিঁ পোকার মতন এক নাগাড়ে ডাক ছাড়ে।
আমি বুঝেছিলাম আসল জীব বিজ্ঞানীর রূপ ও মনোভাব কেমন হয়। সাগরদ্বীপের গবেষণাগারটি যখন এবারে আমফানের ঝড়ে ভেঙে গেছিল, তখন ক্ষতিগ্রস্থ সেই গৃহের জন্যে আমি ডোনেশন ও অর্থ সংগ্রহ করার পর আপনার সে কী আনন্দময় শিশু সুলভ হাসি দেখেছি – যা ভোলবার নয়। দাদা, আপনি হাজার হাজার ছাত্রের মধ্যে আপনার প্রভাব ও অনুপ্রেরণা রেখে গেছেন। আপনাকে স্বর্গের ঠিকানায় চিঠি লিখে শত সহস্র প্রণাম নিবেদন করি।