চন্দনা সেনগুপ্ত

মানুষের জীবন যেন এক চলমান স্রোতের মতন। সেখানে ভেসে আসে কত প্রিয়, স্নেহময়, শ্রদ্ধেয় লোকের নৌকা একের পর এক। আজ স্মৃতির খেয়া বাইতে বসে তাঁদের কথা খুব মনে পড়ছে, তাই হয়ত নিজের মুখোমুখি হতে গিয়ে প্রথমে তাদের স্মরণ গাঁথা গাইতে বসেছি। আপন গর্ভধারিনীর স্বর্গীয়া চিন্ময়ী গুপ্তার  প্রতি ভক্তিপূ্র্ণ প্রণাম জানিয়ে এই লেখাটি আরম্ভ করছি।

 

প্রথম অধ্যায়

 

ধাত্রী মা

চন্দনা সেনগুপ্ত

“কী পাইনি তারই হিসাব মেলাতে

মন মোর নহে রাজি।”

কী পেয়েছি তার খোঁজ করতে করতে –

গুচ্ছ গুচ্ছ শুভ্র রঙিন পুষ্পে

ভরিয়ে নিতে চাই, আমার “স্মরণ সাজি”।

পেছন ফিরে দেখলাম একা একা বসে ঘরে – এই সত্তরটি বসন্তের দ্বারে শুধু একটা তো নয় ‘সাজিরা’ লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে থরে থরে। সেগুলি কোনটা বেতের বুনুনিতে অদ্ভুত এক কৌশলে বানানো এতগুলো বছর পরেও ছিঁড়ে যায়নি ফুলের পাঁপড়িগুলি শুকিয়ে প্রজাপতির পাখা হয়ে গেছে, কিন্তু অপূর্ব তার গন্ধ, ঠাকুর ঘরের মতন পবিত্র তার রূপ।

কিছু সাজি পিতলের পিলসুজের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। তারা যেন অনেকরকম বনফুল সংগ্রহ করে রেখেছিল। জালির ফাঁক দিয়ে অনেকগুলি পড়েও গেছে সেখান থেকে।

আবার সোনা রূপোয় তৈরী কিছু জালি না বানানো কারুকার্য খচিত আমার ‘সাজির’ কাজ করেছে – সেখানে ফুল নয় হীরে-মুক্ত, রত্ন, নীলা, পলার মতন মনি মানিক্য উঁকি দিচ্ছে। নানা সময়ের নানা মানুষের নানা ধরনের উপহার সম্ভার।

‘চন্দন ঘষতে ঘষতে সুগন্ধ বের হয়’। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ বার বার বলতেন। তাই চন্দনার জীবন কাষ্ঠেরও ঘর্ষণ দরকার। ঠিক করে ফেললাম এবার ঘরে ফেরার পালা। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

‘মন চলো নিজ নিকেতনে’ গাইতে গাইতে স্মৃতির খেয়া বাইতে বাইতে একটু উল্টো স্রোতে চলা যাক।

প্রথমেই বড় ঢেউ এর এই ধাক্কাতে পৌঁছে গেলাম একবারে শৈশবের কিনারে। যেখানে জন্মদায়িনী জননীর গলায় শুনতে পেলাম রবীন্দ্রনাথকে আর পিতার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো – কথামৃতের বাণী। প্রিয় জ্যাঠামশাই, পিশিমাদের মুখে ‘হরি নামের’ বোল আবার মামাবাড়ির দাদু ডঃ অনাথ বন্ধু রায়ের অপারেশন থিয়েটার থেকে ভেসে আসা ক্লোরোফর্মের গন্ধ।

শৈশব যে বৈভব – ঐশ্বর্যময়, সুন্দর সুন্দর স্বপ্নে ভরা তার কোনো তুলনা নেই। সব মানুষকেই তা সে গরীব বা বড়োলোক হোক না কেন, এই অপরূপ সময়ের পথ ধরেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। আবার এই পথেই ছেড়ে এসেছে তার সবচেয়ে সুখকর নিশ্চিন্ত জীবনের একান্ত প্রিয় অধ্যায়টিকে।

আমার ছেলেবেলা বইতে ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর পদ্মাপারের অসামান্য শৈশবকে ধরে রাখতে পেরেছেন। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের স্নেহপূর্ণ আবেষ্টনীতে হয়তো সেরকম দিনের কাহিনী বর্ণনা করতে পারবো না, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় নানান বিচিত্র ঘটনা ও মানুষের পরিচয় পেয়ে আমরাও ধন্য হয়েছি – এ কথা অনস্বীকার্য। সেখানেও একটা নদী আছে, পদ্মা বা গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের মতন মহিমা তার নেই, সব সময় জলে পরিপূর্ণও থাকে না সে, কিন্তু তার সাদা বালির মধ্যে যে অভ্র চিক চিক করত তাকে খুঁজতে গিয়ে এই বার্ধক্যের সীমায় এসে আমি যেন ভাবে বিভোর হয়ে পড়েছি। হাতের আঙুলগুলি এখনও অবশ হয়নি, তাই তাদের কথা লিপিবদ্ধ করতে কলম ধরলাম।

পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া জেলার এক অতি সুন্দর ছোট্ট শহরের তাঁতি পাড়া। মাঝে তার বিষ্ণু মন্দির, কলকে, টগরের গাছ, দু চারটে কাঁচা মাটির গোয়াল আর প্রত্যেক বাড়ির মধ্যেই রয়েছে কাঠের তাঁতশাল। সকাল থেকেই সেখানে বাড়ির কর্তা, বাবা, দাদু ও ছেলে বসে যান, খালি গায়ে দুটো দড়ি ধরে টানতে। আওয়াজ উঠতো খট খটা খট খট খট। বোনা হতো চাদর, গামছা, লুঙ্গি, আট হাতি ডুরে শাড়ী – ট্যানা বাচ্চা মেয়েদের জন্যে। হ্যাঁ, সেটা হলো গোপীনাথ পুরের তাঁতীপাড়া।

একটু দূরের জেলখানার বাগান, যেখানে জেলখানার কয়েদীরা চাষ করে কপি – আলু ফলায়। অন্যদিকে পুলিশ থানা। সেই বিশাল পাঁচিলে ঢাকা জেলখানাটি ইংরেজ আমলে বোস্টেল ছিল, তাই তার পাশের মাঠটির নাম বোস্টেল মাঠ। সেখানে একদিকে যেমন বড়োরা অন্যদিকে সেরকম ছোট ছেলেরা ফুটবল খেলে। মাঠের মাঝখান দিয়ে পথ চলার রাস্তাও আছে। সেখান দিয়ে জজ কোর্টের দিকে বা ‘মাচানতলায়’ কিম্বা বাজারের দিকে যায় লোকেরা। ঠিক গ্রামও নয় আবার একেবারে শহরও নয় – বাঁকুড়ার এই অঞ্চলটা অদ্ভুত এক নিজস্ব রূপ নিয়ে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছে। তাঁতিরাও বেশ বর্ধিষ্ণু, সকলের বাড়িতে হাঁস, মুরগি, গরু পোষা আছে। জামবাটিতে পান্তা ভাত আর সাদা ধবধবে সজনে ফুলে ঢাকা সারি সারি গাছ। তাঁতিবৌরা খালি গামছা জড়িয়ে কোমরে আঁচল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বসে, পুকুরে বাসন মাজে ও চান করে, ছেলেদের সাঁতার কাটা, দাপাদাপি লেগেই থাকে। তাঁতীপাড়ার মাঝে মাঝে দু-চার জন উকিলবাবু বাড়ি করেছেন বোধহয় কোর্ট কাচারী, বাজার দোকান, ফিডার রোডের বড় রাস্তা কাছাকাছি বলে। সেখানে একটি সাদা দোতালা বাড়িতে নতুন ভাড়া এসেছেন বড় ডাক্তার অনাথবন্ধু রায় মহাশয়ে্র জামাই কল্যানী প্রসাদ। নতুন বিয়ে হয়েছে তাঁর ঐ কাটা ছেড়ার (শল্য চিকিৎসক) ডাক্তারের বড় মেয়ের সঙ্গে। এই যুবকটিও ডাক্তার, সব রকমের রুগী দেখেন (জেনারেল ফিজিসিওন) আবার মল-মূত্র-রক্ত পরীক্ষাও করেন। অতি সুদর্শন, শান্ত, হাস্যময় ছেলে।

তাঁতীপাড়ার লোকেরা ভীষণ খুশি, রাত বিরেতে যখন তখন অসুখে বিসুখে এই তরুণ ডাক্তারবাবুকে তারা কাছে পায়। টাকা পয়সার লোভও তাঁর নেই, জ্বর জ্বালায় নিজে হাতে মিক্সচার বানিয়ে দেন, খোস পাঁচড়ায় লাগিয়ে দেন নিজের হাতের তৈরী মলম। ডাক্তার গিন্নি বড় মানুষের বিটি, খুব সুন্দর লম্বা চুল, সন্ধ্যেবেলায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন, পাড়াটা বেশ গম গম করে। সেই শান্ত সুন্দর পরিবেশে ডাক্তারবাবুর প্রথম পুত্র বাপি (অশোক গুপ্ত) জন্ম নিল, পরে দু-বছর যেতেই আরেকটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হলো, নাম বকুল (মালবিকা)। কিন্তু তার ছ মাস পরে আবার অন্তঃসত্ত্বা হলেন জননী চিন্ময়ী। এবার কিন্তু অনেকটা unwanted এতো তাড়াতাড়ি তিনটি শিশুকে কি করে সামলাবেন সেই তরুণী মা, সকলেই বিশেষভাবে চিন্তিত। ১৯৪৯ সালে মাঘ মাসের রাত্রে যন্ত্রনা উঠলো মায়ের। ডাক পড়লো সেই সময়কার সবচেয়ে প্রিয় ‘স্বান্তনা’দি কে। তিনি ছিলেন বাঁকুড়া জেলার সবচেয়ে সুদক্ষা স্নেহময়ী “ধাত্রী”, কোথায় কেমনভাবে তিনি এই নার্সের ট্রেনিং নিয়েছিলেন জানি না, অসামান্য কৌশলে অতি স্বচ্ছন্দে তিনি বাঁকুড়ার শত শত মায়ের প্রসবকালে যখনি ডেকেছে গিয়ে হাজির হয়েছেন এবং বাচ্চা প্রসব করিয়েছেন। বাড়ি তার নিকটেই। তাই রাত্রের খাওয়া দাওয়া সেরে এসে গেলেন। গরম জল তুলো ও পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো – তার যা যা দরকার সব ঠিক আছে কিনা দেখে নিলেন, মায়ের পেট টিপে, ইউট্রাসের মুখ পরীক্ষা করে বললেন নাঃ সকালের আগে বাচ্চা বেরোবে না। এখনও জল ভাঙেনি। ঠিক ভোর পাঁচটায় যখন বাইরের রাস্তা দিয়ে ২৩শে জানুয়ারী উপলক্ষে পাড়ার ছেলেরা প্রভাত ফেরী নিয়ে বেরিয়েছে, তাদের ‘দেশাত্মবোধক’ গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে শীতের বাতাস। জানালা দরজা খুলে সবাই বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, শাল গায়ে জড়িয়ে তখনি তাঁতীপাড়ায় ডাক্তারবাবুর নিচের তলার ঘরে একটি শিশু কন্যা জন্ম নিল। আবার মেয়ে! কে যেন বললো। ধাত্রী স্বান্তনাদি ধমক দিয়ে উঠলেন তাকে, মেয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে? মেয়েরাই তো সংসারের লক্ষী, এরাই তো সংসারের শ্রী বর্ধন করে।

সেদিনের সেই মেয়েটি আজকের ‘আমি’, নাম দেওয়া হয়েছিল আমার দিদি বকুলের সঙ্গে মিলিয়ে “মুকুল”। মাত্র দেড়বছর স্বাধীনতা হয়েছে কিন্তু দেশের অবস্থা তখনও তেমন মজবুত হয়নি। ডঃ আম্বেদকরের তত্ত্বাবধানে নানা গুনীজনেরা বসেছেন দেশের কনস্টিটিউশন অর্থাৎ দেশ পরিচালনার জন্য আইন কানুন, কার্যপদ্ধতি নীতি, নিয়মপত্র বানাতে। একবছর আগে গুলিবিদ্ধ করে মারা হয়েছে জাতির জনককে। হিন্দি, ইংরেজি, আঞ্চলিক কোন ভাষায় আমাদের লেখাপড়া শেখানো হবে কেউ জানে না, তখনও কিন্তু বাঁকুড়ায় মিশন স্কুলে, কালিতলা স্কুলে, খ্রিস্টান কলেজে খুব জোর শোর দিয়ে পড়াশুনো চলছে। নাচ, গান, খেলাধূলা সবই শেখানো হচ্ছে। নিজের প্রথম পাঁচবছরের স্মৃতি মানুষের খুবই অস্পষ্ট থাকে। তবে মা, দিদিমাদের মুখে শুনে শুনে হয়ত কিছুটা রূপায়ন করা যায়। আমিও সেই প্রচেষ্টা করে যাব। কারণ এই লেখনী তো শুধু আমার নিজের মনের কথা বলার জন্যে নয়।

(ক্রমশ)

দ্বিতীয় অধ্যায়

“এক থেকে পাঁচে প্রথম দুর্ঘটনা” —

আমরা তিন ভাই বোন মাকে খুব জ্বালাতন করতাম, আর মায়ের শরীরও খুব খারাপ হয়ে যায় তাই আমাদের জন্য নিয়ে আসা হয় কোন এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কামিনী মাসীকে, তাঁর মুখ আমার মনে পড়ে না কিন্তু ঘোমটা ঢাকা সাদা থান পরা সেই ভদ্রমহিলার অবয়ব এক এক সময় চোখে ভেসে ওঠে। এত স্নেহ ও আন্তরিকতা ছিল সেই যত্নে, যার কোন তুলনা নেই। পরবর্তীকালে নার্সারি টিচার্স ট্রেনিং করার সময় চাইল্ড সাইকোলজি পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম, একেবারে শিশু অবস্থায় শিশু যদি নিরাপদ স্নেহপূর্ন কোমল কোল পায় তাহলে পরবর্তীকালে সে কখনও নিরাপত্তার অভাববোধ করে না। আমার জীবনে মানুষের মিছিলে – যাঁরা সামিল হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ হল, এই – কাজের মাসী, দিদি, ক্ষেন্তি, কুন্তী, শ্যামা, মায়ার দল। এঁদের অবদান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবনের প্রতিটি দিন, অধ্যায়কে কিভাবে সমৃদ্ধ করেছে, তা মুখে তো নয়ই, ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না। তাঁরা অভাবের জন্য তাঁদের বাড়ি ঘর সংসার ছেড়ে আমাদের মতন পরিবারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতেন, প্রাণ দিয়ে এই পরিবারের সব ভার বহন করতেন, আপন সন্তানের মতন করে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মানুষ করতেন, কিন্তু বড় হয়ে কি তাঁরা কি কেউ তাঁদের মনে রাখতো? কামিনী মাসী ঝিনুকে করে আমায় দুধ খাওয়াতেন, কুঁয়ো তলায় নিয়ে গিয়ে চান করাতেন। রাত্রে আমাদের দু বোনকে পাশে নিয়ে ভূতের গল্প বলতেন। রান্না ঘরে থাকতেন ঠাকুর মশাই। আমি নাকি সেই ছোট্ট বয়সেও নিজের কোন জিনিষের প্রতি বিশেষ প্রীতি দেখতাম না। কেউ কিছু দিলে তা অন্যদের বিলিয়ে দিতাম। তিনি তাই আমার নাম দিয়েছিলেন – বিদ্যাসাগরের মা – ভগবতী দেবী। ঠাকুর মশাইয়ের রান্নার স্বাদ আমার মনে নেই – কিন্তু তাঁর বাড়ির গল্প পড়াকু ছেলে ‘কালাচাঁদের’ কথা শোনার জন্য রান্না ঘরের দাওয়াতে বসে থাকার দৃশ্যটা এখন চোখে ভাসছে। ঠাকুর মশাইয়ের দেওয়া নামটা আমার খুব পছন্দের ছিল। তখনও ঈশ্বর চন্দ্রের মা বা অন্য কোন মহিয়সী নারীর কথা আমি জানতাম না, কিন্তু এটা বুঝেছিলাম যে যেকোন জিনিষ – সে খেলনা হোক বা খাদ্য হোক ভাগ করে নিলে অন্যকে খুশি করা যায়। অন্য কোন মানুষের হাসি ফোটাতে ভাল লাগত। সে সময় আমাদের বাড়ির অন্যান্য কাজের জন্য আসতেন গুণী মাসী। সঙ্গে থাকত তাঁর আধখ্যাপা handicapped ছেলেটি। তার ভাল নাম ছিল অশ্বিনী – কিন্তু আমরা সবাই তাকে (বড়কা) বলে ডাকতাম। আমার চার বছর বয়সের একটা স্মৃতি মনে পড়ে – বড়কাকে আমার ভাগের থেকে দুটি বিস্কুট দিচ্ছি আর সে আনন্দে হেসে ছুটে পালাচ্ছে। আমার সবচেয়ে আশ্চর্য্য লাগত যখন ওই খ্যাপা ছেলেটি আমাদের প্রথম ভাগের বই পড়ে দিত এবং দাদার দ্বিতীয় ভাগ থেকে মানি–ক্য – বানানও উচ্চারণ করতে পারত। গুণী মাসী বলেছিল – ও পাঠশালা যেত, খুব ভাল ছিল, হটাৎ কি এক অসুখে এরকম হয়ে গেছে। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় ছিল সে, কিন্তু বাচ্চার মতন ব্যবহার দেখে আমরা তাকে ছোট ভাইয়ের মত মনে করতাম। তখন থেকেই handicapped বাচ্চাদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার বীজ বপন হয় ছোট্ট মুকুলের মধ্যে।

এক থেকে পাঁচের একটি বিশেষ ঘটনা আমার মনে আছে, তা হল, আমার হাত ভেঙ্গে যাওয়া। বারান্দা থেকে হটাৎ কিভাবে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমি। আমার গনু দাদা (আমার ছোট পিসিমার ছেলে) আমাকে কোলে তুলতেই দেখতে পান যে বাঁ হাতের কনুই-এর হাঁড় সরে গেছে। আমাকে নিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছোটেন আমাদের মামা দাদু তৎকালীন বিখ্যাত সার্জেন ডাক্তার “অনাথ বন্ধু রায়” -এর চেম্বার-এ। দাদু অপারেশন শেষ করে বেরিয়ে আসছিলেন, আমার কান্নার আওয়াজ শুনেই ছুটে এলেন। আমাকে টেবিলে শুইয়ে ক্লোরোফর্ম দেওয়া শুরু করলেন, তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট পশুপতি বাবু। হাতটির খণ্ডিত হাঁড়গুলিকে ঠিকমত বসিয়ে তিনি যখন নিশ্চিন্ত হলেন আমি তখন যন্ত্রনায় কাতর। হাঁড় ভাঙ্গার যন্ত্রনা বোধহয় ভাবলেও ভয় হয়। তখন আমার পাঁচ বছর বয়স, কামিনী মাসী চলে গেলেন এবং আমাদের দেখাশোনার ভার নিলেন চারু মাসী; অত্যন্ত শান্ত, লাজুক, বাবার সামনে এক গলা ঘোমটা টেনে হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করেন। তখন আমাদের খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিল ছিল না। বারান্দা ভাল করে মুছে সুন্দর সুন্দর লাল নীল উল দিয়ে বোনা আসন পেতে আমরা বসতাম। আসনগুলি দিদিমা তৈরী করে পাঠাতেন –  অপূর্ব তার নকশা। ঠাকুর মশাই কাঁসার থালায় গরম ভাত, শাক ভাজা, ডাল, মাছের ঝোল দিয়ে গেলেই – চারু মাসীর হাওয়া করা শুরু হত। জ্যাড়তুতো দাদা শ্যামল দা (মেজদা), গনু দাদা, আমরা তিন ভাই বোন সবাই বসে পড়তাম। আমাদের ভাত মেখে গোল গোল বল বানিয়ে দেওয়া হত, প্রতিটি বলের উপর মাছের একটু করে টুকরো, শেষ পাতে টক। আমার হাত ভাঙ্গার জন্য আমার ভাগ্যে সর্বদা বেশি বেশি আদর জুটত। কখনও মা খাইয়ে দিতেন, কখনও গনু দাদা। আমার দাদা দিদি কিন্তু এইজন্য কখনও হিংসা করতনা একটুও। ওদের মধ্যে সেই ছোটবেলা থেকে আজ সত্তর বছর অবধি আমি সেই একই রকম ভালোবাসা পেয়ে আসছি। কখন কোনো খেলনা, টফি, চকলেট কিছু নিয়েই আমাদের ঝগড়া হয়নি। দাদা মামা বাড়ির প্রথম নাতি ছিলেন বলে দাদু দিদিমা মামা মাসীদের খুব প্রিয় পাত্র ছিলেন। দাদুর সঙ্গে সে বেড়াতেও যেতেন দূরে দূরে। দেখতেও যেমন attractive ছিলেন তিনি, খেলাধুলো কথাবার্তাতেও তেমনি স্মার্ট। নানা ধরণের ইনোভেটিভ খেলা খেলতেন তিনি, তাঁর সামনের বাড়ির বন্ধু ভোম্বল, গোম্বোল ও দুর্গাদাসের সঙ্গে। নানা ধরণের সার্কাস দেখাতেন তাঁরা। একবার “তামলী বাঁধের মাঠে” একজন লোক মৃত্যু ঝাঁপ দেখিয়ে খুব পয়সা রোজগার করেন। মই দিয়ে অনেক উপরে উঠে তার কাপড়ে আগুন ধরিয়ে নিচে রাখা একটি জলের কুন্ডে ঝাঁপ দিতেন তিনি। ভয়ে লোকেরা নিশ্বাস বন্ধ করে দিত, চিৎকার করে উঠত। আমার আট বছরের দাদা ও তাঁর বন্ধুরা একটি পুতুলের গায়ে আগুন দিয়ে উপর থেকে নিচে রাখা বালতির জলে ফেলতেন। আমি দিদি, বুড়ি ও আমার তাঁতি পাড়ার বন্ধুরা, ভোম্বলের বোন কুটুনি সবাই দর্শক ছিলাম তাঁদের। আমাদের হাততালি ও চিৎকারে পাড়া মেতে উঠত।

পাঁচ বছর বয়সের আর একটি বড় ঘটনা, আমার ভাই বাচ্চুর জন্ম। আমার ভাই হয়েছে, ভাই হয়েছে বলে আমরা সব প্রতিবেশীর বাড়িতেই ছুটে ছুটে খবর পৌঁছাচ্ছি। সে কি আনন্দ। চারু মাসী শাঁখ বাজাচ্ছে, ঠাকুর মশাই মিষ্টি আনতে ছুটছেন, গনু দাদা বাজার যাচ্ছেন, কি একটা ওষুধ আনতে। ঘরে কাঠকয়লা জ্বেলে আগুনের উত্তাপ দেওয়া হচ্ছে। সাদা কাপড়ে মুড়ে স্মিত হাস্যে বাইরে এসে যখন স্বান্তনা মাসী – আঁতুড় ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন, তখন আমার আর দিদির লাফালাফি শুরু হয়ে গেল, তাকে কোলে নেওয়ার জন্য। স্বান্তনা মাসীদের মতন যাঁরা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা বোধহয় জানতেন – কি করে বাচ্চাদের ভোলাতে হয়; বললেন বাবু হয়ে বস। তারপর আমাদের কোলে ঠেকিয়ে তুলে নিলেন। যা আবার ‘আটকলাই’ অনুষ্ঠানের দিনে দেব। আমরা ওতেই সন্তুষ্ট। ভাই তো পালিয়ে যাচ্ছে না। ছুটলাম আবার তাঁতীপাড়ায়। গর্বিত দুই ক্ষুদ্র দিদিকে কিন্তু ওরা কেউ অসমাদর করল না। এক বান্ধবীর মা সুন্দর সুন্দর চারটে কাঁথা দিয়ে বললেন – যাও তোমার মাকে গিয়ে দিও। গিন্নি মায়ের জন্য এই ‘ভেট’ পাঠাতে পেরেই তাঁদের কি আত্ম তৃপ্তি। একজন তার দিদিকে বললো – “তুই কখন বানালি লো এগুলো”? ডাক্তার গিন্নির যবে থেকে পেট দেখেছি তখন থেকেই বানিয়ে রেখেছি। আমরা দুই বোনে খুশিতে ডগমগ। আটদিনের দিন আমরা পাড়ার যত ছেলে মেয়েদের ডেকে নিয়ে এলাম, উঠোনে একটা কুলোকে সবাই মিলে সরু সরু কাঠি দিয়ে, পিটাতে লাগলাম আর বলতে লাগলাম, আটকলাইয়া, বাটকলাইয়া, ছেলে পোয়াতি ভাল। তারপর বেতের ডোনায় করে খৈ, মুড়কি, বাতাসা ও পয়সা দিয়ে বাচ্ছাদের বিদায় দেওয়া হল। এইসব অনাবিল আনন্দ এখন আর পাওয়া যায় না। ছ’মাসে হল আবার অনুষ্ঠান। অন্নপ্রাশন, নানান মানুষের ভিড়। কত রকমের আত্মীয় স্বজন এলেন আমাদের বাড়িতে। প্রথম দেখলাম হরেকৃষ্ণ দাদু (বাবার কাকা), জব্বলপুরের পিসিমা, মালিয়ানের ঠাকুমা, মায়ের পিসতুতো দাদা সুধী মামাদের। ছোট বয়সের যাঁদের স্মৃতি এখনও মনের মণি কোঠায় জ্বল জ্বল করছে, কারণ তখন থেকেই আমি মানুষ দেখতে; হা করে তাঁদের মুখের কথা গিলতে খুব ভাল বাসতাম। আমাদের দুই কাকা আসতেন সবসময় বাবার কাছে। তাঁরা ভীষণ রসিক ছিলেন, তাঁদের হাস্যরসের রসাস্বাদন করার বয়স তো তখন হয়নি, কিন্তু সবাইকে তাঁরা হাসাচ্ছেন দেখে তাঁদের আমার ভীষণ ভাল লাগত। ভক্ত কাকা আর ধর্ম কাকা তাই আমাদের প্রিয় ছিলেন। তাঁদের বাবা সর্বদা মুখে হরে কিষ্ট – হরে কিষ্ট বলতেন, তাঁর নামও আমরা তাই দিয়েছিলাম। নিজেরা তাঁরা কত উদাসীন সহজ সরল মানুষ ছিলেন, যে আমরা শিশুরা ওই বয়সেও – তাঁর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতাম। মনে হতো এইসব লোকেরা যেন আমাদের বাড়িতেই থেকে যান। একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম না হয়েও সব সময় আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া লেগেই থাকত, আমাদের পরিবারে। দাদু বড় সার্জেন, বাবা বড় ডাক্তার, বদ্যি সমাজে তাঁরা ছিলেন গর্ব। কেউ দাদুর কাছে আসতেন ‘এপেন্ডিসাইটিস’ অপারেশন করতে তো – কেউ হাইড্রোসিল। কেউ বা হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো কারও পেটের ব্যামো। তবে সবচেয়ে মজার যে রোগটা আমাদের বিশেষ আকৃষ্ট করত তা হল – গোদ।

আমার পাঁচ থেকে দশের অধ্যায়ে এরকম লোকের দেখা অনেক পেয়েছি আমরা। যাদের পা ফোলা হাতির পায়ের মতন, তাই ইংরাজিতে এর নাম দেওয়া হয় এলিফ্যান্ট লেগ, Filariasis। মশা কামড়ালে যে এই রোগ হয়, তাও আমরা তখন জেনেছি। মশার নাম – কিউলেক্স। গ্রামে মাঠে, ঘটে, বাটে কোথায় যে তারা ওৎ পেতে থাকে কে জানে। যার হতো তিনি খুব লজ্জা পেতেন, লোকের বাড়ি যেতে, ধুতির নিচে পা টি বেরিয়ে গেলে ঢাকবার চেষ্টা করতেন তখনি। জ্বর ও আসত এই রোগে, গ্রামের মানুষগুলোকে একদিকে তখন এনোফিলিস মশার কামড়ে – ম্যালেরিয়ায় ধরত, অন্যদিকে বাঁকুড়ায় এই কিউলেক্স মশার উপদ্রপে অনেকেই আক্রান্ত ছিলেন। আমাদের বাড়ি আশুড়িয়া, হাড়মাসরা, মালিয়ান, লক্ষীসোল, মালিয়ারা, সুপুর, ছাতনা, খাতড়া – যে যেখানেই থাকুন না কেন কোনো না কোনো কারণে তাঁরা হয় বাবা, নয় দাদুর কাছে ছুটে আসতেন। তাই আমাদের বৈঠকখানার ঘরে সবসময়ই চৌকি ও বিছানা পাতা থাকত। তাঁরা আশ্রয় গ্রহণ করতেন, গরম ডাল ভাত পোস্ত খেয়ে তৃপ্ত হতেন, কাঁসার গেলাসে চা খেয়ে আমাদের বাবা মাকে, কত আশীর্বাদ দিতেন। ছোট থেকেই রোগ বা রোগী কাউকেই আমাদের ভয় বা ঘেন্না করত না। দাদুর বাড়িতে অপেরেশনের রুগীদের পুঁজ রক্ত – ব্যাণ্ডেজ – দেখতে দেখতে বড় হয়েছি – বলে কোন ভাবেই রোগ বালাইকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কোন কাকা, জ্যাঠা মনে নেই হেতমপুর বা সিউড়ি থেকে এসে অনেকদিন ছিলেন একবার। তখন তাকে হাতের কাছে জল, ফল, ওষুধ দেওয়া – ছোট খাটো কাজগুলি করতে আমার সাত আট বছরের শিশু মন খুব খুশি হত। মানুষের সেবা যে পরম ধর্ম তা তো হাতে কলমেও শেখা যায়, ওই ছোট বয়সেই তা অনুভব করেছিলাম। সেবা করার অদম্য ইচ্ছেটা তখনি বীজ বুনে দিয়েছিল এই চিকিৎসক পরিবারের সংস্কার। পরবর্তী জীবনে স্কুলে বা হোস্টেলে, কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শ্বশুরবাড়িতে কেউ অসুস্থ হলেই ছুটে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াবার ইচ্ছেটা কখনও দমন করতে পারিনি। নার্স সাজতে, প্র্যাক্টিক্যাল জীবনে কাউকে একটু সেবা করতে পারলে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। অনেক লোক এটাকে বাড়াবাড়ি, শো অফ মনে করেছে, অনেকে ভাল বলেছে, আমি তাদের কথা কানে নিইনি, কারণ এটাই আমার স্বাভাবিক নেচার।

পাঁচ বছর বয়সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বা স্মরণীয় ঘটনা হল – আমার “হাতে খড়ি”। সরস্বতী পুজোর দিন ঠাকুরের সামনে সকাল বেলায় স্নান করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে মা আমায় বসলেন, পন্ডিত মশাইয়ের সামনে। মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে একটা শ্লেটে খড়ি কি যেন লেখালেন ভট্টাচার্য মশাই, খুব যত্ন করে আমার ডান হাতটি ধরে। অদ্ভুত আনন্দ জাগল মনে। এবার তবে স্কুলে যাওয়ার ছাড়পত্র মিলবে আমার। দিদি দাদার সঙ্গে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তাহলে আমিও স্কুলে যাব। নতুন নাম খোঁজা শুরু হল তখুনি। দিদির ভাল নাম দেওয়া হয়েছিল মালবিকা। ওর সঙ্গে আমার নাম দিলেন মাসী ‘মালঞ্চিকা’ কি সুন্দর নাম। কিন্তু আমার পছন্দ নয়। আমি আমাদের বাড়ির সবুজ রঙের গলায় লাল দাগ দেওয়া পাখীটাকে খুব ভালোবাসতাম, তাই ওর সঙ্গে একান্ত হয়ে নিজের ভাল নাম নিজে নিজেই রাখলাম – ‘চন্দনা’। এবারেও কিন্তু আমি স্কুলে ভর্তি হতে পারলাম না। কারণ আমার হাত তখনও পুরোপুরি সারেনি, আর তার সঙ্গে শুরু হয়েছে সেপটিক টন্সিল, কানে পুঁজ। প্রায় জ্বর আসত ১০৪/১০৫ ডিগ্রি। সুশীল কাকা বাবার কম্পাউন্ডার ছিলেন। তিনি এসে লাগিয়ে দিতেন – পেনিসিলিন ইনজেকশন। বিস্কুট, দুধ অথবা মুড়ি খেয়ে দিন কাটতো ছোট্ট মুকুলের। আর বরাদ্দ ছিল সাবু সেদ্দ, আমি কিন্তু বিরক্ত হতাম না তাতে। কান্নাকাটিও করতাম না বিশেষ। সবাই বলতেন মেয়ের সহ্য শক্তি আছে বটে। বুজতাম, সহ্য করা একটা বিশেষ বড় গুন, সেটা থাকলে অনেক শান্ত থাকা যায়। ছোট পিসিমা মানে গনু দাদার মা প্রায় আসতেন, আশুড়িয়া থেকে। বারান্দায় তোলা উনুন ধরিয়ে দেওয়া হত, নিজে ভাতে ভাত করে আলু কুমড়ো সেদ্দ দিয়ে একবেলা খেতেন তিনি। সবসময় সাদা থান পরে হাতে হরি নামের মালাটি নিয়ে জপ – করে যেতেন আমার কাছে বসে। বড় পিসিমার বেলাতেও তাই। বারান্দায় স্বহস্তে রান্না, দুধ কলা চটকে আতপ চালের ভাত খাওয়া চলত। তার সঙ্গে উপরি পাওয়া ছিল “গিরিধারীর” পুজো। এক সুন্দর কালো চকচকে পাথরের ঠাকুর। চন্দনে চর্চিত তুলসী পাতায় ফুলের মালয় সজ্জিত সিংহাসনে বসানো – এই ঠাকুর জীবন্ত হয়ে উঠতেন আমাদের কাছে। গঙ্গা মাটি দিয়ে তার চোখ মুখ আঁকা, সামনে প্রসাদ রেখে আমার সাধিকা পিসিমা যখন পুজো করতেন তখন ভীষণ সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হত বাড়িতে। সন্ধ্যে বেলায় সেই পবিত্র স্থানে বসে আমরা তিন ভাই বোন শুনতাম – মীরাবাঈ এর কাহিনী। সেই – গোপালের গল্প। যার বাবা ছিলনা, মা বলেছিলেন, মধুসূদন দাদার কাছে যা চাইবে তাই পাবে। তাই পাঠশালায় মাষ্টারমশাই – তাকে একবার যখন দই আনতে বলেন, তখন সে কেঁদে কেঁদে তার মধুসূদন দাদাকে ডাকে এবং তিনি – তার সামনে অবতীর্ণ হয়ে তাকে একটি দই পূর্ণ ছোট্ট ভাঁড় দেন। সে ওই ভাঁড় নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের কাছে গেলে, তিনি কিন্তু খুশি হন না, বলেন – “গোপাল এইটুকু দই দিয়ে কি হবে রে”? সে উত্তর দেয়, – “মধুসূদন দাদা বলেছে – ওই দই তে হবে”। বলে সে যখন ওই ভাঁড় উপুড় করে [- কাউকে দেয় পাত্রটি আবার দই দিয়ে ভোরে যায়। সমস্ত ছাত্র, মাষ্টারমশাই ও গ্রামের লোকেরা খেয়েও তা শেষ করতে পারে না। – গল্পটা আমার মনকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিত। মধুসূদন তথা ভগবানের প্রতি একটা অদ্ভুত আস্থা – বিশ্বাস ও ভক্তি ভাব পিসিমার গল্প আমার শিশু মনকে ভরে দেয়। আমি রাত্রে শুয়েও শুনতে পেতাম – “মধুসূদন দাদা বলেছেন – ওই দই তে হবে”। এখনও এই সত্তর বছর বয়সে, সেই ছোট্ট বালিকাটির মতন ঈস্বরে বিশ্বাস প্রগাঢ় ভক্তি ভাব – একটা আধ্যাত্মিক চেতনা – আমার মনকে স্নিগ্ধ করে রাখতে চাই। সর্বদা আমার কানে কানে কে যেন বলে – ‘শরণাগত হয়েই সব পাওয়া যায়’। তিনি যে সর্বত্র বিরাজমান, যে কোন বিপদেই তাঁকে ডাকলেই, তাঁকে কাছে পাওয়া যায় এবং তিনি কৃপাভরে যেটুকু দান দেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকলে, ভরসা রাখলে তা কখনও অপূর্ণ থাকে না।

তাই আমার ওই দুই সাধিকা পিসিমা যাঁরা বাল্য বিধবা ছিলেন পূজা অর্চনায়, ভগবৎ সাধনায়, সাত্ত্বিক জীবন কাটিয়েছেন, তাঁদের প্রভাব বেশি পড়েছিল। ঐ আতপ চালের গন্ধ এখনও আমার মনে একটা পবিত্র ভাব এনে দেয়। তাঁদের কথা ভাবলে শ্রদ্ধায় আমার হৃদয় আপ্লুত হয়ে যায়। এই ছোট পিসিমারই গনু দাদা, যাঁর প্রভাব এই মুকুলের জীবনকে, সেই শৈশবকে – ঋদ্ধ করেছে নানাভাবে। তাঁর কথা পুরো একটা বই লিখেও শেষ করতে পারব না। পরে সেই গল্প বিস্তারিত ভাবে বলে যাবে।

(ক্রমশ)

তৃতীয় অধ্যায়

‘আমার দাদুর কথা’

এখন যে সব মানুষের মিছিল আমাকে আকৃষ্ট করে রেখেছিল তাঁদের কথা জানাই। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন আমার দাদু। মায়ের বাবা ‘ডঃ অনাথ বন্ধু বায়’ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার হালিশহরের লোক। কালীভক্ত রামপ্রসাদ সেনের ভিটে সেখানে। পরে তাঁর পিতা যোগেশচন্দ্র রায় উড়িষ্যার কটকে চাকরি করতে যান। সেখানে তাঁর পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার ছিল। মনে প্রাণে কালীভক্ত ছিলেন তিনি। ছেলে কটকের বিখ্যাত স্কুলে ভর্ত্তি হন, যেখানে তখনকার বিখ্যাত ব্যক্তি জানকীরাম বসুর পুত্র সুভাষ চন্দ্র বোস তাঁর চেয়ে দু ক্লাস উঁচুতে পড়তেন। দেশাত্ববোধের বীজ, দেশের মানুষকে সেবা করার আগ্রহ তাঁর তখন থেকেই জন্মায়। পড়াশুনোতেও তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তাঁদের পারিবারিক জীবনে অস্বাভাবিক দুটি ঘটনা ঘটে, যা তাঁর জীবনের ধারাকে বিঘ্নিত করে। বিচলিত হয়ে যান তরুণ অনাথ বন্ধু। তিনি তখন ডাক্তারি পড়ছেন স্কুলের পাঠ শেষ করে, কলকাতাতে। ঘটনার কথা, সাল, তারিখ জানবার কোনো উপায় নেই, কারণ দাদুর বাবা, দিদি অর্থাৎ মায়ের পিসিমার গল্প আমরা পূর্বে মায়ের মুখে যেভাবে শুনেছি তাই ব্যক্ত করছি। দাদুর দিদির তিনটি কন্যা ও একজন পুত্র জন্মায়, তারপর বিনামেঘে বজ্রপাত হয়। হঠাৎ তাঁর স্বামী মারা যান, তার মাত্র সাত দিনের মধ্যেই গত হন মায়ের ঠাকুমা। যুবক অনাথ বন্ধু তাঁদের সকলের ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁদের নিজের বাবাকে বাঁকুড়ায় এনে রাখেন। মায়ের একজন জ্যাঠামশাই ছিলেন যাঁর পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র জন্মায়। তিনি অকালে পরলোক গমন করেন। মায়ের দাদু তাঁর ভায়ের ঐ পরিবারকে অর্থাৎ সাতজন পুত্র কন্যা সহ বাঁকুড়ায় নিয়ে আসেন। অনাথ বন্ধু তাঁদেরও পিতার মতন হয়ে অতি সযতনে লালন পালন করেন। পরে তাঁর বিবাহ হয়, বর্ধমানের মল্লিক বাড়ির কন্যা ‘অন্নপূর্ণা দেবীর’ সঙ্গে। ঐ একান্নবর্তী পরিবারের সকলকে সমানভাবে ভালোবাসায় বেঁধে তিনি সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তাঁর নিজেরও চার কন্যা ও তিন পুত্র জন্মায়। সুতরাং মায়ের পিসিমার ছেলে সুধা মামাদের চার ভাই বোন + সন্তু মামাদের সাত এবং মায়েরা নিজেদের সাতজন ভাই বোন অর্থাৎ আঠারোটি সন্তানের লেখা পড়া, ভরণ পোষণ – বিবাহের আয়োজন করা, ভিন্ন ভিন্ন বাড়ি ঘর করে, তাঁদের সুপ্রতিষ্ঠিত করার সমস্ত দায়িত্ব অক্লেশে নিজের কাঁধে তুলে নেন, যোগেশ চন্দ্রের – সুযোগ্য পুত্র। অসামান্য তাঁর ব্যাক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও সততা দেখে সেই সময়কার বহু বিখ্যাত লোক মুগ্ধ হয়ে যেতেন। ইংল্যান্ড এ FRCS পড়বার সুযোগও পান তিনি, কিন্তু পিতার একান্ত অনুরোধে তাঁকে পড়া শেষ না করেই ফিরে আসতে হয়। কিন্তু পারিবারিক দায় দায়িত্ব, শৈল্য চিকিৎসার জন্য ‘ঘন্টার পর ঘন্টা’ নিজের অপারেশন থিয়েটার এ কাটানো, ভাগ্নে ভাগ্নি, ভাইপো ভাইজিদের পড়া – চাকরির ও বিবাহের ব্যবস্থা নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকা – সত্ত্বেও তিনি কিন্তু রাত্রি ছাড়া কোনো সময়ের জন্য একটুও বিশ্রাম নিতেন না। তার ওপরে কংগ্রেস পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, পরে বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে তিনি ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং বাঁকুড়ার কোতুলপুর অঞ্চল থেকে ইলেকশনে জিতে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন। তাঁর সেই সময়ের কাজ ও সততার জন্য তিনি সকলের প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। এতো বছর পরে আনন্দ বাজার পত্রিকাতে ৫০ বছর আগের মন্ত্রীর খবর পড়ে ও দাদুর ছবি দেখে আমার মন শ্রদ্ধায়, আনন্দে, ভরে গেল। গর্ববোধ হল তাঁর নাতনী হতে পেরে। প্রণাম জানালাম তাকে বারে বারে। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি কত বড় বড় ‘লিডার’ আসতেন দাদুর কাছে।

শৈশবে আমার এক উজ্জ্বল স্মৃতি – তৎকালীন বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ও বিখ্যাত ডাক্তার ‘বিধান চন্দ্র রায়ের’ দাদুর বাড়িতে আগমন। গৌরীপুরের কুষ্ঠাশ্রম, নবজীবনপুরে কুষ্ঠ রোগীদের বাসস্থান, বাঁকুড়ার মতন এক অনুন্নত শহরে সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ তৈরী – সরকারি হাসপাতালকে সব রকমভাবে সাহায্য করা, তাঁর প্রধান কাজ ছিল। একবার সেই সময়কার রাজ্যপাল ‘পদ্মজা নাইডু’ এলেন বাঁকুড়া পরিদর্শনে। হয়তো সব সরকারি অফিসারদের সঙ্গে সার্কিট হাউসে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু দাদুর সঙ্গে বিধান চন্দ্রের মতন তাঁরও হৃদ্যতা এতো সুদৃঢ় ছিল, তিনি আমাদের মামা বাড়িতে দিদিমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ও বেশ অনেক্ষন নানাধরণের আলাপ আলোচনায় যোগ দেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী কবি। গান্ধীজির প্রিয় পাত্রী ভারতের Night Angel “সরোজনী নাইডুর কন্যা”। সরোজনী বঙ্গ ললনা ছিলেন, তাঁর ভাষণ, কাব্য পাঠ তখনকার বিদগ্ধ জনকে মুগ্ধ করত। পদ্মজা নাইডু যেদিন আমাদের বাড়ি আসেন সেদিন আমাদের দাদুর গৃহ এক নতুন ধরণের উৎসবে আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। বাঁকুড়ার পুরোনো আমলের বিদগ্ধজন, স্কুল কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকা, ‘উমা মাসী’, উদয় ভানুদের মতন দেশপ্রেমী সব মানুষ নিমন্ত্রিত ছিলেন “ও-বাড়ি”, মানে আমাদের মামা বাড়িতে। আমাদের মা ছিলেন দাদু দিদিমার বড় মেয়ে, অত্যন্ত প্রতিভাময়ী, খুব ভালো গানের গলা ছিল তাঁর। পদ্মজা নাইডুর আগমনে মা আমাদের সব বাচ্চাদের দেশাত্মবোধক গান শেখালেন। উদ্বোধনী সংগীত গাওয়া হল, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্য সুন্দর”। তারপর মাঝে দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের গান ও শেষে – “যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ”, – গানগুলির মানে হৃদয়োঙ্গম করার মতন ক্ষমতা সাত/আট বছরের মুকুল, বকুল, বুড়ি, খোকন কারোরই তখন হয়তো ছিল না, কিন্তু দেশাত্ম প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, আনন্দময় এই পৃথিবীর মাটিতে – ধন্য আমাদের জন্ম, পুন্য আমাদের আত্মা – এটা কি ভাবে যেন বুঝতে শুরু করেছিলাম। ভালোবাসতে আরম্ভ করেছিলাম সেইসব নিত্য প্রণম্য মানুষদের। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদকে চিনতে আরম্ভ করেছিলাম। বিশেষতঃ দ্বিজেন্দ্রলালের দেশাত্মবোধক নাটক – যেগুলি আমার বড় মামা অভিনয় করে দেখাতেন, ক্ষুদিরাম, চিত্তরঞ্জন, শহীদ ভগৎ সিং প্রমুখের গল্প আমাদের বড়রা সুন্দর করে শোনাতেন আমাদের।

পদ্মজা নাইডু বিধানরায়ের পর যাঁকে দেখে আমাদের খুব ভাল লেগেছিল, তিনি হলেন, – দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। তখন তিনি অতি সুদর্শন এক যুবক ব্যারিষ্টার। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মায়া রায়ও এসেছিলেন। কী অপরূপ সেই শিক্ষিত অপূর্ব সুন্দরী তিনি। কি কথা বলছিলেন, কি নিয়ে যে আলোচনা যে চলছিল কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু মনের মনিকোঠায় এইরকম মানুষের ছবি গাঁথা হয়ে গেছে। তাঁর নামে আমার সবচেয়ে ছোট ভাই ছোটনের নামও দেওয়া হয়েছিল, সিদ্ধার্থ। অনেক পরে এই সিদ্ধার্থ রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন, পরে পাঞ্জাবের গভর্নর। যাঁরা ঐসময়ের মন্ত্রী স্বান্ত্রীরা আসতেন, তাঁদের সঙ্গে আসতো তাঁদের ADC – PA নিরাপত্তাবাহিনী। তাঁদের দেখে আমাদের খুব আকর্ষণীয় লাগতো। ছোট ছোট খোকন, বুড়ি, মুকুল, বকুলেরা ওদের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াতো।

দাদু স্বাস্থ্য মন্ত্রী হওয়ার পর একবার লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে চাকরের ছদ্মবেশ নিয়ে মেডিকেল কলেজের পেছন দিকের গেট দিয়ে ঢুকে ওষুধের দোকানে সরকারী ওষুধ পাচারকারী চোর ও তাদের সহযোগী হাসপাতাল কর্মীদের হাতে নাতে ধরেছিলেন। ভীষণ সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন তিনি। সরকারের কাজে এত ব্যস্ত থাকতেন যে নিজের রুগী দেখার বা অপারেশন করার সময় পেতেন না।

সংসারে তাঁর অর্থাভাব হয়ে যায়, দিদিমাকে দেখেছি ঐসময় ধার করে টাকা এনে পরিবার পালন করতেন। ভাগ্নে, ভাগ্নি, ভাসুর পো, ভাসুর ঝি, এবং নিজের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে তাঁর শ্বশুর মশাই যোগেশ চন্দ্র রায়ের পালিত বাঁদর, কুকুর, ময়ূর, মুরগি, হাঁস, গরু, বাছুরের পোষা জানোয়ার ভরা এক বিরাট যোগেশ ভবন। আর তাদের দেখাশোনার করার জন্য গ্রাম থেকে আগত বিভিন্ন ধরণের দাস দাসী। ঐসব কাজের লোক, কিংবা কম্পাউন্ডার শল্য চিকিৎসার সাহায্যকারী সব ব্যক্তি পশুপতিবাবু ডঃ গৌরী শঙ্কর – সকলেই ছিল, অন্নপূর্ণা দেবীর প্রিয় পাত্র। ভেতর বাড়িতে সবার ছিল অবাধ বিচরণ। বিশাল এক রান্না ঘরে বড় বড় ঐ উনুন জ্বলতো, খুব বড় বড় কড়াই হাঁড়ি। দিদিমা রান্না করছেন আর সহযোগী ঠাকুর কমলমামা, বিমলা মাসী, বাঁকু মামা, নিতাই মামা সবাই সাহায্য করছে। কেউ মশলা বাটছে, কেউ মাছ কাটছে, কেউ বা নারকেল ছাড়াচ্ছে উঠোনে বসে। – সে এক এলাহী ব্যাপার।

মামাবাড়িকে আমরাও বাড়ি বলতাম এবং ঐসব চাকর বাকর কর্মচারীরা সবাই ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সম্মানীয় মামা, মাসী। ছোটদের মনে তখন থেকেই বড়দের সে কোন কাজ করুন না কেন, আর যে কোন জাত ধর্মের বিশ্বাসী হন না কেন, আমরা তাদের নিজেদের আপনজন মনে করতাম। সব সম্প্রদায়ের গরীব-দুঃখী, উঁচু নিচুর বিচার না করে মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র পেয়েছিলাম ঐ বাড়িতে।

সেই পরিবেশ ছেড়ে দাদুর সঙ্গে গ্রেষ্ট্রীটের হাতিবাগানের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পত্নী হয়ে ঘরের কোনায় বসে থাকতে তাঁর ভাল লাগত না। বাঁকুড়ার বাড়িতে নাতি নাতনিদের সঙ্গে কাজী দা মানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের গল্প করতেন। কাজীদার স্ত্রী তাঁর বান্ধবী ছিলেন, সেই বৈদ্য কন্যা ও মসুলমান যুবকের প্রেম কাহিনীর একজন সাক্ষী ছিলেন তিনি।

মুকুলের তো সেই নজরুলের কথা বারেবারে শোনবার জন্য দিদিমার জন্য মন কেমন করত। কিন্তু হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন খবর এলো, তাঁদের দিদিমা জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে মাত্র পাঁচ মিনিটের কষ্টে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে ৪৯ বছর বয়সে দাদুর কোলে মাথা রেখে হাতিবাগানের বাড়িতে মারা গেছেন। দাদু আরও ১৪/১৫ বছর পরে বাঁকুড়ায় রুগীর বাড়িতে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভাঙলেন। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি বিছানার পাশে টেবিল রেখে রুগীদের হাইড্রোসিল, হার্নিয়া, এপেন্ডিসাইটিস ইত্যাদি অপারেশন থেকে বিরত থাকেনি।

এরকম অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য আমার শৈশব – কৈশোর ও তরুণী জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল। যদি ছেলে হয়ে জন্মাতাম তা হলে হয়তো সে যুগেও রাজনীতি, সমাজ সেবায় যুক্ত হতাম দাদুকে অনুসরণ করে। কিন্তু নারী জন্ম কি শুধু বিয়ে আর সংসার বা সন্তান পালনের জন্যই বিধাতা বানিয়েছিলেন?

১৯৭৪ সালে আমার বিয়ের পর স্বামীসহ দাদুর ঘরে গিয়ে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে যখন প্রণাম করি তখন তাঁর বাণী – তাঁর মুখ নিঃসৃত উপদেশ – এখনও আমার কানে গুঞ্জরিত হতে থাকে। – – –

“সংসারে সবাইকে মানিয়ে চলবে। সেবা দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকের মন জয় করবে। – মুকুল মালা, আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার মাথার ওপর থাকবে জেনো”।

এক সকালে দিল্লীতে ইংরেজি পেপারে খবর পড়ে জানতে পারলাম, প্রাক্তন স্বাস্থ্য মন্ত্রী পরলোক গমন করেছেন। – একটা যুগ শেষ হয়ে গেল।

(ক্রমশ)

চতুর্থ অধ্যায়

তাই আমরা আমাদের মামাতো ভাই বোনেরা যেন সর্বদা অন্য একটা জগতে বাস করতাম। মেজো মামা ছিলেন অত্যন্ত সুদক্ষ সেতার বাদক ও বাঁশুরি শিল্পী। তিনি যখন চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে বাজাতেন বা বাঁশির সুরে নিজেকে ও বাড়ির অন্য সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতেন, তখন আমরা হলদে বারান্দায় বসে সেই সুরের মূর্ছনাতে ভেসে যেতে যেতে নাচ প্রাকটিস করতাম। হ্যাঁ, নাচ ছিল আমার – সেই ছোট মুকুলের মজ্জায় মজ্জায়। গান, বাজনা – সুর তাল আমাকে ভীষণ – ভাবেই আকর্ষণ করত। ঐ সময়, আমাদের বীণাপানি সিনেমা হলে কেউ ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’ ও ‘নাগিন’ সিনেমা দেখিয়েছিল। সেই থেকে বৈজয়ন্তী মালার মতন, পদ্মিনীর মতন আমার পা চলতো – নাচের তালে, হাতের মুদ্রা চোখ সব নকল করত ঐ সুন্দরী নৃত্য শিল্পীদেরকে। নাচের কায়দা কানুন রপ্ত করায় আমি সবাইকার কাছে খুব প্রিয় ছিলাম। মেজো মাসী নাচ শিখিয়েছিলেন, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’। ছোট মাসী শিখিয়েছিলেন – “মম চিত্তে নীতি নৃত্যে কে যে নাচে তা তা থৈ থৈ”। নাচ আমার জীবনে সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা একাই আমি যে ভাবে নাচ করতাম, তখনকার ছেলেমেয়েরা দেখলে হয়ত হাঁসত। তখন বাঁকুড়ায় ভাল নাচ গানের স্কুল ছিল না। কিন্তু যেহেতু মা বিষ্ণুপুর ঘরানার “গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়” মশায়ের ছাত্রী ছিলেন এবং নানা ধরণের উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর অপরিসীম দক্ষতা ছিল তাই প্রথমে দিদির জন্য একজন গানের মাষ্টারমশাই ও আমার জন্য নাচের শিক্ষক ঠিক করলেন। দিদির গানের গলা খুবই মিষ্টি ছিল, সে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করল সেই ছোট্ট বয়সে। আমার মাষ্টারমশায়ের নাম ছিল “দ্বিজ” বাবু। তাঁতি পাড়ার যাত্রা দলের সুদক্ষ শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁতি পাড়াতেই থাকতেন। আমার প্রথম নাচটি ভরতনাট্যম এর কায়দায় কম্পোজ করেন তিনি। গানটি আমার সত্তর বছর বয়সেও মনে আছে। – “দেবতার মন্দিরে দেবদাসী গো আমি পূজারিণী”।

আমাদের ছেলেবেলা মানেই নাচ, গান আর নাটক। সে কথাই পরে আসছি, প্রথম দিনের স্কুলের অভিজ্ঞতাটি আগে ব্যক্ত করি।

বাড়িতে খ্রিষ্টান মাষ্টারমশাই আমায় আগেই একটু একটু করে পড়াশুনো ব্যাপারটার সঙ্গে আমাকে পরিচিত করিয়েছেন। তিনি প্রথমে তিনটি রেখা দিয়ে লেখা আঁকতে সেখান। বলতেন হাত বোলায় – বাবুর “ব” তারপর র, ক, য, য়, খ – ইত্যাদি আসে। অ, আ, ই, ঈ দের কথা পরে জানতে পারি। অক্ষরগুলোর প্রতি আকর্ষণ, অক্ষরদের নিয়ে খেলা করা তিনিই আমার মধ্যে জাগিয়ে তোলেন। শরীর একটু দুর্বল থাকায় পাঁচের জায়গায় ছয় বছরে বুড়ি (মামাতো বোন সুদেষ্ণা) আরতি চ্যাটার্জী, প্রতিমা সেন, মন্দিরা সেনগুপ্ত – শুভেন্দু হালদার, তুফান এরা আমার সহপাঠী হন। প্রথমের অভিজ্ঞতায় বড় দিদিমনি, ময়নাদির দিদি টিয়াদি আমাকে নিজে হাত ধরে KG-1 ক্লাসে নিয়ে গেলেন। মিশন গার্লস স্কুলের হলে – একপাশে আমাদের পড়ার ঘর। প্রথমেই বোর্ডে একটা C “সি” মতন আঁচড় কেটে জিজ্ঞেস করলেন – এটা কি বলতো? কেউ বলতে পারল না তখন ওটাকে একটা নৌকা বানিয়ে সবাইকে শ্লেটে Boat বানাতে বললেন। আমার খুব আনন্দ হল। নৌকার দুপাশে দিদিমনি হাল, পাল ও নিচে নীল চক দিয়ে জল বানিয়ে দিতেই আমাদের কল্পনা আমাদের এক নদীর দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর ছড়া শেখা এবং ‘যীশুর’ ছবির সামনে নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা করতে শেখানো হল। শিব, গণেশ, কৃষ্ণদের মতন যীশুও এক দেবতা। হিন্দু বা খ্রিষ্টান বলে কিছু জানিনা। ভেদ বুদ্ধি মনে দানা বাঁধেনি। সারেঙ্গা, শুশুনিয়া প্রভৃতি জঙ্গলের থেকে অনেক সাঁওতাল, বা অন্য আদিবাসীরা তাঁদের মেয়েদের পড়তে পাঠিয়েছেন আমাদের সঙ্গে। তারা স্কুলের হোস্টেলে থাকত। আমার সঙ্গে সেখানে একটি মেয়ে তরঙ্গিণী – ও ছেলে ফিলিপের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল প্রথম দিনেই। দাদা দিদির বই দেখতে দেখতে বোধহয় বেশি পোক্ত হয়ে উঠেছিলাম তাই – প্রথম বছরেই ক্লাসে ‘প্রথম’ হলাম। প্রাইজ পেলাম একটি সুন্দর মেডেল ও বই। বইটার নাম ছিল ‘সাঁঝের বাতি’ তিনটি গল্প ছিল সেখানে। একটি রাজা-রানী ও তাদের তিন অপরূপা কন্যাদের। রাজকন্যাদের একজনের মুখে পদ্ম ফুলের আর একজনের গোলাপ ও ছোটজনের জুঁই ফুলের গন্ধ। একবার এক দৈত্য তাদের মন্ত্র বলে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেয়। তখন এক রাজপুত্র কি ভাবে মৌমাছিদের সাহায্যে তাদের চিহ্নিত করে এবং আবার জাগিয়ে তোলে, সেই গল্পটি ভীষণ ভাল লাগত আমার। কারণ সেই রাজপুত্র মৌচাকটি ভাঙ্গতে দেয়নি, তাই মৌমাছিরা তাকে সাহায্য করে। পোকামাকড় – ও এই গল্পে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভালোবাসার, রক্ষাকর্তার উপকারের দাম দিতে ভোলে না। আমার কাছে পশু পাখির প্রতি এক অপার মায়া ছিল, বাড়ির গরু ও চন্দনা পাখির সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার জন্য। এবার প্রজাপতি, মৌমাছি, গুবরে পোকারাও আমার কাছে এক বিশেষ সম্মান পেতে আরম্ভ করল। কল্পনার জগতে বিচরণ করতে করতে, নিজেকে হারিয়ে ফেলার এক প্রবণতা জেগেছিল ছোট মুকুলের সেই ছোট থেকেই। এই সময়ে বাঁকুড়ার ভুবন গড়াইয়ের গ্যারেজে নানান রকমের প্রোগ্রাম করা হত। আর কোন হল ছিল না। আন্তঃ স্কুল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা আয়োজন করত বিভিন্ন সংস্থা। তাই মা আমাদের মুখস্থ – করাতেন – বীরপুরুষ, বিজ্ঞ, সমব্যাথী, কাগজের নৌকা বা সবচেয়ে প্রিয় কবিতা – “একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু চেয়ে দেখ, চেয়ে দেখ বলে যেন বিনু”। কলকাতা শহরের এমন আজব – সুন্দর – বর্ণনা আর কোন কবিতা গল্পে পূর্বে বা পরে শিশুদের জন্যে কেউ লিখেছেন – বলে আমার জানা নেই। সেখানে হাওড়ার ব্রিজকে মনে হয় মস্ত সে বিছে, আর হ্যারিসন রোড চলে তারই পিছে পিছে। আমাদের সকলের মনে ঝংকার তুলত। ভালো করে তখনও পড়তে শিখিনি, কিন্তু বড় বড় কবিতা শুনে নিয়ে মুখস্ত করে ফেলত সেই ছোট্ট বুড়ি, আরতি ও মুকুল। হাত পা নেড়ে অ্যাকশন করে আবৃত্তি করে আমরা প্রাইজও আনতাম খুব। কখনও বুড়ি প্রথম হত আমি দ্বিতীয়, কখনও আমি প্রথম তো আরতি দ্বিতীয়, বুড়ি তৃতীয়। আমাদের তিনটি শিশু বান্ধবীর মধ্যে কোন হিংসা ভাব ছিল না। প্রাইজগুলি আনলে দাদু আবার আমাদের উপহার দিতেন। খুব উৎসাহ পেতাম সবার কাছে। দর্শকের সামনে মাইক ধরে কথা বলতে, নিজের নাম বলার পর আবৃত্তি করতে ভীষণ ভাল লাগত। পরবর্তীকালে চল্লিশ বছর পর পাড়ার পুজোবাড়িতে আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারক পদে বসে ছোটবেলার সেই ভাব প্রবন দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটু ভুল বললাম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের লিচু চোর ইত্যাদি সব কবিতা মুখস্ত করার আগেই আমাদের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়েছিল সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল-এর সঙ্গে। তাঁর ওই আজব কবিতাগুলি – আমাদের শৈশবকে সরল সরস ও কল্পনাপ্রবণ করে তুলেছিল। কুমড়োপটাস, হাঁসজারুরা আমার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। রাত্রিবেলায় আমি তাদের সাথে কথা বলতাম। এখনও এই বুড়ো বয়সে একলা ঘরে যদি কোন কারণে মন খারাপ লাগে বর্তমান যুগের মূল্যবোধহীন এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের উন্নাসিকতা যথেচ্ছাচার শিশু কন্যাদের প্রতি দৈহিক অত্যাচারের কথা শুনে, টিভিতে দেখে মনটা তিক্ত হয়ে উঠে, তখন আবোল তাবোল খুলে বসে যাই। অনেক কবিতাই এখনও মুখস্ত বলতে পারি, কারুকে হঠাৎ রেগে মেগে ক্ষেপে গেলে ‘হেড অফিসের বড় বাবুকে’ মনে পরে, তার গোঁফ চুরির ঘটনা মনে এক অনাবিল আনন্দ দেয়। মন হতাশ-নিরাশ হলে – হুঁকো মুখো হ্যাংলা বা ‘সৎপাত্র’-এর গঙ্গারামের গুণগুলি ভেবে ভেবে নিজেকে হালকা করতে চেষ্টা করি। হাস্যরস যেন উবে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে – সমাজ থেকে, মানুষের জীবন থেকে। অন্যকে নিয়ে মজা করা, ব্যঙ্গ করা তখন শিশু মন একেবারেই জানত না। তাই তারা স্বপ্রতিভ। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রাণখোলা সেই হাসি কোথায় হারাল!

মামাবাড়ির ছাদটি ভীষণ বড়। যেন একটা ছোট খাটো খেলার মাঠ। সেখানেই আমাদের জন্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। সে এক ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার মতন উত্তেজনা। পাড়ার যত শিশু দল বেঁধে জড়ো হলাম সেই ছাদে। দাদা খোকনদের জন্যে সব আলাদা খেলা, আমাদের মেয়েদের জন্যে আলাদা। শরীর খুব দুর্বল থাকায় আমি খেলাধুলায় বিশেষ পাত্তা পেতাম না। প্রাইজও নেওয়া হত না। কমলা, বুড়ি ও আরতি সবগুলো নিয়ে চলে যেত। গনু দাদা সব বাচ্চাদেরকে লজেন্স বা চকলেট, নিমকি, সিঙ্গারা খাওয়াতেন। আমাদের জগতে এই গনু দাদা এক দেবদূত ছিলেন, কেউ পড়ে গেলে তাকে ওষুধ লাগনো, কাউকে অকারণে বা প্রাইজ না পাওয়ার জন্যে কাঁদতে দেখলে তিনি তাকে যত্ন করে নিজের কাছে বসিয়ে গল্প করে ভুলিয়ে রাখতেন। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মেটালারজী নিয়ে পড়ছেন তিনি। ছুটিতে বাড়ি এলে বন্ধু বুলা মামা, অসীমদা, সলিলদা দের নিয়ে হৈ হৈ করে বেড়াতেন। সবচেয়ে মজা হত লক্ষ্মী পুজোর দিন। মামাবাড়িতে খুব বড় করে লক্ষ্মী পুজো হত। নিচের বড় বারান্দায় চৌকি লাগিয়ে চাদরের পর্দা টাঙ্গিয়ে স্টেজ বাঁধা হত। আমরা ক্ষুদে ক্ষুদেশিল্পীরা একমাস আগে থেকেই নাটকের মহড়া শুরু করে দিতাম। আমি বেশ হুঁশিয়ার হয়ে উঠেছি তখন। নিজেদের পাঠ্য বইতে “বীরবলের প্রভু ভক্তি” গল্পের প্রতি ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছি এবং ক্লাস থ্রীতে পড়লেও তার নাট্যরূপ বানিয়েছি। আমি-বীরবল, বুড়ি-সম্রাট – আকবর- আরতি, মা-কালী। ছোট্ট বোন থুপুন আমার ছেলে। বীরবলকে পরীক্ষা করার জন্য সম্রাট একবার বলেন, তার ভালোর জন্য মাকালীর সামনে ছেলেকে বলি দিতে। খুব সিরিয়াস ঘটনা। বীরবল খড়গ তুললে মাকালীর দর্শন পান এবং স্বয়ং মা এসে তার হাত ধরেন। এদিকে আড়াল থেকে সম্রাট আকবর বীরবলকে লক্ষ্য করেন এবং তার সেই বিস্বস্ত নবরত্নের এক রত্নকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বাড়ির বড়রা সবাই চেয়ার নিয়ে পিছনে বসে আছেন, সামনে শতরঞ্জিতে পাড়ার লাইন ধারের বাগদি, বাউরি, খয়রাদের ছেলেমেয়েদের দল। মুগ্ধ চোখে তারা আমাদের পিজবোর্ড ও রাংতা দিয়ে তৈরী খড়গটির দিকে হা করে তাকিয়ে আছে – ভাবছে এই বুঝি বীরবল তার ছেলেকে বলি দেবে – সে কি উত্তেজনা। তারপর নাটক শেষে সকলের কী হাততালি। মেজোমামা তাঁর পাওয়া মেডেলগুলি এনে আমাদের গলায় পরিয়ে দিয়ে আমাদের অভিনয়ের ও নাট্য পরিচালনার প্রশংসায় মুখর হলেন। পরের বছর হল নৃত্য নাট্যের পরিবেশন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা “সামান্য ক্ষতি” কে নাট্যরূপ দিয়ে গানে নাচে একটি অপূর্ব অনুষ্ঠান করেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ নৃত্য শিল্পী উদয় শঙ্করের স্ত্রী আমলা শঙ্কর। মা কলকাতার মহাজাতি সদনে সেটি দেখে এসেছেন।

আমাদের মনেও তখন নৃত্যনাট্যের মধ্যে দিয়ে মনোরঞ্জন করার ইচ্ছা প্রবল হল। বুড়ি রাজা সাজলো। সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা ছিল। কাঁধের উপর কোঁকড়া কোঁকড়া চুলে তাকে রাজার বেশে খুব সুন্দর দেখাত। আমি রানী – কাশীর মহিষী করুণা। প্রতিমা আরতি। ভারতী, ডলি অন্যান্য বান্ধবীরা সব প্রজা। কাশীর মহিষী করুণা নদীতে স্নান করে উঠলে শীতে ধরে তাঁকে। সংসারে অভিজ্ঞতা রিক্ত রানী তখন তাঁর সখীদের বলেন যে, প্রজাদের পর্ণ কুটির জ্বালিয়ে দিতে, সেই আগুনে তিনি উত্তাপ গ্রহণ করবেন। গরীব মানুষগুলির গৃহ জ্বালিয়ে আনন্দ করতে করতে তিনি রাজবাড়িতে ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে যখন রাজা দরবারে বসে আছেন তখন ক্রন্দনরত প্রজারা এসে নালিশ জানালেন রাজার কাছে। প্রজাবৎসল ন্যায় পরায়ণ রাজা ভীষণ ক্রূদ্ধ হয়ে ডেকে পাঠালেন রানীকে। আদেশ দিলেন রানীর রাজ বেশ খুলে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাকে নিরাভরণ করে রাজ্যের বাইরে চলে যেতে। যে কুটিরগুলি তিনি নষ্ট করেছেন আগুন লাগিয়ে সেগুলি আবার তৈরী করার নির্দেশ দিলেন তিনি। মাথা নত করে রানী চলে গেলেন রাজসভা থেকে। বিদায় দৃশ্যে ছোট্ট মুকুল তার বড় বড় চোখে যতটা ভাব ফুটিয়ে তুলল, ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে বুড়ি যেভাবে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করল তাতে বাড়ির ও পাড়াপ্রতিবেশীদের, দর্শকের আসনে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। হাততালিতে ফেটে পড়লেন তারা। এইরকম উৎসাহ প্রদানকারী নাটকের শিশুশিল্পীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া দর্শকবৃন্দ আমাদের আত্মবিশ্বাস ও অভিনয় প্রতিভাকে বাড়িয়ে তুলল।

(ক্রমশ)

পঞ্চম অধ্যায়

বড় হয়ে বেথুন স্কুলে শান্তিনিকেতন এবং বিয়ের পরে Teacher’s Training এই ক্ষমতা আমাকে একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছে দেয়। বেথুনে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাড়াটে চাই নাটকে অভিনয় করে আমি প্রথম পুরস্কার পাই। আমার পাগলের ভূমিকায় অসামান্য এক চরিত্র ফুটিয়ে তোলার পর বড় ক্লাসের মেয়েদের প্রিয় পাত্রী হয়ে যাই আমি । যখন তখন সবাই বলে ঐ অভিনয়টা আর একবার করে দেখা। শান্তিনিকেতনে চিরকুমার সভাতেও অভিনয় করে খুব আনন্দ পাই। পরে নার্সারী Teacher’s Training এ গিয়ে দিল্লীতে সব প্রতিযোগিতাতে অংশ গ্রহণ করি। আমার তখন দুই ছেলে একজন তিন এ একজন আট বছরের। তারা আমাদের প্রিয় মিলনদিদি র সাথে দর্শকের আসনে বসে। আমি ছোটবেলার মুকুল হয়ে যাই সেদিন ৩৫ বছর বয়সেও। আত্ম বিস্মৃত হয়ে কখন Mono Acting দেখতে “চোরের” মূকাভিনয় করি, সেই সময়কার বিখ্যাত মূকাভিনেতা যোগেশ দত্তের অনুকরণে। প্রথম পুরস্কার আসে হাতে। পরে নৃত্যনাট্য পরিচালনা করি , “একতার বল”। পায়রার রাজা হয়ে নাচের মধ্যে দিয়ে অভিনয় , জাল উড়িয়ে একসঙ্গে শিকারীর হাত থেকে বাঁচার উপায় বের করে। এ সমস্তো শিক্ষা র সুত্র্ পাত ওই শৈশবে ই l

পরিণত বয়সে ওই পুরোনো দিনের কথা  ভুলে ‘ চন্দনা ম্যাডাম’  হয়ে  যখন স্কুলে দিদিমণি হয়েছি , তখনও ঐ সব স্কুলের ‘Holy Child বা Assisi Convent – এর স্টুডেন্টদের নিয়ে  নানা ধরণের একটিভিটি করেছি , Annual Day প্রোগ্রামে নাচ, গান, নাটকের মহড়া দিতে গিয়ে অনুভব করেছে মুকুল নাম শিশুর কাছে সে কৃতজ্ঞ। ‘মুকুল’ ঐ সময়ের মানুষগুলোর থেকে যে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল, যে আত্মবিশ্বাসের শক্তি আহরণ করে, নিজের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ,মনের মনিকোঠায় সঞ্চিত রেখেছিল,- তারই ফল ফলেছে তার কর্মক্ষেত্রে, একান্তবর্তী বৃহৎ পরিবারে।

শৈশবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এক গুরুত্ত্বপূর্ণ ঘটনা আমার দাদুর রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ। সমাজ কল্যানে নিয়োজিত প্রাণ ডাক্তার অনাথবন্ধু রায় কে  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরু অত্যন্ত স্নেহ করতেন, আর তৎকালীন  মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের অনুরোধে এবার ১৯৫৭ সালে (মুকুল যখন ৮ বছরের মেয়ে) ভোটে contest করতে দেখা যায়।কোতুলপুর (জয়রামবাটি, কামার পুকুরের পাশে) constituency থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ বিধান সভায় যুক্ত হন। তাঁকে বানানো হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ভোটপর্ব আমাদের সকলের মনে একটা অদ্ভুত ছাপ ছেড়ে যায়। ভোটের সময়  মা মাসী, মামারা জীপে করে গ্রামে গ্রামে যেতেন, দাদুর জন্য ক্যাম্পেন করতে। আমরাও সঙ্গে যেতাম অনেক সময়। কত গ্রামের মানুষ কত আদর সম্মানের সঙ্গে ঘরে নিয়ে যেতেন আমাদের। মা দেশাত্মবোধক উক্তি স্মরণ করে কংগ্রেসের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা উল্লেখ করে খুব সুন্দর করে লোকজনদের বোঝাতেন, কেন তারা কংগ্রেসকে – দাদুকে ভোট দেবেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। পূরবী মুখার্জী, আভা মাইতি, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, এবং অতুল্য চন্দ্র ঘোষেরাও বিভিন্ন স্থানে যেতেন ভাষণ দিতে। ছোট্ট মুকুল তাদের বক্তৃতা মন দিযে  শুনতো। তারপর হুবহু সেই কায়দায় নকল করতো তাদের কণ্ঠস্বর, ভাষা। খুব মজা লাগতো তার। সবাই তাকে ডেকে ডেকে শোনাতে বলতো। বিশেষ করে টিচাররা স্টাফ রুমে ডেকে নিয়ে যেতেন এবং মুকুল সেখানে  পূরবী মুখার্জী, বা  আভা মাইতি হয়ে গলার স্বর কখনও বাড়িয়ে কখনও খুব নামিয়ে ভাষণ দিত। ছোট্ট মেয়ের মুখে খাদ্য মন্ত্রী, পূর্ত মন্ত্রী, মৎস্য মন্ত্রীর ভাষণ শুনে, এক্টিং করার কায়দা দেখে সকলে খুব আনন্দ পেতেন। এরপর মুকুলের জীবনে প্রথম কঠিন পরীক্ষা। ক্লাস IV – এর বৃত্তি পরীক্ষা। জেলার education board সব স্কুলের জন্য একরকম প্রশ্ন পত্র বানাতেন। দিদি বকুল পড়াশুনোতে খুব ভাল ছিল, সে গান আর পড়া নিয়ে সারাদিন কাটাতো। আগের বছর বকুল অর্থাৎ তার দিদি যেহেতু বৃত্তি পেয়েছে, এবার মুকুলকেও পেতেই হবে।

 

গৃহ শিক্ষক অজিত কুমার সরকার

এই ঘটনা প্রসঙ্গে যার কথা সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে পড়ে ,তিনি আমাদের গৃহ শিক্ষক  অজিত সরকার মশাই। মামাবাড়ির ভাইবোনদের পড়াতে আসতেন, গোপাল মাস্টারমশাই। তিনি লম্বা লম্বা চুল রাখতেন, গোল গোল চোখ করে কড়া কড়া ধমক লাগাতেন। তাঁর গলার স্বরটা আবার ছিল মেয়েদের মতন সরু। আমাকে খুব ভালোবাসতেন, নাটক দেখে ডাইরেক্টর নামও দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি তাঁর ধারে  কাছে যেতে চাইতাম না। কারণ একদিন মামাতো ভাই খোকন পড়া না বোলতে পারায় , তাকে ভীষণ শাস্তি দেন। আমাদের চোখের সামনে তার হাত দুটো ধরে ঝুলিয়ে ভয় দেখান, যেন  তিনি তাকে উপরের বারান্দা থেকে ফেলে  দিচ্ছেন। দেখে তো আমি সেখান থেকে ছুট। বাবাকে গিয়ে বললাম – ‘আমি কিছুতেই ওনার কাছে পড়বো না। ওনার মেয়েলি গলার আওয়াজে আমার খুব হাসি পায়, তাই ওনার সামনে বসে ফিক করে হেসে ফেললে হয়তো আমাকেও ঐরকম ভয় দেখবেন, উপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার। বাবা আমাদের নতুন মাস্টারমশাইকে একদিন পরিচয় করালেন। বাংলাদেশ থেকে ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে আগত মানুষটির ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ সুন্দর। ফর্সা লম্বা গোলগাল চেহারা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, তখনকার পূর্ববঙ্গের বগুড়া, পাবনা জেলার লোক তিনি। বাড়ি ঘর – জমি-জমা, পুকুর – বাগান সব – এক কথায় ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিলেন দেশ ভাগের সময়। পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলেন। ম্যাটট্রিকে খুব ভাল রেজাল্ট থাকায় এখানের কোর্টে কেরানীর চাকরীতে জয়েন করেছেন। ছা – পোষা, নিরীহ-শান্ত মানুষটি ছিলেন অপার জ্ঞানের আধার। তাঁর নিজের আমাদের বয়সী ছেলে মেয়ে  ছিল, তাদের নামও আমার মনে আছে, অশোক, অরুন, কৃষ্ণা। মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী অত্যন্ত লজ্জাশীলা নরম প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। মাঝে মাঝে আমাদের পিঠে, পাটিসাপ্টা খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। আমার এই লেখনী আত্ম কথাকে ব্যক্ত করার তাগিদে লেখা হচ্ছে না। ঐ মহান  গৃহ শিক্ষকের  উদ্দেশ্যে প্রণাম জানানোর একটা মাধ্যম হিসেবে এই খাতার পাতা ব্যবহার করতে চেয়েছি। মুকুলের জীবনে ‘অজিত মাস্টারমশাইয়ের’ অবদান কতখানি তা বহু-বছর পরে স্কুলে পড়াতে গিয়ে সে উপলব্ধি করেছে। মাস্টারমশাইয়ের অত সুন্দর করে সহজ সরল উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর কায়দা, অংকে ও সাহিত্যে মনোনিবেশ করে ইতিহাস, ভূগোলকে গোগ্রাসে গিলে ফেলবার আগ্রহ তিনি জাগিয়ে দিয়েছিলেন সেই ছোট্ট থেকে। আর বিজ্ঞান যে এক বিশেষ জগৎকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে, সে কথা মর্মে মর্মে অনুভব করার অগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে সফল হয়েছিলেন তিনি। হাতের লেখা খারাপ করার জন্য কত বকুনি খেতে হয়েছে তাঁর কাছে। তিনি বললেন – ‘হাতের লেখা  তো – তোমার মনের মুকুর অর্থাৎ আয়না অর্থাৎ দর্পন। তার মধ্যে দিয়ে তোমার ব্যক্তিত্ব, চরিত্র প্রকটিত হয়। স্বভাবটি ফুলের মতন সুন্দর, স্বচ্ছ ও সততাপূর্ণ করতে  হবে। শুধু  পড়াশুনোতে জলপানি, বৃত্তি, স্কলারশিপ পেলে তো চলবে না। পূর্ব বঙ্গ থেকে আগত অনেক ব্যক্তি তখন কার দিনে এই ভাবে টিউশন করে সংসার চালাতেন , এবং তাঁদের ভাবনা ও প্রচেষ্টা  ছাত্র ছাত্রী দের জীবনের মান উন্নত করে তুলতে এক  বিশেষ ভূমিকা নিত l

বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, নিবেদিতার মতন দয়ালু সেবাপরায়ন হতে হবে, আর অনেক মানুষের উপকার করার জন্য সর্বদা যে প্রস্তুত থাকতে হবে, এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। পড়াশুনোকে প্রাণমন দিয়ে ভালোবাসা, ‘বই ‘ অর্থাৎ ভালো গ্রন্থ কে জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করার ইচ্ছাটা তিনি অত ছোটবয়সেও তাঁর শিশু ছাত্রীর মনে জাগিয়ে দিতে চাইতেন। ক্লাশ ফোর এর পরীক্ষায় ‘বৃত্তি’ পাওয়াতে মুকুলের জীবনে যে সাফল্য লাভ হয়েছে, তাঁর চেয়ে হাজার গুণ সফলতা পেয়েছে সে “চন্দনা ম্যাম” হয়ে এই মানুষ টির শিক্ষা গ্রহণ করে l পরবর্তী কালে সেই মুকুল যখন সংসার সংগ্রামে বিব্রত ,তখন তার জীবনে টিচার হবার ইচ্ছা সে কার্যকরী করযে সফল হয় l

 দিল্লীত সে বাড়িতে ‘কোচিং ক্লাশ’ খুলে অনেককে টিউশন দিতে আরম্ভ করে। নিজের দুই পুত্রের মধ্যেও সেই একই জ্ঞানের পিপাসা বাড়িয়ে তুলতে সে সামর্থ হয়। বাড়িতেই দুরকমের ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে শুরু করে। একদল যারা এয়ারলাইনসের হাউসিং সোসাইটি তে থাকেন আর্থিক অবস্থা ভালো । বাবা মা রা যারা পাইলট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চাদের সময় দিতে পারে না ,কিন্তু টিউশন দিদিমনিকে ভাল দক্ষিনা দিতে প্রস্তুত তাঁদের ছেলে-মেয়েরা। অন্যদিকে অসহায় কাজের বৌ যারা তাদের পুত্র কন্যাকে টাকা দিয়ে কোথাও পড়াতে না, তাদের সন্তানকে ভালোভাবে শিক্ষা দানের চেষ্টায় এই ম্যাডামকে অনুরোধ জানায়, চন্দনা তাঁর maid এর তিন কন্যা ও এক পুত্রের সঙ্গে অন্যান্য maid দের “ঝুগ্গির” আরও কিছু বাচ্চা ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে আর একটি ফ্রি গ্রূপ করে। দুই দলকেই সমানভাবে শিক্ষা দিতে চায় সে। বড়লোকের ছেলে মেয়ে দের  কাছ থেকে পাওয়া টাকায় সে কাজের মেয়েদের শিশুদের সাহায্য করতে পারে। এক গ্রূপ কে উদ্বুদ্ধ করে আর এক দল অসহায়কে খাতা, পেন, পেন্সিল, রং বা ব্যাগ – জুতো জামা দিয়ে সাহায্য করতে। অন্য দলটিকে হাসি মজাকের মধ্যে দিয়ে উৎসাহ দিতে ও তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে। জীবনের শৈশবের অধ্যায় এই মেয়েটিকে উদার হবার শিক্ষা দিয়েছিলেন  সেই   পাব্নার’ অজিতবাবু ‘, পরিণত বয়সে তাই সে বারবার তার গৃহ শিক্ষককে স্মরণ করে। দিল্লি যে অনেক বন্ধু স্বজন যখন তাকে বিদ্রুপ করে , স্কুল ছেড়ে ‘টিউশন টিচার ‘হবার জন্যে তখন সে  ওই  মাস্টার মশাই এর গলা শুনতে পায়, মনের ভিতরে, সংগ্রামে আর্থিক অসাচ্ছল্যে সে ভেঙে পড়ে না। যে কোনো সাংসারিক বিপর্যয়ে সে যেন শক্ত হাতে হাল ধরতে পারে, একথাই সর্বদা মনে ভাবে। স্বর্গীয় মাস্টারমশায় তাঁর জীবনে চিরনমস্য।

বাঁকুড়ায় কোনদিন বন্যা হয়নি, খরা অল্প স্বল্প হলেও  গ্রাম, শহর, বাড়ি, ঘর ছেড়ে কাউ কে পালিয়ে যেতে হয়নি, পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বলে সেখানে লোকজনকে partition, দেশভাগের দুঃসহ ক্লেশ, পীড়ন ও সহ্য করতে হয়নি। জেলাটি সীমান্ত রেখা থেকে অনেক দূরে, তাই এখান্ কার বাসিন্দারা উদ্বাস্তুদের দলে দলে ঘর পরিবার ধন-সম্পদ, আত্মীয় বন্ধু প্রিযজন হারিয়ে লাইন করে চলে আসতে দেখেনি, এই ছোট্ট  শহরের মানুষেরা তাই খুব শান্তিপ্রিয ,  এখানে হিন্দু মুসলমান – খ্রিষ্টান, মন্দির-মসজিদ-গির্জা ঘরে একসঙ্গে উৎসব মানিয়েছে। রাঢ় মাটির লাল পাথরে মোড়া রুক্ষ দেশের মানুষগুলো কিন্তু রুগ্ন হলেও রুক্ষ নিরস নন। ঝগড়া ঝাটি, দাঙ্গা হলে ভারতের অন্য শহরগুলোর লোক যখন হিংসায় ফুঁসছে, ষাট সত্তর বছর আগেকার বাঁকুড়ায় আমাদের শৈশব  কিন্তু এরকম কোন ঘটনা ভায়োলেন্সের সাক্ষী হয়নি। বড়লোক গরীবলোক, জাতপাতের ভেদাভেদ করতেও দেখিনি কাউকে। আমাদের পরিচিত ডাক্তার, উকিল প্রফেসরদের পরিবার নিঃসংশয়ে, নিঃসংকোচে ছেলে মেয়েদের বাউরি পাড়ায়, বাগ্দী ঘরে মনসা পুজো দেখতে, মেলায় চড়ক গাজনের ভিড়ে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁদের মনে বাচ্চা কিডন্যাপ হওয়ার ভয় ছিল না। বাচ্চারা আমরা স্বাধীনভাবে তিলি পাড়ায় মুড়ি খেতে, তাঁতি পাড়ায় কুলের চাটনি খেতে, যখন তখন চলে যেতে পারতাম। এক পয়সার কুল কিনতে পাওয়া যেত, কিন্তু সে ছেড়ে দিয়ে আমরা নদী পেরিয়ে দল বেঁধে পৌঁছে যেতাম, ‘বাঁশি’ বা ‘তোড়া’ গ্রামে   কুল পাড়তে। গরমকালে প্রায় কুয়োর জল শুকিয়ে যেত, কলেও জল আসত না সব সময়। বুড়ি,খোকন বকুল, মুকুলের বাড়ির কাজের মাসিদের সঙ্গে চলে যেত, “দ্বারকেশ্বর” নদীর বালিতে। সেখানে গিয়ে ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হত তাকে বলা হত “চূঁয়ো” কুয়োর ছোট ভাই মনে হয়। সেখানে নদী গর্ভের শুদ্ধ জল বাটি বা ছোট ঘটিতে করে কলসীতে ঢালা হত। কলসীর মুখটি কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকতো যাতে জল ছেঁকে নেওয়া যায়। আমাদের জন্যেও কেনা হয়েছিল ছোট ছোট পিতলের ঘড়া। গামছা পরে নদীতে স্নান সেরে আমরা বাড়ি আসতাম নাচতে নাচতে। জীবন সহজ ছন্দে বহে যেত। নদী পাড়ে বড় বড় গাছ ছিল শাল, সেগুন, চালতা, আম জাম, কাঁঠাল। সন্ধ্যে বেলায় সবচেয়ে মোহময় ছিল শেয়ালের ডাক। পুকুরপাড়ে ঝোপে ঝাড়ে, নদীর ধরে গর্তে গর্তে লুকিয়ে থাকতো তারা। কোনোদিন চোখে দেখা যেতোনা, কিন্তু সন্ধ্যে হলেই শোনা যেত তাদের গান। হুক্কা হুয়া, হুয়া হুয়া। আমাদের একটু ভয় ভয় লাগত, সেই ডাক শুনে। তখনকার দিনে টিভি ছিল না, রেডিও শুনতাম আমরা রবিবার সকাল ৯টায় – “শিশুমহল”।

‘ছোট্ট সোনা বন্ধুরা সব, কি ভালো আছো তো সব? তোমাদের ইন্দিরাদি বলছি” – এই ইন্দিরাদিকে আমাদের কোনোদিন সামনে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাঁর গল্প ,প্রশ্ন উত্তর জ্ঞানের আলোচনা ছোটদের এতো প্রিয় ছিল যে, কোনো ব্যক্তিত্ব হয়তো সেই সময় আর দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না।

শুশুনিয়া পাহাড়ে             

শৈশবে স্মৃতির খেলায় ভাসতে ভাসতে মুকুল পৌঁছে গেল, একেবারে শুশুনিয়া পাহাড়ের উপরে। প্রত্যেক বছর আমাদের বাবা ,মা ,মামা ,মাসির রা তাঁদের সব বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয়স্বজন মিলে শীতকালে  চরুই ভাতি অর্থাৎ পিকনিক করতে যেতেন। সবাই মিলে অনেকেগুলি গাড়িতে বাচ্চা বুড়ো, যুবক তরুণ ভরে রান্নার লোক, বড় বড় হাঁড়ি কড়াই নিয়ে হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়তেন। গাছ-পালা, পাহাড়, ঝর্ণা – সব মিলিয়ে বাঁকুড়া শহরের মাত্র আট দশ মাইল দূরের এই ছাতনা গ্রামের পাশে হাতির আকারের সুন্দর সবুজ পাহাড়টির নিচে বহু পরিবার একসঙ্গে রান্না করতে, শালপাতার ওপর গরম গরম মাংস ভাত ও চাটনি খেতে খেতে আনন্দের সঙ্গে হাত চাটতেন। এইধরনের বাইরে গিয়ে খাওয়ার নাম যে চড়ুইভাতি কেন হল তাই নিয়ে আমাদের বাচ্চাদের মধ্যে গবেষণা চলল। অনেক ভেবে আমি বললাম, আমরা সবাই খাওয়া দাওয়া করে চলে গেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাতগুলি চড়াই পাখিরা এসে খাবে। তাই এরকম বাইরে এসে রান্না খাওয়ার নাম চড়ুইভাতি। শুশুনিয়া পাহাড়ের নিচে নানানরকম বনফুলের গাছ ছিল এবং ওপরে অনেক পলাশ, শিমুল গাছ। পাহাড়ের ঝর্ণা দিয়ে অবিশ্রান্ত কাল ধরে জল পড়ছে। ভারী মিষ্টি তার স্বাদ। চৈত্র মাসে অর্থাৎ বসন্তকালে এখানে একটি বিরাট মেলা বসে। দূর দূর থেকে বহু আদিবাসী সাঁওতালরা এখানে আসেন তাদের শাড়ি, চুড়ি, মালা, বেতের ঝুড়ি মাদুর ইত্যাদি কিনতে। মাদুরকে এরা বলেন ‘চাটাই’। মহুয়ার মদ খেয়ে মেয়ে পুরুষে ঢোল বাজিয়ে তালে তালে নাচ করে। তেলে ভাজা, পাঁপড় ভাজার গন্ধে সারা জায়গা ম ম করে। আমাদের সবাই কে নিয়ে সেই “ধারা”র মেলায় আমার একবার যাওয়া হয়েছিল। সারা পাহাড়ের গায়ে তখন অপূর্ব লালের সমারোহ। শিমুল – পলাশের রূপে সেদিন এই শিশুমন মোহিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অনেকদিন পরে সম্ভবত কুড়ি – পঁচিশ বছর হবে, একবার স্বামী ও নিজের ছেলেদের নিয়ে বাঁকুড়ায় গিয়েছিলাম দিল্লী থেকে। তখন দেখলাম পাহাড় প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। কে বা করা কখন বা কেন শাল পিয়ালের মাথা ভেঙে শিমুল পলাশকে কেটে ফেলে সবুজ পাহাড় তা কে একেবারে  নেড়া করে দিয়েছে জানিনা,  আমার কিন্তু খুব কান্না পেয়েছিল, বনানী উজাড়ের এরকম ঘটনা চাক্ষুষ করে। 

শুনলাম, এখন আবার গাছ লাগানো শুরু হয়েছে, পাহাড়ের নিচে বহু দোকান বাজার বসেছে, ঝর্ণার জল বোতলে ভরে বিক্রি হচ্ছে ,ঐ পাহাড়ের পাথর দিয়ে নানারকমের মূর্ত্তি, খেলনা বা ঘর সাজানোর জিনিস তৈরী হচ্ছে। সেখানে শান্ত পরিবেশে পিকনিক করতে গিয়ে এখন এমন  মাইক বাজে, হৈ চৈ হয়, যে মাটির নিচের কেঁচো, গুবরে পোকা বা কাঠবিড়ালীরাও সব ভয়ে পালিয়ে যায়, গাছের পাখিরা গান করা ভুলে কান বন্ধ করে দেয়। শৈশবের সেই পরিবেশকে কেন যে মানুষ এমনভাবে দূষিত করে ফেলছে, কে জানে! আরও কয়েকটি জায়গায় আমরা পিকনিক করতে গিয়েছিলাম, আমরা সে সব স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না। ‘ফুলকুসমার’ ঘন  জঙ্গলে, ক্ষুদিরাম বোস ও তাঁর বন্ধুরা বোমা তৈরী করতেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। সেখানে তখন  হাতি, হরিণ, খরগোশ ছাড়াও কখনও কখনও ভালুক, নেকড়ে, হায়নার দেখাও পাওয়া যায়।  পিকনিকের পরে এক্ বার আমরা রাস্তা হারিয়ে ফেলি, আমাদের গাড়ি ক্রমশঃ ঘোর জঙ্গলের দিকে চলে যেতে থাকে, সন্ধ্যে হয়ে যায়, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সবাই ভয়ে অস্থির। মায়েরা ঠাকুরের নাম করছেন। আমি গাড়ির জানলা দিয়ে দেখছি, এক অপূর্ব দৃশ্য। হাজার হাজার জোনাকি। পাতায় পাতায় ছোট ছোট তারা বা নক্ষত্রের মতন তাদের সেই ঝিকমিক করা আলো জীবনে আর কখনও কোথাও দেখিনি। শৈশবের সঙ্গে সঙ্গে সেই অপূর্ব জ্বলন্ত পোকারাও সব কোথায় হারিয়ে গেল। অনেক রাত্রে প্রাণ নিয়ে যখন সবাই ফিরে এলেম আমরা তখন গভীর ঘুমে অচেতন।    

 মামাবাড়ি র কথা —যোগেশ ভবন , বাড়ি টি  মায়ের দাদু র নামে ,  বিশাল সেই  লাল প্রাসাদপম বাড়িটির কোন কোন কত ইতিহাস , কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে. জীবনের প্রথম অধ্যাযের   ১২ বছর টি এখানে কেটেছে, খুব নিশ্চিন্তে ও আনন্দে, সে কথা আজ বারে  বারে  মনে পরে,তার পর ছয় টি  যুগ কেটে গেছে , অর্থাৎ ৭২  বছর বয়সে এসে স্মৃতির  সম্ভার উজাড় করতে গিয়ে, আমি আবেগ প্রবন হয়ে পড়ছি l কারণ আমার প্রিয় মামা , মামীমা  মাসি রা শুধু নয় , খেলার সাথী রা ,যারা আমারই সম বয়সের তারাও সব একে একে ছলে যাচ্ছেন l

আমার ছেলেবেলার সব চেয়ে প্রিয় চার বন্ধু ছিল.আমার  মামাতো ভাই খোকন  , বোন বুড়ি , আরতি ও বোবা দুলু .সারাদিন পেয়ারা গাছে ওঠা , লুকোচুরি খেলা , মাইমার কাছে বসে হালিশহর গঙ্গার গল্প শোনা  আমাদের কারো মধ্যে ছিল না কোনো হিংসা ভাব ,ঝগড়া ঝাটি , সব খাবার ভাগ করে খাওয়া  নাড়ু বাবু দের পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে চান করা কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোতে বারান্দায় স্টেজ বানিয়ে নাটক করা , সে এক অনাবিল আনন্দ, মামাবাড়ির আদর কি মধুময় তা এখন বলে বোঝানো যাবে না ,খোকন ছিল সব চেয়ে সহজ সরল , দিদি বকুল ভীষণ লাজুক , বুড়ি খুব সাহসী , আমি কি ছিলাম ! জানি না , কিন্তু সবাই কে ই খুব ভালোবাসতাম , মায়া করতাম l  আমার  মামা খুব দয়ালু ছিলেন , গরিব ভিখারি কে একবার নিজের গায়ের কোর্ট খুলে দিতে দেখে আমার মনে হতো যে মন টি এমনি নরম রাখলে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়l

মামাবাড়ি কে আমরা ‘ও বাড়ি ‘ বলতাম , সেখানে অনেক গরু ছিল  দাদুর , আমরা খুব দুধ খেয়েছি তাদের , ভীষণ তেজি কুকুর ছিল টুসি তাকে ও খুব ভালো বাসতাম সবাই, পশু পাখি , কাজের লোক দের আপন করে নেবার মন্ত্র পেয়েছি আমরা সেখানে l 

(ক্রমশ)

ষষ্ঠ  অধ্যায়

আমার প্রিয় বাঁকুড়া ভাষার ছন্দে মশগুল মুকুল

বাঁকুড়ার মানুষ, প্রকৃতি, জল হাওয়া সবকিছুর ওপর আরেকটি বিশেষ ব্যাপারের কথা  না বললে আমার কথা অসম্পূর্ন থেকে যাবে। তা হল আমার অতি প্রিয় “বাঁকড়ী” ভাষা। এর মাধুর্য্য  ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। মুখে বলতে হয়। আমাদের বাড়ির কাজের লোকেরা শুধু নন, বহু আত্মীয় স্বজন, গ্রামের দাদু, জেঠা, কাকা, মাসী, পিসি সবাই এই ভাষাতেই কথা বলতেন। প্রায় প্রত্যেক শব্দের সঙ্গে ‘ক’ লাগিয়ে এক অদ্ভুত সুরে  টান দিয়ে কথা বলা হয়, এই আঞ্চলিক ভাষায়। কারুর বাড়ি গেলে, তারা আদরের সঙ্গে বলতেন, – ‘‘ডাগটর বাবুর বিটি আইচে লো, উয়াকে মুড়ি মুড়কি খ্যাত্যে দ্যে লো, এত্য তাড়াতাড়ি কুথা যাবেক  গো, অখন য্যাতে হবেক নাই। অমন কর়্যে ভ্যালে আছ্যো ক্যানে গো? আমাদের খানে একটুকুন  বসত্যেই  হবেক’l

                                                                   আমরা বাড়িতে যতই ভালোভাবে কথা বলতাম না কেন, খেলার মাঠে, পুকুর ঘাটে, জজ কোর্টের লম্বা বারান্দায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে প্রায় এই মধুর বাঁকড়ী ভাষার টানে ডাকা-ডাকি, হাঁকা-হাঁকি করতে ভালোবাসতাম। বড় হয়ে যখন সাধারণ মানুষের কথা আমার কাহিনী তে বা গল্প কবিতায় বলতে চেয়েছি তখনই মুখে শুধু নয় আমার আঙ্গুলের  কলমে ও  বাঁকড়ী বুলি বেরিয়েছে। একবার মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে সিডিউল কাস্ট জনজাতি, আদিবাসীদের জন্য চাকরিতে রিজার্ভেশন / সংরক্ষণ প্রস্তাব আনা হয় এবং তাঁর জন্য বিল পাশও করা হয়। সারা দেশ জুড়ে সমস্ত জেনারেল ক্যাটাগরি, মধ্যবিত্ত জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তাতে। এইসময়ে রাজনীতিবিদরা উল্টো প্রতিবাদ মিছিলেরও ডাক দেন জায়গায় জায়গায়। গ্রাম থেকে নানান জাতের গরিব শ্রমিক সম্প্রদায়কে জড়ো করে ভাষণ দেওয়া বা সরকারি অফিসের সামনে প্রতিবাদের জন্য জনতা কে উত্তেজিত করা হয়। কয়েক জায়গাতেই ছত্রভঙ্গ করার জন্য দিল্লীতে লাঠি চার্জ কাঁদানে গ্যাস ছোড়া চলে। একদিন হিংসা দমন করে সোচ্চার লোকদের স্তব্ধ করবার জন্য গুলি চালানো হয়। তাতে এক অতি নিরীহ অসহায় অত্যন্ত দরিদ্র মায়ের ছেলে প্রাণ হারায়। তাদের পরিবারের দুঃখে আপ্লুত আবেগপ্রবণ চন্দনা যখন কবিতা লেখে, তখন মায়ের মুখে কেবলমাত্র বাঁকুড়ার ভাষা এসে যায়। কবিতাটির শুরু অনেকটা এরকম ছিল। –

শুশুনিয়ার পাহাড় কোলে – চাঁদড়া গাঁয়ে বাগান তলে

ঘর ছেল্য গো বড় সুক্যের।

ডিঙলা লতায় – বাঁশের বাতায় – মহুয়া ফুল জমতো যে ঢের।

কনড্যাক্টর বাবু অ্যাস্যে বললেক কথা হ্যাস্যে হ্যাস্যে –

চলরে বুধি ডিল্লী যাব্যি, অনেক ট্যাকা পইস্যা পাবি

ম্যেয়া মরদে খুব কামাবি, মাটি কাটার রোজগারে  l

মরদ আমার বেবাক বোকা, কথাডা উয়ার লাগে ব্যাঁকা,

হাত কচলায়, প্যাট চুলকায় – কানে গুঁজ্যা পুড়া বিড়ি।

জঙ্গলে শাল পাতা কুড়িয়ে আসে পাশে গ্রামের বড় লোকদের জমিতে  ধান কেটে, পুকুরের গুগলি তুলে, ওল সেদ্দ কচু পোড়া, শুকনো কুলের চাটনি, কিম্বা সজনে ফুল ভাজা, মোটা চালের ভাত খেয়ে, পরবে পার্বনে মাদল বাজিয়ে, মাথায় পলাশ ফুল গুঁজে – তাদের দিন তো খুব আনন্দেই কেটে যেত। নিজেদের ধর্ম কালচার ও ভাষা কিছুই তারা হারায়নি। কিন্তু শহরে বাবু নেতা বা দাদারা তাদের ছাড়লো না। নানান লোভ দেখিয়ে, বাস্তুছাড়া করে ধরে নিয়ে গেল শহরে। বুধি ও মদনা তাদের আদরের ছেলে ডাবকা ও মগনুকে নিয়ে দিল্লীতে এসেছে। সামিল হল মন্ডল কমিশনের প্রতিবাদ মিছিলে। ‘সংরক্ষণ দিতে হবে দিতে হবে’ , বলতে বলতে শহরের বড় রাস্তার গাড়ি ঘোড়া বাস অটোরিক্সার পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতে লাগল তারা। ইন্ডিয়া গেটে সেদিন কোন বিদেশী ডেলিগেশনও আসছে, তাই মাঝ রাস্তায় বাধা পেল মিছিল। গুলি চলল ছত্রভঙ্গ করতে। ‘কালু সোনা’ বলে ডাকে বুধি তার মগরু ব্যাটাকে, মরদের সঙ্গে ওকে ওই ভিড়ে পাঠানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তার। কিন্তু বাবুকে লোক জোগাড় করতে হবে। তাই ছাড়ান পেল না সেও। বিকাল বেলায মরদটা বলছে ,-

আসনটা কি বট্যে, সিটা

দ্যেখতে তো মুই পেল্যম নাই

“আসন চাই, আসন চাই”, –

ভকভকায়ে বক্যে গেল্যম, –

চাকরি ঠাঁয়ে জায়গা নাই ,

“ছিলা” আমার গুলি খেলেক, বুজত্যে লারলম আমি তবু –

মিছিল বাগে, খালি প্যাটে, হ্যাঁট্যে হ্যাঁট্যে হলাম কাবু।

বাঁকুড়ার ভাষা আমার রক্তের স্রোতে মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে। আমার বাবা মা কখনও এই ভাষায় কথা বলতেন না, কিন্তু ‘হাট- আশুরিয়াতে’ আমাদের দেশের বাড়ির পুজো দেখতে গিয়ে, চণ্ডীমণ্ডপে সমবেত সবাইকে ‘ক’ এর অনুপ্রাস দিয়ে ‘’হবেক নাই, খাবেক নাই, যেত্যে হবেক; দিব্যে নাই? পড়বেক লাই, কি বলছ্যে?  উটি চৈলবেক নাই, আমাক তু চিনিস নাই, এমন বাখান দিল্যেক, যে থাকত্যে লারলম,  উয়াকে কাপড়টি পরাই দিত্যে  দিবেক, হ, হ, বাবা আমি জেস্যে লোক লই,  আমার সঙে লাগতে আস্যো না বাপ, তুমাক খেসারত দিতে হবেক – হঃ বলে দিলাম, বাছাধন বাকচাতুরি করলে চলবেক নাই – – -’’। ইত্যাদি কথা আমাদের কানে সব সময় বাজত। তখন লাইন ধারে, নদীর পারে যেসব মানুষগুলো থাকত তারা লোকের বাড়ি কাজ করতেন, বিড়ি বাঁধতেন, তালপাতার চাটাই বুনতেন, গামছা দিয়ে পুঁটি মাছ, শামুক-গুগলি তুলতেন পুকুরে – ডোবায় নেবে। তাদের বাড়ির মেয়েরা স্কুলে যেতেন না। পুরুষেরা সমাজে সম্মানীয় স্থান পেতেন না। মুকুল ছোট বয়স থেকেই ওদের কথা ভাবে। তার বন্ধুদের তালিকায় বাউরি, বাগদি, মুচি, কামার, কুমোর আর ডোমদের বাড়ির মেয়েরাও ছিল। তাদের পান্তাভাত, তরকারি মেখে কাঁচালঙ্কা ঘষে মুড়ি ও মূলো খাওয়া, সহজ সরল জীবনযাত্রা মুকুলকে টানত। মাঝে মাঝে তাই সে বোবা দুলুর হাত টি  ধরে ঐসব লোকের বাড়ি গিয়ে বসে থাকত তাদের উঠোনে। অন্যান্য ভাই বোনেরা ও বন্ধুরা সাথে  যাবে না, তাই ডলির ভাই ঐ  বোবা দুলু ছিল তার প্রিয় সাথী। ইশারায় কথা হত তাদের। তাঁতের গামছাকে শাড়ি করে পরে ঘোমটা দিয়ে বোবা দুলু নাচ দেখাতো বাগদি বৌকে। আমি ওকে উৎসাহ দিতাম। ওর মধ্যে একজন বড় শিল্পী লুকিয়ে ছিল, অনেক কথায় সে আমায় বোঝাবার চেষ্টা করত, বড় লোকের বাড়ির বন্ধুরা তাকে কেউ পাত্তা দেয় না, তাই এদের মাঝে এসে উপস্থিত হত, তারা ঐ সরল ছেলে মেয়েদের অনাবিল আনন্দ দিতে অথবা একরাশ আনন্দের পসরা ভরে নিয়ে মুকুল নামের সেই ছোট ভাবুক মেয়েটি নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে নিয়ে আসত। তাদের গাছের নারকেল কুল, টোপা কুল, কুসুম বীজ মেশানো মুড়ি ঠোঙায় ভরে খেত সে। কোঁচড়ে ভরে দিত তারা বাগানের কচি শশা, কাঁচালঙ্কা, তালের ফোফরা। হ্যাঁ বাঁকুড়া তখন প্রায় সব বাড়িতেই সজনে গাছ, পুকুরের পাড়ে পাড়ে তালগাছ। পাকা তাল খাওয়ার পরে সেটি মাটিতে পুঁতে দিলে সাদা সাদা অঙ্কুর বেরুত। তাকেই বলা হত তালের ফোফরা। গরমকালে ঝুড়ি মাথায় করে তাল শাঁস বিক্রি করতে আসতেন, তার জলটি ভেঙে খেতে বড্ডো ভালোবাসতাম আমরা। 

আমাদের ঝি চাকরদের আমরা কখনও নাম ধরে ডাকতাম না। মাসী, পিসি, মামা, কাকা বা দাদা দিদি বলে সম্মানের সঙ্গে ডাকতাম, বাউরি  বৌকে বলতাম বৌ মাসী, খুব ছোট বয়সে সে শাশুড়ির সঙ্গে এসেছিল আমাদের বাড়ির কাজের সাহায্য করতে তারপর পঞ্চাশ বছর ধরে সে আমাদের সেবা করেছে। আমি মনে করি আমরা তাদের উপকার করিনি, তারা আমাদের কাছে চিরতরে প্রণম্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো সুযোগও তারা আমাদের কোনোদিন দেন নি। ধন্যবাদ কথাটা ব্যবহার করা বিশেষতঃ domestic helpদের জন্য আমাদের জাতির চরিত্রে হয়ত ছিল না। মুকুল নামের সেই ছোট্ট আত্মাটি কিন্তু তাদের জন্য কাঁদত। তাদের ছেলে মেয়েরা কেন স্কুলে যায় না, সে কথার উত্তর খুঁজে পেত না সে। এদের সমাজে অতি ছোট বয়সেই বিয়ে দেওয়া হত ঢাক ঢোল বাজিয়ে, একটাই সুখের কথা জেনে ভাল লাগত, এদের মধ্যে পণ প্রথাটা উল্টো রকম ছিল। মেয়ের বাবাকে বিশেষ কষ্ট করতে হত না। মেয়েরা যত সুন্দর, সুঠাম, স্বাস্থবতী কাজের এবং অল্প বয়সী হত তত বেশি পণ পেত বরপক্ষের কাছে। ওদের বিয়েতে গিয়ে খুব মজা করতাম আমরা। কিন্তু মেয়েটির শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কান্না দেখে ভীষণ কষ্ট হত। একবার দুগ্যি নাম একটি মেয়ে বিদ্রোহ করে বসে, কিছুতেই সে শ্বশুরবাড়ি যাবে না। কিন্তু ধরে বেঁধে যখন তাকে পাঠানো হল, তখন রগে দুঃখে মুকুলের চোখে জল এসে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল সে। চল্লিশ বছর পরে বাঁকুড়ায় গিয়ে দেখলাম অনেক মেয়েই এখন বাউরি  বাগদি পাড়ার থেকে পড়াশুনো করছে, বিয়ে না করে চাকরী করছে। ওই বউ এর নাতনি ও স্কুলে যায় , সে mid day meal খাবার  লোভে ই হোক , আর লোকের বাড়ি বাসন মজা র হাত থেকে মুক্তি পেতেই হোক, বাউরিপাড়ার সব মেয়েরা এখন স্কুল যাচ্ছে ,এটা দেখে এখনকার চন্দনা খুশি হল। একদিন একটি মা বললেন, তার বিটির জেদের কথা। কেমন করে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁকুড়া শহরে স্কুলে ভর্তি হয়েছে তার মায়ের উৎসাহে। এবার মুকুলের পরিণত ব্যক্তিত্ব বাঁকুড়ার ভাষায় সেই মেয়েটির হয়ে একটি কবিতা লিখে ফেলল, আঞ্চলিক ভাষায়। –

দুগ্গি বিটি

হে মাই, তোর পায়ে পড়ু, আমাক তুই পড়ত্যে দে গো,

ইস্কুল টার ঘন্টা বাজ্যে, বললেক কে জাগো জাগো।

বড় লোকের বিটি ছা টা, হাসত্যে হাসত্যে চলে যাবেক,

আর তুয়ার ঘরকে চোকের জল্যে এই বিটিটা বুক ভিজাবেক ?

দুখ লাগে না তোদের কাঁন্যে , ঠাকমা বুড়ি কোঁকাই মরে,

বাপ দাদা আর খুড়্যা, জেঠ্যা বিয়া দিবার জুগার করে ,

তোর জীবন তো ঘুচাইছস গো, গোপর ল্যাপে, কাদ্যা ঘেঁট্যে

আমাক হবেক  বাঁচত্যে যে মা, যাবো নাই আর ঘাট্যে মাঠ্যে,

বন বাদাড়ে ধুমস্যা মরদ ভ্যাল-ভ্যালায়ে তাকাই থাক্য  ; –

পাঠাস না মা একলা আমায়, পাঠাস না আর ঘাস কাটত্যে  l

লিখ্যা পড়া শিখার ল্যাগে, হ্যাঁ করে  যে বস্যে থাকি।

খাঁচা খুলে উড়াই দে গো, তোর বিটি যে বনের পাখী।

 

শৈশবের মুকুল তার সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে ,এইরকম দুগ্গি রানীদের কথা লিখতে চাইতো, বড় হয়ে। জানতো না বড় হয়ে সে কি  হবে!  ডাক্তার বা নার্স হয়ে রোগীদের সেবা না কি শিক্ষিকা হয়ে এইরকম অসহায় কন্যাদের শিক্ষাদানে জীবন কাটাবে। দুগ্গিরানীর মায়ের পাশে দাঁড়াতে চায় সে। চন্দনাকে দিয়ে তাই সে সেই মায়ের কোথাও ব্যক্ত করে সে, কারন এখন তো সেও একজন মা, যে তার সন্তানকে বিশেষ করে কন্যাকে আর আটকে রাখতে, বেঁধে রাখতে, বিবাহের শেকলে জড়িয়ে পরাধীন করে রাখতে চায় না। তাই সে বলে –

– আয় না রে মা দুগ্গিরানী চুল বেঁধে দি যতন করে,

পড়ত্যে তোখে যেতেই হবেক, সাদা জামা ইসকাট পরে।

বই খাতা আর কলম লিবি জেদটা তুয়ার রাখবি ধরে।

ফাস্টো তোকে হত্যেই হবেক, চেষ্ঠা থাকলে কেউ কি হরে?

দশ হাত তোর নাই বা হল্য, কাজ করবি মনের জোরে।

দশের কাছে নাম কুড়াবি গব্বে বুকটা উঠবে ভরে।

চোখ থাকতেও নিরক্ষর পড়ে আছি , অন্ধকারে –

লিখা পড়া শিখে তোখে, যেত্যে হবেক আলোর পারে।

‘ই’ বাগ ছেড়্যে ওই উধারে যেতে তোখে হবেক ইবারে।

ইয়াদিগকে সামলাই লিব, যা পালায়ে যা ইসকুল ঘরে।

থাকতে তোখে হবেক নারে, বাবা, দাদা, খুড়ার ডরে,

নিজের পায়ে দাঁড়াই যাবি, বুকে ত্যাখন রাখবে ধরে।

মুকুলের বাঁকড়ী ভাষার ওপর কতখানি টান আছে তা সবসময় এই চন্দনা টের পায়।

মুকুলের ভাই ছোটনের জন্ম হয় যেদিন, সেদিন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় যিনি চিত্তরঞ্জন দাসের নাতি ও পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন, দাদুর বাড়ি এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী মায়া রায়কে সঙ্গে নিয়ে। ভাইটির নাম দেওয়া হয় সিদ্ধার্থ। এ প্রসঙ্গে দিদিমা অন্নপূর্ণা রায়ের কথাও এসে যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্মার্ট, সাহসী ও অতিথিবৎসল। তাঁর গ্রামের দাদা ছিলেন নজরুল ইসলাম। কবির স্ত্রী ছিলেন হিন্দু এবং দিদিমার বন্ধুস্থানীয়া। তাঁদের নিয়ে নানান গল্প করতে শুনেছেন সেই সময়কার বাচ্চারা। বাড়িতে নানান ধরনের এইসব লোকের আনাগোনা, আলোচনাসভা বাড়ির শিশুদেরও মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। মামাবাড়ির পরিবেশ পরোক্ষভাবে তাই মুকুলের শৈশবকে নানান রঙে রঞ্জিত করেছে।

(ক্রমশ)

সপ্তম অধ্যায়

“ঠাকুরদা ডঃ পূর্ণচন্দ্র বিশ্বাসের পরিবার”

এবার বাবাদের পরিবারের কথা স্মরণ করা যাক। বাবার বাবা ডঃ পূর্নচন্দ্রকে আমাদের চাক্ষুস দেখার সুযোগ হয়নি। তিনি ছিলেন সাঁকতোড়িয়াতে কোলিয়ারির হাসপাতালের ডাক্তার। খুব স্বাত্বিক মানুষ ছিলেন তিনি, সাধু সন্গ , জপ ,পুজা অর্চনা তে মগ্ন থাকতেন,  আমাদের ঠাকুমা মারা গিয়েছিলেন বহু আগে, বাবার তখন মাত্র আড়াই বছর বয়স। বড় জ্যাঠামশাইও ডাক্তার ছিলেন, হরিহর নামটি তাঁর সার্থক ছিল। তিনি হরি কীর্তনে মেতে উঠতেন, খোল কীর্তনের সঙ্গে। দ্শ জন দাদা, দিদি ছিল, সেই পরিবারে, সবাই মিলে এক সন্গে বসে, খাওযার খেতাম সবাই আমরা, মেজো জ্যেঠামশাই  মাইন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। চিনাকুড়ির রাধানগরে বিরাট এক বাংলো বাড়িতে অনেক বাগান সার্ভেন্ট কোয়াটার, চাকর বাকর, ৭জন পুত্র কন্যা নিয়ে বাস করতেন। তাঁর পাঁচ পুত্র -ই ছিলেন বুদ্ধিমান ও গান বাজনায় দক্ষ। দুই মেযে খুব ভালো  নর্তকী  ছিলেন, বড় জেঠ্যামশাইয়ের আট পুত্র, দুই কন্যা – বড় পরিবার। আমাদের সাধিকা বড় পিসিমা ঠাকুর ঘরে নানা নিয়ম নিষ্ঠা মেনে শুদ্ধাচারে জীবন কাটাতেন। প্রত্যেক গরমের ছুটিতে মা আমাদের সব ভাই বোনদের নিয়ে সাঁকতোড়িয়া, চিনাকুড়ি যেতেন। সেখানে যেন চাঁদের হাট বসে যেত। নানারকমের হাসি ঠাট্টা, নাচ-গান – সে এক আলাদা আনন্দময় পরিবেশ। বকুল, মুকুল, বনু ও খুকু অর্থাৎ বনদেবী, সুদেবী সবাই প্রায় একই বয়সের চার বালিকা। ভীষণ খুশি হত, একসঙ্গে শুয়ে গল্প করে সময় কাটত তাদের। নানাধরনের বিজ্ঞান বা সাহিত্যের আলোচনা, জোকস বা হাস্যকৌতুক তাদের মনের সহজ, সরস, সাবলীল বিকাশকে সুষম রূপ দিতে সাহায্য করত। মুকুলের শৈশবের প্রিয় জায়গা ছিল এই বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার দুটি। একের পর এক বড় দাদাদের দিদিদের বিয়ে পৈতের অনুষ্ঠান এসে পড়ল। বড়দি ছোড়দিরা শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেন, নতুন নতুন বৌদিরা আসতে লাগলেন। ৮ + ৫ + ৩ = ১৬ জন ভাইদের মাঝে আমরা চার বোন, একটা বিশেষ আদরের জায়গা করে নিলাম, পড়াশোনা ও নৃত্যকলায় বেশ পারদর্শী ছিলাম আমরা। বনু খুকু দিকে যিনি নাচ শেখাতে আসতেন তিনি খুব প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। নানাধরনের নাচের গবেষণা (experiment) করতেন। কখনও মনিপুরী নৃত্য কখনও বা হাতে বর্শা নিয়ে নাগা ডান্স। কখনও ভরতনাট্যম তো কখনও কত্থক। বাইরের প্রোগ্রামও করতো আমার ঐ দুই দিদি। মুকুল সাপের নাচ, সঙ্গে সাপুড়ের কাহিনী জুড়ে নতুন শৈলীতে নৃত্যনাট্য করে দেখাত সবাইকে। শৈশবের এই নাচগুলি তাকে এমনভাবে মুগ্ধ করে রাখত যে বাঁকুড়া ফিরে এসে স্বপ্নেও সে নাচ করত আপনমনে। পরবর্তীকালে চন্দনা যখন দিল্লীর হোলি চাইল্ড স্কুলে চাকরী পেয়েছে, তখন ছাত্রীদের সে ঐ স্মৃতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের প্রোগ্রাম করতে স্বার্থক হয়েছে। স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে নাগানৃত্য, কোলাটেম রূপায়ন করতে শৈশবের বনু খুকু দিদির নাচ মনে এসেছে,সেই সব তাল ও মুদ্রা শৈলী তাকে অনেকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। কোন বিশেষ নৃত্য শিক্ষা বা ট্রেনিং তার ছিল না, কিন্তু স্কুলে নাচের দিদিমনি হয়ে বেশ নাম কামিয়েছে এবং পরে বাড়িতেও ছোট ছোট মেয়েদের নাচ শিখিয়ে অর্থ উপার্জন করেছে সংসারের আয় বাড়াতে। নাচ তার passion, – আগ্রহ ও আনন্দ দুটো যখন মিলে মিশে এক হয়ে যায়, তখন সে যে কোন  বিদ্যা, কলা বা শিল্প হোক না কেন ,মানুষ তাতে অদ্ভুতভাবে পারদর্শিতা লাভ করে, কোন ট্রেনিং ছাড়াই।

এর আর একটি রূপায়ন তার ধনুচি নাচের মধ্যে। মুকুলের confidence পরে চন্দনাকে দুর্গা- পুজো বাড়িতে, যমুনায় মূর্ত্তি ভাসানোর সময়, মনের আনন্দে চারটে ধনুচি নিয়ে আপনমনে নাচ আরতি নৃত্য করতে সাহস জুগিয়েছে। নাচই তার পূজা, সাধনা ছিল।

“বাঁকুড়া রামকৃষ্ণ মিশন”

মুকুলের বাবা অনেকগুলি সেবা প্রতিষ্ঠানে শ্রমদান করতেন। সরকারী অনাথ আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম,, নিত্যানন্দ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশনে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি বৃদ্ধ শিশু নির্বিশেষে চিকিৎসা করতেন। সন্যাসী মহারাজদের সেবা তাঁর জীবনের আদর্শ ছিল। বাঁকুড়ার রামকৃষ্ণ মিশনটি খুবই পুরোনো। শ্রী শ্রী মা বেঁচে থাকতেই এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয় এবং নানাধরনের সেবামূলক কাজ আশ্রমের সাধুরা বাঁকুড়া বাসীর মন জয় করতেন। তখনকার একজন মহারাজকে বাবা ডাক্তার মহারাজ বলতেন, তাঁর নাম ছিল বৈকুন্ঠ মহারাজ, যিনি শ্রী শ্রী সারদা মায়ের দীক্ষিত ছিলেন, এবং মা একবার রাধুকে নিয়ে জয়রামবাটি থেকে বাঁকুড়া এসে মহারাজের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন, খুব সম্ভব ‘রাধু’র চিকিৎসার জন্য। রাধু যে কে, ‘মা’ তাঁকে কেন এত ভালোবাসতেন, সে সব কথা কিছুই তখনকার মুকুলের জানা ছিল না। কিন্তু একবার কাশি সর্দ্দি সারাবার জন্য তার কাছে মিষ্টি মিষ্টি হোমিওপ্যাথি গুলি খেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম – একথা বেশ মনে আছে। মহারাজ বলতেন তোর বাবা আমার শরীর সারায়, আয় আমি তোদের ঠিক করে দিই। সেখানে কখনও কখনও সন্ধ্যারতি শুনতাম। “খণ্ডনভব বন্ধন, জগ বন্দন বন্দি তোমায়” – আরাত্রিক ভজনের মানে বোঝার বয়স তখন মুকুলের হয়নি, কিন্তু এর সুর, তাল ও ব্রহ্মচারী, মহারাজদের চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে – গানটি গাইবার ভঙ্গি আমার শিশুমনকে মুগ্ধ করে দিত। আমরা দুই বোন তখন থেকেই শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও মা ও বিবেকানন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতার গল্প আমরা আমাদের পাঠ্য পুস্তকেই পেয়েছিলাম। একটি খুব সুন্দর বই একবার উপহার পেয়েছিলাম – “বাংলার মনিষী” একপাতায় তাঁদের ছবি ও অন্য পাতায় তাঁদের জীবনী গল্প কাহিনী লেখা থাকত। তখন থেকেই জীবনী গ্রন্থ পড়বার ইচ্ছে ও আগ্রহ আমার প্রবল হয়। ঠাকুরের ও মায়ের ছবি তো সব ক্যালেন্ডারেই থাকত তাঁদের বাণীও স্কুলে বা পথে ঘটে অনেক জায়গাতে লেখা থাকত। তাঁর কথা “যত মত তত পথ” কথাটি যেন মনের মন্দিরে বার বার শঙ্খ ধ্বনির মত গুঞ্জিত হত। ক্লাস V থেকে আমাদের দুই বোনকে কলকাতায় পড়তে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছিল ‘দুজনই’ বৃত্তি পেয়েছি। মাসে তিন টাকা (তখনকার দিনে অনেক টাকা) করে জলপানি আসে কলকাতার বিদ্যালয়ে আরও ভাল পড়াশুনো হয় বলে, সেখানে ভর্তির চেষ্টা চলছে। আমাদের শিশুমনে খুব ভয় সৃষ্টি হয়েছে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য। তখন একদিন বললেন, শ্রী শ্রী মায়ের বাণী সব সময় মনে রাখবে, তাহলে ‘কখনও কোথাও কোন সমস্যা হবে না।’ তাঁর সেই তিনটি উপদেশ মুকুলের জীবনকে সদা ধন্য করেছে। জ্ঞানে অজ্ঞানে শৈশব থেকেই সে এই মহান বাণীকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করছে।

যখন যেমন তখন তেমন,

যার সাথে যেমন তার সঙ্গে তেমন। 

অর্থাৎ যে “সময়ে” যে ভাবে চলা উচিৎ সেইভাবেই চলো। ছোটবেলায় ভাবতাম যখন শীতকাল তখন সেরকম পোষাক পরতে হবে, যখন গরমকাল তখন বার বার স্নান করতে হবে। মাষ্টারমশাই অজিতবাবু আরো পরিষ্কার ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করতেন – ‘Time ‘ অর্থাৎ সময় সবচেয়ে দামী, তাকে কখনও নষ্ট করো না। এখন তোমাদের পড়াশোনা করে জ্ঞান বাড়াবার সময়। খেলাধুলো করে শরীর স্বাস্থ্য খুব মজবুত করার কালে অন্য কাজে – বাজে কথায়, বড়দের ব্যাপারে নাক গলিয়ে “সময়”কে বইয়ে দিওনা। যখন তোমার কাছে কম পয়সা, কম খাবার বা বিলাস ব্যসনের আয়োজন মা বাবা করতে পারেননি, তখন ঐ অবস্থাকে মেনে নেওয়াই সময়ের তালে চলা। তিনি আরও বোঝাতেন শিশুর মনের উপযোগী উদাহরণ দিয়ে – ‘ধরো তোমার অসুখ করেছে, তখন কি তুমি মাছ-মাংস, রসগোল্লা খাবার জেদ করলে চলবে। তখন তোমাকে তেতো ওষুধ খেতে হবে।’ তাই যখন যেমন তখন তেমন অবস্থাকে মেনে নেওয়ার কথাই যে “মা” বোঝাতে চেয়েছেন, সে সমন্ধে আমাদের মনে একটা সুস্পষ্ট ধারণা এনে দিতে পারেন তিনি। এরপর “যেথায়” কথাটির ওপর জোর দেন শ্রীশ্রী মায়ের মতন আমার মা ও। কারন আমাদের বাঁকুড়ার বাড়ির আরাম, মা, বাবা ঝি চাকর – পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে হোস্টেলে গিয়ে থাকতে হবে। ঘড়ির কাঁটা ধরে, বিভিন্ন রুল, নিয়ম নীতি মেনে সুপার দিদিমণিদের কথা শুনে চলতে হবে। রান্না খাওয়ার ধরণ সময় বা স্বাদও ভিন্ন হবে। তাই যেখানে যাচ্ছি সেখানের মতন হয়ে যেতে পারলেই ভাল। নিজেদের খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা (adaptability) adjust করার শিক্ষা ঐ একটা লাইনের মধ্যেই পায় আমরা। জীবনে উন্নতি করতে গেলে ভাল স্কুলে ভাল রেজাল্ট করতে গেলে সেখানকার মতন হতে হবে। পরবর্তীকালে শশুড়বাড়িতেও সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের পরিবার – পরিবেশ পেলে মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়, না নিলেই সংসারে অশান্তি নেমে আসে। অত ছোট বয়সেই নানাধরনের প্রাকটিক্যাল বুদ্ধিতে পরিণত করার চেষ্টা চলতো আমাদের। কারন আমরা যে কন্যা সন্তান, পরের ঘরে যেতে হবে আমাদের। এরপর তিন নম্বরের সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশটির মানে বোঝবার চেষ্টা করতাম আমরা।

যার সঙ্গে যেমন তার সঙ্গে তেমন। যে শান্ত শিষ্ট ভাল মানুষ তার সঙ্গে বাস করতে মানুষের অসুবিধা হয় না, কিন্তু একটু অন্যরকম লোকের সঙ্গে থাকতে গেলে যদি তার মেজাজের মত না থাকা যায়, অন্যের মেজাজ বা মুড (mood, attitude) বুঝে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। একবার আমার ছোট পিসিমার কাছে জোর আপত্তি, প্রতিবাদ জানালাম আমি। “কেন সবসময় মেনে নেব অন্যের কথা? খারাপ ব্যবহার করলে কেন আড়ি করবো না ঐ দুষ্ট বন্ধুর সঙ্গে?” রাগী, বকুনি দেওয়া, সর্বদায় মাথায় চাটি, গায়ে টোকা মেরে, চিমটি কেটে কথা বলা মাস্টারমশাইয়ের কাছে কেন পড়া করব? যে আত্মীয়স্বজন বাড়ি এলেই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয় কেন মেনে নেব সহ্য করব তাদের?

আমার প্রশ্ন শুনে প্রথমে পিসিমা একটু যেন থমকে গেলেন। তারপর নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে সুন্দর করে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, confused বালিকাকে। বললেন, – “দেখ মা, আমি এক বাল্য বিধবা। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ৫ বছরের এক কন্যা ও দু মাসের পুত্র কোলে নিয়ে খবর পেয়েছি আমার তরুণ ডাক্তার স্বামী কোন এক কোলিয়ারির হাসপাতালে ডিউটি করতে গিয়ে মাথার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়ির লোকের সেবা না পেয়ে বা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। আমি তখন কি করতে পারি বল? সব শোক সম্বরণ করে দুটি অসহায় দুধের শিশু নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে সবাইকে মানিয়ে নিয়ে সকলের কথার বাধ্য হয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। যার অতবড় ছেলে এমনভাবে হটাৎ মারা গেল সে মাও তো কতবড় শোক দুঃখ সামলে আমাকে বুকে টেনে নিয়েছেন, তার সঙ্গে তার মনের মতন হয়ে তার বা সেই সময়কার সমাজের নিয়মনীতি মেনে, সাদা থান পরে নিরামিষী একবেলা খাবার খেয়ে আমাকে থাকতে হয়েছে। কিন্তু যদি আমি তখন তাদের সঙ্গে তাদের মতন হয়ে না থাকতাম, তাহলে কি ভাল হত? আমার মা নেই। ঐ বাড়িতে বড় দিদি বিধবা হয়ে ঠাকুরঘরে আশ্রয় নিয়েছেন, ভাইদের অনেকগুলি ছেলেমেয়ে – বড় সংসার, বাবা বৃদ্ধ হয়েছেন তাই বাপের বাড়ি গিয়েও সুবিধে ছিল না। দেখ – আমাদের একশ বছর আগে বিধবাদের সতী হবার জন্য স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হত। রাজা রামমোহন রায় এসে তা বন্ধ করলেন। তারপর গৌরীদানের নামে বাল্যবিবাহ দানে, অল্প বয়সী পাঁচ – সাত বছর বয়সের মেয়েকে কুলোয় বা কোলে বসিয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রথা ছিল। আমাদের দরদী মনিষী বিদ্যাসাগর আইন করিয়ে ইংরেজ সরকারের দ্বারা তাও বন্ধ করাতে সক্ষম হন। তোরা যখন বড় হবি তখন হয়ত বাঙালি – ভারতীয় স্বামী হারাদের জন্য এত কঠিন কঠিন নিয়মনীতিও আর থাকবে না। স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে সে দাঁড়াতে পারবে – যার সঙ্গে তার থাকতে ভাল না লাগবে তার থেকে দূরে সরে যেতে সে সামর্থ হবে। কিন্তু যার সঙ্গে যেমন তার সঙ্গে তেমন ভাবে না চললে ঘরে – সমাজে – পরিবারের শান্তি যে বিনষ্ট হবে। দেখো, পাগলা কুকুর দেখলে তুমি দূরে পালাবে না? যে গরুটা অনেক দুধ দেয়, তাকে সময়মতন যত্ন না করলে, ভাল খাবার না দিলে, সেকি তোমায় দুধ দেবে?”

শিশু মুকুলের মনে এই তিনটি বাণী এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে সে পরবর্তী জীবনে তার counterpart ‘চন্দনাকে’ ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। জীবনের নদী তার আপন গতিতে তাকে অনেকরকমভাবে ঘুরিয়েছে, নানানদিকে বয়ে নিয়ে গেছে, নানান মানুষের ভীড়ে ভাল খারাপ – আনন্দ মুখর বা সংঘাতময় সময়ের মধ্যে দিয়ে পার করে এনেছে “সত্তরের” কোঠায়। পৃথিবীর নানা শহরের নানান বিচিত্র মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। কখনও অভাব অনটনে – অসুখ বিসুখে চিন্তামগ্ন হয়ে সে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে গিয়ে নানারকম দুঃখপূর্ণ অভিজ্ঞতায় নিজের ঝুলি ভরেছে, কিন্তু ঘাবড়ে যায়নি। শ্রীশ্রী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সে কবিতা রচনা করতেও সফল হয়েছে।

স্থান, কাল আর পাত্র

যেথায় যেমন, সেথায় তেমন, যে দেশের যা আচার,

অনুকরণ করতে হবে তাদের ব্যবহার।

অন্যরকম খাওয়া দাওয়া, পোষাক পরিধান,

ভাষা ও চাল শিখতে হবে, অন্য সুরে গান।

যখন যেমন তখন তেমন, না হয় যেন ভুল,

সব বয়সে, অবস্থাতে, তুলব জ্ঞানের ফুল।

যে কালেতে যেমন ফসল, সব কাজে চাই পরিশ্রম,

কালের তালে চলতে হবে, করতে হবে সংযম।

যার সঙ্গে যার যেমনটি ভাব, তার সঙ্গে তেমনটি লাভ,

করলে পরেই মঙ্গল, সাধুর সঙ্গে তীর্থ যাত্রা, পশুর সঙ্গে জঙ্গল,

ভাল মানুষ সুবাস ছড়ায়, দয়া ক্ষমায় ভরা,

ডাকাত মাতাল তেমনটি নয়, পালাও দূরে ত্বরা।

শ্রীশ্রী মায়ের তিন উপদেশ নিলাম গেঁথে মালায় –

আনন্দেতে কাটছে যে কাল, সকাল সন্ধ্যে বেলায়।

বরফের দেশ মরু প্রদেশ, ছুটে ছুটে যায় তবু –

কোথাও গিয়ে অসুবিধায় পড়তে হয়নি কভু।

ধনী নির্ধন, সুখী দুঃখী জন ভাল খারাপের সঙ্গে,

তাদের মতই হয়ে থাকি যে রসে বশে ও রঙ্গে।

এ জীবনে যা সাফল্য সবই তাদের দান,

ঠাকুর ও মা’র আশীর্বাদে ভরল যে মন প্রাণ।

মুকুলের আরেকটি প্রিয় জায়গা ছিল “অনাথ আশ্রম”। সমবয়সী অসহায় শিশুগুলির বাবা মা নেই, কেমন করে তাদের দিন কাটে, কে যে তাদের আদর করে, কোথায় তারা অসুখ করলে একা একা শুয়ে কাঁদে। ভাবলেই তার দুঃখে – হৃদয় কাতর হয়ে যেত। ভাবতো কবে সে বড় হবে – এইসব অনাথদের জন্য আশ্রম খুলবে, বাবার মতন ডাক্তার হয়ে ওদের চিকিৎসা করবে, অনেক টফি মিষ্টি নিয়ে গিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু সব ইচ্ছে তো মানুষের পূরণ হয় না। তবে একথাও সত্যি প্রকৃত আন্তরিকতা থাকলে হয়ত কিছু ইচ্ছে পূরণের উপায়ও করে দেন আমাদের আরাধ্য দেবতা। অনেক পরে সংসারের দায়-দায়িত্ত্ব মোটামুটি ভাবে সম্পন্ন করে ছেলেদের বিদেশ যাত্রায় উচ্চ শিক্ষার্থের জন্য পাঠিয়ে চন্দনা যখন বসে আছে তখন ‘আনন্দবাজার পত্রিকায়’ এক অনাথ আশ্রমের খবর পায়, শেষ জীবনের মুকুলের ইচ্ছা মত যুক্ত করে নিজেকে সেখানকার শিশুদের সঙ্গে। সেই “অন্ত্যদ্বয় অনাথ আশ্রমের” কথা পরে আবার আলোচনা করা যাবে।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উৎসব পালন করা হয় উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে। তখনকার অত্যন্ত সুদক্ষ জেলা শাসক আয়েঙ্গার সাহেব তার ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠিতে খুব সুন্দর একটি স্টেজ করেন। সেখানে বেশ একসপ্তাহ ধরে চলে নানান অনুষ্ঠান। আমরাও তাতে অংশগ্রহন করি এবং রবীন্দ্রনাথকে সেই ছোট বয়স থেকেই চেনবার, জানবার ও বোঝবার চেষ্টা করতে প্রবৃত্ত হই। ১৯৬২তে মুকুল ক্লাস সিক্স এ ভর্তি হয় কলকাতার বেথুন স্কুলে। নতুন জীবন, নতুন অধ্যায় শুরু হয় সেই ছোট্ট বালিকার। বাঁকুড়া ছিল যেন এক দীঘির শান্ত জল আর কলকাতার স্কুল এক বিশাল নদীর মতন। এক এক ক্লাসের বহু সেকশন, বহু ছাত্রী শিক্ষিকা, চারিদিকে বড় বড় দেবদারু গাছ। মস্তবড় পুরোনো দালানবাড়িতে, বিশাল চাতালের পাশে পাশে আমাদের শ্রেণী কক্ষ। বড় বড় থাম্বা সাদা সাদা পায়রা ও লক্ষী পেঁচার বাস সেখানে। অন্য দিকে সায়েন্স বিল্ডিং, উপরে সারি সারি ল্যাবরেটরি। অন্যদিকে একটি গানের ক্লাস। রেনু দিদিমনির কাছে লাইন করে একের পর এক ক্লাস পৌঁছে যায় গানের পিরিয়ডে। কুঁয়োর ব্যাঙ যেন সাগরে এসে পড়েছে। দিশাহারা বা বলা যায় আনন্দে আত্মহারা মুকুল এক অন্য জগতে এসে অবাক বিস্ময়ে সবার সঙ্গে সবরকম ভাবে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করতে থাকে। হোস্টেল জীবন সম্পূর্ণ অন্যরকম।

(ক্রমশ)

অষ্টম অধ্যায়

“বেথুন কলেজিয়েট স্কুল”

John Elliot Drink Water Bethune জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮০১ সালে এবং জীবিত ছিলেন ১৮৫১ পর্যন্ত। তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁহার লেখা History of Seige of Gibraltor বইটি বিখ্যাত ছিল। বেথুন সাহেব বাবার মতন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথমে তিনি ব্যারিস্টার হন Law member হয়ে পার্লামেন্টে যোগ দেন। তিনি প্রথমে Westminster School, Wrangler, CambridgeTrinity School এ পড়াশুনো করেন। বিভিন্ন ভাষা লেখার প্রতি তাঁর অধীর আগ্রহের জন্য তিনি গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মানি এবং ইটালিয়ান ভাষায় বিশেষ ব্যৎপুত্তি লাভ করেন। তিনি একজন কবিও ছিলেন। পরে তাঁকে Law Member of Indian Governor General এর কাউন্সিলর হয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। পরে Education officer হয়ে তিনি তৎকালীন স্কুলগুলি পরিদর্শন করতে যান। কলকাতার কাছে বারাসাত নামে জায়গাতে পিয়ারী চরণ সরকার ও কালী কৃষ্ণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত Girls School (১৮৪৭) টি পরিদর্শন করতে গিয়ে বেথুন কলকাতায় এই ধরনের একটি secular বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে উদ্যোগী হন। যাঁরা তাঁকে এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তাঁরা হলেন – ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদন মোহন তর্কালঙ্কার, রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণাচরণ মুখার্জী প্রমুখ সমাজ সেবক। বেথুন ছিলেন, President of Education, ১৮৪৯ সালে এই স্কুল স্থাপনা হয়। নিজের স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি সরকারি মাইনে সব তিনি লাগিয়ে দেন এই বিদ্যালয়ের পিছনে বাংলার কন্যা রত্নকে ধন্য করে। ১৮৫৬ সালে এটি সরকার গ্রহণ করেন। এর আগে যে সমস্ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হত, সবই Church এর অধীনে মিশনারী দ্বারা পরিচালিত ছিল। সে ইতিহাস এর কথাও কিছুটা আলোচনা করা যাক। নর্থ কলকাতার ‘গৌরীবাড়ি’ তে ১৮১৯ অর্থাৎ বেথুন সাহেবের ও ৩০ বছর আগে একটি মেয়েদের স্কুলও স্থাপন করেন Calcutta Baptist Mission Society ১৮২০ সালে Mrs. Gogerly মেয়েদের স্কুলে Reading, Writing, Geography and Needlework শেখাতেন। এখানে Lower Cast Hindu বা Converted Christan মেয়েরা পড়তেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাঙ্গালীদের স্কুল স্থাপনের আগে প্রথমে মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন করেন – মহারাষ্ট্রের পুনের Bhinde Wade জায়গাতে। গোবিন্দ রাও ফুলে ও তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী ফুলের দ্বারা এই স্কুলটি স্থাপিত হয়।

বেথুন সাহেব Calcutta Public Library তে Translation Activity-র সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজেদের ভাষায় শিক্ষা দেওয়ানো তে জোর দেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৪৯ সালে ইংরেজিতে প্রথম কাব্যগ্রন্থ Captive Lady প্রকাশ করেন। বেথুন সাহেব তাঁকে বাংলাতে নিজের মাতৃ ভাষায় লিখতে নিজের প্রতিভার বিকাশে উদ্বুদ্ধ হতে অনুরোধ করেন। মাইকেল তাতে সাফল্যও লাভ করেন। ‘বিদ্যাসাগরের বিশিষ্ট বন্ধু এই বেথুন সাহেবের জন্য বঙ্গ ললনা আজ ধর্ম নিরেপেক্ষ স্বাধীন চিন্তা ধারায় জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে নিজেদের জীবনকে উন্নত করার – বিকশিত করার – সার্থক করার সুযোগ পেয়েছে। পরে, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দের বা তৎকালীন সব নাম করা প্রসিদ্ধ পরিবারের কন্যাগন এখানে পড়বার সুযোগ লাভ করে ধন্য হন। ১৮৮৮ সালে ১৩৩ জন মেয়েদের মধ্যে ৮৭ জন ব্রাহ্ম, ৪৪ জন হিন্দু ও ৫ জন খ্রিষ্টান ধর্মের মেয়ে পড়ত। এরপর কলকাতায় ভিক্টোরিয়া ১৮৮৬ সালে এবং ১৮৯০ সালে ব্রহ্মসমাজের ব্রাহ্ম স্কুল ও Christ Church স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় – তখন দেখা যায় ১৮৯৪ তে ১৩৮ জন মেয়ের মধ্যে – ৭০ জন হিন্দু, ৩৩ জন ব্রাহ্ম ও ১৩ জন খ্রিষ্টান মেয়ে পড়ত বেথুন স্কুলে।সেই সময় ছাত্রীরা দেশের ও দশের কাছে যথেষ্ট নাম কামাতে সক্ষম হন।

বেথুন স্কুলের হলে বেথুন সাহেবের একটি সুন্দর স্ট্যাচু এবং সেই সময়কার পুরোনো ছাত্রীদের অনেক তৈল চিত্র অঙ্কিত ও টাঙানো আছে। ৭ই মে বেথুন দিবস (ফাউন্ডার ডে) এবং ১২ই অগাস্ট বেথুন সাহেবের মৃত্যু দিন – দুটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। এই স্কুলে ভর্তি হতে পেরে, মুকুল নিজেকে ধন্য মনে করে। কিন্তু এখানে এসেই সে শুধু মুকুল নামটি তার হারিয়ে ফেলে, সবাইকার কাছে “চন্দনা গুপ্ত” নামে পরিচিত হয়। ছোট্ট শহর থেকে এসে প্রথমে সে হতচকিত হয়ে যায়, বাঁকুড়ায় সে “শেয়াল রাজার” মতন ছিল। সব কিছুতেই প্রথম হত অনেক প্রাইজ পেত। দুবার অলরাউন্ডার বেস্ট গার্ল এর প্রাইজ ও জিতেছে, কিন্তু এখানে তার চেয়ে অনেক অনেক পড়াশুনোয়, নাচে-গানে, নাটকে, খেলা-ধুলোয় ভালো মেয়ে আছে। চন্দনার কথাতে এখনও গ্রাম্য টান। হোস্টেলে একা একা টেবিলের এক কোনে বসে অন্য মেয়েদের সঙ্গে পড়া অর্থিত হোম ওয়ার্ক করতে হয় তাকে। মাষ্টারমশাই নেই, দাদা-দিদি নেই, বুড়ি, আরতি, প্রতিমার মতন বন্ধুরা তখন অত ক্লোজ হয়নি, ওরা মুকুলের কত আন্তরিক ছিল, একটা তেঁতুল কুড়িয়ে পেলেও মুকুলের জন্য একটুকরো নিয়ে আসত। এখানে গাড়ি, বাড়ি, ভাল রেজাল্টের, কে কত বেশি নাম্বার পেল তার গল্প করে – আমি কাউকে জানতেও দিই নি যে আমের দাদু মন্ত্রী – আমার বাবাও নাম করা ডাক্তার, সারা শহর তাঁকে দেবতা মানে। আমার মাও খুব বড় গায়িকা, ম্যাট্রিকে, খ্রিস্টান কলেজের খুব প্রতিভাময়ী ছাত্রী ছিলেন, ঝর ঝর করে ইংরেজিও বলতে পারেন। এখানে চন্দনা যেন নিজেকে গুটিয়ে নিল প্রথম বছরটাতে। পরে আসতে আসতে এখানকার জীবনযাত্রা ভাল লাগত তার। বাড়িতে সব অন্যেরা করে দেয়। এখানে নিজের কাপড় নিজেদের কাঁচতে হয় – বাইরে মেলবার সময় হোস্টেল ওয়াডের্ন মাসিমা সেগুলি যদি ময়লা দেখেন তো সকলের সামনে বকুনি খেতে হয়। ভোর বেলায় ঘন্টা বাজলে উঠে নিজের বিছানা না তুলে প্রার্থনা সভায় গেলেও শাস্তি পেতে হবে। সব কিছু ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পা ফেলে চলার অভ্যেস করতে করতে নিজের উপর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল, ছোট মেয়েটির। ভাত খেতে বসে থালায় কিছু পরে থাকলে শুনতে হয় – ও বড় লোকের ঘরের দুলালী, মা ঠিক করে খেতেও শেখায়নি। তখন নিজের জন্য নয় মাকে কথা বলেছে বলে চন্দনার খুব রাগ হয় – কান্না পায়। নিজের সব কাজ খুব তাড়াতাড়ি এবং ভালভাবে করার অভ্যেস হয়ে যায়, তার আস্তে আস্তে। একেই বলা হয় ‘স্বাবলম্বী’। স্বাবলম্বনের উপর রচনা লিখতে গিয়ে এইটা সে আরো ভালভাবে অনুভব করেছে। একদিন মাসিমার জ্বর শরীর খারাপ, খাওয়ার টেবিলে তদারক করতে আসেননি। সব মেয়েরা খেয়েদেয়ে চলে গেল। রবিবারের দিন, লাইব্রেরি, সেলাই ক্লাস, গানের চর্চা – সবাই যে যার অবসর বিনোদনে চলে গেল। চন্দনাকে মুকুল কিন্তু কানে কানে কি যেন মন্ত্র দিল। সে গুটি গুটি পায়ে চলল মাসিমার ঘরের দিকে। তার মাথায় জল পট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, রান্না ঘরের মাসিদের কাছ থেকে দুধ সাবু এনে তাঁকে খেতে দেওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সুপার দিদি সেদিন ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন। বিকেলে এসে চন্দনার ব্যবহারে ভীষণ খুশি হলেন। পরে রাত্রে খাওয়ার টেবিলে সব মেয়েদের সামনে তাকে প্রশংসাও করে ফেললেন তিনি। ব্যাস আর যাবে কোথায়। সবাই চন্দনার পিছনে লাগা শুরু করে দিল। কেউ বলে, “মাসিমাকে মস্কা দিচ্ছিস?” কেউ বলে ব্যঙ্গ করে – “কি করে – তোকে দেখলে তো মনে হয় ভিজে বেড়াল, কিছুই বুঝিস না”। আর এক দিদি তার সঙ্গে যোগ দিলেন যেন চন্দনা কত দোষ করেছে। 

 “হ্যাঁ, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না যেন”, ভেতরে ভেতরে কত চালাক দেখ, মাসিমার আদর কাড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চন্দনা ঝগড়া করাটা একেবারেই পছন্দ করে না। অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। এইসময় গোপাদি যার মধ্যে একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল, কাছে এসে দাঁড়ালো, তার পাশে। বলল, “ওর পেছনে কেন লেগেছ তোমরা। আমাদেরও তো এটাই করা উচিত ছিল, মাসিমা আমাদের মায়ের মতন কত যত্ন করেন, উনিও তো নিজের বাড়ি-ঘর, ছেলে মেয়েদের ছেড়ে আমাদের কাছে এসে আছেন, আমরা তাঁর জ্বর হয়েছে শুনে চুপ করে নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেছি। আর এই বাচ্চা মেয়েটা গেছে ওনার কাছে, আমাদের সবার কর্ত্তব্য পালন করেছে, আর তোরা এসব কি বলছিস?” এবার আমার চোখে জল এসে গেল। গোপাদি আমার হাত ধরে লাইব্রেরীতে নিয়ে গেল এবং একটা হাসির বই পড়তে দিল।

হোস্টেলের মেয়েদের মাঝে মাঝে ছুটির দিনে স্কুলবাসে করে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত, প্রথমবার, তারা গেল কলকাতার “পরেশনাথের” মন্দির। মাড়োয়ারী জৈনদের ধর্ম গুরু যে আলাদা তাঁদের মন্দির – উপাসনা গৃহটি এত সুন্দর তারা মাছ – মাংস – ডিম খান না, তাই পুকুরে নানা রঙের মাছ পালন করে রেখেছেন তাঁরা। চন্দনার মন আনন্দে ভরে গেল। এরপরে তাদের নিয়ে যাওয়া হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। বড় সুন্দর সেই শ্বেত পাথরের সুন্দর প্রাসাদ ইংরেজদের নিদর্শন ছেড়ে গেছেন। চন্দনা অবাক বিস্ময়ে দেখতে থেকে সেগুলি। তারপর সেই বিখ্যাত জাদুঘর – মিউজিয়াম, কত বড় বড় জন্তুদের কঙ্কাল, কত পুরোনোদিনের নমুনা, জ্ঞানের ভান্ডার। চন্দনা ভাবে এতদিন সে তো সত্যি কুঁয়োর ব্যাঙ হয়ে পড়েছিল, এ জগতে কতকিছু জানার ও শেখার আছে। ছ্য় ক্লাশের 

 (VI B) এর ক্লাস টিচার তখন ছিলেন সুমতি দি। খুব ভালবাসতেন ছাত্রীদের। যোগমায়া দিদি ইতিহাস পড়াতেন গল্পের মতন করে, খুব ভাল লাগত তার। একদিন একটু দেরী হয়ে গেল তার ক্লাসে আসতে, ছুটতে ছুটতে এসে নিজের চেয়ারে বসে হাপাঁচ্ছেন তিনি, একটি মেয়ে বলল, “দিদি আপনি রিকশা করেন না কেন ! রোজ আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসেন।” দিদি উত্তর দিলেন, “ওই গরিব লোকগুলোর ঘাড়ে চড়ে আমার কখনও ভাল লাগে না রে। ওরা হাতে টেনে কত কষ্ট করে সব মানুষদের ভার বয়ে নিয়ে যায়।” চন্দনা কলকাতায় এই হাতে টানা রিক্সাওয়ালাদের দেখেছে, একবার হাতি বাগান থেকে ওতে চেপে হোস্টেলেও এসেছে, কিন্তু আজ যেন তার চোখ খুলে গেল, তার দরদী মন বলে উঠলো – ঠিক তো একজন মানুষের কাঁধে চড়ে আরেকজন মানুষ কেন যাবে। আর কোনদিন ওই ধরনের রিক্সাতে চড়বে না সে।

(ক্রমশ)

নবম অধ্যায়

“বেলুড় মঠের প্রভাব”

এরপরে তার দর্শনীয় স্থান হল “বেলুড় মঠ”। ১৯৬৩ সাল, বিবেকানন্দের শতবার্ষিকীতে – কয়েকদিন আগেই চন্দনা নিবেদিতা স্কুলে গিয়ে – “হে ভারত ভুলিয়ো না দরিদ্র ভারতবাসী তোমার ভাই . . . .”, বক্তৃতাটি মুখুস্থ করে অন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় ভাগ নিতে গিয়েছিল। সেখানে সে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। হোস্টেলের লাইব্রেরীতে নরেন্দ্রনাথ – বিলের বিবিষানন্দ থেকে বিবেকানন্দ হবার গল্পও পড়েছে, – মন প্রাণ তার তেজস্বী বাণী ও তেজময় জীবনীর প্রতি আকৃষ্ট। সপ্তম শ্রেণীর কিশোরীর মনে তখন অদ্ভুত একটা আবেগ – ভালোবাসা শ্রদ্ধা জেগেছে তাঁর প্রতি। তাঁর প্রিয় শিষ্যা মার্গারেট নোবেল – নিবেদিতার – আদর্শে চন্দনা তখন অনুপ্রাণিত। সেও চাই তার মতন সন্ন্যাসিনী জীবন যাপন করতে। শ্রীশ্রী মা ও ঠাকুর রামকৃষ্ণ – যারা বাঙালির জীবনের পথ প্রদর্শক – গুরু – তাদের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ প্রচারক – ভাবধারার বাহক, সংঘ স্থাপক রামকৃষ্ণ মিশন সেবা ব্রতের পরিচালক – বিবেকানন্দ, – এক কথাই সকলের প্রিয় ‘স্বামীজী’ ছিল ত্রয়োদর্শী চন্দনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তাই বেলুড়ে বিবেকানন্দের গৃহ, বিশেষতঃ সমাধি স্থান যেখানে তাঁকে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ বিদায় জানিয়ে দাহ করেছে – সেখানে গিয়ে সে ভীষণ ভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সেখানকার মাটি মাথায় ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলল কিশোরী চন্দনা। বন্ধুরা গঙ্গার ধরে গোল হয়ে বসে বাদাম ভাজা খাচ্ছে। যুথিকা দি তখনকার সুপারিন্টেন্ডেন্ট দিদি সবাইকে বলছেন, – ‘কেউ বাদামের খোসা ঘাসে ফেলবে না এই বড় থলিতে ভর’ – চন্দনা কিন্তু সে সব কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। শুধু কানে বাজছে একটি বাণী, –

“বহু রূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুজিছো ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেই জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর”।

কবিতাটি কোন কবিতা থেকে গৃহীত তা তখন সে জানতো না, পরে যখন বিবেকানন্দ গ্রন্থাবলী কিনে, রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ গ্রন্থাবলীর পাশে সাজিয়ে রাখা হয় তখন তার আরও অনেক সুন্দর সুন্দর কবিতা স্তোত্র পড়তে গিয়ে “সখার প্রতি” কবিতাটি খুঁজে পায় সে। এবং ওই পদ্যটির শেষ দুটি লাইন হলো এই বিখ্যাত উক্তিটি। চন্দনার মনে হত যদি তিনি সন্ন্যাসী হতেন তাহলে হয়তো কাব্য – গদ্য – পুরান – উপনিষদ – বেদ বা গীতার ভাষ্যকার রূপে তিনি বাংলা সাহিত্যে তার বিশেষ স্থান করে নিতেন। চলতি ভাষায় লেখা তার চিঠি পত্রগুলি এত সুন্দর যে পরিণত বয়সে বারবার করে পড়ে মুকুল তথা – প্রৌঢ়া – বৃদ্ধা চন্দনা বিশেষ আনন্দ পেয়েছে। সেদিন কিশোরী চন্দনা কে বেলুড়ের মন্দিরে ক্রন্দনরত দেখে বন্ধুরা অবাক হয়ে যায়। হয়ত তার বাড়ির জন্য মন কেমন করছে – এইভেবে তাকে তারা স্বান্তনা দেয়, – “কাঁদছিস কেন? কয়েকদিন পরেই তো গরমের ছুটি হবে, বাড়ি যাবি, মন খারাপ করিস না।” – কিশোরী বালিকা সেদিন কাউকে বোঝাতে পারেনি বা চাইনি যে সে কেন কাঁদছে। কিন্তু তার জীবনের মধ্যে এক নতুন ভাব ভক্তি রসে সিক্ত উপলব্ধি – একটা বোধ মনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল – এ কথা আজ সে অনুভব করতে পারে। প্রত্যেক মানুষ ছোট থেকেই তার জীবনে কিছু কিছু জিনিষ জমাতে চায়। কেউ ধন, কেউ সম্পদ, কেউ বিদ্যা বা জ্ঞান ধীরে ধীরে সংগ্রহ করে শেষ জীবনে এসে দেখে যে সে কতটা সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছে। আবার কিছু কিছু মানুষ তার Emotional Capital collect করে – সেখানে হয়তো শৈল্পিক সত্তা, কবিত্ব প্রতিভা, অঙ্কন কলা, সঙ্গীত – সুর সৃজনের ক্ষমতা অথবা একটা spiritual অনুভূতির বীজ বপন হয় কোন এক বিশেষ ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, আর সেই আবেগ প্রবাহ তাকে চালনা করে – এগিয়ে নিয়ে যায় – জীবনের আসল মানে খুঁজে দেয়। শেষ অধ্যায়ের যাত্রা তখন তার সুখময়, শান্তিময় আনন্দপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রামকৃষ্ণ মিশনের বাঁকুড়ার মাটিকে ধন্য করে দেওয়া জয়রামবাটির নাম, মা, ঠাকুর ও স্বামীজীর প্রভাব চন্দনাকে শুদ্ধ করেছিল, চন্দনার সেদিনের আনন্দাশ্রু তার প্রমান। পরে, এই ভাবধারায় সে দীক্ষা লাভ করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট (২০১৮/১৯) শ্রীমদ স্বামী স্মরণানন্দজীর কাছে সংসার ধর্ম পালন করেও তাই সে বারেবারে ছুটে যায় ঐ শ্রেষ্ঠ তীর্থ বেলুড়ে। সেখান থেকে তার প্রিয় জায়গা জয়রামবাটি, কামারপুকুর, ভুবনেশ্বরের তপোবন বা অখণ্ডানন্দ প্রতিষ্ঠিত ‘সারগাছিতে’ যেখানে মিশনের প্রথম সেবামূলক কাজ শুরু হয় বিবেকানন্দের অর্থানুকূল্যে। ছুটে যায় চন্ডিপুরে, কাঁথির রামকৃষ্ণ মিশনে।

বিদেশে বক্তৃতা দিয়ে হিন্দুধর্ম ভারতীয় Tradition ও Spirituality নিয়ে ভাষণ দিয়ে তিনি যে সমস্ত টাকা পয়সা রোজগার করে ঐসব আশ্রমে সেবামূলক কাজে তা সবই লাগাতেন স্বামী বিজ্ঞানানন্দের তত্ত্বাবধানে এই বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীশ্রী মায়ের নামে ঐ জমিটিতে ভূমি পূজন হয়। মাঝে একবার প্লেগ রোগের চিকিৎসায় ওষুধ পথ্য কেনার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ এই জায়গাটি বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভাবেন কেননা তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, মানুষের দুঃখ দেখলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কিন্তু শ্রীশ্রী মা তা হতে দেননি। তিনি চাইতেন ঠাকুরের নামে একটা সংঘ হোক যেখানে তাঁর সন্ন্যাসী সন্তানেরা একসঙ্গে থাকতে পারবে, জপ ধ্যান জ্ঞানের আলোচনা করে জীবন কাটাবে। বেলুড় মঠটির ভবনের মধ্যে ঠাকুরের সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের ভাবধারাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে – মন্দির মসজিদ গুরুদ্বারা, গির্জার আদলে মন্দির গৃহকে বানানোর মধ্যে। বেলুড়ের মন্দিরে বসে নিজের মনে যে স্বপ্ন চন্দনা দেখে সেটি হয়ত তার পূরণ হয়নি নার্স – ডাক্তার – সন্ন্যাসী হয়ে মানুষের সেবা সে বড় হয়ে করবার সুযোগ পায়নি, জীবনের নদী তাকে অন্যখাতে অন্য পথে বহে নিয়ে যেতে বাধ্য করে কিন্তু হৃদয় থেকে ঐ ভাবধারার Emotional Capital অমূল্য সম্পদকে সে কোন ভাবেই হারিয়ে যেতে দেয়নি। তার মধ্যে অঙ্কুরিত হওয়া নতুন বীজটি সে সযতনে রক্ষা করতে পেরেছে। এজন্য “বেলুড় মঠের” কাছে সে চির কৃতজ্ঞ।

অষ্টম শ্রেণীতে নানারকম activity তে ভাগ নিয়ে স্কুলে শিক্ষিকা প্রধান অধ্যাপিকা অনিমা হালদার, প্রতিভা দি, প্রীতি দি, বাণী দি, রেবেকা দি, টুটুল দি, রমাদি সকলের প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠে সে। হোস্টেলের মেয়েদের নিয়ে নানা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে। বেথুন সাহেবের মৃত্যুদিন ১২ই আগস্টে বিরাট বিরাট মালা গেঁথে তারা পার্ক সার্কাসে কবরে গিয়ে গান গাইতে যেত –

“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো

সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো, ধরায় আসো।”

৭ই মে ছিল ফাউন্ডেশন ডে। সেদিনও স্কুলে নানান অনুষ্ঠান হত। বেথুনের স্কুলের পোশাক ছিল ক্লাস VIII পর্যন্ত সাদা জামা, লাল বেল্ট, লাল ফিতে, সাদা মোজা। আর ক্লাস IX থেকে সাদা লাল পাড় শাড়ি। যেদিন চন্দনা প্রথম নবম শ্রেণীতে উঠল, তার সে কি আনন্দ। সাদা ব্লাউজ, সাদা শাড়ি, কালো জুতো পরে প্রথম যেদিন স্কুলে গেল রত্না, পান্না, রিনা, রিতা, শিপ্রাদের সঙ্গে সেদিন তার মনে হল, অনেক বড় হয়ে গেছে সে। প্রথম ক্লাস IX, X ও XI এই তিন বছরের জন্য আলাদা স্ট্রিম অর্থাৎ বিভাগ করা ছিল। চন্দনা ভর্তি হল বিজ্ঞান শাখায়। Physics, Chemistry, Biology ও অঙ্ক নিয়ে পড়তে আরম্ভ করল সে। ভীষণ উৎসাহ সব বিষয়েই আগ্রহী, অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্রী। বেথুন স্কুলে বাঁকুড়ার মতন কখনও প্রথম স্থান অধিকার করতে পারতো না সে, এজন্য একটু দুঃখ থাকলেও প্রথম দশজনের মধ্যে সবসময়েই তার স্থান থাকত। সর্বদা বই পোকা হয়ে বসে থাকতে ভালোবাসতোনা সে, স্কুলের সব কাজেই সরস্বতী পুজো, স্পোর্ট, বেথুন ডে বা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আয়োজনে, স্কুলের চৌকিদার, জমাদার, পিওনদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ায় সাহায্য করায়, স্কুল এক্সিবিশন, টিচার্স ডে বা চিলড্রেন ডে প্রোগ্রামে দিদিমণিদের ও উৎসাহী বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করতে সবসময়েই ব্যস্ত থাকতো সে। বিশেষ করে ১৫ই অগাস্ট, ২৬শে জানুয়ারী ইত্যাদিতে তাকে ভীষণ ছুটে ছুটে কাজ করতে দেখতো সবাই। ম্যাগাজিনে কবিতা বেরোতো তার প্রত্যেকবার। ছোট কবি নামও পেয়েছে স্কুলে।

(ক্রমশ)

Leave a comment