চন্দনা সেনগুপ্ত
কলকাতার এক সরকারী হাসপাতালের লেবার রুম। একটা ঘরে একগাদা মহিলা, প্রসব বেদনায় কাতর। তাঁদের সঙ্গে আগত মা, বৌদি, মাসী, দিদিরা সব বাইরের বেঞ্চে বসে আছেন। যাদের যন্ত্রনা ঘন ঘন আসছে, ঢেউয়ের মতন ওপর পেট থেকে নীচে সমস্ত শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে বা মেমব্রেন রাপচার মানে জলের থলি ভেঙে ঝর ঝর করে জল বেরিয়ে পড়ছে, তাদের অবস্থা বুঝে একেক করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – প্রসূতি ঘরে। ডাক্তার – নার্সরা ছুটে যাচ্ছেন তার পাশে।
নিজের জন্মের সময়কালে কি কি ঘটনা ঘটেছিল তা আমার জানার কথা নয়, কিন্তু মা এতবার আমাকে সেই গল্পটা করেছেন, যে মনে হয় আমি চোখের সামনে দৃশ্যটা খুবই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি। সেই প্রথম দিন থেকেই তো আমার জীবনে চমকের পর শুধু চমক দেখা দিয়েছে। ভাগ্যদেবীর ছলনা কি বুঝতে পারি আমরা? না, আমার মাও তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু আমাকে আজ তা ব্যক্ত করতেই হবে। না হলে মরেও শান্তি পাবো না আমি।
মায়ের সঙ্গে সেদিন কেউ ছিলেন না, শুধু বাবা শুকনো মুখে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। মা কে বার বার পরীক্ষা করার পর যখন নার্স দেখলেন সে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে কিন্তু অন্য মেয়েদের মতন চিৎকার করছে না, মুখ দাঁত চিপে ওঃ মা, ও বাবাঃ করতে আরম্ভ করেছেন, তখন তাঁকে নিয়ে গেল – লেবার রুমে, টেবিলে শুতেই একজন মাথার দিকে এসে দাঁড়ালেন। আরও দুজন এসে চেপে ধরলেন হাত দুটি, পায়ের কাছে ডাক্তার ম্যাডাম সাহস দিলেন, – কোন ভয় নেই, জোর দাও, বাচ্চার মাথা এসে গেছে।
আপ্রাণ চেষ্টায় জঠর বন্দি শিশুটিকে বাইরে আনতে হবে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্যে; যে বাচ্চাদানীর মুখে মাথা কুটছে শুধু মায়ের শক্তি ও চেষ্টাই তাকে ঠেলা দিয়ে নীচে নামাতে পারে। আঃ মা গো চিৎকারে ভীষণভাবে জোর লাগাতেই মাথা বেরিয়ে এলো, ডাক্তারের হাতে। হ্যাঁ এরচেয়েও বেশি force লাগাতে হবে কাঁধটা বেরুতে পারছে না, হাল ছাড়বেন না, জোর দিন – আরো – না আসছে না ঐ শিশুর দেহ। ফোরসেপ দিয়ে বেশ খানিকটা কেটে দিলেন; ডাক্তার ম্যাডাম ইউট্রাসের মুখ। একরাশ ময়লা জল, রক্ত ঠেলে বাইরে এল সেই শিশুটি এবারে। প্রথমে কাঁদছে না, এই দেখে ডাক্তার তাকে ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে দিতেই ক্যাঁ – করে কান্নার আওয়াজ বের করলো সে। মা ক্লান্ত শ্রান্ত হলেও আনন্দের ঝংকার শুনতে পেলেন, বুকের মধ্যে – যাক – বেঁচে আছে বাচ্চাটা। তাঁর প্রথম সন্তান, ধন্য হলেন তিনি, কিন্তু লেবার রুমে প্রত্যেকটি নার্স, আয়া, ডাক্তার নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি, গুঞ্জন করছে – একটা ঘরের মধ্যে থাকলেও তিনি শুনতে পেলেন – “এ মা, এ কী গো, এ তো ছেলেও নয়, মেয়েও নয়।” হাসপাতালে বোধহয় একমুহূর্ত্তে খবরটা রটে গেল। সবচেয়ে বড় সার্জেনও এসে দেখে গেলেন, বললেন, কোনরকম অপারেশন করেও কিছু করা যাবে না। এটি Third Gender – “হিজড়ে”। বাচ্চাকে মায়ের কোলের কাছে দিয়ে গেলেন একজন নার্স দিদি। বুকের নীচে ধরে স্তন পান করাতে শুরু করলেন মা। তাঁর স্নেহের অমৃত ধারায় ধন্য হল শিশুটি। সন্তান প্রাণে বেঁচে আছে, তাঁর দুধ পান করছে চকচক করে, সুন্দর দুটি চোখ মেলে অবলোকন করছে তার জন্মদায়িনীর অপূর্ব করুন মুখখানি। সে যে ছেলে বা মেয়ে নয় – কোন অদ্ভুত এক অজানা তৃতীয় সত্তা – সে কথা মা’র মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা জাগাচ্ছে না বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়।
বাবাকে বাইরে গিয়ে একজন ছোকরা জমাদার, (যে লেবার রুমের ময়লা নিতে এসেছিল এবং শুনেছে বাচ্চাটি নরমাল নয়,) বলে দিল – “তোমার ‘ছে-মে’ হয়েছে গো দাদা। এইরকম ঘটনা আমাদের এই হাসপাতালে এই প্রথম, হৈ চৈ পড়ে গেছে”।
চব্বিশ বছরের সাধারণ একজন কেরানী, কথাটা শুনে ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। এখন কি করবেন তিনি? স্ত্রী নমিতা এই সংবাদে কতটা বিচলিত, পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনকেই বা কি খবর দেবেন? ঘরে তাঁর বৃদ্ধা মা, এক ভাই ও আইবুড়ো বোন অপেক্ষা করে আছে, ঘর আলো করা শিশুর আগমনের জন্য। কেমন করে এই “তৃতীয় সত্তা”কে গ্রহণ করবে তারা – কিছুই ভেবে পেলেন না। মাথাটা ঘুরে গেল।
ইউট্রাসে অনেকগুলি সেলাই পড়েছিল, তার দু-একটি পেকেও গেছে, প্রচন্ড যন্ত্রনা, জ্বর এসে গেছে সদ্য – সন্তান প্রসবের পরে তরুণী মায়ের। অনেক দাইমা’রা এটাকে সুতিকা জ্বর বলেন। এখন সেপটিক জ্বর বলা হয়। ডাক্তার ম্যাডাম এন্টিবায়োটিক দিয়ে দু-দিন আরও রাখতে চাইলেন, হাসপাতালে। চার পাঁচজন আরও নবজাতকের সঙ্গে শিশুটি রইল। বাচ্চাকে পরিষ্কার করতে গিয়ে একজন নার্স চমকে উঠলেন, বললেন, “আমি পারবোনা একে ডাইপার চেঞ্জ করতে”। মেট্রন দিদি ধমকালেন তাঁকে, – “কেন এই শিশুটি কি মানুষ নয়, সেবা ধর্মে দীক্ষিত হয়ে, এই জীবিকায় এসে তুমি এসব কি বলছো। আমি তোমার নামে নালিশ জানাবো হাসপাতাল কতৃপক্ষের কাছে”। তবুও সে শুনলো না। অন্য একজন আয়া তার ভার নিল, কিন্তু একবারে বিরক্ত মুখ এনে। মা আচ্ছন্ন হয়ে জ্বরের মধ্যেও বুঝতে পারলেন সব। রাত্রে ডাক্তার ম্যাডাম যখন জানালেন যে আগামীকাল তার ছুটি হয়ে যাবে, তখন আর থাকতে পারলো না মা। ম্যাডামের হাত দুটি ধরে কেঁদে ফেললো একটা বাচ্চা মেয়ের মতন। “এখন কি করে একে বাঁচাবো বলুন তো দিদি, আমাদের এই নিষ্ঠূর সমাজের কাছে তো তার কোন মর্যাদা নেই। আবার এদের গোষ্ঠীর – মানে হিজড়ে সম্প্রদায়ের লোকেরা জানতে পারলেই নিয়ে চলে যাবে কেড়ে। আমি আমার প্রথম সন্তানকে হারাতে চাই না। কি করি আমায় বলে দাও তোমরা”।
ডাক্তার দিদি ও মেট্রন ম্যাডাম পাশে বসলেন তাঁর স্নেহভরে। তাঁরাও তো সন্তানের মা। এই তরুণী মায়ের বেদনা তাঁরা অনুভব করতে পারছেন। মেট্রন বা চিফ নার্স তারপর ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পরামর্শ দিলেন – “হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তুমি বাড়ি যেও না। অন্য কোথাও চলে যাও বাচ্চাটি নিয়ে, যদি ওকে বাঁচাতে চাও, নিজের কাছে রাখতে চাও, তাহলে আজ সকালের মধ্যেই ট্রেনে করে চলে যাও, পালাও এখন থেকে। বাড়ি গেলেই এই হাসপাতালের ছেলেরা রেজিস্ট্রার দেখে ওদের মানে ঐ সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেবে তোমাদের ঠিকানা। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউই তখন তোমার সাহায্য করতে আসবে না।” এবার ডাক্তার ম্যাডাম তার বাচ্চাকে আদর করে কোলে তুলে নিলেন। কী সুন্দর ফুটফুটে বেবী – “তুমি মা, বাঁচাও ওকে। ওর বাবাকে ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার নাম করে ডাকছি আমি। তোমরা দুজনে মিলে ঠিক করো কোথায় যাবে। বাড়ি থেকে খুব জরুরী জিনিসপত্র টাকাকড়ি নিয়ে মা কে জানিয়ে চলে এসো। বলো বাচ্চা অসুস্থ এখন ওকে অন্য জায়গায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হবে। একদিনও দেরী করো না, পালাও বাচ্চা নিয়ে, একেবারে অন্য শহরে যেখানে তোমাদের কেউ জানতে বা চিনতে পারবে না। বড় করো একে, দেখো কিভাবে কতদিন লুকিয়ে রাখতে পারো”।
দিশাহারা মা-বাবা আমাকে নিয়ে ভোর রাত্রে ট্রেন ধরলেন শিয়ালদহ থেকে। পাঁচটায় ছাড়লো লোকাল ট্রেন। তাতেই চড়ে বসলেন তাঁরা। আপাতত বনগাঁ। তারপর দরকার পড়লে, অন্য কোথাও বসতি বাঁধবেন। কিছুতেই তো ছাড়তে পারবেন না, কাউকে কাড়তেও দিতে পারবেন না, তাঁর নাড়ি ছেঁড়া এই বুকের ধন। সুন্দরভাবে কেটে গেল, আমাকে নিয়ে মা বাবার দিনগুলো। ভাই বোনেদের বিয়ে হয়ে গেলে সেই শহরের নিরিবিলি সংসারে ঠাকুমাও এসে গেলেন। স্কুলে ভর্তি হলাম আমি। কন্যা রূপে, নাম রাখা হল “ত্রিনয়নী”, মা, বাবা ও ঠাম্মা আদর করে ডাকেন “তিন্নি” বলে।
দিদিমনিরা খুব ভালোবাসেন, চঞ্চল বুদ্ধিমতী মেয়েটিকে। চতুর্থ শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি অর্থাৎ ‘জলপানি’ পেয়ে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করলাম, বলে প্রাইজ পেলাম অনেক।
ক্লাস ফাইভ থেকে খেলাধুলাতেও বিশেষ আগ্রহী ছিলাম। তখন আমার বয়স দশ। স্কুলের স্পোর্টসে দেখা গেল সব বিষয়েই প্রথম ‘ত্রিনয়নী’। পনের / ষোল বছরের মেয়েরাও দৌড়ে হেরে যায় আমার কাছে। খেলার দিদিমনি আমাকে নিয়ে গেলেন Inter School Competition গুলোতে। সব জায়গাতেই মেয়েরা হেরে যেত আমার কাছে। ভীষণ আনন্দ উৎসাহে কেটে গেল কয়েকটা বছর। আমি একেবারেই যখন খেলাধুলায় মেতে উঠেছি তখনই একদিন ঘটলো ঘটনাটা।
কাবাড্ডি বা হাডুডু আমাদের চলতি ভাষায় ‘কিতকিত’ খেলছি স্কুলের মাঠে, আমি তখন ১২/১৩ বছরের, ভীষণ জোর আমার গায়ে, কেউ আটকাতে পারে না। – “চু — কিত, কিত, কিত, কিত একবার দম ভরে নিয়ে, ঢুকে পড়েছি, বিপক্ষীদের কোর্টে। তার আগে মেরে পালিয়ে এসেছি, প্রায় চারজনকে, একসঙ্গে আউট করে। – এবার বাকিরা সবাই মিলে চেপে ধরল আমাকে। কিছুতেই ছাড়বে না। আমি প্রানপন চেষ্টায় দম না ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছি ঐ দাগটা ছোঁবার জন্য। আর একটু – আর একটু – শুয়ে পড়ে – পা হাত ছিচঁড়ে যাচ্ছে, তবুও ওরা পাঁচজনে আমাকে চেপে ধরে অপরদিকে টানছে। এবার আমার জামা টেনে ছিঁড়ে দিল, তবুও আমি চিৎ হয়ে শুয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, মুখে কি- – -ৎ – – – কি- – -ৎ, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। জোর দিয়ে সবাইকে ফেলে দিয়ে আর একটু এগুতে যাব, একজন প্যান্টটা ধরে টান দিল, আমার সেটাও ওদের টানাটানিতে নেমে গেল, কোমর থেকে। আমি তখন দাগ ছুঁয়ে পড়ে গেছি আমার কোর্টে, – সেখানে সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে – জিতে গেছি, জিতে গেছি – ওদিকে অন্য মেয়েরা স্পোর্টের দিদিমনিকে ডেকে এনে শুরু করে দিয়েছে আমার নিম্নাঙ্গ দেখে অদ্ভুত আলোচনা। আমি মেয়ে নই। তবে কি? তৃতীয় সত্তা! মা বাবা কেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানাননি, আমার ভভিষ্যৎ সেদিনিই হয়ে গেল অনিশ্চিত। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, কেন বুঝতে পারলাম না। বাবা, মা, ঠাকুমা আমাকে নিয়ে আবার চললেন, নতুন ঠিকানার সন্ধানে। এবার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আমরা এসে উপস্থিত হলাম কানপুরে, গঙ্গার ধরে, এক ছোট্ট অজানা আস্তানায়। ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে লাগলেন বাবা। পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেল আমার। চেহারাতে হাবে ভাবে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। মনে মনে মেয়ের মতন কোমলতা, কিন্তু চেহারায় পুরুষের কাঠিন্য। আমি বয়ঃসন্ধিকালে অন্যান্য ছেলে ও মেয়েদের মতনই কখনও হঠাৎ (adult) বড় হয়ে উঠতে চাইছি। সব সমাজব্যবস্থা – মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক ভেদাভেদ, জাতপাত, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-নির্ধনের বৈষম্য নিয়ে ভাবতে মা বাবাদের সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করেছি। মানতে চাইছি না কোনও ছেলে, মেয়ে, হিজড়ে বাধা নিষেধের গন্ডি।
আবার কখনও মায়ের কোলের কাছে ছোট্ট মেয়ে হয়ে চুপ করে বসে বসে তাঁর রান্না করা দেখছি। মা একটা একটা করে বেগুনি ভেজে খাওয়াচ্ছেন। রাত্রে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি, অজানা এক আতঙ্ক গ্রাস করে – আমায় এদের ছেড়ে যদি কোন দিন চলে যেতে হয়; কি হবে তাহলে? ভয় পাই। কাঁদি হাপুস নয়নে। আমার বয়সী অন্য মেয়েরা কত লাবণ্যময়ী তাদের বুকে, মুখে, হাসিতে ছেলেরা আকৃষ্ট হয়, – আর আমার যে সবই অন্যরকম। কোনদিনই কেউ কি আমায় নিজের বলে গ্রহণ করতে পারবে? ঠাকুমা ছোট থেকেই রামায়ণ, মহাভারত, পূরণের গল্প শোনান, আমি তাঁকে সেই একই গল্প বারবার বলতে পীড়াপীড়ি করি। খুবই জ্বালাতন করি। – যেখানে অজ্ঞাতবাসের শেষ পর্যায়ে অর্জুন বিরাট রাজার বাড়িতে “বৃহন্নলা” সেজে নাচ শেখাতে গেছেন।
আমার কোনদিন “মাসিক ঋতুস্রাব” হবে না, সন্তানের মা হবার সম্ভাবনা থাকবে না, এসব কথা এখন আসতে আসতে বুঝতে পারছি। আমার নামটা স্বার্থক হয়েছে, তৃতীয় নয়নের দৃষ্টি খুলে গেছে। – ঠিক এই সময়েই আমার মা আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন। মাঝে বছর পাঁচেক আগেও একবার তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন, কিন্তু বাথরুমে পড়ে গিয়ে তাঁর সেই বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। বাবা খুবই হতাশায় আচ্ছন্ন থাকতেন। এবারে মাকে আমি ও ঠাকুমা খুবই সাবধানে যত্নে রাখলাম। বাবা ভাল ভাল ওষুধপত্র, ফল, দুধ খাওয়াতে লাগলেন। আমার তেরো বছর বয়সে সুন্দর দেবশিশুর মতন একটা ভাই জন্ম নিল। আনন্দের যেন বন্যা বয়ে গেল বাড়িতে, হঠাৎ একদিন ঠাকুমা হার্ট এ্যাটাকে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। মাও ঠাকুমার সেবায় ভীষণ ব্যস্ত, ওদের এই ‘তিন্নি’ তখন ঘরের কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিল। বাড়িতে একদিন ডাক্তারবাবুকে ডাকা হল, ঠাকুমার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায়। তিনি বেশ কিছুক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন আমায়। খুব খুশি হয়ে বাবাকে বললেন, – “এর মধ্যে এতো সেবা ভাব – এই মেয়েকে নার্স করুন আপনি। তবে মনে হয় এর একটু ‘হরমোনাল প্রবলেম’ আছে।” আমার স্ত্রী গাইনোকোলজিস্ট একদিন নিয়ে আসুন, আমাদের নার্সিং হোমে, উনি চেক করে বলে দেবেন কি Treatment করতে হবে। কিন্তু সে সুযোগ আর এলো না। বাবা তাঁর কাছে গিয়ে আমার ‘তৃতীয় সত্তার’ কথা প্রকাশ করতে চাইলেন না। ঠাকুমা মারা গেলেন, তাঁকে জড়িয়ে থাকার আনন্দ আমার চিরতরের জন্য যে হারিয়ে গেল, তা বুঝতে পারলাম।
ঠিক এই সময়েই বাবা জানতে পারলেন তাঁর প্রমোশন ও ট্রান্সফারের কথা। খুব খুশি মনে অফিস থেকে এসে জানালেন, এই কানপুরের ফ্যাক্টরির মালিক নতুন কারখানা খুলছেন ‘সোদপুরে’ গঙ্গার ধারে, সুন্দর বাগান ঘেরা কোয়াটার দিচ্ছে। আবার তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের বাঙালি পরিবেশে ফিরে যাবেন এবং মাইনেও খুব ভাল হবে জেনে মা বাবা ভীষণ আনন্দিত। আমার মনটাও খুব চঞ্চল হল, হয়ত আবার নতুন করে বাংলা স্কুলে যাব। ভাইটা আমাদের খুব পয়মন্ত ভাবলাম আমি।
শোবার সময় অন্য ঘরে মাকে জল দিতে গিয়ে বাবা-মায়ের কিছু কথাবার্তা কানে এল, – তাতে যেন সমস্ত পৃথিবীটা এক রাত্রের মধ্যে ভীষণ অচেনা মনে হল আমার। বাবা বলছেন মাকে – “যাবো তো সোদপুরে, কিন্তু চারপাশে আরও অনেক কোয়াটার থাকবে। তারা মেলামেশা করতে চাইবে আমাদের সঙ্গে। এই ছেলেটাও বড় হবে. তাকেও স্কুলে দিতে হবে, কিন্তু তোমার এই তিন্নি “ত্রিনয়নী” যে ক্রমশঃ ‘হিড়িম্বার’ মতন লম্বা ধিঙ্গি পুরুষালি ভাব নিয়ে বড় হচ্ছে – একে এবারে তুমি লুকাবে কোথায়”? – বাবার উক্তি।
মা বেশ জোর দেখিয়েই উত্তর দিলেন – “কেন লোকের বাড়ি আইবুড়ো বা বিধবা মেয়েরা কি বাবা মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে না? আমার সন্তান, আমি এতদিন যখন বড় করেছি, – তখন যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আমার কাছেই থাকবে”।
– “তারপর? তারপর ওর ভবিষ্যৎ কি হবে ভেবে দেখেছো একবার”।
– কি আবার ভাববার আছে? জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। ওর ভাগ্য ওকে যেভাবে রাখবে সেই ভাবেই থাকবে।
– ভীষণ গম্ভীর গলায় বাবার রায় শোনা গেল, – “না আর আমি ওকে সঙ্গে রাখতে পারব না, এই ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। একটু বড় হলেই সবাই ওকে নানান প্রশ্ন করবে, ও লজ্জায় পড়ে যাবে”।
– তাহলে কি করবে? মা রাগত ভাবে বললেন, – “গলা টিপে মেরে ফেলবো এই সুন্দর পেটের সন্তানকে”?
-“মারবো কেন ওকে …..” কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি, হটাৎ আমার ছায়া দেখে।
সেদিন সকালটা ভীষণ সুন্দর রৌদ্রে ঝলমল, শরৎ কালে পুজোর গন্ধ বাতাসে। ভাইকে বারান্দায় বসিয়ে তেল মালিশ করছেন মা, বাবা বাজারে। আমি রান্না ঘরে ভাতের চাল ছাড়ছি। বাইরে করা যেন ঢোলক বাজিয়ে গান করছে। আওয়াজটা আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই। দরজার কড়া নড়ে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলতেই – হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লেন “তাঁরা”। একজন মায়ের কোল থেকে তুলে নিলেন ভাইকে ছোঁ মেরে। তারপর শুরু করলেন, গান ও নাচ। আমরা একেবারে হতবুদ্ধি। ওদের যিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ্য মানুষটি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে ওদের গানের সঙ্গে সঙ্গে তালি বাজাচ্ছিলেন, তিনি হঠাৎ মুখ ঘোরালেন। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। একটু থমকে গেলেন, ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগলেন আমায়। আমারও সারা শিরা ধমনীতে যেন একটা শিহরণ বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। এতো বছর কেটেছে এমন করে তো কাউকে দেখে আকর্ষণ অনুভব করিনি। অন্যের নাচ, ভাইটির কান্না, মায়ের নার্ভাস হয়ে চিৎকার করে ওঠা, কিছুই যেন দেখতে বা শুনতেও পাচ্ছিনা আমি। ওনার দিকে চেয়েই আছি তাই এক দৃষ্টিতে। আর উনিও ঠিক তাই। যেন জহুরি জহর চিনে ফেলেছে – এক মূহুর্ত্তের মধ্যে। মনে হল এতদিনে খুঁজে পেলাম আমি আমার আপনজনকে।
বাবা মা সব জিনিসপত্র বেঁধে ছেঁদে ভাইকে ও আমাকে এবং নিজেদের সমস্ত টাকা-পয়সা নিয়ে স্টেশনে এসে উপস্থিত হলেন। ট্রেনের বেঞ্চে বসে সব জিনিসপত্র সিটের তলায় গুছিয়ে রাখলেন বাবা। জল আনতে নামলেন সামনের দরজা দিয়ে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল, – “তোর বাবা কি চড়েছেন, দেখতো তিন্নি জানলা দিয়ে”। মায়ের কথায় জানলা দিয়ে মুখ বার করতেই চোখে পড়লো আবার ওই দলটিকে। সেই বয়স্ক মানুষটিও আমাকে হঠাৎ দেখতে পেয়েছেন। বাবা সামনের দরজা দিয়ে উঠলেন, কিন্তু ট্রেন চলতে শুরু করে দিল। আমি আর দেরী করলাম না। অন্য দিকের দরজায় ছুটে গেলাম যাতে বাবা আমায় আটকাতে না পারেন। লাফ দিলাম ট্রেন থেকে। সেই দলটি ছুটে এসে তুললো আমায়। মায়ের গলাটা শুনতে পেলাম একবার তিন্নি – তিন্নি রে। রেলগাড়ির ঝমঝমানিতে মিলিয়ে গেল সেই আওয়াজ। ট্রেন স্পীড নিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে – আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন ওদের ঐ ‘গুরুমা’, সবাই তাঁকে “কমলা আম্মা” বলে জানে। হিজড়েদের সমাজে সবাই তাঁকে খুব সম্মান করে ভালোবাসে।
বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, – “ইতনে দিন কাঁহা থে বচ্চে”? “বহুচারা” মাতা নে তুঝে মিলায়া। ইস লড়কা লড়কীকে বীচ মে তুম কাঁহা ফাঁস গয়ে থে। আও মেরে পাশ আও। ওহ দুনিয়া তেরে লিয়ে নহি হ্যায়”।
তাদের সঙ্গে হিজড়েদের আড্ডায় এসে বুঝতে পারলাম আমার ঐ মা আমায় জন্ম দিয়েছেন, স্নেহ মমতায় পালন করেছেন, আর এই “মা” আমাকে আজ নতুন ‘জীবন’ দান করলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় (বৃহন্নলা)
শুরু হ’ল বাস্তব জীবনে “বৃহন্নলার” চরিত্র রূপায়ণ। প্রথম দিন থেকেই কমলা আম্মাজী বুঝতে পেরেছিলেন, আমি বাঙালী ঘরের এক লাজুক কন্যা হিসাবে বড় হয়েছি। বাড়ি বাড়ি নাচ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা ট্রেনে বাসে উঠে টাকা চাইতে, গালাগাল দিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাব, অসভ্য ব্যবহার, কদর্য ইঙ্গিতও পছন্দ করতে, সহ্য করতে পারব না, তাই সবাইকে তিনি সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন আমাকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না করে। আমাকে হারমোনিয়াম বাজাতে, লক্ষ্ণৌ ঘরানার একজন মাষ্টারমশাইকে দিয়ে কত্থক শেখাতে শুরু করলেন। পড়াশুনো করতে আমার ভীষণ আগ্রহ দেখে হিন্দিতে বই কিনে দিলেন, বললেন টীচার রেখে দেব। তুই প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিবি। তিনবছরের মধ্যেই আমি পারদর্শী হয়ে উঠলাম নানা বিষয়ে। সব সময় বলতে লাগলেন, – “হম লোগো কো সরকার বুদ্ধু বানাকে রাখ দিয়া হ্যায়। পড় লিখকর তেরে কো আওয়াজ উঠানে হ্যায়। হামারে বারে মে লেখ লিখনা হ্যায়, হমে ভোট দেনে কি অধিকার দিলওনা হ্যায়”। আমি একজন শিক্ষিত মানুষ হবার চেষ্টায় প্রাণ মন সোঁপে দিলাম।
আমাকে আমার মা উল বোনা, সেলাই ফোঁড়ায় সব কাজ শিখিয়েছিলেন। রান্নাতেও ঠাকুমা একেবারে ওস্তাদ বানিয়ে দিয়েছিলেন, তাই এখানে এই নতুন সম্প্রদায়ে এসে সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে দেরী হল না আমার। কিন্তু হিংসাতে জ্বলতো অন্য দু একজন, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যাতে কমলা আম্মার থেকে দূর করা যায়, সেই চেষ্টাও চালাতে থাকতো তারা। দুটি ছেলে ছিল এ দলে, বাজনা বাজানো, বাজার করা, হাসপাতালে গিয়ে গিয়ে কোথায় কোন বাড়িতে বাচ্চা হয়েছে, কোন ঠিকানায় যেতে হবে সে সব কাজ করবার জন্য। তাদের একজন প্রথম দিন থেকেই পিছনে পড়েছে আমার। একটু সুযোগ পেলেই চেপে ধরছে, ওর সঙ্গে শুতে বলছে, আমার রুক্ষ ব্যবহারে একটু ভয় পাচ্ছে এবং হতাশও হয়ে পড়েছে। যখন দেখলো আমি ওদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ক্রমশঃ গুরুমার কাছের জন হয়ে উঠছি, তখন একদিন টাকা চুরির দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করল, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে অপমান করল। আমি তখন দরজা বন্ধ করে ভাবলাম জীবনটা শেষ করে দেব। আমার জন্য কোথাও কি শান্তির জায়গা নেই? এখানে বেশিরভাগ সময়ই সালোয়ার কামিজ পরতাম তাই চুনরি বা ওড়নিটা নিয়ে ঠিক যখন পাখার সঙ্গে লাগিয়েছি, চিৎকার শুনতে পেলাম কমলা আম্মার।
“বেটা দরওয়াজা খোল, ম্যায় ইনলোগোকে বাত বিশওয়াশ নেহি কিয়া, কোই অনর্থ নেহি কর না, খোল দে রানী, ইয়ে মা কো রুলানা নেহি”।
দরজা খুলতেই গভীর আবেগে কেঁদে উঠলেন তিনি। তারপর চিৎকার করে সবাইকে একত্র করলেন, ধমক দিয়ে সাবধান করে দিলেন, যে আমার দিকে নজর দেবে তাকে দলত্যাগ করতে হবে, এ কথাও জানালেন। রাত্রে আমাকে নিজের পাশে শোয়ালেন তিনি, ঠিক মা ও ঠাকুমার মতন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানালেন, প্রথমদিন আমাদের বাড়িতে দেখার পর থেকেই তিনি আমাকে কতটা নিজের করে নিতে চেয়েছিলেন। সেদিন যে ঐভাবে আবার ট্রেনের জানলায় আমায় দেখতে পাবেন বা আমি ঐভাবে লাফিয়ে নেমে আসবো বাবা মাকে ছেড়ে – তা উনি ভাবতে পারেননি। এখন কয়েক বছর কানপুরে থেকে হিন্দিটা আমার ভালোই রপ্ত হয়েছে। তাই তাঁর কথাগুলো বুঝতে পারছিলাম। এবার খুব কাছে টেনে ‘কমলা আম্মা’ বললেন যে এদের সবাইকে পরীক্ষা করবার জন্য কিছু টাকা তিনি টেবিলের ওপর ইচ্ছে করেই ফেলে রেখেছিলেন এবং নিজে বাথরুম থেকে লক্ষ্য করছিলেন, কে নেয়। আমি ঘরে ঢুকে ঘর পরিষ্কার করে চলে এসেছি; ঐ ছেলেটি ওটি চুরি করে আমার ব্যাগে রেখে দিয়েছে। আর পরে সবাইকে ডেকে এনে আমাকে হাতে নাতে ধরার অপবাদ দিতে চেয়েছে। ছি ছি কি করে ওরা সবাই আমাকে ঘিরে ধরেছে। কমলা আম্মা ঠিক সেই সময়টিতে স্নান সেরে ‘বহুচারা’ মায়ের পুজোয় বসেছেন। আমার মনে হয়েছে যে তিনি হয়তো আমায় ভুল বুঝবেন, এবং তাড়িয়ে দেবেন এই নিরাপদ আশ্রয় থেকে। এই দুনিয়ায় তো আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই কোথাও। তাই হটাৎ আবেগের বশে নিজের জীবনটি শেষ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুইসাইড করার জন্য যে সাহসের দরকার আমার মতন ১৫/১৬ বছরের একজন Teen Age-এর পক্ষে আনা সহজ নয়। তাই কাঁদতে কাঁদতে আবার দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি আমি।
আম্মাজী আমাকে শপথ করালেন, এইরকম ‘গলদ’ ভাবনার বশবর্তী আমি যেন আর কখনও না হই। আরো বললেন, – “জিন্দেগী খুবসুরৎ হ্যায়, হম লড়কা হ্যায়, কি লড়কি হ্যায়, আমীর ইয়া গরীব হ্যায়; হিন্দু ইয়া মুসলমান হ্যায় – ইয়ে সব বাতে বেকার হ্যায়। হম ইনসান হ্যায়। জানোয়ার, কীড়ে মকোড়ে নেহী হ্যায় – ইয়ে হামেশা ইয়াদ রাখনা”। – তারপর ওনার ছোটবেলাকার দেখা একটি হিন্দি সিনেমার গান গাইতে লাগলেন, – ” এ মালিক তেরে বন্দে হম”। আমি খুব আনন্দ ও শান্তি-সুখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম।
পরের দিন থেকে আমার নানা ধরণের পড়াশোনার তালিম শুরু হল। প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষাও দিয়ে দিলাম, হিন্দি মিডিয়ামে। এবার ছুটি, পড়াশুনো নেই। গুরুমা বললেন, তিনি তীর্থ করতে যাবেন গুজরাটে বহুচারা মাতার মন্দিরে। এই শক্তিরূপিণী মাকে এঁরা খুব মানেন। আমার কমলা আম্মা – গুরুমা আমাকে তাঁর গল্প-গাঁথা শোনাতে খুব ভালোবাসেন। অনেকটা সন্তোষী মা বা জগদ্ধাত্রীর মতন তিনি চার হাত নিয়ে, নানা অলংকারে ভূষিতা হয়ে মোরগের পিঠে চড়ে অধিষ্ঠাত্রী। প্রত্যেক হিজড়ে কলোনীতে তাঁর ছবি বা মূর্ত্তি দেখতে পাওয়া যায়। মোরগ ভোরে সকালে উঠে যেমনভাবে মানুষকে জাগায়। মায়ের এই বাহনও তেমনি করে লোভ, মোহ ভঙ্গ করে মানবকে জাগাতে এসেছে – বলে তারা মনে করেন। মায়ের চার হাতের মধ্যে একটি হাত (ওপরের দিকের বাম হাতটি) অভয় মুদ্রা দেখায় এবং অন্য তিনটিতে থাকে বই, ত্রিশূল ও তলোয়ার।
আমাকে উদাস হয়ে বসে থাকতে দেখে গুরুমা কাছে এসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, – “পড় লিখকর এক অচ্ছে ইনসান বননা। ফির কলকাত্তা যা কে মিলকর আনা তেরী পিতা মাতা কে সাথ। মুঝে পতা হ্যায় হম কিতনা ভী প্যায়ার করে তেরা মন উনকে লিয়ে দুঃখী হ্যায়”। আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল টপ টপ করে।
কেননা হাজার চেষ্টা করলেও আমার এখানের ওই ভাই বোনদের মতন তালি বাজিয়ে ভিক্ষে বা জোর করে কাপড় তুলে দিয়ে পয়সা আদায় আমি তো করতে পারবো না, এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেহ বিক্রিও করছে এবং যেটা খুবই স্বাভাবিক, বেঁচে থাকার জন্যে ‘Sex Worker’ এর ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়েছে। সমাজই এইসব অসহায় হিজড়ে কন্যাগুলিকে বাধ্য করেছে পুরুষের লালসার শিকার হতে। কেউ আবার বিবাহিত স্বামী স্ত্রী হয়ে কোন ছোট কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাকে মানুষ করছেন, তাঁদের স্নেহ মমতা ও আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু পড়াশুনো শেখানোর ইচ্ছে থাকলেও আমাদের বাচ্চাদের জন্যে আলাদা স্কুল কলেজ নেই, আমার মতন কেউ কেউ জোর করেই প্রাইভেটে ওপেন স্কুল থেকে থেকে পরীক্ষা দিতে আরম্ভ করেছে, গুরুমা সেটা জানতে পেরেই আমাকে খুব উৎসাহ দিতে চেষ্টা করছেন। ক্লাস VI পর্যন্ত আমি তো শুধু রবীন্দ্রনাথের পদ্য, বিবেকানন্দের বাণী, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল পড়ে একটা সম্পূর্ণ আলাদা জগতে বড় হয়েছি, এখন এই অস্তিত্ব রক্ষা করতে, অর্থাৎ বাঁচবার তাগিদে নিজের আপনজনকে খুঁজে, নিজেকে একটা গোষ্ঠীবদ্ধ করে এই আস্তানায় আমি নিরাপত্তা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু এদের ভাষা, কালচার, আদব-কায়দা, ধর্ম, কিছুই আমাকে টানতে বা আকৃষ্ট করতে পারছে না। এরাও আমাকে বুঝতে ও মেনে নিতে পারবে কিনা, সেই সংশয়ের দোলায় দুলছি আমি।
তৃতীয় অধ্যায়
এইসময় একদিন শহরের এক খুব নাম করা উকিলের বাড়ি থেকে খবর এল, পুত্র সন্তান জন্ম লাভের। সেদিন আমাদের গোষ্ঠীর মেয়েরা অন্যত্র কোথাও গেছে। সেখান থেকে ফিরতে তাদের দেরী হবে। গুরুমা আমাকে অনুরোধ করলেন, আমার এক গুরু ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐ বাড়িতে যেতে। আমি মাথা গুঁজে বসে আছি দেখে নিজে তৈরী হলেন এবং ঐ ছেলেটিও ঢোলক নিয়ে বেরুবার আগে বহুচারা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনাতে রত হলেন। আমার মনে হল, আমি কি এটা ঠিক করছি? “গুরুমা” আমাকে এতরকম ভাবে স্নেহ ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাঁর আশ্রিত হয়ে আমি তাঁকে অমান্য করছি। তাড়াতাড়ি একটা ভাল শাড়ি পরে কাজল, টিপ ও লিপস্টিক লাগিয়ে তৈরী হয়ে গেলাম। তাই দেখে গুরুমার কি আনন্দ। বললেন, “দেখ মনুয়া – মেরে তিন্নি কো আজ কিতনি সুন্দর লগ রহি হ্যায়। দে এক কালা টিকা লগা দূঁ, তাকি নজর না লগ জায় মেরে বাচ্চো কো”।
আমি কমলা আম্মার সঙ্গে এসে হাজির হলাম শ্রী বিনোদ রঞ্জন বোসের বিশাল ভবনে। চারিদিকে বাগান ঘেরা বাড়িতে ঢুকেই মনটা ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। গেট দিয়ে ঢুকলাম আমরা তিনজনে। মনুয়ার ঢোলকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ছুটে এল চাকর বাকরেরা। একজন বোধয় ম্যানেজার বাবু, চ্যাঁচাতে লাগলেন, “চৌকিদার শম্ভূ কোথায় গেল, এদের বাড়ির ভেতরে আসতে দিল কেন”? গুরুমা তালি বাজিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “অরে ভাইয়া গুসসা কিউ করতে হো? হম তো বাচ্চে কো আশীর্বাদ, দুয়া দেনে আয়া হুঁ। বুলাও মালকিন কো। বাচ্চা ভী সাথ লানা”।
কিন্তু ততক্ষনে চৌকিদার এসে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। ইট সুড়কির লাল রাস্তা ঐ বিশাল প্রাসাদের বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। দুই সারিতে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা ও বাগানের কোনায় লাল – হলুদ – সাদা জবা। আমার মন সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে উঠল, ঠাকুমার সুরে। এক অচেনা ব্যাথায় বুকটা ভরে গেল, আমি ঐ ঢোলকের তালে হাতে তালি দিতে লাগলাম। গুরুমাও অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে, – “গাও না বেটা গাও জো গানা তুমহে আতা হ্যায়”।
আমি এই প্রথম হিজড়ে গোষ্ঠীর দুজন সদস্যের সামনে গলা ছাড়লাম। – “আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন, তার গন্ধ না থাক, যা আছে তার নয় তো ভুয়ো আবরণ”। – গানের কথাগুলো কানে যাওয়ার জন্যে কিনা জানি না – বারান্দায় বেরিয়ে এলেন সেই বাড়ির ‘মা’, পরণে সাদা শাড়ি। কপালে চন্দনের টিপ – কী সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ ও মমতায় ভরা তাঁর দুটি চোখের দৃষ্টি। কোন কথা না বলে ইশারায় ঐ চৌকিদারদের আদেশ দিলেন, আমাদের পথ না আগলাতে। হাতছানি দিয়ে ডাকলেন গুরুমাকে। তিনজনে এগিয়ে গিয়ে উঠলাম ঐ বারান্দায়। সেখানে অনেকগুলি বেতের চেয়ার ও একটা গোল টেবিল পাতা। বসতে নির্দেশ দিলেন আমাদের। আমার যে কী হল আমি জানিনা। ঠিক আগেকার মতন তাঁর দুই পায়ে হাত দিয়ে হাতটা নিজের মাথায় ছুঁয়ে প্রণাম করলাম তাঁকে। গুরু শিষ্য পরম্পরাতে ‘হিজড়ে’ সম্প্রদায়ের লোকেরাও সর্বদা বড়দের পা ছোঁয়, কিন্তু ঠিক আমার কায়দায় নয়। সেই মা জিজ্ঞাসা করলেন ধীর স্থির ভাবে, – “তুমি বাঙালী”?
– “হ্যাঁ মা, কলকাতায় বাঙালী পরিবারে জন্মেছি”। এবার তিনিও একটা আশ্চর্য কান্ড করে বসলেন, আমার কাছে এসে ‘চিবুকটি’ ধরে মুখটি তুলে নিজের ঠোঁটে ঠেকালেন। এমনভাবে চুমু খেলেই আমি ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরতাম। হাতটা টেনে নিয়ে বলতাম – “আর একবার খাও না ঠাম্মা – বেশি করে আশীর্বাদ দাও যাতে আমি এবারেও ফার্স্ট হতে পারি”। চোখে জল চিক চিক করে উঠল। মায়ের ডাকে তাঁর বৌমা বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। গুরুমাকে সাদরে আহ্বান করলেন – ঐ মামনি। বললেন – “আপ বৈঠিয়ে না, খড়ে কিউ হো”? কমলা আম্মা এগিয়ে গেলেন বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আশীষ দিতে। –
হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। মানসিক ভারসাম্যহীন, একটু বেশি স্থুলকায়, বড় সরল হাসি, ১৫/১৬ বছর বয়স হবে। ঢোলকের তালে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে গেল, আমার গুরুভাই মনুয়ার দিকে হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই ওর বাজনাটিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, মনুয়া জোর করে ধরে রেখেছে ও ছাড়বে না। অদ্ভুত গলার আওয়াজে চিৎকার করছে ওটিকে কেড়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় ধাক্কা দিল তাকে। মনুয়া বারান্দা থেকে ছিটকে পড়ল নিচে। সবুজ ঘাস ভরা মাটিতে, আর মেয়েটি উল্টোদিকে, ঠিক আমাদের পায়ের কাছে। আমি তাড়াতাড়ি তুলে ধরলাম ওকে, ঢোলকের কথা এক সেকেন্ডে ভুলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল, লজ্জিত ঠাকুমা ছাড়াবার চেষ্টা করলেন। “ছাড়ো সোনামনি, লক্ষী মেয়ে, ছাড়ো ওকে – চলো ভেতরে চলো” – কিন্তু সে আরও আঁকড়ে ধরেছে আমায়। আমি বললাম, – ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি ওকে সামলাচ্ছি”।
আদর করে ঘরের ভেতরে ওর খেলা ঘরে নিয়ে গেল সে আমায়। মা তার বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়ালেন। মাকে দেখে ঐ মেয়েটি অদ্ভুত আদো আদো সুরে জানতে চাইলো, – “এ তা কে? এ তা কে”? – মা তাকে শান্ত করবার জন্য বললেন, – “দিদি – তোমার দি দি”। আমার মনের বীণায় কেউ যেন ঝংকার তুললো। আমিও বলতে লাগলাম, – “হ্যাঁ সোনামনি, আমি তোমার দিদি”।
মেয়েটি নানান খেলনা তুলে তুলে দেখাতে লাগলো। তারপরই – ‘মা – আগু – আগু – আগু দাবো’ – বলে চেঁচাতে লাগল। মা বাচ্চাকে রাখতে অন্য ঘরে গেলেন, ততক্ষনে ঘরের মাঝেই পেচ্ছাব ও পায়খানা করে ফেললো মেয়েটি এবং হাসতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বাচ্চা কাঁদছে জোরে জোরে মা তাকে ছেড়ে আসতে পারছেন না, ওর ঠাকুমা তখন আমাদের গুরুমায়ের সঙ্গে কথা বলে, তাঁকে চাল, ডাল, তেল, ফল-মূল, টাকা ও একটি সুন্দর শাড়ি দিয়ে বিদেয় করতে ব্যস্ত। আমার বড় মায়া হল। ঐ অসহায় মানসিক ও শারীরিকভাবে ভারসাম্য হারানো কিশোরীর ওপরে। ওকে হাত ধরে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। পরিষ্কার করিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে পাশের ঘরে এনে বসলাম। ঠাকুমা যখন বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন অনেকবার তাঁকে বিছানাতে bedpan দিয়েছি, বিছানা নোংরা হয়ে গেলে পরিষ্কারও করেছি, তাই এসব কাজে কখন ঘেন্না লাগেনি। তাছাড়া ও আমাকে ‘দিদি’ বলে ডেকেছে, ছোট্ট একটা বোনের মতন মনে হচ্ছে ওকে আমার।
ততক্ষনে ওর মা যিনি পরে আমার ‘পিসিমনি’ হয়ে যান, কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন, লজ্জিত হয়ে sorry বলছেন বারবার। তিনি আরও জানাতে চাইছেন, “ও ইচ্ছে করে করেনি, তুমি কিছু মনে করো না, আসলে ওকে যে দেখাশোনা করে সে বাড়ি গেছে এবং চিকেন পক্স হওয়ায় এখন ২/৩ সপ্তাহ আসতে পারবে না। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম – “না না আমি এসব কাজ করতে কিছু মনে করি না। কাছে থাকলে রোজ চলে আসতাম। ঠাকুমা ও পিসিমনি নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করে গুরুমার কাছে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন, হিন্দিতে তাঁর সাথে কথা বলতে লাগল বিনীত ভাবে।
আমি বোনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। গুরুমা কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যদি কিছুদিন এঁদের কাছে মেয়েটিকে দেখাশোনা করি ওঁরা ভাল মাইনে দেবেন, আমি রাজী আছি কি না। আমি তো যেন আনন্দে আত্মহারা একটা কাজ পেয়ে। ভিক্ষে করে বা রাস্তায় পুরুষ মানুষদের সঙ্গে ন্যাকামি করে টাকা রোজগার নয়। নার্সের ভূমিকা হবে আমার। আমিও গুরুমার হাতে অন্যদের মতন কিছু অর্থ এনে দিতে পারব। খুব আনন্দ ও আগ্রহের সঙ্গেই রাজী হয়ে গেলাম। সেই দিন থেকে শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়। বোস বাবুদের বাড়িতে আমি যে চাকরি পেলাম তাতে অবাক হল তাঁর সমাজ। প্রতিবেশীরাও নানা আলোচনা শুরু করে দিলেন, স্থানীয় ছোকরাগুলো প্রথম প্রথম টিটকেরি মারার চেষ্টা করতো, ঘরের দারোয়ান ও চাকর বাকরও পেছনে লাগতে ছাড়েনি। কিন্তু রাসভারী উকিলবাবু ও ঠাকুমার ভয়ে কেউ আমার দিকে তাকাতে সাহস করতো না। পিসিমনি ভীষণ মমতাময়ী। সোনা রানী তো দিদিকে পেয়ে যেন মনে হয় হাতে চাঁদ পেয়েছে। বাংলায় কথা বলতে পেরে, বাঙালী সুতীর ছাপা শাড়ি, শান্তিপুরী, টাঙ্গাইল পরে ম্যাচ করা টিপ ব্যাগ হাতে কাজে যেতে শুরু করলাম।
সমাজে অন্ততঃ একটা পরিবার একজন হিজড়ে কন্যাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। উকিলবাবুকে একদিন ফোনে কথা বলতে শুনলাম, – Yes, I have appointed on eunuch third gender to look after my mentaly physically disabled daughter. Our society must “accept” them. They are aslo humanbeing. They have also different talents ability. What is other’s problem? I don’t care, what people think. I know I have done right thing”.
ঐ ‘accept’ করা মেনে নেওয়া আমার গুরুমায়ের ভাষায় হিন্দিতে, – “তেরে কো উনহনে স্বুইকার কিয়া, আপনায়া. ইস সে খুশী অউর ক্যা হো সাকতা হ্যায়”?
আমাদের গোষ্ঠীতেও আমাকে পক্ষপাতিত্ব করা নিয়ে কানা ঘুঁষো চলছে, কিন্তু কমলা আম্মাকে সবাই ভালো যেমন বাসে, ভয়ও তেমনি করে। এই হিজড়ে সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষে হল বড়দের সম্মান করা। গুরু শিষ্য পরম্পরা, তাঁর কথার অমান্য না করা। যা কিছু কামাই, বিনা সংকোচে, কোন লোভের বশে নিজেদের কাছে না রেখে গুরুমাকে অর্পণ করা। আমাদের সমাজে মা-বাবা, শিক্ষক, অন্নদাতা সবই তিনি। গুরুর সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে সবাই চেষ্টা করে। তাই আমি এখনো পর্যন্ত কাউকে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তর্ক করে, তাঁকে অসম্মান, অনাদর করতে দেখিনি। আজ আমার তাই ঐ নতুন জীবিকা গ্রহণ, পড়াশোনা, বাংলায় কথা বলা সবাই এরা মেনে নিয়েছে।
এখানে দু বছরের মধ্যে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ভালোভাবে পড়াশোনা করে নিজেকে “ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে হাইয়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার জন্য তৈরী করছি। ‘সোনামনি’কে পরিষ্কার করে স্নান করিয়ে, খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর পর অনেকটা সময় থাকতো, বইপত্র পড়ার। একদিন পিসিমনি এসে আমাকে কম্পিউটার চালাতে শেখালেন। কি করে ইন্টারনেট থেকে সার্চ করে জ্ঞানের ভান্ডারকে বাড়ানো যায় তাও জানালেন। আমার পরিবারের কথা সবই ওনাকে জানিয়েছিলাম, তাই একদিন আমার সঙ্গে বসে Google Search করে বাবার কানপুরের কোম্পানী এবং তারপর তাদের সোদপুর ফ্যাক্টরীর ঠিকানা খুঁজে বার করলেন। E-mail করলেন সেখানে বড় বাবু বা ম্যানেজার কে। তারপর তাঁর ফোন নাম্বার জেনে একদিন কথা বলালেন, আমার সঙ্গে, – সেই মানুষটি তো তখন বিস্ময়ে হতবাক। পিসিমনি সুন্দর নম্রভাবে আগেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। – “দেখুন তো এখন আপনার মেয়ে তিন্নির গলা চিনতে পারছেন কিনা”। – আমি বাবার আওয়াজ শুনেই তাঁর গলা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু মুখ দিয়ে স্বর বার হচ্ছে না। হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো কি হল কে বলছেন? পিসিমনি ঠেলা দিয়ে বললেন, – ‘কি হল কথা বলো’। এবার আবেগরুদ্ধ কান্না ভেজা গলায় শুধু বললাম – “বাবা আমি তোমার তিন্নি”।
“তুই বেঁচে আছিস মা, তুই কোথায়, কেমন আছিস, কেমন করে আমায় পেলি?” এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন কিছুই দিতে পারলাম না। শুধু মা ও ভাইয়ের খবর নিয়ে ফোন ছেড়ে পিসিমনিকে ধরে কেঁদে ফেললাম বাচ্চা মেয়ের মতন।
এই সময় বোস বাবুরা সবাই কলকাতা ঘুরতে চলে গেলেন, আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গুরুমা আমাকে তাঁর কাছ থেকে এতদূরে এতদিনের জন্য ছাড়তে চাইলেন না। আমিও এই গোষ্ঠীদের ছেড়ে থাকতে ইচ্ছুক নই এখন।
গুরুমা এবার হিজড়ে সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ তীর্থ ক্ষেত্র গুজরাটের “বহুচারা” মাতার মন্দিরে তীর্থ দর্শন করতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। আমি প্রত্যেক মাসে যে মাইনে পাচ্ছিলাম সেটি তিনি খরচা করেননি। আমাদের চারজনকে নিয়ে তিনি “চৈত্র পূর্ণিমার” কয়েকদিন আগে আমেদাবাদের ট্রেনে চড়ে বসলেন। আমাদের শোনাতে লাগলেন বহুচারা মাতার কাহিনী। আমেদাবাদের থেকে প্রায় ২০০কি.মি. দূরে “মেহসানা জেলায় এই মন্দিরটি স্থাপিত হয় – ১৮৮৩ সালে। এই অঞ্চলে এক ধরণের লোক থাকতেন, যাঁরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন, তাই তাদের ‘চারণ’ বা যাযাবর শ্রেণী বলা হত। তাদেরই একজন দল নেতা যাকে ওরা রাজার মতন মানতো, তাঁর নাম ছিল চারণ বাপন ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন দেথা। তাঁদের কন্যা ছিলেন ভীষণ সুন্দরী। এই উপজাতিদের দলটিকে একবার পথ দস্যু আক্রমণ করে। শত্রুর হাতে নিজেকে সোঁপে দিয়ে সম্মান হারাবার আগে সেই কন্যা ও তার বোন নিজেদের ‘স্তন’ কেটে ফেলেন, এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য মারা যান। তাঁদের এই মৃত্যুবরণ যাতে বৃথা না যায় এবং তারা চিরদিন নমস্য হয়ে থাকেন তাই এই মন্দির স্থাপনা করা হয়। ঐ দস্যু ব্যাপিয়া শাপগ্রস্ত হয়। ঐ দুষ্টু – দস্যু কে শাপ দেওয়া হয় – যেন সে তার পুরুষত্ব হারায় এবং কোনোদিনও যেন কোন নারীকে ভোগ করতে না পারে। শাপমুক্ত হবার জন্য সে বহুচারা মায়ের কাছে মেয়ের রূপ ধরে এসে ধর্ণা দেবে। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলে বন্ধা নারীও সন্তান ধারণের ক্ষমতা ফিরে পাবে। তাই সন্তানহীন মা-বাবাদের ভীড় এখানে।
“ভাবনা নগরে” নেমে ঐ মন্দিরে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন তো আমরা সেখানে হাজার হাজার ভক্তের আনাগোনা, উৎসব অনুষ্ঠান, প্রসাদ বন্টন ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খলভাবে লোকেদের লাইন করে পুজো দেওয়া দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। শ্বেতপাথরের সুন্দর কারুকার্য খচিত মন্দির ঐ ইংরেজদের সময় কি করে এখানকার রাজারা স্থাপনা ও নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ভাবতে অবাক লাগে। কারণ এই ব্রিটিশ সরকার ভারতে এই হিজড়ে জাতির সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কদর্য ব্যবহার করেছে – এসব কথা আমি পিসিমনির কম্পিউটারে ইন্টারনেটে Indian Eunuch দের History পড়তে গিয়ে জেনেছি। তাদের সবসময় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে তুলনা করা হত, নানান ছুতোয় শাস্তি দেওয়া, কারাগারে বন্দি করা যেন তাদের খেলা ছিল। অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় তাঁরা দিন কাটাতেন। হিন্দু ধর্মে প্রতিটি শুভ কাজে বিয়ে বা সন্তানের জন্মকালে তাঁরা যেতেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ নেওয়া আমাদের সামাজিক জীবনে সেই প্রাচীনকাল থেকে এই আধুনিক কালেও শুভ বলে মানা হয়। কিন্তু ইংরেজ সরকারের অত্যাচারে অনেক হিজড়ে গোষ্ঠী তখন চারণ বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
এখানে পুজো দেওয়ার পর যাঁদের বাচ্চা হয় তাঁরা পুজো দিতে আসেন এবং বাচ্চাকে বা তার ছবি এনে ‘গুরুমা’কে দেখান। এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না যে, আমার সমাজও শুধু তালি বাজিয়ে, নেচে, গান করে পেট চালান না। আমাদেরও একটা বিশেষ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্ম ও সুশৃঙ্খল জীবন ধারণের পদ্ধতি – রীতি নীতি আছে। আমাদের মা কে “তৃতীয় প্রকৃতি” বলা হলেও তিনিও মা দুর্গারই এক অবতার রূপে পূজ্য। এখানে Transgender কে “কিন্নর” বলা হয়। গুরুমা এখানে মহামহিমা মন্ডলীর প্রধানা “লক্ষী নারায়ণ ত্রিবেদী কে” দেখালেন আমাদের। তিনি উজ্জয়িনীতে হিজড়েদের জন্য এক সুন্দর আশ্রম বানিয়েছেন। গুজরাটের মুরারি বাপু একজন ‘মহাত্মা’ যাঁকে এঁরা শ্রী শ্রী রামচন্দ্রের মতন মনে করেন। কারণ তিনিই প্রথম কিন্নরদের এই ‘আখড়া’ দিয়ে লক্ষীনারায়ণ মা কে কিন্নরদের প্রধান গুরু রূপে বরণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, যেন অহল্যাকে পাষান মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই মুরারীবাপুকে কিন্নর সম্প্রদায় ভীষণ ভাবে শ্রদ্ধা করে। তাই এখন এলাহাবাদের ও উজ্জয়নীর কুম্ভ মেলায় অন্যান্য সাধুদের সঙ্গে এই কিন্নর মাতাও মিছিল করে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন। এই তীর্থেই “মধু কিন্নর” কে দেখলাম যিনি প্রথম মেয়র হবার যোগ্যতা পেয়েছেন। এঁরা সবাই আমার চোখ খুলে দিলেন। বাড়ি ফিরে এলাম আনন্দিত চিত্তে।
এরপর হাইয়ার সেকেন্ডারীতে প্রথম বিভাগে পাশ করলাম আমি। ‘গুরুমা’ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এবার তীর্থ করতে নিয়ে গেলেন আমায় ম্যাড্রাস তথা চেন্নাই থেকে ২০০ কি.মি. দূরে ‘কুভা গাম’ গ্রামে পরের চৈত্র পূর্ণিমাতে। সেখানে হিজড়াদের এক দেবী “বিষ্ণুর” অবতার “মোহিনীর” মন্দির আছে। মহাভারতের গল্পে অর্জুনের পুত্র ‘আরাভানম’ শত্রু অর্থাৎ কৌরবদের নাশ করবার জন্য “জীবন দান” করতে রাজী হয়েছেন, কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি একদিনের জন্য হলেও বিয়ে করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু যে যুদ্ধে “মৃত্যুবরণ” করতে যাবে তাকে কোন মেয়েই বিয়ে করতে রাজী হলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন পাণ্ডবদের একমাত্র উপদেশ দাতা এবং উদ্ধার কর্ত্তা তিনিই এই সংসারে ইন্ধন যোগান দিয়েছেন, অর্জুনের মিত্র সারথি উদ্ধার কর্ত্তা তো শ্রী বিষ্ণু ভগবানেরই রূপ তাই এবারে অর্জুন পুত্রের সামনে এসে দাঁড়ালেন “মোহিনী” রূপে। বিয়ে করলেন আরাকানকে। তরুণ রাজপুত্র প্রাণ ভরে সম্ভোগ করলেন সেই মায়াময়ী দেবী নারী কে – সেই নারী রূপই এখানে পূজিতা হন। গুরুমায়ের সঙ্গে আমি আর একজন হিজড়াদের দেবী “রেণুকা” কেও দর্শন করতে গেলাম। দক্ষিণ ভারতে হিজড়ে সমাজে “অর্দ্ধনারীশ্বর” – অর্থাৎ অর্ধেক শিব অর্ধেক পার্বতী মূর্ত্তির পুজো হচ্ছে খুব ধুমধামের সঙ্গে। অভয় দান করছেন সেই দেবী শত শত হাজার হাজার “তৃতীয় প্রকৃতির” মানুষকে। হয়তো ধর্মের ভয় দেখিয়ে মূল্যবোধকে ধরে রাখা।
দুবছর ধরে এতো তীর্থ ভ্রমণ, ঠাকুর দেবতা বা ধর্মের কাহিনী আমার ভাল লাগলেও – কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা থেকে গেল আমার মনের মধ্যে। আমি গুরুমাকে অনুরোধ করলাম – ‘এতো দূর যখন এসেছি তখন একবার কন্যাকুমারী ‘বিবেকানন্দ’ রক দেখতে যাওয়ার জন্যে। সেখানে গিয়ে মন ভরে গেল অপার শান্তি ও আনন্দে। কিন্তু সাধারণ দর্শক তো আমাদের মতন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ নাম দেওয়া লোকদের মানুষ বলে মনে করেন না। ট্রেনে, বাসে, প্রসাদের বা টিকিটের লাইনে, বাজারে, দোকানে, হোটেলে যেখানেই যাই সব জায়গাতেই শুধু অবজ্ঞা – অবহেলার ও ঘৃণার প্রকাশ। আমাদের দূরে দূরে আলাদা আলাদা রাখা, ধমকি, মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলা এবং মাঝে মাঝে পুলিশের ভয় দেখানো, – যেন এই নিরীহ হিজড়ের দল কোন সংক্রামক রোগে ভুগছে, – যেন এরা কুকুর, বেড়াল, গাধা, গরু – এদের মনে দুঃখ – অভিমান, রাগ, অপমান নেই। কেউ কেউ তো ভাবেন এরা রক্ত মাংসের মানুষই নয়, কোন দানবী পিশাচ। এদের এই পুরুষালি দেহ, কর্কশ কণ্ঠস্বর এবং মেয়েদের মতন হাবভাব – গান নাচ করা ভীষণ হাস্যকর, লজ্জাজনক।
সেদিন ‘বিবেকানন্দ রকে’ যেতে গিয়ে যে ঘটনাটি ঘটে সে কথা মনে করলে এখনও আমার শরীরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। এখনও আমি আমার গুরুমাকে যারা অসম্মান করেছে, গুরু বোনের শ্লীলতাহানি করেছে তাদের ক্ষমা করতে পারি না।
ঐ বিবেকানন্দের বিরাট নিস্তব্ধ হ’লে বসে চুপ করে অনেকক্ষণ কাটিয়ে যখন বাইরে এসেছি, একদল ছেলে আমাদের এক গুরুবোনের পেছনে লেগে গেল। তাদের ভাষা আমরা বুঝতে পারছি না, কিন্তু হাবে ভাবে ইঙ্গিতে সব ধরতে পারা যাচ্ছে কি তাদের উদ্দেশ্য। পুলিশ বা গার্ড দাদারাও হ্যা হ্যা করে হাসছে, যেন কোন হাসির নাটক দেখছে তারা। নানাভাবে তাদের আমরা উপেক্ষা করে যাচ্ছি। গুরুমা আমাদের সাবধান করেছেন যে, আমরা যেন ওদের সঙ্গে ঝগড়া করতে না যাই। আমার অন্য গুরুবোনটি দেখতে খুবই সুন্দর। প্রয়াগের মেলায় আজ থেকে ২০ বছর আগে তাকে এঁরা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, সে কোথাও শুনে এসেছে হিজড়েদেরও বিউটি কন্টেস্ট হয় আজকাল। তার ইচ্ছে সে তাতে নাম দেবে। তাই সবসময় একটু বেশি সেজেগুজে ভালো শাড়ি পরে থাকে সে। ভীষণ হাসি খুশি সরল। একটু চঞ্চল মতিও বলা যায়। ছেলেরা ওর প্রতি খুব তাড়াতাড়ি আকৃষ্ট হয়, আবার ওকে বারণ করা সত্ত্বেও ও বারবার ওদের দিকেই তাকায়। এখানে একটি খুব সাধারণ ধর্মশালায় উঠেছি আমরা। অটো করে তাড়াতাড়ি রওনা হবার পরে লক্ষ্য করলাম, পেছনে দুটি মোটরসাইকেল আমাদের অনুসরণ করে ঠিক ঐ আস্তানায় এসে হাজির হল।
সন্ধ্যে গড়িয়ে এসেছে, আমরা কন্যাকুমারী মন্দিরে আরতি দেখতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময় আবার ঐ চারটি গুন্ডা মতন ছেলে এসে আমাদের পান্থশালার ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে কথা বলতে লাগল নিজেদের ভাষায়। ব্যাপারটি গুরুমা ভাল চোখে নিলেন না। এবার সোজাসুজি ওদের সামনে অফিসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গলায় জোর এনে ঐ ছেলেগুলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, – “ক্যায়া বাত হ্যায় বেটা আপলোগোকো ক্যায়া চাহিয়ে”?
হিন্দি সিনেমা দেখে দেখে ভারতবর্ষের সর্বত্রই অর্থাৎ যে কোন প্রদেশের লোকেরাই এখন হিন্দি ভালোই বোঝে বা বলতে পারে। কিন্তু এরা বলতে চায় না। তবু সামনাসামনি স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়ায় একজন একটা কুৎসিৎ অঙ্গ ভঙ্গি করে উত্তর দিল – “তেরে কো নেহি রে বুড়িয়া উসকো চাহিয়ে”। একজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। “নেহী বিলকুল নেহী। হম ইঁহা তীর্থ করনে কে লিয়ে আয়ে হ্যায়। হম কোই sex worker নেহী হ্যায়”।
হো হো করে হেসে উঠলো তারা। বিনা দ্বিধায় এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে। আমাদের গুরুভাই বাধা দিতে গিয়ে এক থাপ্পড় খেল, একটা দৈত্যের মতন লম্বা চওড়া লোকের হাতে। এবার গুরুমা ভীষণ জোরে চিৎকার করে ঐ লোকগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, – “হারামজাদা ভাগ ইধর সে, নেহী তো হম পুলিশ বুলায়েঙ্গে” –
“পুলিশ? পুলিশ কাঁহা? হম হী তেরা পুলিশ কে বাপ হ্যায়। বুড়িয়া, আ জা, পহলে তু। তেরে জ্যায়সা হিজড়া বহৎ দেখা হ্যায়”। বলে এমন একটা ধাক্কা মারলো যে গুরুমা ছিটকে পড়ে গেলেন। পাশেই একটা লোহার চেয়ারে মাথাটা লাগল ভীষণ জোরে। আমি তখন আর থাকতে পারলাম না, ঝাঁপিয়ে পড়লাম হিংস্র বাঘিনীর মতন ঐ লোকটির ওপরে – রাগে আমার শরীর কাঁপছে। আঁচড়ে, কামড়ে, লাথি, কিল, ঘুষি চালাচ্ছি লোকটার ওপরে। ম্যানেজারটা ও তার চাকর বাকর এসে আমায় ধরল এবং কমলা আম্মাকে তুলে শোয়ালো, জল দিয়ে জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করতে লাগল। কেউ একজন আমার মারের ছবি তুলে নিয়েছে ততক্ষনে, পুলিশেও ফোন করে দিয়েছে। লোকগুলো গালি দিতে দিতে সেই সময়ের জন্য চলে গেল বটে কিন্তু শাসিয়ে গেল যে আবার আসবে তারা আমাদের সর্বনাশ করতে। ‘কমলা আম্মাকে’ অ্যাম্বুলেন্স-এ করে হাসপাতালে এবং আমাকে ওরা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেল। ধর্মশালায় রইল আমাদের বাকী দুই গুরুবোন, গুলাবী আর কুসুম।
সেদিন কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি ঐ দুষ্টু লোকগুলোর অভিপ্রায়, গুরুমায়ের সঙ্গে ঝগড়াটা ছিল, ওদের সাজানো নিছক একটা drama আমাদের আলাদা করার উদ্দেশ্যে।
পুলিশ স্টেশনে কেউ আমার কথা বোঝে না। মার পড়ল ভালো রকম, এমনভাব করছে যেন কোন চোর, ডাকাত কিম্বা উগ্রবাদী, টেরোরিস্ট ধরেছে। সারারাত ওদের নোংরা ‘লক আপে’ কাটলো। সকালে অফিসার এলে, হাত জোর করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বোঝালাম, সমস্ত ব্যাপারটা। তিনি কিছুটা নরম প্রকৃতির। আর আমি এরকম মারামারি করব না লিখিয়ে – একটা কাগজে সই করিয়ে আমাকে ছাড়লেন। আমি আমার কষ্ট যন্ত্রণাতে কাতর হইনি, শুধু গুরুমায়ের চিন্তায় কাঁদছি তখন।
তিনি জানতে চাইলেন ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও আমি কাঁদছি কেন ! আমি বললাম, আমার গুরুমাকে কোথায় কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কি করে তাঁর কাছে পৌঁছাবো, আমার কাছে তো কোন পয়সা কড়িও নেই। তিনি একজন সেপাইকে ডেকে বললেন – আমায় একটা আটো রিকসায় বসিয়ে সেই ড্রাইভেরকে আমরা যেখানে উঠেছি সেই ধর্মশালার নাম বলে দিতে। আমি বসে আছি অটোর অপেক্ষায়, ঠিক তখন একজন ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে থানায় প্রবেশ করলেন। ইংরেজীতে বললেন দারোগাবাবুকে যে তাঁর গাড়িটি রাত্রে চুরি হয়ে গেছে। ধর্মশালার পাশেই তাঁর ক্লিনিক, সেখানে রেখেছিলেন তিনি। ভোর বেলায় তাঁর ড্রাইভার জানায়, গাড়িটি সেখানে নেই। এতক্ষন ঐ অঞ্চলের দোকানদার ও রাত্রের চোকিদারদের কাছে জানা গেল চার পাঁচটি ছেলে একটি মেয়েকে ধর্মশালা থেকে নিয়ে ঐ গাড়িতে করে কোথাও নিয়ে গেছে। অনেকেই তাদেরকে ঐভাবে যেতে দেখেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর তখনই চারিদিকে ফোন করতে শুরু করলেন। আমার শরীরের রক্ত তখন ভয়ে হিম হয়ে গেছে। কোনোরকমে ইংরেজীতে বললাম – “oh my God! Gulabi, She is my Sister”, – ভদ্রলোক চমকে উঠে তাকালেন আমার দিকে। এরকম মার খাওয়া বিদ্ধস্ত চেহারার একজন হিজড়ে যে ইংরেজীতে কথা বলতে পারবে, এটা তিনি হয়ত আশা করতে পারেননি। ইন্সপেক্টরবাবু রাত্রে ধর্মশালার মারপিটের ঘটনাটি জানালেন ওনাকে। আমি তখন সম্ভ্রান্ত চেহারার ঐ মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের পায়ের কাছে বসে পড়ে বার বার বলে চলেছি – “Sir, Please help us, Save my Sister’s life।
আমার জন্য অটোটি এসে গিয়েছিল। ঐ ডাক্তারবাবু বললেন, – “আমি তো ওখানেই ক্লিনিকে যাচ্ছি – চলো তুমি আমার সঙ্গে। আর পুলিশ ইন্সপেক্টরকে বললেন, যত শীঘ্র পারেন গাড়ি ও ঐ মেয়েটির খোঁজ করুন”। শান্ত হয়ে বসে একটা ডাইরীও লিখলেন তিনি, শুধু তাই নয়, আমার হয়েও একটা বড় নালিশ ও ডাইরী লেখা শেষ করে আমাকে সই করতে বললেন।
ধর্মশালায় ফিরে দেখলাম কুসুম একা বসে হাউ হাউ করে কাঁদছে। বাইরে নানান রকমের লোকের ভিড়। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল সে। ডাক্তারবাবু এবার সেখানকার চাকর বাকরদের সবাইকে ডাকলেন, ধমকের সুরে নিজেদের ভাষায় কি সব বললেন, তারপর আমাকে ও কুসুমকে সঙ্গে করে – একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে গেলেন গুরুমায়ের খবর নিতে। সঙ্গে ধর্মশালার কর্মচারী, যাঁরা তাঁকে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছে।
‘কমলা আম্মা’ অর্থাৎ আমার গুরুমায়ের মাথায় ভীষণ আঘাত লেগেছে, তাঁর জ্ঞান ফেরত এলেও যন্ত্রনায় কাতর হয়ে গেছেন তিনি। ছোট্ট একটা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিশেষ পরীক্ষা নিরীক্ষারও ব্যবস্থা নেই। ডাক্তারবাবু ওনাকে অ্যাম্বুলেন্স-এ নিজের নার্সিংহোমে – ক্লিনিক সেন্টারে পাঠাবার জন্য অনুরোধ করলেন সরকারী ডাক্তারকে, আর আমাদের বললেন – ‘গুলাবীর’ কিডন্যাপ হওয়ার কথা যেন ওনাকে জানানো না হয়। চোখ খুলে আমাদের দুজনকে একবার দেখতে পেয়ে গুরুমা যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার চোখ বুজলেন। ডাক্তারবাবুকে আমাদের ভগবান মনে হল। আমরা তাঁর সঙ্গে তাঁর নার্সিং হোমে এলাম এবং ওখানে বসে ডাকতে লাগলাম আমাদের দেবী ‘বহুচারা’ ও ‘রেণুকা’ মাতাকে। পুলিশের সঙ্গে বারবার কথা বলছেন ডাক্তারবাবু এবং তাঁর স্ত্রী, গাড়ির জন্য নয়, ঐ মেয়েটির খোঁজ করবার জন্য নানা জায়গায় ফোন করছেন তাঁরা। বিকেল বেলায় খবর এল গাড়িটি একটি জঙ্গলে পাওয়া গেছে, এবং গুলাবীর ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেহ দূরে এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে পাওয়া গেছে। যখনই আমার কানে এল, – “Her body is found”- আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, কুসুম আমাকে চেপে ধরে কী যেন বলেই অজ্ঞান হয়ে গেল। নার্স দিদিরা তাকে চোখে মুখে জল দিচ্ছে – আমি যে কখনও কাউকে মুখে একটা খারাপ কথা বলতে পারি না – বাংলা, হিন্দি, ইংরাজী যে ভাবে যত খারাপ ভাষায় বলা যায় শাপ-শাপান্ত গালি দিয়ে যাচ্ছি ঐ নিষ্ঠূর নৃসংশ হত্যাকারী দানবদের।
এতো সুন্দর ফুলের মতন মেয়েটাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে কি লাভ পেল ওরা? ভগবান কি অন্ধ? কি হল ঐসব তীর্থে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেব-দেবীর দরবারে মাথা কুটে?
স্থানীয় লোকেরাও বিস্ময়ে ভয়ে সব স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সেখানকার মহিলা উকিল, সাংবাদিক, activists রা আমাদের ঘিরে ধরেছেন, তাঁদের কথা প্রশ্ন কিছুই আমার কানে যাচ্ছে না শুধু – গুলাবী রে — গুলাবী তু বাপিস আ – – শরীরে কোন রোগ হলে তাকে নিয়ে কত চিন্তা থাকে, আর যখন সেটা প্রাণহীন তাকে শুধু দেহটা বা Body বলে ধপাস করে এনে মাটিতে ফেলে দিতে কারুরই কোন দ্বিধা হয় না। আমাকে সেই “দেহ” যখন সনাক্ত করতে বলা হল। তখন আছড়ে পড়লাম সেই ধর্ষিতা গুরুবোনের বুকের ওপরে।
দিল্লীতে এই ধরণের গণ ধর্ষণ ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা শোনা গেছে। সারা দেশের মানুষ তার জন্য মোমবাতি জ্বেলে, মিছিল করে, শোক সভা করেছে। আমি রোজ খবরের কাগজ থেকে পড়ে শুনিয়েছি আমার গুরুমা কে। তাঁর চোখে জল পড়েছে। আর আজ তাঁরই ঘরের একজন সদস্য এইভাবে পশু মানবের লালসার শিকার হবে, এমন শোচনীয় ও ভয়াবহ মৃত্যু বরণ করবে আমরা কি কেউ ভাবতে পেরেছিলাম ! ডাক্তারবাবুর তোড়জোড়ের চেষ্টায় বোন গুলাবীর পোষ্টমর্টেম ও সৎকার করা হল। মুখাগ্নি করার সময় মনে হচ্ছিল যে ঐ জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে আমি সামনের সব পুরুষের পুরুষাঙ্গ জ্বালিয়ে দিই। সারা শহরের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে চলে যাই। গুরুমা ও কুসুমের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা ছাড়া আর কিছুই করবার মতন শক্তি সঞ্চয় করতে পারিনি সেদিন। পরে শুনেছিলাম ঐ ছেলেগুলি ধরা পড়ে আবার ছাড়া পেয়ে গেছে, কারণ স্থানীয় কোন রাজনৈতিক দলের নেতার পুত্র আছে সেই ঘৃণ্য পাষণ্ডদের মধ্যে, অতএব জামিনে খালাস পেয়ে আবার শহরের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। Activist সাংবাদিক এবং উকিল দিদিরা আমাদের হয়ে কেস করে হতাশ হয়েছেন। একে তো অন্য প্রদেশের লোক তায় আবার “হিজড়ে”! কে তাদের হয়ে সাক্ষী দেবে? কেউ সাহস করে এগিয়ে আসতে চাইছে না। সুতরাং কে তাদের বিচার করবে, শাস্তি দেবে? অতএব বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
কানপুরে এসেই গুরুমা দেখা করলেন আমার মালিক উকিল বোস বাবুর সঙ্গে। তিনি গুলাবীর কেস নিয়ে অনেক লেখালেখি শুরু করে দিলেন। ঐ পশুদানবদের প্রথম ছোট কোর্টে – যাবৎজীবন সাজা হলেও তারা আবার আপিল করল হাইকোর্টে। সব জায়গাতেই তাদের টাকার জোর খাটাতে লাগল। রক্ষক যেখানে ভক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করে সেখানে কে কি ভাবে সুবিচার পাবে? আমরা সবাই খুব বিমর্ষ মনমরা হয়ে পড়লাম।
এইসময়ই হঠাৎ আমার কলকাতা যাওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল। পিসিমনির ভাইয়ের বিয়েতে তাঁরা কলকাতা যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। সোনামনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল। পিসিমনি আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। সোনামনির দেখাশোনাও হবে, আবার আমি আমার মা বাবার সাথেও একবার দেখা করে আসতে পারব। আমি তো আনন্দের সঙ্গে এই সুযোগ গ্রহণ করলাম, অবশ্যই গুরুমায়ের অনুমতি নিয়ে।
হাওড়া স্টেশনে নামতেই মনটা যেন ময়ূরের মতন নেচে উঠল। ট্রাম, বাস, রিকশা – সবাই শাড়ি পরে, বাংলায় কথাবার্তা – একটা অদ্ভুত অন্য জগৎ, যার সঙ্গে আমার প্রাণের টান অনুভব করতে লাগলাম। পিসিমাদের বাড়িতে খুব ভিড় তাই আমাদের জন্য খুব সুন্দর এক Guest House এ থাকার ব্যবস্থা হল, ঐরকম মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ মেয়েকে নিয়ে তো সকলের মধ্যে থাকা যাবে না। আমারও খুব সুবিধে হল। পিসিমনি মা বাবাকে ফোন করে ডাকলেন সেই গেস্ট হাউসে। ভাইও এল। আমি যে কি করব তা ভেবে পাচ্ছি না। একবার মা কে জড়িয়ে ধরে – কাঁদছি, তো একবার বাবাকে প্রণাম করছি। কখনও ভাইয়ের মুখটা বুকে চেপে ধরে কাঁদছি। সেও দিদিকে পেয়ে অবাক হয়ে চেয়ে আছে – এ এক অপূর্ব মিলন মেলা যেন। হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে পেয়ে এমন আবেগে আপ্লুত হতে দেখে ঐ ঠাকুমা, পিসিমা এমন কি রাসভারী বোস বাবুরও চোখে জল এসে গেল। আনন্দ অশ্রু যে এতো পবিত্র হয়, মনকে এমন ভাবে সিক্ত করে, ধৌত করে স্নিগ্ধ করে দেয় – তা আগে কখনও অনুভব করিনি। ওঁদের জন্য পিসিমনি অনেক উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, মা বাবা ও আমার জন্য খুব সুন্দর শাড়ি এবং মায়ের গলার একটি চেন, কানের ঝুমকো ‘তিন্নি’ লেখা একটি আংটি দিলেন – আমায়। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আরও পড়াশুনো করার প্রতিজ্ঞা করলাম তাঁদের সামনে। ভীষণ খুশি হলেন তাঁরা। বাবা পিসিমনির কাছে অনুরোধ করলেন যাওয়ার আগে একবার যেন তাঁদের বাড়ি যাই আমরা সবাই মিলে। ঠাকুমা প্রশ্ন করলেন “আপনাদের ওখানের প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবরা আমাদের তিন্নিকে অন্য চোখে দেখবে না তো? ওর অসম্মান হোক এমনটা কিন্তু হতে দেওয়া চলবে না”। –
এবার হাত জোড় করে বাবা বললেন – “মা আপনারা ওকে আপন করতে পেরেছেন, সুন্দর জীবনের রাস্তা দেখিয়েছেন, আর আমরা আপন বাবা মা ওকে কোন সাহসে দূরে ফেলে রাখব? ওর অপমান তো আমরাই আগে করেছি, ওর মনে আঘাত দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা কর মা, তিন্নি মা আমার একবার বাড়ি চল”।
বাড়ি গিয়ে সারাদিন প্রানখুলে গান, গল্প – সুক্ত, মাছের ঝোল, চাটনি, পায়েস, খেয়ে সারাক্ষন ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করে এক অবাধ ভালোবাসার স্বাদ ও পরিতৃপ্তিতে ভরে ফিরে এলাম, এক নতুন উৎসাহ, আনন্দ ও প্রেরণা নিয়ে।
কলকাতা থেকে ফেরার সময় যেন আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। ট্রেনে সবাইকার এক জায়গায় সীট পাওয়া যায়নি। আমি বললাম – ‘আমি পাশের কামরায় একা বসছি। যখন তখন এসে সোনামনিকে দেখে যাব, বাথরুম করিয়ে দেব। পিসিমনি তো এবার আমাকে একটা মোবাইল ফোনও উপহার দিয়েছেন। সেটিতেই তো সর্বদা যোগাযোগ থাকবে। অন্য কামরায় এসে একা একটি কোণে জানলার ধারে মুখ করে বসে রইলাম। বাংলাকে যে এতো ভালোবাসে, বাংলা ভাষায়, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে খাওয়া পরায় যার এতো আসক্তি ও অনুরাগ তাকে বাংলা পরিবেশ ছেড়ে কেন যে বারবার চলে যেতে হয়, – দূরের পানে চেয়ে আঁখি – কেবল আমি চেয়ে থাকি, মনটা মোচড় দিতে থাকে, কান্নায় বুকের মধ্যে একটা ঠেলা উপলব্ধি করতে পারছি। বাইরে সবুজ মাঠ ছুটে যাচ্ছে – – – রাখাল, গরু, নদী, পুকুর, হাঁসের দল – কী সুন্দর অনুভূতি – হটাৎ কে যেন ডাকল, – “Excuse me, May I know your seat number”? চমকে উঠে মুখ ফেরালাম আমি, যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম, প্রথমে মুখে কথা সরল না, বোধহয় অন্য জগতে বিচরণ করছিলাম। আবার তাঁর সুন্দর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে বাজলো – “আপনার সীট টা বোধহয় ঐদিকে – এটা আমার জায়গা – ১২ নাম্বার – দেখুন টিকিটটা একবার”।
চোখে চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গে। এক সেকেন্ডে আমার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল, – এতো সুন্দর প্রগাঢ় দৃষ্টি – এতো সম্মানজনক ভঙ্গি – এমন সুঠাম লম্বা পুরুষ ! আমার সঙ্গে একজন হিজড়ে, বৃহন্নলা – কিন্নরের সঙ্গে এইভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন – একি কোন দেবদূত নাকি? লজ্জিত মুখে উঠে দাঁড়ালাম – উত্তর দিলাম। “Yes, I know, this is not my seat । জানলার ধারে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আপনি বসুন এখানে, আমি ওদিকে চলে যাচ্ছি”।
কিন্তু তাঁর চোখে হয়তো কিছু ধরা পড়ে গেল, – “একী আপনি কাঁদছিলেন? Any bad news, না আপনার শরীর খারাপ”?
বুঝতে পারলাম না কি জবাব দেব। – কিন্তু আমার “তৃতীয় নয়ন” বা অন্য একটা সত্তা বলে দিল এটাই বোধহয় “- – – Love at first sight” – প্রেমের আকর্ষণ এটাকেই বলে কিনা জানি না। আমার বুক কাঁপতে লাগল অকারণে। ঠিক এই সময়ে আমার ফোনটা বেজে উঠল, আমি ছুটে গেলাম পাশের কামরায় সোনামনিকে attend করতে। কি মনে হল যাওয়ার আগে ঐ attractive খুব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষটিকে ইশারা করে শুধু আমার স্যুটকেশটা দেখিয়ে বললাম – “Please একটু দেখবেন – আমি পাশের কামরায় আমার বোনকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আসছি”।
তিনি মাথা নাড়লেন – ‘OK No Problem! প্রায় এক ঘন্টা লাগল, সোনামনিকে বাথরুম করাতে, খাওয়াতে ও শোয়াতে। এসে দেখলাম, চা, বিস্কুট, চপ দিয়ে গেছে, আমাদের টেবিলে। আমারগুলি আগলে উনি বসে আছেন। আমি স্মিত হাসি হেসে – ধন্যবাদ জানালাম। ট্রেনের আওয়াজে ভালো করে কথা বলা বা শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা ছোট্ট কাগজে কিছু লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ঐ যুবক। লেখা – “Can’t – talk, Please Give me your Whatsapp Number”।
আমার বুকের মধ্যে তখন শত শত দামামা তবলা, খোল, মৃদঙ্গ বাজতে শুরু করেছে। হাত কাঁপছে তবুও ওনার পেন ও কাগজে লিখে দিলাম আমার নাম – ‘ত্রিনয়নী’ এবং ফোন নাম্বার।
শুরু হল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। সামনে যেন খুলে গেল স্বর্গের দ্বার। হৃদয়ের মন্দিরে যেন চার্চের বেল বাজছে, দূর থেকে মসজিদের আজান ও গুরুদ্বারার শব্দ কীর্তনের ধ্বনি ভেসে আসছে ভাবছি, – “সখী ভালোবাসা কারে কয়? সে কী – – – -?
‘ধানবাদ’ স্টেশনে উঠলেন দুজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা প্রায় ৭০/৮০ হবেন। যাঁরা চড়িয়ে দিতে এসেছিলেন তাঁরা জিনিসপত্র গুছিয়ে ওনাদের প্রণাম করে নামার আগে ঐ ভদ্রলোক ও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, – “দাদা, – বৌদি, Please একটু সীট চেঞ্জ করে দেবেন, ভুল করে ওপরের বার্থ দিয়েছে ওঁদের। আমরা বলেছি, জ্যেঠুকে ট্রেনে কোন ভাল লোককে অনুরোধ করে বদলে নেবেন। জ্যেঠিমা খুব অসুস্থ”। তাড়াতাড়িতে নেমে গেলেন তাঁরা, কারণ ট্রেন এখানে খুব অল্প সময়ের জন্য থামে। আমি বললাম, “ঠিক আছে কোন চিন্তা করবেন না, আমি ঐ মায়ের বার্থে উঠে যাব”। খুব খুশি হলেন ঐ বুড়ো বুড়ি জ্যেঠু-জ্যাঠিমা আমাদের পেয়ে। গল্প জুড়ে দিলেন ঐ ছেলেটির সঙ্গে জোরে জোরে। আমিও শুনতে লাগলাম চুপ করে।
উনি একজন – প্রাকৃতিক উর্জা বিশেষজ্ঞ, মানে Sustainable – Energy – Consultant, বিদেশে পড়াশোনা করে এসেছেন। আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় অর্থাৎ ৩০ বছরের বিবাহিত ব্যক্তি! একটি ছেলেও আছে তাঁর ৩ বছরের। পুনে, মহারাষ্ট্রতে থাকেন, নিজের বাবা মায়ের বাড়িতে। বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এই সুন্দর শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার আমার মনকে যেমন আবেগে আপ্লুত করল তেমনই আবার যেন একটা চাবুকও খেলাম আমি। সমস্ত প্রেমিক সত্তা আমার প্রথম এবং হয়তো এই শেষ প্রেমের প্রবল স্রোতে বাধাপ্রাপ্ত হল। ও হো উনি বিবাহিত? না, না, কারোর সংসার ভাঙতে চাই না আমি। রাত্রে ‘ডিনার’ খেয়ে আর একবার দেখে এলাম ঐ কামরায় পিসিমনিদের। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে একটু যেন ধাতস্ত হলাম। ভেতরে যে অদ্ভুত একটা আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাৎ হচ্ছে তাকে শান্ত করার জন্য অনেক মেঘ কান্নার বৃষ্টি চাই। ঐ মায়ের পাশে বসে অনেকটা জল খেলাম নিজের সীল করা বিসলারির বোতলটা থেকে, উনি আমায় লক্ষ্য করছিলেন এতক্ষন, বোধহয় একজন ‘হিজড়ে’র পাশে বসে ওনার একটু সংকোচও হচ্ছিল, কিন্তু আমাকে এতটা জল একসঙ্গে ঢক ঢক করে পান করতে দেখে মাতৃ সুলভ প্রশ্নটা স্নেহময়ীর কণ্ঠে শোনা গেল।
“ও মা ! কত জল তেষ্টা পেয়েছিল গো। কতক্ষন জল খাওয়া হয়নি তোমার”?
আমি শুধু বললাম, – “অনেকক্ষন – – -“। মনে হচ্ছিল আমার এই তৃষ্ণা বোধহয় আর কোনদিন মিটবে না। ঐ মায়ের বিছানাটা করে দিয়ে চাদর বালিশ কম্বলে ঢেকে, ওনার পা দুটি সুন্দর করে মুড়ে দিয়ে বললাম, – “এবার শুয়ে পড়ুন, আমি ওপরে উঠে যাচ্ছি”। – সালোয়ার কামিজ পরেছি – ট্রেনের সফরে সুবিধে হল। তাড়াতাড়ি ঐ ওপরের বার্থে উঠে শুয়ে পড়বার আগে হাত জোড় করে ঠাকুমার শেখানো প্রার্থনাটা করলাম, যেটা ছোট থেকেই করি, – “শরণাগত পরি – – – । তারপর ওনার দিকে কোনরকমে তাকিয়ে শুধু Good Night বলে শুয়ে পড়লাম।
মুখটা অন্য দিকে করে ফোনটা বুকের কাছে ধরে শুয়ে আছি। যদি হটাৎ পিসিমনি ডাকেন সোনামনির বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনে। ঠিক তখনই মেসেজ আসতে শুরু করলো একের পর এক। প্রথমে ভাবলাম বোধহয় কোন বিজ্ঞাপন কোম্পানীর মেসেজ, কিন্তু বেশ কয়েকটা আসার পর খুলতেই হল, ফোনের আলোয় জ্বল জ্বল করে উঠল কয়েকটা লাইন।
তিনি কে বুঝতে দেরী হল না –
– ঘুমিয়ে পড়লেন? আপনার নামটা বড় সুন্দর। একটু কথা বলতে চাই !
উত্তর দিচ্ছি না দেখে আবার মেসেজ, –
– Are you sleeping?
– No
– Please turn this side , look at me
– Sorry I am very tired
– I know you are upset also
– বাবা, মা ভাইকে ছেড়ে এসেছি।
– কোথায় যাচ্ছেন?
– কানপুর। এক এক word এ reply দিচ্ছি।
– আমি দিল্লী, পরের সপ্তাহে পুনে চলে যাব, ওখানে আমার মা ও ছেলে আছে।
– নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হচ্ছে না।
– কানপুরে আপনার কে আছে? ঐ বোনটি কি আপনার নিজের?
– না, আমি ওর নার্স দিদি, ওদের বাড়িতে কাজ করি। মেয়েটি মানসিক দৈহিক ভারসাম্যহীন।
– এইরকম একটি অসুস্থ বাচ্চাকে সেবা করতে কষ্ট হয় না আপনার?
– না খুব ভালো লাগে, আনন্দের সঙ্গেই করি। তাছাড়া ভদ্রভাবে বাঁচার জন্য টাকা রোজগারেরও দরকার।
– খুব ভাল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভীষণ খুশি হলাম।
– Thank You
– আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন Please
– কেন? আমাদের গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়ম নেই, বাইরের লোকের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করার।
– আপনার ওখানে গার্জেন, মানে অভিভাবক কে?
– আমার গুরুমা – কমলা আম্মা।
– ওনাকে আপনি খুব ভালোবাসেন মনে হচ্ছে।
– হ্যাঁ, বাবা মা বাঙালি, জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু উনিই আমাকে জীবন দান করেছেন, নতুন ভাবে।
– Very Interesting
– আমাদের হিজড়ে মানে থার্ড জেন্ডার-দের কে সবাই খুব ইন্টারেস্টিং মনে করে।
– না না আমি কিন্তু সেভাবে বলিনি। কিছু মনে করবেন না please
– মনে করার কিছু নেই। আপনাদের সমাজ আমাদের সম্মানের চোখে কোন দিনিই দেখে না।
– কে বলেছে আপনাকে? কত থার্ড জেন্ডার-এর ব্যক্তি এখন অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন।
– তাই নাকি? একটু ব্যঙ্গ করে বলে উঠলাম।
– আপনি গৌরী শাওনের নাম শোনেননি।
– না, কে তিনি? কোথায় থাকেন?
– পুনে তে। মহারাষ্ট্রের মেয়ে – মানে জন্মগত ভাবে নন, প্রথমে ছেলে ছিলেন পরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে তাঁর এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি Eunuch “ইউনাক” গোষ্ঠী ভুক্ত হন।
একসঙ্গে এতো বড় মেসেজটা পাঠিয়ে একটু উঠে বসলেন তিনি নিজের বার্থে। জল খেলেন বোতল থেকে।
আমি ওনার দিকে ফিরে তাকিয়ে আছি হাঁ করে। কত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ত তাঁর ব্যবহার। যেন কত চেনা কোনো এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন।
অদ্ভুত একটা ভাল লাগায় মনটা যেন আপ্লুত হয়ে গেল।
আমার দিকে হাত বাড়িয়ে নিজের বড় ফোনটা মনে হয় I-Pad এগিয়ে দিয়ে বললেন, Google Search করে গৌরী শাওনের ‘Ted Talk’, Proctor and Gamble-এর অফিসে, বিভিন্ন স্কুল, কলেজে দেওয়া কথাগুলো শুনুন। আমি একটু নিচে নামি। washroom যেতে হবে।
আমি পড়তে লাগলাম গৌরী দেবীর কথা মন দিয়ে, মুগ্ধ হয়ে – মগ্ন হয়ে শুনতে লাগলাম তাঁর অপূর্ব ভাষণ, True Story। চেহারাটা ঠিক যেন বাঙালি মেয়ের মতন। কপালে “উষা উত্থুপের” মতন বড় টিপ।
মেরুন রঙের শাড়িতে তাঁর অসম্ভব উজ্জ্বল শ্যামলী চেহারা যেন জ্বল জ্বল করছে, স্টেজের ওপরে। দাঁড়িয়ে এক মিনিটেই আমাকে সম্মোহিত করে দিলেন তিনি।
পুনের এক বড় পুলিশ অফিসারের পুত্র, – খুব ভাল ইংরেজী স্কুলে পড়তেন। বিরাট বাংলো বাড়িতে থাকতেন। অনেক চাকর বাকর, এক দিদি – মা – বাবা – সুখের জগতে বিলাসিতার মধ্যে বড় হচ্ছিলেন। হটাৎ তাঁর ‘মা’ অকালে মারা গেলেন। দিদির বিয়ে হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকেই পুরুষের সমস্ত লক্ষণ নিয়ে জন্মালেও মানসিক ভাবে মেয়ের গুণগুলি লক্ষ্য করা যেত তার মধ্যে। পুতুল খেলতে, মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রান্না বাড়ি খেলতে পছন্দ ছিল তাঁর। ধীরে ধীরে চেহারায় পরিবর্তন এসে গেল। ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী, থেরাপিস্ট কেউই তাঁর পুরুষত্ব প্রমান করতে বা অক্ষুন্ন রাখতে পারল না। বাবা কথা বলতেন না, অপমানে, গ্লানিতে, লজ্জায়, ঘৃনায় ও ভগবানের ওপর – পৃথিবীর মানুষের ওপর রাগে – অভিমানে সেই গণেশ নামের ছেলেটি যখন সম্পূর্ণ লালিত্য নিয়ে কন্যা তথা কিন্নরীর রূপ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করল, তখন একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিল মুম্বাইয়ের হিজড়ে সম্প্রদায়ের আড্ডায়। ইংরাজী সাহিত্য জানা ছিল, আর মনে ছিল অদম্য উৎসাহ, তাই যুবতী গৌরী হয়ে সে প্রথমে ‘গায়েত্রী’ নামে এক sex worker এর কন্যাকে adopt করে ‘মা’ ডাক শুনে নিজেকে ধন্য করল। পরে ওই রকমই আরও অসহায় পতিত দুঃখী পথ শিশুদের নিয়ে তৈরী করল ‘NGO’ “নানী কা ঘর”। সেখানে তাঁর মাতৃত্বে স্নেহে লালিত পালিত হচ্ছে কত শিশু দুঃখী পরিত্যক্ত বাচ্চারা।
ফোনে গৌরী শাওনের জীবনী পড়তে পড়তে আনন্দে আশায় আবেগে উঠে বসলাম এবং ঐ ভদ্রলোকের – হাতে সেটি ফেরত দিয়ে, নিজের মোবাইলে আবার আমাদের নীরব বার্তালাপ – গল্প কথা শুরু হল। এবার আমিই প্রথম মেসেজটা করলাম।
– অনেক অনেক অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমার আজ পথ প্রদর্শক গুরু হলেন। আপনাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
– তাহলে এসো না, আমরা দুজনে মিলে একটা নতুন জীবন, আলোকোজ্জ্বল পবিত্র স্নেহ সেবা, ভালোবাসায় গড়া পরিবার তৈরী করি।
– না না সে কী করে হয়? আপনার স্ত্রী পুত্র কি ভাববে? কত আঘাত পাবে।
– আমার পুত্রটি অন্ধ। আর স্ত্রী? একটু স্মিথ হাসি হেসে থেমে কেটে কেটে শুধু বললেন, তিনি বাচ্চা প্রসব করেই চিরতরে এই পৃথিবী থেকে স্বর্গের পথে চলে গেছেন।
– ওঃ হো, I am very sorry।
– ঐ বাচ্চা ও আমার বুড়ি মায়ের ভার যদি শেয়ার করে নাও, I will be grateful, কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চাই “ত্রিনয়নী” তোমাকে।
– আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এই রাত্রের ট্রেন জার্নিতে মা বহুচারা, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী সারদা মা – বিবেকানন্দ কি তোমার মধ্যে আমার সামনে প্রকট হয়েছেন।
– তোমাকে আমার পুত্রের ‘মা’ বলে আমি মর্যাদা দিতে চাই, সুযোগ দেবে তুমি?
– হে ভগবান, এ আমি কি শুনছি ! আমি কি এর যোগ্য হতে পারব?
– হ্যাঁ নিশ্চয় পারবে। – আমরা দুজন স্বর্গ খেলনা গড়িব এ ধরণীতে।
কানপুরে সোনামনি, পিসিমনি, ঠাকুমা ও বোস বাবুর সঙ্গে স্যুটকেশ হাতে করে যখন নেমে পড়লাম, তখন ঐ নাম না জানা দেবদূত হটাৎ বিদায় সম্ভাষণ জানাতে আমাদের পিছনে এসে দাঁড়ালেন।
কি ভাবে যে কি কথা বলা উচিৎ এখন বুঝতে পারলাম না। শুধু দু চোখে জল নিয়ে অদ্ভুত আবেশে ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, আমি ধরা গলায় বললাম, –
– আমি রাজী।
সোনামনি খুব আনন্দে উৎসাহে স্টেশনের মাটিতে পা দিয়ে হেসে উঠল খল খল করে। কলকাতায় গিয়ে মামার বিয়ে দেখে সে এখন “বৌ – বর – বর” খেলতে ভালোবাসে।
আমি ওকে একহাতে চেপে ধরে অন্য হাতে স্যুটকেশ নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমার জীবনের প্রিয় মানুষগুলির সঙ্গে।
বাইরে দুটি বড় বড় গাড়ি অপেক্ষা করছে। ঠাকুমা ও আমি সোনামনিকে নিয়ে একটা গাড়িতে বসে পড়লাম। পিছনে হুইশেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার শব্দ ক্রমশঃ মিলিয়ে যেতে লাগল। বুকের ভিতরে ঐ আওয়াজটা যেন “শেল” বিঁধিয়ে দিচ্ছে। কে জানে কখন কেমনে তার সঙ্গে আবার দেখা হবে? আর ঠিক তখনই আমার বোনটি হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল – “দিদি দিদি বল, তোল বল এসেছে, – বল? কোথায় আবার বল পেলে তুমি? ঐ যে বল, বল, বল, আয়, আয়। জানলার বাইরে দেখি সত্যি তো আমার বর দাঁড়িয়ে আছেন – তিনি বললেন – “চলো তোমার গুরুমাকে প্রণাম করে আসি”।
চতুর্থ অধ্যায়
গুরুমা বললেন, –
“আজ মেরে জিন্দগীকে সব সে আচ্ছা দিন হ্যায়। হামারা বরাদ্রিকে কিসিকো এক সাচ্ছা ইনসান নে জীবন সাথী বানানে কে লিয়ে তৈয়ার হুয়া। ঈশ্বর তুম দোনো কো সদা সুখী রাখেঙ্গে।”
বোসবাবুদের বাড়ির লনে সুন্দর করে আম পল্লব, গাঁদা ফুলের মালা সাজিয়ে প্যান্ডেল বানানো হল এবং মা বাবার উপস্থিতিতে আমাদের সম্প্রদায়ের সব সদস্যদের মাঝে বিবাহ মণ্ডপ তৈরী করা হল। আমার স্বামীর মা ও পুত্রও যোগ দিলেন সেই অনুষ্ঠানে। সম্পূর্ণ বাঙালিদের নিয়ম কানুন অর্থাৎ আইবুড়ো ভাত ও গায়ে হলুদ ইত্যাদি সমাধা হলে, কন্যাকে সম্প্রদানের জন্য পিতার ডাক পড়ল।
কিন্তু বাবা দুই হাত জড়ো করে বললেন, – “আমি এর যোগ্য নই, ‘কমলা আম্মাই’ একে মেয়ের যথার্থ মর্যাদা দিয়েছেন, তিনিই সম্প্রদান করুন।” কিন্তু পুরোহিত মহাশয় রাজী নন। তিনি বললেন “তা কি করে হয়, গোত্র চাই, এর গোত্রান্তর হবে। নারায়ণ স্বাক্ষী করে এসব অনাচার তো হতে দেওয়া চলবে না।”
এবার বরের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বর – স্বামী “দেবমাল্য সাহা।” – “তাহলে দক্ষিণাটার টাকা নিয়ে আপনি এখন থেকে বিদায় গ্রহণ করুন।” তারপরে আমার হাত ধরে টেনে তুললেন – বিয়ের পিঁড়ি থেকে। – “এসো তিন্নি আমরা আজ এক নতুন ধরণের বিবাহ বন্ধনে যুক্ত হই।” প্রথমে তাঁর নিজের মা ও পরে আমার মা, বাবা, গুরুমা, ঠাকুমা, পিসিমনি, ও বোসকাকুকে প্রণাম করে তিনি তাঁর ছোট্ট শিশুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমাদের দুজনের হাত তার ছোট্ট হাতে সঁপে দিয়ে বলে উঠলেন, কান্না জড়িত গলায়, – “হে শিশুরুপী নারায়ণ, তুমি আমাদের এই বিবাহ বন্ধনকে স্বীকার করো, অনুমতি দাও তোমাকে ও সমগ্র জগতের দুঃখীজনের সেবায় যেন আমরা দুজন লাগতে পারি।” – সেই ছোট্ট পুত্র প্রথমে আমার হাতটি পরশ করে, পরখ করে দেখতে লাগল। আমি ওর কাছে নিচু হয়ে বসে পড়েছি। মালাটি নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলো সে, তারপর আমার মুখে চোখে হাত বুলিয়ে মাথার চুলে তার আঙুল ছোঁয়ালো। আমার শরীর আনন্দে, আবেগে শিহরিত হয়ে কাঁপছে – আমি আর থাকতে পারলাম না। মাটিতে বসে ওকে বুকে টেনে নিলাম। সে ও আমায় জড়িয়ে ধরে বলল – “আমার মা! বাবা তুমি আমার জন্য ‘মা’ কিনে এনেছো? কি সুন্দর গন্ধ”, – আমার মতন বিবাহ বাসরে আনন্দ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিতদের আসরে সবাইকার চোখে জল এসে গেল।
বোসকাকু রেজিস্ট্রি অফিসের লোকদের আগেই নিয়ে এসেছিলেন। আইনসম্মতভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে গেলাম। –
ওদিকে আমার বোন সোনামনি তখন একটু দূরে ঠাকুমার পাশে বসে হাততালি দিচ্ছে। ওকেও আমি চন্দনের ফোঁটা, লাল ছোট্ট বেনারসী পরিয়ে ‘নিৎ কনে’ সাজিয়ে দিয়েছি আগেই। এবার সে আমায় ডাকাডাকি শুরু করেছে। “দিদি দিদি আয় আয়, বল বল আয় আয়।” – বুঝলাম আমার বরকে নিয়ে সে তার কাছে যেতে বলছে। আমরা এগিয়ে গেলাম তার দিকে। ক’দিন ধরেই তার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। পিসিমনি তাকে ধরে আছেন। যেমন করে শিশু নারায়ণের কাছে নতজানু হয়েছিলাম, এবার আমার স্বামী ‘দেবমাল্য সাহা’ ঠিক সেইভাবে সোনামনির কাছে গিয়ে বসলেন, – “এইতো সোনামনি বল এসে গেছে” বলে তার হাতটি ধরল। সোনামনি তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো তারপর আমাকে কাছে পেতেই হটাৎ কেন জানিনা, ঢোলে পড়ল আমার কোলে। হাসি মুখে আমাদের আশীর্বাদ দিতে দিতে ঐ শুদ্ধ সরল প্রাণ আজকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিল স্বর্গলোকে।
ফুলে সাজানো যে গাড়িতে বর – তার বল এসেছিল তাতে ফুলের মালা চন্দনে চর্চিত ফুটফুটে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হল, অন্তিম যাত্রায়। ডাক্তার আগেই তার বাবা মা কে জানিয়েছিলেন, কিডনী ফেল হওয়ার কথা, কিন্তু বিয়ে যাতে বন্ধ না হয়, তাই আমাকে বলেননি তাঁরা। জানা ছিল সে চলে যাবে কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি ভাবতে পারিনি।
পুনে শহরে এসে প্রথমে মা ও ছেলের দেখাশুনোর সঙ্গে সঙ্গে B.A. পড়া শুরু করলাম। প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলে ‘দেবমাল্য’ আমাকে বললেন Law পড়তে। ব্রেল লিপিতে তখন পুত্রের লেখা পড়া শুরু হয়েছে।
দেবমাল্য সূর্য্যপ্রদীপ জ্বালাতে অর্থাৎ সোলার প্যানেল লাগাতে উড়িষ্যা গেলেন। খুব ভাল লাগল তার সেখানে একটি গ্রাম। ফিরে এসে বললেন এবার তোমায় নতুন কিছু করার কথা ভাবতে হবে। তোমাদের তৃতীয় সত্তার মানুষগুলির উন্নতির জন্য একটা এমন সংস্থা তৈরী করব যেখানে ওদের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। –
আমি বললাম, আমাদের একার পক্ষে তা কি করে সম্ভব? তিনি বললেন অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো প্রকৃত মানুষের কাজ। এখন ইন্টারনেট-এর যুগ। অন্য দেশের ট্রান্স জেন্ডারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি Organisation গড়ে তুলতে হবে যেখানে আশার আলো দেখবে তারা।
আনন্দে, উৎসাহে, আবেগে ভরে উঠল আমার মন। শুধু ভোটের অধিকার বা উজ্জয়িনী প্রয়াগের কুম্ভমেলায় প্রবেশাধিকার আমাদের জন্য সবকিছু নয়। এমন প্রশিক্ষণের দ্বারা তাদের আত্মনির্ভর করে তুলতে হবে যাতে তাঁদের মধ্যে থেকে সমাজ পায় অনেক দক্ষ কুশল কর্মীর দল।
বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা বলা, আলোচনা শুরু হল। কি কাজে লাগবেন এরা? এতদিন তো শুধু হাতে তালি আর মুখে গালি নিয়ে জীবন কেটেছে এদের।
প্রথম কাজ – নিরাপত্তা বাহিনী অর্থাৎ পুলিশের মধ্যেই Male, Female-এর সঙ্গে একটি কিন্নর সুরক্ষা বাহিনী তৈরী। যারা পুলিশ সৈনিক বা কমান্ডোদের মতন নানা ধরণের দৈহিক শক্তি বাড়াবে। Excercise জুডো, ক্যারাটে-এর ট্রেনিং নিয়ে মহিলাদের সুরক্ষায় নিযুক্ত হতে পারবেন।
আমরা জেনেছি – ‘Eunachs are casterated male since 9th century B.C…. The World derives from the Greek – “The keeper of Bed”, because those castrated men where in populer demand to guard royal harems”।
এঁরা বহু দেশে বহু রাজার – সম্রাটের বাড়িতে অন্দরমহলে তাঁদের রানী ও রাজকন্যাদের “সুরক্ষা কাজে” নিযুক্ত হতেন। গ্রীক, রোমান, হিন্দুদের পর মুসলমানদের বেগমদের রক্ষা কার্য্যেও তাঁদের অর্থাৎ এই হিজড়ে ট্রান্স জেন্ডারদের ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ইংরেজ সরকার তাঁদের ওপর অত্যাচার করেছে, অকারণে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে, – উল্লেখ মনিপুরের ঘটনা – শিশুদের সঙ্গে দেখলেই ছেলে ধরা বলে তাড়া করে গ্রেপ্তার করেছে – সে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অন্য জগতে বন্দি করে। ‘বহুচারা মাতার’ কল্পনা তাদের ধর্মবোধ জাগায় এবং নানাভাবে তারা একত্রিত হতে থাকে, কিন্তু তাদের মধ্যেও সেরকম কোন মানুষ নেতৃত্ব করতে বা তাদের সাহস এক করে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সক্ষম হয়নি।
বর্তমানে অনেক NGO হয়েছে। কলকাতায় ৪০/৫০ বছর আগে কোন ইউনাক বা হিজড়েকে কোথাও ভিক্ষে করতে দেখা যেত না এখন পথে ঘাটে রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রায় প্রত্যেক ট্রাফিক লাইটে, বাস স্ট্যান্ডে এবং ট্রেনে, বাসে এদের উপদ্রপ বাড়তে শুরু হল। এতো হিজড়ের সংখ্যা আচমকা কেন বেড়ে গেল সে বিষয়ে গবেষণা করে সমাজ বিজ্ঞানী তথা সাংবাদিকরা জানতে পারলেন যে কিছু গুরুমা তাঁদের আশীর্বাদ দানের অর্থাৎ বিয়ে বাড়িতে বর কনে দম্পতিকে ও সদ্য জন্মানো নবজাতককে স্নেহাশিস দিতে যাওয়ার ব্যবসাটাকে একচেটিয়া করে রেখেছেন তাদের অবস্থা বেশ ভালো। এখনও মানুষের আবেগে – ধর্মীয় ভাবনায় – দেবী মাতার দোহাই দিয়ে, কোথাও বা অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তাঁরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। বিশেষতঃ যাঁদের অনেক ধর্ণা দিয়ে অনেক দেব-দেবীর কাছে মানত করে বাচ্ছা হয়, তারা এবং কিছু অন্ধবিশ্বাসী ধনী পরিবারের লোকেদের বদান্যতায় এরা তাদের এই blessing দেবার জীবিকাটা ধরে রেখেছে। কিন্তু বাকিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়; হয় তারা Sexworker নয় Begger। আরেকটি চাঞ্চল্যপূর্ন খবর (ত্রিনয়নীর) আমার কানে এলো। –
কিছু গরিব ছেলে যারা চাকরি পাচ্ছেন না কিন্তু বড় পরিবারের সদস্যরা তাদের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল, তারা ছদ্মবেশী হিজড়ে সেজে টাকা রোজগারের এক অভিনব নতুন উপায় খুঁজে বের করেছেন।
এইরকম একটি দলের সঙ্গে আমার যে সত্যি সত্যি দেখা হয়ে যাবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। বিয়ের চার বছর পরের ঘটনা। “নির্মাল্য” আমার ছেলে, এখন দশ বছরের। তাকে বার বার চোখ পরীক্ষা করতে হয়। এখানে একজন চক্ষু বিশারদ বললেন ওকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ধরণের পরীক্ষা করাতে ও সেখানে ডাক্তারের মতামত নিতে। বাবা দেবমাল্য ও ছেলে নির্মাল্য খুব সহজে পাসপোর্ট ভিসা পেয়ে গেলেও আমি কিছুতেই যাওয়ার অনুমতিপত্র জোগাড় করতে পারলাম না। কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশন-এ জানা গেল আমার নামে তামিলনাড়ু পুলিশের খাতায় মারপিট করার কেস লিপিবদ্ধ করা আছে। বুঝতে পারলাম গুলাবীর রেপ ও মার্ডারের সময়কার ঘটনার জন্য আমার বাইরে যাওয়ার ছাড়পত্র মিললো না। অতএব ছেলে ও বাবা গেলেন তার চোখের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নতুন এক আলোর সন্ধ্যানে সিঙ্গাপুরে।
আমাকে আমার শাশুড়ি মা বললেন, – “তিন্নি চলো মা এই কয়েকদিন আমরা কলকাতা ঘুরে আসি। আমার ভাই বোনদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি, তোমারও বাপের বাড়ি যাওয়া হবে।”
আমার এই প্রস্তাবটা খুব ভাল লাগল। ওখানে শুনেছি এখন অনেকগুলি NGO আছে এই ট্রান্স জেন্ডারদের জন্য, তাদের সঙ্গেও দেখা হবে।
দিল্লীর (Sangini 1997) সঙ্গিনী, নাজারিয়া (Nazariya), আশীর্বাদ (Ashirwad in Pune) পুনেতে প্রান্তিক প্রভৃতি নানা নাম নানা রকম বেসরকারি সংস্থা পথ শিশু নারী বা হিজড়ে, লেসবিয়ান, গে অর্থাৎ সমাজের অবহেলিতদের সাহায্য করবার জন্য অনেক ভাল ভাল কাজ করছেন। কিন্তু আরও নানা দিক থেকে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত পুরুষ, নারী তথা হিজড়ে – সকলকেই জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজন আছে। সাধারণ মানুষ ঐসব গোষ্ঠীর মানুষকে যেমন সমদৃষ্টিতে দেখেন না, তাদের সহানুভূতি যেমন বাড়ানো দরকার ঠিক তেমনি আমাদের নিজেদের গোষ্ঠীরও দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে হবে। তাদের যত কুসংস্কার ছাড়তে হবে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, উত্যক্ত-জ্বালাতন করে টাকা রোজগারের পন্থাও পাল্টাতে হবে।
দেবমাল্য ও নির্মাল্যকে বিদেশ যাত্রায় পাঠিয়ে আমি ও মা চেপে বসলাম কলকাতার ট্রেনে। অনেক জায়গাতেই দেখলাম স্টেশনে আমাদের গোষ্ঠীর সদস্যদের ভিক্ষে করতে। কলকাতার কাছাকাছি আসতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমাদের সামনের সীটে একজন মধ্যবয়স্ক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছিলেন। প্রথমে মায়ের সঙ্গে আলাপ করলেন পরে আমার প্রতি কৌতূহল দেখে আমিও কথা বলতে শুরু করলাম। মনে হল উনি খুব অবাক হয়েছেন, তবে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেশের সমস্যা ও রাজনীতি আলোচনা করতে লাগলেন আমার সঙ্গে।
খড়গপুর স্টেশন এল, স্টেশনে নেমে চপ, সিঙ্গারা জিলেপী কেনার লোভটা সামলাতে পারলাম না। মায়ের জন্যে গরম চা হাতে নিয়ে কামরার জানলা দিয়ে তাঁকে দিতে যাব এমন সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে একদল আমারই গোষ্ঠীর হিজড়ে সম্প্রদায় হৈ হৈ করে উঠে পড়ল আমাদের ঐ রিজার্ভ কম্পার্টমেন্টে। ট্রেন ছেড়ে দিল, আমরা যারা নেমেছিলাম তারা সবাই উঠে নিজের সীটে বসতে গেলাম। কিন্তু তারা ততক্ষণে নানা অসভ্য ভাষায় গালি গালাজ দিয়ে লোকেদের কাছে টাকা/পয়সা আদায় করতে শুরু করেছে।
ভীষণ রাগ হল আমার। ঐ বয়স্ক ভদ্রলোকও বেশ জোরে বলে উঠলেন – “কি হচ্ছে এসব? সরো আমাদের বসতে দাও।” তারা ঐ ভদ্রলোক কে বললো – “আগে টাকা ছাড় – – – শা – – – ব – – – পরে বসতে পারবি, নয়তো এই আমার কাপড় তুল – – – ” কথাটা শেষ হল না, লজ্জায় ঘেন্নায় মুখ সরিয়ে নিলেন ঐ ভদ্রলোক। এবার মায়ের কাছে একজন মুখ ঝামটা দিল – “এ্যাই বুড়িয়া তালি বাজাচ্ছি তুই নিজের ব্যাগ খোল।”
এবার আর আমি থাকতে পারলাম না। আমাদের হিজড়েদের মধ্যে আমরা ফারসি, উর্দু এবং হিন্দি মেশানো যে বিশেষ ভাষায় আমরা কথা বলি, সে ভাষায় বললাম চিৎকার করে, “একদম চুপ কর নয়তো এমন শাস্তি দেব যে” ওরা হো হো করে হেসে উঠলো। আমার হিজড়ে সম্প্রদায়ের ভাষা ওদের বোধগম্য হল না। প্রথমে ভাবলাম পশ্চিমবঙ্গে ওরা হয়ত এখন ঐ ভাষায় আর বার্তালাপ করে না। তাই একজনের শাড়িতে টান দিয়ে বললাম “সাৎলা (শাড়িকে আমরা বলি) উঠায়েগা তো এক থাপ্পড় খায়েগা – তেরে গুরুমা কোন হ্যায়?”
আমাকে ধাক্কা দিয়ে সে আর একটা অশ্রাব্য গালি দিতেই আমি দাঁড়িয়ে উঠে ওদের চুলের মুঠি ধরে টান দিলাম। আমার হাতে ওদের লম্বা পরচুল্লা এসে গেল। অনেক্ষন থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল, এবার প্রমান পেয়ে গেলাম এরা হিজড়ে সেজে এসেছে। শাড়ি ধরে টান দিতেই সে ঘুরে পড়ল বেঞ্চের উপর। ব্লাউজে টান দিতেই অন্যরা হৈ হৈ করে উঠলো। কিন্তু ততক্ষণে আমি ওকে বে-আব্রু করে কাচ্ছা বনিয়ানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। সবাই বুঝতে পারল যে কিছু ছেলে “হিজড়ের” পোশাক ও বেশ ধরে এসে এক নতুন ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেছে। ঐ ভদ্রলোক এবং আরও দু চারজন যুবক তরুণ ততক্ষণে ভিড় জমিয়ে ওকে কিল চড় মারতে শুরু করেছে। ছেলেটি হাউ মাউ করে কেঁদে আমার পায়ে পড়ল। আমার বড্ডো মায়া লাগল, মারের হাত থেকে রক্ষা করে জিজ্ঞাসা করলাম – ‘সারাদিন কি করো?’
– ট্রেনে পেন, চিরুনি, আমলকি চূর্ণ বিক্রি করি, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। তাই যখন দেখলাম হিজড়েদের দলটি কেমন ‘তালি’ আর ‘গালি’ দিয়ে টাকা আদায় করছে – প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে, শাপ-শাপান্তর ভয়ে, অসভ্যতামী, নির্লজ্য অঙ্গভঙ্গি এবং অকথ্য ভাষা শুনে পুলিশ তাদের ভয় করে চলে এবং গাড়ি বাবুরা টাকাও দিয়ে দেয়। তখন ভাবলাম সন্ধ্যে বেলায় এইভাবে ভিক্ষা করতে পারলে ভালো উপার্জন হবে।
– আমার চোখে জল এসে গেল। দারিদ্রতা অসহায়তা সমাজের বৈষম্য আজ আমাদের তরুণদের কত নিচে নামতে বাধ্য করেছে। প্যাসেঞ্জেরদের মধ্যে আলোচনা শুরু হল। হিজড়ে সম্প্রদায়ের এইভাবে ঘৃণ্য উপায়ে জোর করে টাকা আদায়ের পন্থাকে সরকার কি বন্ধ করতে পারে না? তাদের জন্য যদি কাজের বা নানা ধরণের ‘প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার ব্যবস্থা হয় তাহলে তো তারাও এইভাবে পথে বেরুবে না।
আজকাল বড় বড় এপার্টমেন্টে তারা বাচ্চাকে আশীর্বাদ করতেও ঢুকতে পারে না। বিয়েতেও কেউ সহজে তাদের আসতে বা আশীর্বাদ করতে দেয় না। কারণ মানুষ আর বিশ্বাসও করে না যে শুভ কাজে ঐ তৃতীয় সত্তার কোন প্রয়োজন আছে।
সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যেমন গুন্ডা পালন করা হচ্ছে। এই গোষ্ঠীর মধ্যেও এখন তেমনি সব দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষ জুট গেছে। তারা বড় বড় ব্যবসাদারদের বাড়ি গিয়ে পুত্রকে দেখবার জন্য হাজির হয়ে যায় নার্সিংহোমে, হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে। যাত্রীদের মধ্যে এখন নানা গুঞ্জন শোনা গেল। একজন সাংবাদিকও যোগ দিলেন সেই আলোচনায়। কয়েকদিন আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন তিনি।
বর্দ্ধমান জেলার একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাচ্চা হওয়ার খবর শুনে একদল হিজড়ে এসে বাচ্চাটিকে কোলে নিতে চাইল। মা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। বাড়ির মালিকও টাকার অঙ্ক শুনে আঁতকে উঠলেন, বললেন, – “মগের মুলুক নাকি? এত টাকা কোথায় পাবো?” বাড়িতে তাঁর দুই ভাই ছিলেন, তাঁরাও রুখে উঠলেন। “পারবো না এত টাকা দিতে আমরা – পুলিশ ডাকবো।”
তারা এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে মায়ের কোল থেকে টেনে নিতে গেল। গালির সঙ্গে শাপ দেওয়ার অমঙ্গলের ভয় দেখানো চলতে লাগল।
মায়ের কোলে কচি বাচ্চা কেঁদে উঠল। যে ঢোলক বাজাচ্ছিল তার সঙ্গে বড় ভাইয়ের ধাক্কা ধাক্কি হাতাপাই শুরু হল। আর তখনই একজন ছিনিয়ে নিয়ে বাচ্চাটিকে দোলাতে লাগল জোরে জোরে। নবজাত শিশুটি পড়ে গেল তার হাত থেকে। তারপরের বর্ণনা শোনার আর আমাদের প্রবৃত্তি হল না।
সত্যিই এরা দিনে দিনে কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছে, কেন এমন ভাবে সমাজে নিজেদের কলঙ্কিত করছে তা ভাবতে ভাবতে আমার ও মনে ভীষণ ভীষণ হতাশা নৈরাশ্য এসে ঘিরে ধরল।
কলকাতায় গিয়ে অনেক বুদ্ধিমান সমাজসেবীদের, Activist দের সঙ্গে, পুলিশ অফিসার এমন কি মন্ত্রীদের কাজে যারা সাহায্য করেন সেই সব বড় বড় অফিসারদের সঙ্গে কথা বললাম। সকলেই সমালোচনা করেন, নিন্দাতে সোচ্চার হন, কিন্তু প্রতিকারের উপায় কেউ বলছেন না।
আমি নিজে ট্রান্স জেন্ডার তাই তাদের দুঃখ-কষ্ট শোচনীয় অবস্থায় যেমন ব্যথিত হই, তেমনি তাদের অসামাজিক কার্যকলাপকে বন্ধ করে ভদ্র জীবন যাপনের উপায় বের করতে সচেষ্ট হই।
যতক্ষণ না আমার ভারতবর্ষের সব প্রদেশের হিজড়ে গোষ্ঠীকে এক করতে পারব, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান না জাগাতে পারব ততক্ষণ কোন লাভ হবে না।
পঞ্চম অধ্যায় (আলোকাশ্রম)
পুনে ফিরে এসে দেবমাল্য ও আমি উঠে পড়ে লাগলাম একটি NGO তৈরী করবার জন্য। এখন তো আমরা ভোটের অধিকার পেয়েছি, তাহলে সরকারকে সজাগ করতে হবে। আমাদের সমাজের উন্নতি না ঘটলে, আমাদের পুলিশ বাহিনীতে আলাদা প্রশিক্ষণ দিয়ে সুরক্ষা দলে কাজ না দিলে, শিক্ষার জন্যে আলাদা বিদ্যালয়, নার্সিং কলেজে সীট রিজার্ভ না করলে, আমরা তাদের ভোট দেব না। “ভোট ব্যাঙ্ক” মন্ত্রীদের কাজে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট তাই এবার ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে নিজেদের স্বনির্ভর করার চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। এমনকি ট্যাক্সি চালক হবার জন্য মোটর ট্রেনিং স্কুলে হিজড়েরা যদি গাড়ি চালানো শেখেন তাহলে রাত্রে মেয়েদের জন্যে ট্যাক্সি চালকের কাজ দিলে সমাজে মেয়েদের প্রতি অত্যাচার এমনকি রাত্রে ধর্ষণের কেসও কমে যাবে। মহিলা এম.পি, এম.এল.এ-দের সাথেও দেখা করলাম। কিন্তু তেমন সাড়া পেলাম না। হটাৎ একদিন কাগজে পড়লাম উড়িষ্যা সরকারের কথা। তারাই প্রথম প্রদেশ যারা এই হিজড়ে গোষ্ঠীকে নানারকম সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ছুটলাম সেখানে।
সত্যিই তাদের এই প্রথম কেউ সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখলো। তাদের জন্যে ‘পেনশন’ ভাতা দেওয়ার কথা শুনে মনটা আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। উড়িষ্যার এক গ্রামে সমুদ্রের ধারে নিরিবিলি জায়গাতে আমাদের এক অফিস তথা আশ্রম গৃহ বানানো হল। নাম দিলাম আলোকাশ্রম।
সেখানে প্রথমেই একটি গাড়ি কিনে মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং এর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। যে হিজড়েরা একটু আত্মবিশ্বাসী এবং রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে আগ্রহী হলেন। প্রথমে মাত্র দশ জন হিজড়ে ভাই বোন এসে ওখানে আশ্রয় নিলেন। পরে কয়েকমাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা বেড়ে ২০ হয়ে গেল। অনেকেই গুরুমা কে ছেড়ে আসতে ভয় পায় তাই এবার আমাদের গুরুমা কে অর্থাৎ কমলা আম্মাও আমার সব গুরু ভাই বোনদের নিয়ে এলাম এখানে। এবার জমে উঠল এক নতুন আনন্দালয়।
১৯৯৪ তে ভোট দেওয়ার ‘অধিকার’ পেয়েছি আমরা “শাবানা মৌসী” মধ্যপ্রদেশের বিধায়ক হন ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। রায়গড়ে মধু কিন্নরও অনেক কাজ করছেন। কিন্তু সারা ভারতে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক জাগরণ আনার জন্যে একজোট হয়ে কিভাবে আমরা কাজ করব – আন্দোলনে গিয়ে আমাদের মর্যাদা – সুবিধা Basic Need গুলো পূরণের দাবি করব – তা ভেবে পাচ্ছি না। অনেক কিন্নর ধর্মকে – নাচ-গানকে উপজীব্য করেই থাকতে চান। হিন্দি সিনেমার প্রভাব একদলকে সাজ-সজ্জা বিলাস-বাহুল্য ও অতি জাঁক জমকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখছে সেই সব মানুষের প্রতি অন্যান্য পুরুষেরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন – জমাচ্ছেন তাঁদের পাশে কিন্তু সাধারণ গরীব হিজড়েরা আরও গরীব হয়ে যাচ্ছেন – এই বৈষম্য সমাজের প্রতিটি স্তরে এই ধনী নির্ধনের বিভেদ ক্রমশঃ বাড়ছে। এর যে প্রতিকার কী ভাবে হবে তা কে জানে।
আমাদের ‘আলোকাশ্রমে’ ধীরে ধীরে অনেক সদস্য বাড়তে লাগলো – প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাল শিক্ষক – ট্রেনার জোগাড় করা বিদেশের ইউনাকদের ভারতের হিজড়েদের এই শোচনীয় দুর্দশার কথা অবগত করিয়ে ‘দান’ – funding তথা সবরকমের সহযোগিতার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। আশা ও উৎসাহ আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। একদিন আমাদের জীবনের অন্ধকার দূর হবেই যদি সবাই এগিয়ে আসেন।
জীবন বড় মূল্যবান তার রক্ষার দায়িত্বও আমাদের। যখন বেঁচে আছি তখন ডাক্তার, ওষুধপত্র, সুচিকিৎসায় স্বাস্থকর পরিবেশ সৃষ্টি করে শরীরকে অক্ষত নীরোগ করার দায়িত্ব যেমন আমাদের তেমনি মৃত্যুর পরও যে এই দেহ অন্যের কাজে আসতে পারে সে সম্পর্কেও সজাগ হবার দিন এসেছে।
আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল চোখ। আমাদের দেশে চোখের চিকিৎসাও এখন খুব ভালোভাবে হচ্ছে। একটি NGO এসে আমাদের আলোকাশ্রমের কিন্নরদের কাছে অনুরোধ করলেন ‘চক্ষুদানের’ জন্য।
“ত্রিনয়নী” নাম যখন পেয়েছি তখন এই জীবনের নয়ন যদি আরও কারো চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে তার চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে।
বিশেষ করে আমাদের পুত্র দৃষ্টিহীন নির্মাল্য কে নিয়ে বিভিন্ন চক্ষু চিকিৎসালয়ে ঘোরাঘুরি করতে করতে আরও অনেক কিছু জানতে পারলাম। বিজ্ঞানের এই বিশেষ অবদান অপারেশনের দ্বারা চক্ষুদান। নির্মাল্যের চোখ পরীক্ষা করে জানা গেছে, তার কর্নিয়ার মধ্যে সমস্যা আছে। কোনো সুস্থ ব্যক্তির কর্নিয়ার টিস্যু যদি পাওয়া যায় তাহলে তার অপারেশন করা হবে। অর্থাৎ Healthy Donner চাই। এই অপারেশনকে বলা হয় ‘Keratoplasty ‘ – ‘A cornea transplant operation is possible to restore vission ‘ – এই খবর আমাদের মনে ভীষণ আলোড়ন তুললো। Healthy donated Tissue ঐ diseased cornea র damaged portion কে বাদ দিয়ে ডোনারের টিস্যু লাগিয়ে দিলেই আমাদের ছেলে নির্মাল্য দেখতে পাবে, অতএব এবার চলল ডোনারের অপেক্ষা। দিল্লী – মুম্বাই – চেন্নাই সব জায়গায় এখন বড় বড় চোখের হাসপাতাল, আমাদের দেশেই এখন এত ভালো চিকিৎসা হয়। ছেলেকে নিয়ে স্বামী দেবমাল্য ব্যস্ত আছেন। এদিকে আমার গুরুমা কমলা আম্মা খুব অসুস্থ। কিছুদিনের মধ্যেই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের মাতৃ পিতৃ হারা করল। প্রচন্ড শোকে ভেঙে পড়লেন আমার আশ্রমের গুরু বোনেরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আম্মার দেহ আগলে বসে রইলেন। শুধু চক্ষু দান নয় পুরো দেহ দান করে গেছেন তিনি। কিন্তু আমাদের গোষ্ঠীর কেউই তাঁর দেহতে হাত লাগাতে দিল না হাসপাতাল থেকে আগত ডাক্তারদের। তাদের ধারণা চোখ খুলে নেবে – চোখের কোটোর থেকে এবং তাঁর দেহ সৎকার হবে না। পরের জন্মে তিনি অঙ্গহীন চক্ষুহীন হয়ে জন্মাবেন। অতএব তাঁকে পোড়ানো হোক।
আমার বোঝানো, আম্মার শেষ ইচ্ছে পূরণ করার চেষ্টা বৃথা গেল। তাঁদের কান্নাকাটি, হৈ চৈ – তর্ক বিতর্কে সময় পার হয়ে গেল। এখানে তিন্নি একা তো তাঁর শিষ্যা তথা সন্তান নন। সমস্ত গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠল।
কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ মানুষগুলির ধর্মান্ধকার – ইহকাল – পরকালের ভুল ধারণা একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে দিল না। আমি ও দেবমাল্য ভীষণ বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। কমলা আম্মার শোকে আচ্ছন্ন হলেও তাঁর শ্রাদ্ধ শান্তি অবাস্তব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রবৃত্তি আর রইলো না আমাদের। অন্ধ পুত্র কে নিয়ে কখনও Shroft Eye Centre কখনও Shankar Netralay কখনও অন্য কোনো চোখের হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম এক তরুণ মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে দিল্লীর রাজপথে। বাবা মাকে খবর দেওয়া হলে তাঁরা যখন তাকে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছালেন তখন জানতে পারলেন সেই তরুনের শরীরের নিচের অংশ ট্রাকের তলায় ঢুকে যাওয়া দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু ওপর দিকের ভাগ সম্পূর্ণ অক্ষত আছে। মৃত পুত্রের সামনে তার পিতা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পাথরের মতন দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে দিয়ে নিয়ে গেল আরও কয়েকটি যুবক রুগীকে – কেউ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাতরাচ্ছে যন্ত্রনায়। কয়েকজন তরুণ ডাক্তার নার্স সেই ছেলেগুলিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একজন লেডি ডাক্তার এসে সেই পিতার হাত ধরে অনুরোধ জানালেন – “Uncle আপনার ছেলে তো চলে গেছেন, আর ফিরে আসবেন না, এই ছেলেগুলির অবস্থা দেখুন – একজনের একটি চোখ নেই, দুজনের পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে – আপনার ছেলের শরীর থেকে আমরা – – -” কথাটা শেষ করতে দিলেন না সেই বাবা। বললেন আমার ছেলের দেহ আপনারা নিয়ে যান, যদি কোন যন্ত্র এখনও তাজা থাকে লাগিয়ে দিন অন্যকে – আমি জানব তার জীবন ধন্য হ’ল।
দেবমাল্যর মোবাইলটা বেজে উঠল – “আপনার ছেলের ডোনার পাওয়া গেছে। শীঘ্র Eye Centre এসে যোগাযোগ করুন।”
নির্মাল্য তার দৃষ্টি ফিরে পেল, ভগবানের অশেষ কৃপা ও ডাক্তারদের অপরিসীম প্রচেষ্টায়। আমি আবার লেগে পড়লাম আমার কিন্নর গোষ্ঠী কে শিক্ষিত করার, জাগ্রত করার, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে।
সমাপ্ত