চন্দনা সেনগুপ্ত

- ডাক্তারবাবু নমস্কার।
- আরে আরে আসুন ভবেশবাবু, কি হলো? এতো বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন? আবার জ্বর বাঁধালেন নাকি?
- না না টেম্পারেচার তো আসেনি তবে বড় দুর্বল লাগছে, মাথা ভার, বুক ধড়ফড়, কি হলো ডাক্তারবাবু কিছু বুঝতে পারছি না।
- দেখি দেখি হাতটা, জিভ কুঁচকে অমন করে চোখটা টিপছেন কেন? রিলাক্স, হুঁ, সেরকম তো কিছু মনে হচ্ছে না।
আড়ষ্ট শরীরটা ডাক্তারের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে মিয়ানো গলায় ভবেশবাবু বললেন, কোনো কাজ ভালো লাগে না, খাবারে স্বাদ পাই না, মাঝে মাঝে হাত পাও ঝিম ঝিম করে।
ডাক্তারবাবু সদা হাস্যময় মানুষ অনেকদিন ধরে একই পাড়ায় দুজনের বাস, ছেলেদের হাম, চিকেনপক্স, মাম্স, মেয়ের হুপিং কাশি, স্ত্রীর আমাশা, অম্বল, বোনের পেটে ব্যাথা, ভাইয়ের এলার্জি, বাবার হাঁপানি, মায়ের পা ফোলা, সব কিছুতেই ভবেশবাবু সমব্যাথী, দুঃখভঞ্জন "হরির" মতন এই পরিবারের সব লোকের কষ্ট দূর করতে ছেলে, বুড়ো, বৃদ্ধা, প্রৌঢ়া সকলেরই পরম বন্ধু তিনি।
প্রেসার চেক করে, লিভার আর গ্ল্যান্ডগুলো সব টিপে-টুপে বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন - নাঃ কিছু হয়নি আপনার। মেয়েদের মেনোপস আর ছেলেদের এই মানে.... মানে এই প্রৌঢ়ত্বের সীমায় বয়সটা এলে, সবাইকার একটু আধটু এরকম হয়। অতো ঘাবড়াবেন না।
- একটা ভালো ওষুধপত্র কিছু লিখে দিন না আপনি, তাহলে নিবু নিবু প্রদীপের শিখাটা হয়তো আবার জ্বলে উঠবে - হতাশ গলায় ভবেশবাবুর আকুতিটা শোনালো বাচ্চা বেড়ালের মিউ মিউ আওয়াজের মতন।
- আরে রাখুন তো মশাই, ওষুধপত্র। কি করবেন আমার ওষুধগুলো? বিনা কারনে গিলবেন? আগে তো আপনি এরকম হাইপোকন্ড্রিক ছিলেন না মশাই, আজকাল হলোটা কি?
- অন্ততঃ একটা "টনিক" দিন না ডাক্তারবাবু - স্নায়ুগুলো বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। মেয়েটা অফিস থেকে দেরী করলে, কেমন পাগল পাগল হয়ে যায়। ছেলের বন্ধুরা হঠাৎ ছেলেকে ডেকে নিয়ে গেলে ভয় লাগে, মনে হয় রাজনীতির কোনো চোরাবালিতে পড়লো না তো ছেলেটা।
- স্ত্রীর সঙ্গেও কথায় কথায় ঝগড়া, আমি কি সাইকোলজিস্ট দেখাবো?
এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো ডাক্তারবাবুর। না আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না দাদা। এবার যা বলি মন দিয়ে শুনুন, শহুরে জীবনের এক ঘেঁয়েমীতে আপনার শরীর মন ক্লান্ত হয়ে গেছে। কোনো "টনিক" আপনাকে এখন চাঙ্গা করতে পারবে না। আপনি এক কাজ করুন, মিসেস কে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসুন কিছুদিনের জন্যে। আপনার "টনিক" হচ্ছে খোলা হাওয়া। সব সবুজ গাছ-পালা কিম্বা নদী-নালা। সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসুন ফ্রেশ হয়ে আসবেন।
অরে ডাক্তারবাবু ওসব জায়গায় যাওয়ার ঝামেলা কত জানেন? ট্রেনের টিকিট, হোটেল বুকিং, বাক্সপ্যাঁটরা গোছানো। স্ত্রীর পানের বাটা নেই মায়ের মতন ঠিকই, কিন্তু জামাকাপড়, স্নো-পাউডার, লিপস্টিক থেকে চুলের কলপ, নিভিয়ার বোতল, শ্যাম্পু-সাবান বিরাট লিস্ট সমেত জিনট্যাক-ফিনট্যাক সব ওষুধপত্র গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চারটিখানি কথা? এর চেয়ে একটা "টনিক" খেয়ে জোরটা বাড়িয়ে নিলে ভালো হতো না ডাক্তারবাবু?
- না হতো না। আপনাকে এবার কিছুতেই আমি ওষুধ দেবো না, যান বেরিয়ে আসুন।
- ডিসেন্ট্রি রুগীর মতন পাঁচন খাওয়া তেতো মুখে, ভিজে বেড়ালের মতন চুপসে যাওয়া ভবেশবাবু বাধ্য হয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়তেই ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, আরে বাবা অতো টেনশন করছেন কেন বলুন তো? গ্রাম সাইডে কোনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িও তো কাটিয়ে আসতে পারেন। লাইফে মোনোটোমি কাটাতে মাঝে মাঝে চেঞ্জে যেতে হয়।
- দেখি! কি যে করি! - রাস্তায় নামলেন ভবেশবাবু।
বাড়িতে এসে অবশ্য অত ন্যাকা সেজে থাকা যায় না, কারন শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু সুকুমার রায়ের সিদ্ধান্ত তাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় - "কাউকে বেশী লাই দিতে নেই, সবাই চড়ে মাথায়"। তাই ছেলে পিলে বা স্ত্রীকেও তিনি কোনো দিনই মাথায় তুলতে রাজি নন, কিন্তু এখন এই অকারণ বিমর্ষতা তথা "ডিপ্রেশন"-এ ভুগতে শুরু করে মাঝে মাঝে একটু নিরীহ ছাগলের মত বোকা বোকা ব্যবহার করে ফেলছেন। বাড়ি ফিরেই বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে খানিকটা জল দিয়ে এসে একটু যেন ধাতস্ত হলেন, এবং অন্য দিনের মতন চা নিয়ে কাছে দাঁড়াতেই স্ত্রীর হাতটা ধরে ফেললেন অকস্মাৎ। একটু গদ্গদভাবে বললেন-
- গ্রাম সাইডে মানে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের সেরকম কোনো আত্মীয় টাত্মীয় আছে না কী গো?
- সে রকম মানে? কি রকম? কাদের কথা বলছো? - হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে স্ত্রী মলিনাদেবী ওদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিয়ে আশ্বস্ত হলেন - না কাজের মেয়েটা রান্না ঘরের ভেতরে, হাত ধরাটা দেখে ফেলেনি।
- সে রকম মানে এই ধরো যাদের কাছে গিয়ে দু-চার দিন একটু আরাম করে কাটানো যায়।
- কেন? হটাৎ গ্রামে যাওয়ার কি হলো?
- ডাক্তারবাবু বলছিলেন আমার শরীরটা আবার কেমন যেন দুর্বল হয়ে গেছে তাই চেঞ্জে যাওয়ার দরকার।
- আগেকার দিনে কলকাতা থেকে "মধুপুর" "দেওঘর" কিংবা পুরী যেতাম, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে হাওয়া বদল করতে, তোমার কি সে রকমই ইচ্ছে জাগলো নাকি?
- ধরো তাই যদি হয়, তাহলে ভেবে দেখো না, কোথায় যাওয়া যায়। কারন এই বেড়ানোটা হবে আমার "টনিক"।
- তা "টনিক"ই যদি চাই তো এই দিল্লী শহরের কাছেই তো হরিদ্বার, মুসৌরি নয়তো সিমলা যাই, চলো। অনেকদিন তো সত্যি কোথাও যাওয়াই হয় না।
- না না ওসব জায়গায় আমার ভালো লাগে না, হোটেল ফোটালে থাকবো, আমার পোষাবে না।
- পোষাবে না? না টাকা খরচের ভয়ে বেরুবে না? তাই বলো। এখন তো ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে যে যার নিজের নিজের কাজ, পড়া, কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত, চলো না একটু শখ মিটিয়ে, বেড়িয়েই আসি।
- আরে ওতে আমার টেনশন আরও বেড়ে যাবে, প্রেসার তো হাই জানোই, তার ওপরে বাইরের খাবার খেলেই তো তুমি ঢেকুর তুলে তুলে মরবে - এই বয়সে ও রকম বেড়ালে কি "টনিক" পাওয়া যায়?
- হ্যাঁ, গ্রামে তোমার জন্যে সব লোকেরা "টনিক" বানিয়ে যেন বসে  আছে - যত সব ঢঙের কথা! মুখ ঝামটা দিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মলিনা চলে গেলেন রুটি করতে।
সত্যি বাবা সেই কত বছর আগে পুরুলিয়া থেকে দিল্লী চলে এসেছেন ভবেশবাবুরা এই প্রবাসেই লেখা পড়া চাকরী-সংসার নিয়ে পঞ্চাশটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, দেশের বাড়ি খুব একটা যাওয়াই হয়নি, এখন কার কাছে যাই ভাবতে ভাবতে হটাৎ মনে পড়লো, মায়ের খুড়তুতো বোন "পিতুমাসী" মানে 'প্রতিমা মাসী' ও 'সোমেন মেশোমশাই' একবার বছর দশেক আগে মা বেঁচে থাকতে 'কেদার-বদ্রী' তীর্থে যাওয়ার সময় দিল্লিতে তাঁদের বাড়ি এসে কিছুদিন ছিলেন এবং বারবার অনুরোধ করেছিলেন একবার ওনাদের গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে। অতএব শুরু হলো পুরোনো ডায়রী ঘেঁটে ওনাদের ঠিকানা আবিষ্কার। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার মতন মায়ের পুরোনো ট্রাঙ্ক, বাবার পুরোনো চামড়ার সুটকেশ, সেটারই এক কোনে বহু পাকিং বাক্সের নীচে যা চাপা পড়েছিল এতদিন ধরে তা বের করা হলো, পাশের দোকানের 'চাকর' ও 'ঝি'-এর ছেলেকে দশ দশ টাকা দক্ষিণা দিয়ে। স্ত্রী মলিনাদেবী তো রেগে গজ গজ করতে লাগলেন। এইসব লোকদের ঘরের ভেতরে ঢোকানোর জন্য। কিন্তু ভবেশবাবুও "টনিকের" সন্ধানে এবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, পিতু মাসীর গ্রামে তিনি যাবেনই যাবেন। বাবার ডাইরীতে তাঁদের সবাইকার জন্ম তারিখ বাংলায় লেখা এবং কিছু দোকানের হিসাব নিকাশ। অতীতকে হাতড়াতে হাতড়াতে হটাৎ রুপোর কৌটোতে ঠাকুমার আমলের সেই বিখ্যাত সোনার টিকলিটা পাওয়া গেল, ছোট্ট কাগজের পুরিয়া মোড়ানো, যেটার ওপর সব দিদিদেরই নজর ছিল কিন্তু মা কাউকে দেননি, বলতেন - তোদের তো অনেক দিয়েছি আবার কেন? "মলিনাও একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, যখন মা প্রায় বিছানায় শয্যাশায়ী, "মা" জবাব দিয়েছিলেন - "জানি নে বাপু কোথায় হারিয়ে ফেলেছি"। অতএব দশ বছর পরে জিনিষটির হদিশ পাওয়ায় সবাই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভবেশবাবুর ঘাড়ে। বিমর্ষতা, মাথা ধরা সব ভুলে গিয়ে খুব বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, 'সরো তো সব - আমাকে মায়ের কাগজপত্রগুলো দেখতে দাও'। যে কাগজের পুরিয়াটিতে "টিকলিটি" মোড়াছিল স্ত্রী সেটা ফেলে দিয়েছিলেন কেন্নোর মত কুন্ডুলি পাকিয়ে, ভবেশবাবুর পায়ের কাছে পড়েছিল সেটি। এতদিন যার বুকে অমূল্য ধন সমুদ্রের "মুক্তোর" মত সযত্নে রক্ষিত ছিল আজ সে অকেজো, - কুড়াদানিতে চলে যেতে হবে তাকে, কেমন যেন হতাশাগ্রস্থ হয়ে গেল মুখ হাঁ করে। ঝিনুকের মত পরে থাকা "মোড়ক"টা হাতে তুলে নিলেন তিনি, মায়ের অপটু হাতে পেন্সিলে লেখা প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া, একটা লাইন পড়বার জন্য। তাতে লেখা - পিতুর মেয়ের বিয়ের জন্য"। চমকে উঠলো সমস্ত সত্তা। এক মুহুর্ত্তে কেটে গেল নৈরাশের কালো মেঘে ঢাকা পর্দা। কাগজের টুকরোটা খুলে ভালোভাবে টানটান করলেন, হ্যাঁ পেছনে পিতু মাসীর ঠিকানা -
শ্রী সোমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, গ্রাম - সুপুর, জেলা - বাঁকুড়া
আনন্দে লাফিয়ে উঠলো হৃৎপিণ্ড। সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী 'আর্কিমিডিসের' মতন বলতে ইচ্ছে করল তার 'ইউরেকা' 'ইউরেকা'।
তারপর চিঠিপত্রের 'আদান প্রদান', সোমেন মেসোর আন্তরিক আহ্বান, টিকিট রিজার্ভেশন, "নীলাচল" এক্সপ্রেসে। স্ত্রীকেও আকৃষ্ট করলেন "পুরী" ঘোরাবার আকর্ষণ, ওখানে কিছুদিন থেকে তাঁরা জগন্নাথ দর্শনটাও সেরে আসবেন এই ফাঁকে - সেরকম প্ল্যানও একটা হয়ে গেল। ডাক্তারবাবুর চেম্বারে আবার গিয়ে হাজির হলেন তিনি। - ডাক্তারবাবু যাচ্ছি গ্রামে আপনার "টনিকের" খোঁজে, দেখি কেমন কাজ দেয়। ভবেশবাবুর মুখের চেহারা দেখে ভীষণ খুশী ডাক্তার "বরাট"।
- "আরে যাওয়ার নামে আর প্রিপারেশন-এ তো আপনার সব রোগ পালিয়ে গেছে, আধ ফোঁটা 'গোলাপের কুড়ি' মনে হচ্ছে আপনাকে। এটাই তো চাই।
নির্দিষ্ট দিনে 'জগন্নাথে'র মাসীর বাড়ী যাওয়ার মতন তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। "পুরাতন ভৃত্য" তো আর আজকাল কার দিনে তার "বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে" গিন্নি ক্ষান্ত হতে পারলেন না, হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, "আমি লাজপত নগরের সেন্ট্রাল মার্কেট এবং সরোজিনী নগরের ব্যাগ, চপ্পল আর সালোয়ার কামিজের বাজারে ঘুরে শপিং করতে যাচ্ছি, নিজের কি কি নেবে ঐ সুটকেশটাতে ভরে নাও, VIP টা আমি নেব। স্ত্রীকে চিরকাল VIP ট্রিটমেন্ট দিতে হয় একথা তিনি খুব ভালো করে জানেন। স্বামীদের জীবন যে সংসারের রঙ্গমঞ্চে স্ত্রীর সামনে কতটা গৌণ তা ভুক্ত ভোগীরা সবাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।
"নীলাচল" এক্সপ্রেসে প্রথমে বাঁকুড়া, সাতদিন পরে পুরী এবং সেখানে একসপ্তাহ কাটিয়ে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় স্বাস্থ্য ও মন পরিবর্তনের কোনো এক অজানা "টনিক" সেবন করে ফেরত আসা - এই পরিকল্পনা যোজনা বানিয়ে ট্রেনে বসলেন, ভবেশবাবু সস্ত্রীক। ভয় না টেনশন কে জানে, বুকটা ধড়ফড় করে উঠল অকারণ উত্তেজনায়। স্ত্রী তখন পাশের মহিলার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছেন অপটু স্বামীর নার্ভাসনেস নিয়ে।
গাজিয়াবাদ পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের আঁখের ক্ষেতের মধ্যে এসে ট্রেনের গতি গেল বেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সব আশংকা ভয় চিন্তাও দূরে সরে যেতে লাগল মন থেকে। সবুজ আর সবুজ ক্ষেত অবুজ শিশুদের মত মাথা দুলিয়ে যেন আনন্দে বিগলিত। বড় ভাল লাগল তাঁর। ভাবলেন ডাক্তারবাবুর কথা শুনে ভালোই করেছেন। বিভিন্ন টিফিন বাক্স খুলে ততক্ষনে বিকানীরের নমকিন, বাঁটনেয়ালী মহীয়সী মাড়োয়ারী "বহনজি" মায়াবন বিহারিণী হরিণী - পাটনার বাক্য পটিয়সী আচার, ছাতুর পরোটা চখানেয়ালী তরুণীর সঙ্গে তাঁর গিন্নি বাঙালী আলুর দম লুচি দিয়ে পিকনিক জমিয়ে ফেলেছেন। সকাল বেলায় পেপারটা পড়া হয়নি তাই সদ্য স্টেশন থেকে কেনা খবরের কাগজে চোখ বোলাতে অথবা বলা যায় এসব মেয়েলী গল্প কথা বা দৃষ্টির আড়ালে যাবার জন্য নিজের আমড়ার মত গোমড়া মুখটি ঢাকতে সবে টাইমস অফ ইন্ডিয়াটি খুলে মেলে ধরেছেন, চোখের সামনে গিন্নি এক ঝটকায় সেটি কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে আরম্ভ করলেন। "আরে করো কি করো কি"? বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন কাগজের টুকরোগুলি নেমন্তন্ন বাড়ির পাতার মতন ট্রেন পিকনিকের অতিথি সৎকারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনা-সামনি সব যাত্রী বন্ধুই পরম আনন্দে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা খাবারের স্বাদ নিতে ব্যস্ত। ছেলেরা এত তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব পাতাতে পারে না কেন কে জানে? বিশেষতঃ গল্প শুরু করলেও রাজনীতি দুর্নীতি আর ক্রিকেট প্রীতি ছাড়া যে পৃথিবীতে অন্য কোনো টপিক নিয়েও বাক্যালাপ করা যায় এ তারা ভাবতেও পারেন না। মেয়েরা কেমন মনের-প্রাণের কথা ছেলে-মেয়ে, বৌ-জামাই, ঘর-সংসার সব নিয়ে এক মিনিটেই একজন আরেকজনের হেঁসেলে, অন্দরমহলে, বেশী সময় থাকলে বেডরুমের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। স্বামীদের আলুর দোষ, পটোলের প্রীতি কিছু নিয়ে আলোচনা করতে তাদের মুখে আটকায় না। পারেও বাবা এরা বকবক করতে! ভাবতে থাকেন ভবেশবাবু।
সন্ধ্যে গড়িয়ে এলো। ছুটে পার হয়ে যাওয়া অসংখ্য জীবনমুখী কবিতা মাখা গ্রাম সূর্য্যাস্তের পর্যন্ত রোদের রক্তিম আভা, ঘরে ফিরে যাওয়া গরু-ছাগল মোষ - রাখালের দল, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীদের আকাশ থেকে গাছের বাসায় প্রত্যাবর্তন, - দেখতে দেখতে মনটা যখন উদাস হয়ে অনেক দিনের সেই ভুলে যাওয়া গানের কলিটা মনে মনে ভাঁজছেন - "দিনের শেষে ঘুমের দেশে...."
- শোনো ঘুম পেয়েছে তো বাঙ্কে শুয়ে পড়ছো না কেন।
- সব ভাবনার সুর হটাৎ ঝনাৎ করে কেটে যাওয়ায় একটু রাগত স্বরে বলে উঠলেন ভবেশবাবু "ঘুম পাবে কেন এত তাড়াতাড়ি"। তোমার জায়গা চাই তো বলো উঠে যাচ্ছি ওপরে।
- ভালো কথাই তো বললাম, অতো খেঁকিয়ে কথা বলছো কিসের জন্যে? আমি কি আমার জায়গার কথা বললাম নাকি?
- কথা না বাড়িয়ে উঠে বাথরুমের কাছে গিয়ে একটা সিগারেটে ধরালেন তিনি।
এবারে শুয়ে পড়া যাক ভেবে রাবারের বালিশটি ফোলাতে উদ্যত হলেন ভবেশবাবু। ঠিক সেই সময় মোক্ষম প্রশ্ন মলিনাদেবীর।
- মায়ের সেই টিকলিটা এনেছো নাকি?
- হ্যাঁ, ওটা আমি মাসীর মেয়েকে দেব।
- তোমার জন্যে যেন মাসীর মেয়ের বিয়ে এতদিন আটকে আছে? যদি সেই মেয়েকে না পাও তো ...
- হ্যাঁ, ওটার দিকে তোমাদের সবাইকার লোভ আছে জানি, কিন্তু মাসীর কি একটাই মেয়ে নাকি, মায়ের যখন ইচ্ছে ছিল, আমি তখন মাসীকেই দিয়ে আসবো।
- কেন? সে বুড়ি কি চিতায় যাবার সময় পরে যাবে নাকি?
- দেখো সব সময় ঐ সব বাজে বাজে কথা বলবে না। পিতু মাসী মায়ের থেকে অনেক ছোট ছিলেন, আমার চেয়ে বড়জোর পাঁচ/ছয় বছরের বড়।
- আচ্ছা আচ্ছা খুব দরদ উথলে উঠছে যে দেখছি, "টনিক" পাবার লোভে।
আর কথা বাড়ালেন না তিনি স্ত্রীর সঙ্গে। ভোর রাত্রে ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসলেন, ট্রেন থেমে আছে, যাত্রীদের শোরগোল, কুলিদের হৈ হল্লা ছাপিয়ে নিজের নামটা কানে গেল তাঁর।
- হ্যাঁরে 'ভবা' আছ নাকি এই কামরায়? কুথা গেলেক ব ডিল্লির ছা ট।
- ষাট বছরের ভবেশবাবু সোমেন মেসোর কাছে এখনও ছোট "ছা" হয়ে গেলেন, ষোলো তরুনের মতন ঝট করে বাঙ্ক থেকে নেমে কোনো রকমে চাদর টাদর টেনে গোল করে আওয়াজ দিলেন।
- মেসোমশাই এই যে আমরা নামছি নামছি।
- স্ত্রীও তখন জানলা দিয়ে দেখে নিয়েছেন স্টেশন এর নাম "বাঁকুড়া"।
দুটো কুলী উঠে পড়েছিল, তাড়াতাড়ি 'মাজী'কে ধরে নামালো তারা। ভবেশ স্যুটকেশ হাতে নিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়াতেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
"নীলাচল" থেকে ধরাতলে পা দিতে গিয়ে হুড়মুড় করে প্লাটফর্মে পড়লেন মেসোমশায়ের গায়ের ওপর।
সস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন ৭২ বছরের ফুর্তিবাজ সতেজ মানুষটি। অর্দ্ধেক রাতে স্টেশনে এসে বসে আছেন, অতিথিকে সম্বর্ধনা জানাবার জন্য আশ্চর্য্য প্রাণবন্ত, বয়সের নাগাল না পাওয়া বৃদ্ধ-যুবক। দুই শক্ত বাহুর আলিঙ্গনে ধরা দিয়ে পরম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন "ভবা"।
ভোরবেলায় সূর্য্যের লাল আভায় শালগাছে ঘেরা বাঁকুড়ার গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ ভুলিয়ে দিল সারা পথের ক্লান্তি। 'সুপুর' যাওয়ার রাস্তায় শিমুল-পলাশের মাথায় লেগেছে রঙের আগুন। পঞ্চাশ বছর, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর (দশ বছরে সেই শেষ আসা) মাসীর বাড়ী আসছেন, ভবেশবাবু আর এতগুলো বছর তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন বসন্ত ঋতুকে। "ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে, ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে -
- হুঁ তা যা বলেচ বাপ, ই রাস্তা ট বড় সোন্দর। হুই উধারে তাল ডাংরা ... ঝিলিমিলি, সিমলাপাল। দু-দিন জিরাই লে, তোদিকে "মুটুকমুনিপুরটা"ও দেখাই লিয়ে আসবো।
- মেসোমশাই-এর মিষ্টি বুলি আর কবিতার ছন্দে দোল খাওয়া গ্রামের নামগুলো ভবেশবাবুর বুকের মধ্যে যেন জল-তরঙ্গ বাজিয়ে দিল।
- মুটুকমুনিপুর লয় গো কর্ত্তা মুকুটমণিপুর বটে - ট্রেকার তথা গাড়ির চালক মেসোর ভাষা মার্জনা করতে চাইলো।
- হঁ হঁ লে তোকে আর 'বাকচাতুরী করতি হবেক লাই, তাড়াতাড়ি যেতে লাইরচু, তোর গিন্নিমাকে তো জানুস নাই অতখন দশবার ঘর বার কইরবেক।
- ট্রেকার বা জিপের চালক হর্ন বাজালো ভোঁ ভপ ভপ।
গ্রামের খোলা মেলা পরিবেশে কী যে ভালো লাগল ভবেশবাবুর তা অবর্ণনীয়, রোজ সকালে ক্ষেতের আল ধরে ধরে তাল দীঘির ধারে বেড়াতে যাওয়া, মুড়ি চপ দিয়ে জল খাবার খাওয়া, দুপুরে টাটকা মাছের ঝোল ভাত, রাত্রে বাড়ির চালে বড় হওয়া মিষ্টি কুমড়োর ছক্কা লুচি কিম্বা হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়া বড়ই আনন্দের। সন্ধ্যেবেলায় বাঁকড়ী ভাষায় গাওয়া কীর্তন, গৌরাঙ্গ মেলায় খোলের সঙ্গে পুরোনো হারমোনিয়ামের গান - "মালা কে লিলি রে? পাড়ার ছিল্যারা/গৌড় আমার কেঁইদ্যে আকুল মালা দ্যে তরা"।
একদিন শখ করে আদরের ভবাকে মেসোমশাই বেশ বাগিয়ে পরিয়ে দিলেন নিজের একখানা ধুতি, কিন্তু দিল্লীর বাবু সেটি পরে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গুলি ডান্ডা খেলতে গিয়ে পড়লেন ধড়াম করে। তাঁর সেই শিশু সুলভ আনন্দ ও পতন দেখে গ্রাম সুদ্ধ লোক তো হেঁসেই বাঁচে না।
যাবার দিন এসে গেল, ঠিক বেরুবার আগে টিকলিটি মাসীর হাতে দিয়ে বললেন ভবেশবাবু 'এটি মা তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য রেখে গেছেন'।
সেটি প্রথমে হাতে নিয়ে দেখলেন দুজনে তারপর মাথায় ঠেকিয়ে বললেন - "বৌমা ইটি তোমার শাশুড়ির জিনিষ তোমার ছিল্যার বৌ এলে দিও। আমার বিটির বিয়া তো কতদিন আগ্যে হই গ্যাছে, উয়াকে আর দিতে হবেক লাই"। মলিনার চোখে জল, স্বামী কে বললেন এতো তাড়াতাড়ি পুরীর টিকিট কেন কাটলে? আরো কিছুদিন এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে। ভবেশবাবুকে মেসো ছোট বাচ্চার মতন জড়িয়ে ধরে বললেন হ্যাঁ তাই ভালো। রিটায়ার্ড জীবন, কাজ তো কিছু নাই তোর ভবা, অখন য্যাত্যে হবেক নাই। সাত/দশ দিন আরো থাক, তারপর না হয় জগন্নাথ ধামে যাবি। পিতু মাসীমা বললেন, হ হ আমারও অনেকদিন জগন্নাথ দর্শন হয়নি, চলো না আমরা সবাই একসঙ্গে যাই। মলিনাও আদুরে মেয়ের মতন মাসীমার হাতটা ধরে গদগদ কন্ঠে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ তাহলে তো খুব মজা হয়। ভবেশবাবু কত বছর পর স্ত্রীর মধ্যে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের ভাব দেখেননি। ভীষণ ভালো লাগলো তাঁর। টিকিট ক্যান্সেল হল। তারপর ওই চারজন সিনিওর সিটিজেন মিলে পুরীর সমুদ্র সৈকত হোটেলে আরো এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন, এক অনাবিল সুখের সাগর ভাসলেন তারা, যেন শৈশব ফিরে এল আবার তাদের জীবনে। আসবার সময় মাসী মেসো নেমে গেলেন বাঁকুড়ার স্টেশনে, এবং তাদের আন্তরিকতার টনিক পান করে অশ্রুসিক্ত নয়নে  মলিনা দেবী ও ভবেশবাবু নতুন মানুষ হয়ে ফিরে এলেন দিল্লি শহরে।

Leave a comment