চন্দনা সেনগুপ্ত
বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের বধূ হিসেবে আমার জীবনতরী হয়তো ঘরের আঙিনাতেই চিরদিন এক ভাবে বাঁধা থাকতো, যদি না স্বামী এয়ার লাইন্স কোম্পাণীতে চাকুরীরত হতেন। তাই পথ আমাদের ডাকে। অচেনা মানুষ দেয় হাতছানি। সাত সাগরের তেরো নদীর পারে শুধু স্বপ্নে দেখা রাজকন্যারাই বাস করেন না, তার সঙ্গে আরো কত সুয়োরানী দুয়োরানী সাত রাজার ধন মানিক এবং কত শত খ্যাপারা পরশপাথর খুঁজে বেরোনোর পরিচয় মেলে সেখানে। পরিচয় পায় কত সুন্দর উদার মানুষের যাঁরা বৈভবের মধ্যে বাস করেও অহংবোধ শূন্য। যাঁরা বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে দ্বিধাহীন এবং সরলতা ও সেবার প্রতিমূর্তি।
বাঁকুড়ার লাল মাটির রক্তিম আভায় মন রাঙানো সজনে ফুলের শুভ্রতায় স্নাত কিশোরী আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। ৩০ বছরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ছোট ছোট সুখ দুঃখ আনন্দ ভাগ করে নিতে চাই আমার মতো আরো অনেক বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। শুধু ভৌগোলিক বর্ণনা বা ঐতিহাসিক বিবরণ দেওয়ার আগ্রহ আমার নেই। কারণ বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামের কল্যানে এখন তো ঘরে বসেই নানান দেশের দর্শনীয় স্থান, রাস্তাঘাট, স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর থেকে শুরু করে কি না দেখার সুযোগ মিলছে। তাই আক্ষরিক অর্থে শুধু ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, পথে পথে ছড়ানো পাথরগুলি সরিয়ে ফুল পাখি বন্ধু মানুষগুলির কথা তুলে ধরার এক ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এই জনমেই যে জন্ম জন্মান্তর ঘটে যায় তা অনুভব করতে পারি যখন পথে বেরিয়ে ঐসব অমূল্য চরিত্র, অসাধারণ মানুষগুলির সঙ্গ লাভ করি।
ক্যালিফোর্নিয়া - পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের দেশের ঠিক অপর প্রান্তে উত্তর আমেরিকার পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের কিনারে এবং রকি পর্বতের কোলে অপূর্ব সুন্দর প্রদেশ। তরুণীর তন্বী দেহের মতন শীর্ণকায় অর্থাৎ লম্বা আয়তন তার। একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সাগর মাঝখানে কোথাও সবুজ আঙ্গুর ক্ষেত কোথাও বিশাল বৃক্ষের অরণ্য, লম্বা সুদীর্ঘ সেই বিখ্যাত 'রেড উড' বৃক্ষের সারি আকাশকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। এই স্টেটটিকে তিন ভাগে ভাগ করে দেখা যাক। উত্তরে বরফে ঢাকা, সবুজ পাহাড় ঘেরা "লেক টাহো" এবং রেডউড পার্ক। সেখানে এক একটা গাছের গুঁড়ি এতোই বৃহৎ যে মাঝখানটা কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ঠিক মধ্যভাগ সমতল ভূমি। "সানফ্রানসিস্কো বে" প্রশান্ত মহাসাগর থেকে জলের স্রোতকে বয়ে নিয়ে এসেছে শহরের চারপাশে অথবা সানফ্রানসিস্কো শহরটি গড়ে উঠেছে এই বে এরিয়া-তেই। এখানকার আবহাওয়া সারাবছরই অত্যন্ত সুখদায়ক। আমেরিকার কোনো প্রদেশে এতো সুন্দর প্রাকৃতিক শোভা ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া নেই। এজন্য মধ্যাঞ্চলের (৬০০ কি.মি. বা ৩৭৫ মাইল) সমতল ভূমিতে বহুলোকের বসবাস। মাটিও এখানে ভীষণ উর্বর। শ্যামল জমিগুলিতে এক্সটেন্সিভ কাল্টিভেশন হয় অর্থাৎ আমাদের মতন ছোট 'আল' দিয়ে জমিগুলি বিভাজিত হয়নি। বিশাল প্রান্তর শুধু সবুজ আর সবুজ আর তার মধ্যে হাজার হাজার ফোয়ারা বা ঝর্ণা লাগানো, যা জল দিচ্ছে সময় সময়। জমির সব কাজই করে মেশিন। কিন্তু চাষীও ভীষণ পরিশ্রমী। বিশেষত "নাপা" ভ্যালি এরিয়া তে গিয়ে আঙ্গুর ফলের চাষ ও তাঁদের কাজ দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। ট্যুরিস্টরা এই আঙ্গুর ক্ষেতের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আলাপ করেন তাদের সঙ্গে জায়গায় জায়গায় তারা আবার আঙ্গুর থেকে তৈরী রকমারি ওয়াইন টেস্ট করবার জন্য সেন্টার খুলছেন। এখানে একজন বাঙালি ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ হল যিনি একজন আমেরিকানকে বিয়ে করেছেন। সন্তানহীন এই দম্পতি ঐ নিরিবিলি অঞ্চলে অদ্ভুত শান্তিময় পরিবেশে প্রকৃতির কোলে শুধু একজন আর একজনের পরিপূরক হয়ে কখনও আঙ্গুর ক্ষেতে কখনও রঙ তুলি হাতে পাহাড়ের কোলে বসে নিস্তব্ধতার মধ্যে বার্ধক্যের বারাণসী রচনা করেন। আমেরিকান ভদ্রলোক ভীষণ আমুদে। এক সময় কলকাতায় ছিলেন। ভদ্র মহিলা অপূর্ব ছবি আঁকেন। কোনো দাম পাবার আশায় বা নাম কামাবার তাগিদে নয়। মাঝে মাঝে ছবিগুলি নিজের বাগানে সাজান অতি সুন্দরভাবে এবং পাড়া প্রতিবেশীরা ইচ্ছে হলে কিনে নিয়ে যান। আঙ্গুর ছাড়াও এই সমতলভূমিতে লেবু, ধান, কমলালেবু প্রচুর পরিমাণে হয়। তাই ক্যালিফোর্নিয়ার ফলের রস ও স্যালাড এতো সুস্বাদু। সানফ্রানসিস্কো এবং তার আশপাশের জায়গাগুলি অনেক বার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে পাহাড়ের থাকে থাকে খাঁজে নতুন রাস্তা ও শহর। উঁচু নিচু এই রাস্তায় ট্রাম চলে। শহর জুড়ে নানা জাতের নানান লোক। "চায়না টাউনে" অসংখ্য চীনা দোকান এবং রেস্টুরেন্ট। তারই মধ্যে খুঁজে বের করেছি আমাদের প্রাণের প্রিয় রামকৃষ্ণ মিশনটি। "ঠাকুর, শ্রীশ্রীমা, বিবেকানন্দের পাশে সেখানে যিশুখ্রিষ্ট এবং বুদ্ধদেবের ছবি। ফুলের বাগানে সাজানো কথামৃত, লীলাপ্রসঙ্গ। লাইব্রেরি ভরা ঠাকুর ও মায়ের ছবিতে। সেই মহিমান্বিত রামকৃষ্ণ মিশনে আমেরিকান সাধু ও সাধুনীরা কী সুন্দর গভীর ধ্যানে মগ্ন। গানে আরতিতে মুখর পরিবেশটি এতোই মনোরম যে মনে হয় জয়রামবাটি বা কামারপুকুরে বসে আছি। ক্যালিফোর্নিয়াতে বিবেকানন্দ এসেছিলেন এবং তাঁর ভাব প্রেরণায় পরে এগুলি গড়ে উঠেছে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কেন্দ্র রূপে। শিকাগোতে প্রথম তিনি যে বাড়িতে ছিলেন বা যে হলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেই 5423 South Hyde Park Blvd, Chicago তে গিয়ে এতো আনন্দ পাইনি যত ক্যালিফোর্নিয়ার এই আশ্রম দুটির পরিবেশে পেয়েছি। (Vedanta Society of Berkeley 2455 Bowditch Street Berkeley, California 94704 2429 এবং অন্যটি Vedanta Society of Northern California, 2323 Valle jo St. Sanfransisco 94123)।
ক্যালিফোর্নিয়ার এই বে অঞ্চলটি সারা বিশ্বে Silicon Valley নামে বিখ্যাত। এখানেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার কোম্পানি। এগুলি সম্বন্ধে কিছু কথা বলার আগে অতীতের দিকে একটু তাকিয়ে দেখি। ১৮৫০ সালে এই প্রদেশটি Statehood পাওয়ার আগে ১৮৪৬ - ৪৮ সালে Mexican - American War হয়েছিল এবং তার পরেই Mt. Whitney (Sierra Nevada) তে আবিষ্কার হয় সোনা। এই সোনা যারা সেই সময় যত সংগ্রহ করতে পারে তারা তত বড়লোক হয়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই ধনী পরিবারের সন্তানেরাই তৈরী করেন আমেরিকার বিভিন্ন উদ্যোগ। স্থাপিত হয় বিখ্যাত গবেষণাগার, সংগ্রহশালা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। আবার বিংশ শতাব্দীতে তারাই টাকা ঢালতে থাকেন এক অদ্ভুত নতুন যন্ত্রদানবের উত্তরোত্তর উন্নতিতে। ১৯৯৯ তে যখন ঐ অঞ্চলের কম্পিউটার কোম্পানীগুলি দেখি তখন IT ইন্ডাস্ট্রিতে Boom এসেছে। ভগবানের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে এই সিলিকন ভ্যালি তখন আবার একবার চমকাচ্ছে সোনা নয় হীরের ঝলকানিতে। টাকা উড়ছে হাওয়ায়। ছোট খাটো প্রোগ্রামার থেকে বড় বড় গবেষক ও ব্যবসাদার তথা Venture Capitalist হয়ে যাচ্ছে ধনকুবের। আলাদীনের প্রদীপ ঘষে কম্পিউটার "জিন" মানে সেই দানবের ছোঁয়ায় দেশ বিদেশের ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানীর দোকানদার লালে লাল হয়ে যাচ্ছে। বহু ভারতীয় Brain drain হয়ে সিলিকোন ভ্যালি তে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে।
হটাৎ এলো ৯/১১ এর সেই বিরাট ধাক্কা। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দুটি এক সঙ্গে ধ্বংস হয়ে সমগ্র আমেরিকাকে আপাদমস্তক ঝাঁকিয়ে দিল। তারপরে ইরাকের যুদ্ধ। অর্থনীতির দুরবস্থার কোপ পড়লো সবচেয়ে আগে এই শিল্পের ওপর। সব আশীর্বাদ অভিশাপে পর্যবসিত হয়ে হাজার হাজার কোম্পানী বন্ধ হয়ে গেল। আতঙ্কবাদীদের একদিনের আক্রমণের বলি হল লক্ষ্য লক্ষ্য ছাত্র বিজ্ঞানী তথা সাধারণ মানুষ। কোম্পানীগুলির সুবৃহৎ অট্টালিকাগুলি হয়ে গেল কর্মহীন। সব হয়ে গেল শূন্য। কম্পিউটার চিপস তৈরির mother machine বানাবার সুবিশাল সেই কারখানাগুলি প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। আমেরিকা বিদেশী ছাত্রদের খুব তাড়াতাড়ি ঋণ দিয়ে মাকড়সার জালে আবদ্ধ করে দেয়। তাই ধার নিয়ে বাড়ি গাড়ি কেনা তরুণ তরুণীরা পড়ে গেল অথৈ জলে। এরকম হটাৎ চাকরি চলে যাওয়া কয়েকটি ছেলে মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি বা তার আশে পাশে স্যানিভেল, সানহোসে (সান Jose কে spanish এ হোসে বলা হয়) শহরে। কেউ অবসাদে ভুগছে, কেউ তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে গেছে জলের দরে বাড়ি গাড়ি বিক্রি করে। ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখলাম অনেক শান্তি প্রেমী মানুষকে যাঁরা পোস্টার হাতে নিয়ে যুদ্ধবিরোধী শ্লোগান লিখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন এবং পথচারী লোক ও গাড়িরা হর্ন দিয়ে তাঁদের সমর্থন জানিয়ে চলে যাচ্ছে।
দক্ষিণ ক্যালিলিফোর্ণিয়া অঞ্চলে অবস্থিত লস এঞ্জেলেস অর্থাৎ হলিউড। আমাদের বলিউডের মতই হাজার রকমের চিত্রপ্রেমী টেকনিশিয়ান, অভিনেতা ও এক্সট্রা এবং গুন্ডার বাস সেখানে। এরা শিক্ষা দীক্ষার অভাবে চুরি ছিনতাই খুন জখম রাহাজানিতে লিপ্ত থাকে। বিদেশিদের প্রতি কিছু লোকের খুবই রাগ ও ক্ষোভ, কারণ এখানে ৬০% চীনা এবং বাকি ২০% এশিয়ান অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ইত্যাদির লোক। এখানে ভালো ভালো চাকরি ব্যবসা থাকতেও তারা সুযোগ পাচ্ছে না। তাই তারা ক্ষুণ্ণ। তারা পড়াশোনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে অক্ষম তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ নিষেধ।
এবার আসুন এই ক্যালিলিফোর্ণিয়াতে আলাপ পরিচয়ে মুগ্ধ করে দেওয়া একজন মায়ের কথা, শোনাই। তাকে পেয়েছিলাম এই Bay এরিয়া-র বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় Sanford-এ, যাকে আমি পরে "ভিক্ষা মা", বলে চিহ্নিত করেছি।
আমেরিকান ভিক্ষা মা
(“আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী)
উজ্জ্বল সোনার বর্ণের ঝলমলে রোদ্দুর, মিষ্টি মধুর কনকনে ঠান্ডা হাওয়া চারিদিকে গাঢ় সবুজ, চিকন শ্যামল গাছপালা, লাল হলদে বেগনী ঘাসফুলে ঢাকা পাহাড়ের সারি, তার কোলে সাগর তটের শুভ্র বালিয়াড়ি নিয়ে আমাদের পশ্চিম ভারত বা আন্দামানের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যযুক্ত আমেরিকার পশ্চিম প্রদেশ ক্যালিফোর্নিয়া। তার মধ্যভাগে সানফ্রান্সিসকো-সিলিকন ভ্যালি এবং অনতিদূরেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম "স্ট্যানফোর্ড"। সেখানে পৌছেই মনে হল যেন প্রাচীন ভারতের কোনো তপোবন বা গুরুকুল আশ্রমে এসে পড়েছি। বাইরে থেকে দেশটার চাকচিক্য জাঁকজমক উৎকট উল্লাস যতটা দৃষ্টিকটু লাগে শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে তার ঠিক বিপরীত ভাব। সাদা-কালোর বৈষম্য এবং বিধ্বংসী মারণাস্ত্র বানাবার জন্য এই জাতি শান্তিকামী মানুষের অভিশাপ কুড়িয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প বাণিজ্য সবদিক দিয়ে তাদের উন্নতির কারণ এই বিখ্যাত বিদ্যালয়গুলির অনবদ্য পরিবেশ। কত বিশ্বামিত্র আর্যভট্ট, ধন্বন্তরী বা খনা লীলাবতীরা যে সমগ্র বিশ্ব থেকে একত্রিত হয়ে এখানকার জ্ঞানভান্ডারের সুধারস পানে লিপ্ত তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। নোবেল প্রাইজ অস্কার প্রাপ্ত স্বনামধন্য প্রতিভাসম্পন্ন সেই গুরুকুলের অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের ব্যবহার, শিষ্যদের আক্ষরিক অর্থে সাহায্য তথা guide করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সেই ঋষিতুল্য অধ্যাপকদের সহধর্মিণীরা আবার শুধু ছাত্রছাত্রীদের খবরাখবর নিয়েই শান্ত থাকেন না। (তারা অনেকেই) দুরাগত বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের সব রকম সাহায্য করে "নতুন মা" হবার আগ্রহ প্রকাশ করেন ইনটারনেটে। যে সব ছাত্ররা নতুন দেশে একেবারে অচেনা পরিবেশে এসে নানা রকম অসুবিধা ও অস্বস্তির মধ্যে পড়েন তারা যতদিন না হস্টেল পাচ্ছেন ততদিন নিজেদের বাড়িতে রেখে আপ্যায়িত করতে ছাড়েন না এই মায়েরা। এরকম একজন "Home stay mother" “মিসেস চুলা"। স্বামী হুভার্ট (Huvert) Stanford University র অধ্যাপক ছিলেন। ফরাসি ভাষায় 'চুলা' মানে "খুকি"। এই 'চুলা' ৬৫ বছর বয়সেও সত্যিই ছোট্ট খুকীর মতন সরল, সহজ, অমায়িক স্বভাবের মহিলা। নিজে আমেরিকান হলেও সারা বিশ্বের ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের তিনি অসাধারণ মহত্বে, ও আন্তরিকতায় একান্ত আপন করে নিয়েছেন। তাঁর মতন আরো অনেক "Home stay mother" আছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। যারা একসঙ্গে মিলিত হন “স্টানফোর্ডের" 'International Bechtel Centre'- এ। নানা ধরনের আলোচনা হয় সেখানে। দূরাগত ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা অসুবিধা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে আলোচনা করা হয় এবং যে কোনো সাহায্য দেবার জন্য তাঁরা হাত বাড়িয়ে দেন বিশ্বস্ত বন্ধুর মতন। ভারতীয় ছেলেরা এই 'Centre' এ একত্রিত হয়ে হোলি, দেওয়ালি, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান করে আনন্দ পান, পাকিস্তানী বা অন্যান্য মুসলিম দেশের ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চিন্ত মনে নির্বিঘ্নে কোথায় নামাজ পড়বে এবং নামাজ পড়ার আগে কোথায় হাত পা ধোয়ার জল পাবে সে বিষয়েও তাঁরা লক্ষ্য রাখেন। এই বেকটেল ইনটারন্যাশনাল সেন্টারে জাপানি, কোরিয়া, চীনা ছেলে মেয়েদের ইংরেজি ভাষা, রান্না অপেরা গান বাজনা, নাচ ও যোগ ব্যায়াম শেখবার সুযোগ করে দিতেও তাঁরা সর্বদা আগ্রহী।
ভিক্ষে দেওয়া মা - ছেলে আমাকে যখন তার পরম প্রিয় এই Home stay mother - এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল তখন তাঁর অকৃতিম আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের ভিক্ষে মায়েদের কথা। পৈতের দিন প্রথম "ভিক্ষে" প্রদান করে তিনি যে সন্তানটিকে নিজের বলে কোলে টেনে নেন, তার প্রতি অগাধ স্নেহ ও দায়িত্ববোধ তাঁকে নতুন সম্মানে গৌরবান্বিত করে সেই কথা শৈশবে নিজের মাকে দেখে অনুভব করতাম। এখানেও ব্রহ্মচার্য্য পালনে আগত শিষ্য ছাত্র যেন গুরুকুল আশ্রমে গুরু পত্নীর স্মরণে এসে ধন্য এবং নিশ্চিন্ত হয়। প্রথম সাত দিন ধরে এই "ভিক্ষেমা" তাকে নিয়ে ম্যাপ দেখিয়ে চিনিয়ে দেন শিক্ষালয়ের বাজার, দোকান, লাইব্রেরি, ক্যান্টিন। কিনে দেন অতি প্রয়োজনীয় নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিষ যেমন - সাইকেল, কুকার, খাদ্য সামগ্রী। সাবধান করেন শহরের নিষিদ্ধ স্থানগুলির সম্পর্কে। বুঝিয়ে দেন বিদেশে আগত নতুন ছাত্রদের ছোট ছোট সমস্যাগুলির সমাধান কিভাবে করতে হয়। এছাড়া জন্মদিনে বা যে কোন আনন্দ উৎসবের দিনগুলি পালন করতে আহ্বান করেন পরম আগ্রহে নিজের ঘরে। এমন কি পূর্ণিমার রাত্রে চাঁদের হাসি যখন ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড় অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের ফেনিল ঢেউয়ের উপর আছড়ে পড়ে তখন তাঁরা ছাত্র সন্তানদের নিয়ে পিকনিক করতেও যান। অসম্ভব পড়ার চাপে ভারী হয়ে যাওয়া ছাত্রদের মাথার ভার হালকা করতে বা মা-বাবার জন্য মন কেমন করা তাদের দুঃখময় দিনগুলিকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিতে তাঁরা সর্বদাই ব্যস্ত। মিসেস 'চুলা'র সঙ্গে আলাপ যখন বন্ধুত্বে বদলে গেল তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম - "এইসব ছেলে মেয়েদের জন্যে এতো করো, তারা কি পরে মনে রাখে? চিঠি পত্র দেয় দেশে ফিরে গিয়ে?" কারোর উপর কোনো অভিমান না দেখিয়ে স্মিত হাস্যে উত্তর দেন তিনি - 'না, সবাই রাখে না, তবে কেউ কেউ কার্ড পাঠায়। কারণ সব দেশেই এই যুগের ছেলে মেয়েরা আজকাল ভীষণ ব্যস্ত'। - 'তাহলে কেন এত করো? তোমার কি লাভ হয় এতে?' প্রশ্ন ছুড়ে দি আবার। আর তখনই শুনি এক ঝরঝরে হাসি। "গোটাটাই তো লাভ। কোন বই না পরেও সমগ্র বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের ধর্ম সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে এমন practical knowledge আর কেমন করে পেতাম বলো? তাছাড়া আমরা তোমাদের দেশের মতন অত Emotional attachment রাখি না। আমাদের নিজেদের ছেলে মেয়েরাই তো আমাদের সঙ্গে কত কম যোগাযোগ রাখে, তাই ওসব নিয়ে ভাবি না। সময় আছে কিছু কাজ করা কর্ত্যব্য। তার সঙ্গে উপরি পাওনা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সেতু রচনা"।
চুলা সংস্কৃতির সেতু - নিজে আমেরিকান। চার কন্যার জননী, সমাজ সেবিকা অসাধারণ মা। দেশ কাল জাত ধর্ম, সাদা কালোর কোনো ভেদাভেদ নেই তাঁর কাছে। তাঁর নিজের মেয়েরাও কেউ কালো মানুষ, কেউ বাদামি মেক্সিকান স্বামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। স্বামী 'হুভার্ট' ফ্রান্সের লোক। বিশ্ব শান্তির জন্যে বহু ধরণের আলোচনা সভায় যোগদান করেন। ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতায় বহু ভাবে সোচ্চার হন। পেশায় ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। একসময় "রুড়কী ইউনিভার্সিটিতে Visiting Prof. হিসাবে বেশ কিছুদিন ভারতে কাটিয়ে যাওয়ায় ভারত বন্ধু। চুলার কাজে সর্বদায় উৎসাহ দেন এবং বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের শুধু নয় তাদের মা-বাবাদের সঙ্গেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে মেলামেশা করেন। ভারতীয় ছাত্র "সিজার সেনগুপ্তর" বিবাহ উপলক্ষে চুলা দিল্লী আসেন এবং বিয়ের আগের দিন পৈতের সময় বাঙালি আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে বসে সব কাজে সাহায্য করতে থাকেন। পুরোহিত মশায় জিজ্ঞেস করেন ভিক্ষে মা কে হবে? এদিকে আসুন। সিজার তখন বলে "চুলা" আমার "Home stay mother" যখন তিনি এখানে উপস্থিত তখন তাঁকেই আমার "প্রকৃত ভিক্ষেমা" রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। চুলাকে ব্যাপারটা ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলা হলে, সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিত মশায় যে তাকে এরকম একটা ধর্মীয় ব্যাপারে যোগ দিতে অনুমতি দেবেন তা সে একেবারেই আশা করতে পারেনি। "প্রথম আমেরিকান ভিক্ষামা" হবার অধিকার পেয়ে সে মুগ্ধ কৃতজ্ঞ ("O I am obliged, charmed") ধন্য হয়ে যায়।
আর একটা কথা মনে পড়ছে। আমরা বাঙালিরা মনে করি যে, বাঙালি শ্বাশুড়ি-জামাইদের সম্পর্কই বুঝি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে মধুর ও সম্মান জনক - স্নেহ ভাজন সম্পর্ক। কিন্তু আমেরিকায় থেকেও হুভার্ট তার ৯৩ বছরের বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে যে ভাবে সেবা করেছেন তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এই তুলনাহীন মানুষ দুটির কথা বলে শেষ করা যাবে না।
ভিক্ষা করতে বাধ্য যে ভিক্ষা মা - এরপর পল অ্যালটোতে চুলার বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় চোখে পড়লো, ক্যাল ট্রেন এর ছোট স্টেশনের টিকিট ঘর। সেখানে অতি সুন্দর একটি দেওয়াল চিত্র। ছবিটি দেখেই মনে হল এই Wall painting টি ধ্যৈর্য্য ধরে যিনি বানিয়েছেন - তিনি নিশ্চয় একজন বড় মাপের নামী দামী শিল্পী। প্রতিটি তুলির আঁচড়ে যার আনন্দের তথা নৃত্যরতা শিশু কন্যাদের উচ্ছাসের অভিব্যক্তি। শিল্পী নিজেও নিশ্চয় প্রাণ চঞ্চল কোন তরুণী হবেন। চুলা কোন কিছু কিনতে একটি দোকানে গিয়েছিলেন। আমাকে মন দিয়ে দেওয়াল চিত্র নিরীক্ষণ করতে দেখে বললেন - "ভালো লাগলো ছবিটা? আলাপ করবে নাকি শিল্পীর সঙ্গে"? বললাম - "নিশ্চয়। কিন্তু তিনি রাজি হবেন আমার মতন একজন সাধারণ মহিলার সঙ্গে কথা বলতে"? - চুলা মুচকি হেসে গাড়ি ঘোরালেন - স্টেশনের অন্য পাশে। রবিবারের সকাল। চার্চের পাশেই ছোট একটি মাঠ, টেবিল চেয়ার পেতে বা বেঞ্চে বেশ অনেকজন বিভিন্ন ধরণের ছিন্ন ভিন্ন পোশাক পরিহিত সাদা ও কালো মানুষ। শিল্পীরা সামনে টুপি উল্টে রেখে রাস্তার লোককে আকৃষ্ট করছে, নিজেদের শিল্প প্রতিভার নমুনা পেশ করে। কারোর হাতে গীটার, কারো মুখে 'স্যাক্সোফোন'। কেউ ভিক্ষে চাইছেন না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে সবাই ভিখারি। আমাদের দেশের কানাই বলাই বা মোহন বাউলের মতন গান বাজনা শুনিয়ে কিছু রোজগারের আশায় একত্রিত এখানে। তাঁদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে ফ্রি-তে চা কফি খাওয়ানো দোকানদারের পাশেই দেখলাম একটা টেবিলে বসে আপনমনে ছবি এঁকে চলেছেন - একজন বিশাল মোটা বেঁটে কালো মহিলা পঞ্চাশোর্ধের। অত্যন্ত দরিদ্র শিল্পী "আলমা"। চুলা কাছে যেতেই একগাল হাসি, হাত দুটি জড়িয়ে ধরে কি আবেগে চুমু খাওয়া, সুদূর ভারতবর্ষ থেকে একজন ছাত্রের 'মা' তাকে দর্শন করতে এসেছে শুনে সে কি আনন্দ! আমি তার আঁকা ছবির প্রশংসা করায় একেবারে বাচ্চার মতন গদগদ। তারপর একবারে ঘরেলু প্রশ্ন - "ছেলে মেয়ে ক'টি? তুমি কি করো? স্বামী ছেড়ে দিয়েছেন না সঙ্গে থাকেন"? এবং আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই শোনাতে লাগলেন নিজের কথা। জানো আমার স্বামী আমায় ছেড়ে দিয়েছে, মেয়ে বিয়ে করে চলে গেছে জ্যামাইকা। ছেলে খুব বুদ্ধিমান, গ্রেহাউন্ড বাসের চালক, অনেকদিন পরে পরে তাকে দেখতে পাই, এবার খ্রিস্টমাসে আসবে। সে এলে তাকে বলবো ইন্ডিয়া থেকে আমার friend এসেছিল। আনন্দে আবেগে একসঙ্গে অনেক কথা বলে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিল সেই গর্বিত শিল্পী মা। কেন জানিনা, আমাদের গ্রামের "পদী পিসিমার" মতন বড় অসহায় লাগলো তাকে। সরকারী সেল্টার হোমে বিনা পয়সায় থাকার সুযোগ পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞ। কোন ক্ষোভ, অভিযোগহীন, অসুস্থ নিঃস্ব শিল্পী স্কুলের বাচ্চাদের বা চুলার মতন হেল্পফুল ফ্রেন্ডসদের সহায়তায় কোন রকমে নিজের অস্তিত্বটা টিকিয়ে রেখেছেন। বেঁচে থাকাটাকে কিন্তু কষ্টকর মনে করেন না তিনি আর। "ভিক্ষে (করা) মা" হলেও নিজের আত্মার আনন্দ প্রকাশ করে চলেন তার আঁকা ছবির মধ্যে দিয়ে। শিল্পী "আলমা"কে জড়িয়ে ধরে আমার অন্তরের সমস্ত সত্তা ধন্য হয়ে গেল। গ্রামের বিধবা নিঃসহায় ধন সম্পদহীন পদী পিসিকেও দেখতাম ঠিক এইরকম অকারণ আনন্দে কাঁথায় মোটা পারের সুতো দিয়ে তুলতেন কত রকমের নকশা। উঠোনে দিতেন অপূর্ব আলপনা। আর সব দুঃখ অবজ্ঞা সহ্য করে রোদে বসে দিতেন গহনা বড়ি।
উষ্ণ পরশের ভিক্ষা কাঙাল বিদ্ধাশ্রমের ভিক্ষে মা - সাধারণ বাঙালি মধ্যবৃত্ত গৃহবধূ। ভ্রমণ বিলাসী টুরিস্ট হয়ে বড় বড় দর্শনীয় স্থান দেখবার চোখ বা মন নেই আমার। সর্বদা খুঁজে বেড়ায় সমান মানসিকতার বন্ধু যেখানে মাতৃ হৃদয়ের আকর নিয়ে স্ত্রী, বৌদি, ভগ্নি মহিলামহলের সুখ দুঃখের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবো শুধু এমন অন্দরমহলেই ছুটে যেতে চাই বারেবারে। এতদিনে চুলাও আমার মন বুঝে গেছে। তাই এক প্রভাতে তার ফোন বেজে উঠল। চন্দনা চলো তোমায় বৃদ্ধাশ্রমের শিশুদের দেখাতে নিয়ে যাব। 'বৃদ্ধাশ্রম বা হোমের' ধারণাটি এখন আমাদের দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। একটু উচ্চবিত্ত সমাজে ওটা একটা জলভাতের মতন ব্যাপার। তবু এদেশের বুড়িমাদের দেখতে পাওয়ার সুযোগটা এত তাড়াতাড়ি এমনি ভাবে এসে যাবে ভাবতে পারিনি।
সুন্দর পাহাড়ি টিলার ওপর লম্বা লম্বা গাছে ঢাকা এক অপূর্ব স্বর্গোদ্যান। ভেতরে বাগান, ঝর্ণা-শুভ্র বিছানা বইঘর ছবির মেলায় অনেক ফোকলা শিশুর ভিড়। তারা কেউ অতি শীর্ণকায়, কেউ বিশাল বপু নিয়ে চলৎশক্তি রোহিত। তাঁদের তত্বাবধানে ব্যস্ত কালো মেয়ে ও ছেলে সেবক সেবিকার দল। কি অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধার মায়া মাখা করুন মুখগুলি। আমরা কার Visitor জানার দরকার নেই। আমাদের আগমনে যেন সারা বাগান চঞ্চল হয়ে উঠল। হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে কাছে এসে কুঞ্চিত চামড়া প্রশস্ত করে তারা একগাল হেসে আমাদের উইশ করছেন। কেউ বা বিরক্ত আরামের ঝিমুনির রেশ কেটে যাওয়ায়। চুলার মা ৯৩ বৎসরের বৃদ্ধা যেন একটি নরম তুলোর পুতুল। ৯০ বছর অবধি নিজে গাড়ি চালিয়েছেন, নানান রকম সমাজ সেবার কাজে ব্যস্ত থেকে জীবনকে উপভোগ করেছেন। এখন পা অক্ষম হয়ে যাওয়ায় Nursing cum home এ আসতে বাধ্য হয়েছেন। এই মমতাময়ী কন্যা চুলা এবং তার ফরাসি জামাই স্নেহপ্রবণ ৬৮ বৎসরের পুত্রসম হুভার্ট প্রায় প্রতিদিন একবার করে আসেন এই স্মিত হাস্যময়ী বৃদ্ধার কাছে। এই বয়সেও যাঁর বিন্দুমাত্র স্মৃতিভ্রম হয়নি, আরো হাজারো শান্তিকামী স্থিরবুদ্ধি মানুষের মতন ২০০০ শতাব্দীতে পদার্পন করা পৃথিবীর প্রতি - নব্য যুবা সম্প্রদায়ের প্রতি দারুন আশাবাদী। হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসলীলা যিনি স্বামীর সঙ্গে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছেন, বহু প্রিয় আত্মীয় বন্ধুদের যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধখেলায় অকারণে হারিয়েছেন - তাঁর কোলের কাছে বসে মন প্রাণ শান্ত স্নিগ্ধ আনন্দিত হয়ে গেল। জীবনের উজ্জ্বল সুন্দর সুকোমল দিকটার প্রতি সর্বদা দৃষ্টি দেওয়ার উপযোগী আশাবাদী মনোভাব জেগে উঠল। আর আমার উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে তিনিও হলেন তৃপ্ত। প্রকৃত মূল্যবোধের দীক্ষায় দীক্ষিত করার জন্য আমাদের ভারতবর্ষের কোণে কোণে এই রকম অনেক ভিক্ষা মায়েরা অপেক্ষা করছেন যাঁরা স্কুল কলেজের ডিগ্রিধারী না হয়েও প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষিতা। কিন্তু তাঁদের কাছে দুদন্ড বসে মনের কথা বলার বা শোনার সময় নেই আমাদের। তাই দূরদর্শনের পর্দায় অথবা চিত্রকথার পত্রিকায় চোখ সেঁটে বসে আছি, আমরা সত্যিকারের জীবন থেকে পালিয়ে গিয়ে।
এরপর এমন একজন ভিক্ষে মায়ের সঙ্গে চুলা আলাপ করিয়ে দিলেন যিনি ভোগীর দেশে ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিতা এক মহিয়সী সাধিকা কর্মচঞ্চল, সদ্য হাস্যময়ী প্রচার বিমুখ ফ্রান্সিয়া আলা-র সঙ্গে। পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত ঘর সংসার স্বামী-পুত্র পরিবার নিয়ে ব্যস্ত জীবন যাপন করেছেন। তখনই তাঁর চোখ পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার এক অতি অবহেলিত অত্যাচারিত দুঃখ - পীড়িত মানুষে ভরা ছোট্ট দেশটির দিকে। নাম গুয়াতেমালা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপদে বিপর্যস্ত গুয়াতেমালার প্রায় নিঃস্ব রিক্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার মতন নির্ভীক, কর্মঠ ও সেবাপরায়ণ বন্ধু খুবই কম। এই দেশের অসহায় শিশু ও মহিলাদের কাছে পৌঁছে গেছেন - 'ফ্রান্সিয়া মা' সব বৈভব সুখের আরাম ছেড়ে। কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি হাতে (ব্যাঙ্কের চেক জোগাড় করার) ভিক্ষার পাত্র। ক্যালিফোর্নিয়ার ধনকুবেরদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ওষুধ কাপড় জামা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে তিনি পৌঁছে দেন সেই নিষ্পাপ আদিবাসী পরিবারের ঘরে ঘরে। ছেলের দেওয়া ২৩ ডলার পকেট মানি তাঁর ঝুলিতে দিতেই অশ্রুসজল চোখে জড়িয়ে ধরলেন তিনি আমায়।
অপূর্ব এক আবেশ নিয়ে ফিরলাম নিজের দেশে। আমাদের দেশেও কত 'প্রব্রাজিকা - সন্ন্যাসিনী নিজেদের নিঃস্বার্থ জীবন "ফ্রান্সিয়া আলার" মতই যাপন করছেন। কত খ্রিস্টান নান, সিস্টার, মাদার এই ভারতের গ্রামেগঞ্জে (তা সে বিহারের দুমকা হোক আর পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর বা ত্রিপুরার বনের মধ্যেই হোক অথবা নাগাল্যান্ডের পাহাড়ী চার্চে) একাগ্র মনে সেবা করে চলেছেন অসহায় দুঃস্থ মানব শিশুদের। সবাই এঁরা একই গোত্রের একই ধর্মের। সংসারের সুখ ছেড়ে কুষ্ঠ রোগীর ঘায়ে ওষুধ লাগাতে তাদের যেমন কুন্ঠা নেই, বেদনাকাতর নার্স ডাক্তারহীন সহায়সম্বল রহিত আদিবাসী তরুণী কন্যার মুখখানি বুকে চেপে ধরে ভগবানের নাম গাইতে গাইতে সদ্য জন্মলাভে ধন্য কৃতজ্ঞ নতুন প্রজন্মকে সাহস ও উৎসাহ প্রদান করতেও তাঁরা তেমনিই পারদর্শী কুশল। ভিক্ষে মায়েরা আমাদের চিরনমস্য। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমার আজকের এই ভ্রমণ কাহিনী উৎসর্গিত হল।