চন্দনা সেনগুপ্ত
হাতে "ডোনেশন" বাক্স নিয়ে ঘুরছিলাম সমুদ্রের ধারে। দেখা হল, সেই ছেলেটির সঙ্গে। শান্ত স্নিগ্ধ চেহারা, একটু তামাটে রঙ, মাথায় কোঁকড়ানো থাক থাক চুল। পশ্চিমে মুখ করে স্থির হয়ে বসে সে, বোধহয় সূর্য্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্যে। সমুদ্রের নীল জলে তখন আলোর আল্পনা। রোদের তেজ কমে এলেও চোখের গগলসটা খোলেননি তিনি। কী যেন একটা আকর্ষণ আছে ঐ বুদ্ধিদ্বীপ্ত চেহারার মধ্যে, বারবার চোখ চলে যায় তার দিকে, "বন্দর" পাহারারত "নৌ সেনাদের" একটি হেলিকপ্টার মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে খুব কাছে চলে এল, বোধহয় তার শব্দ শুনেই ওপরে তাকালেন, মুখ তুলে। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ্য করলেন, ঐ যন্ত্র পাখিটার ওড়বার গতিপথ। একটু পরে বিশাল এক মালবাহী জাহাজ ধীর গতিতে এগিয়ে এল, এই "সানফ্রান্সিসকো" বন্দরের ঘাটে, নোঙর ফেলবার জন্যে। তার ধাক্কায় বিরাট কয়েকটা দানবী ঢেউ আছড়ে পড়ল পাথরের বাঁধানো - দেওয়ালটার ওপর। জানি না, শব্দ করে উঠল কিনা 'ছলাৎ ছলাৎ ছল' - কিন্তু আমার মনে হল হাস্য মধুর সুরে ওরা যেন ডাক দিল. - 'বল, বল না কথা বল'। এটা অবশ্য আমার অনুমান, কারন ঐ তরঙ্গ বা হাওয়ার শনশনানি কোনোটাই তো আমি শুনতে পাই না। ওরা যতই আমায় ওদের সভায় গাইতে বলুক, আমি তো গাইতে পারিনে এক কলিও। কারন আমি যে বধির মূক। অবশ্য বোবা কালা হওয়ার জন্য দুঃখ নেই আমার কোনো। মা বলেন, এটা নাকি শব্দ দূষণের যুগ। বাস, ট্রেন, প্লেন বা মোটর বাইকের শব্দে নাকি তাঁদের কান ঝালা পালা হয়ে গেছে। সব চেয়ে অবাক লাগে যখন লাল আলোর ঝলকানি তুলে পুলিশের গাড়ি কিম্বা অ্যাম্বুলেন্সগুলো যায় তখন অনেক বুড়ো বুড়িকে দেখি কানে হাত চাপা দিতে। ওদের 'সাইরেন' ভীষণ কান ফাটানো আওয়াজ তোলে। আমি কিন্তু ওদের কাজের 'গুরুত্ব' অনুভব করে তীব্র বেগে ছুটে চলার গতি দেখে খুব উৎসাহ অনুভব করি। 'ডোনেশন বাক্স'তে চাঁদা সংগ্রহ করতে বেরিয়ে আজ কেমন যেন একটা লজ্জা ভাব আসছে মনে। আমাদের চেয়েও তো কত অসহায় দুঃখী মানুষ আছেন, এ সংসারে তাদের কথাই মনে পড়ছে। যদিও এ চাঁদার অর্থ আমাদের বোবা-কালা স্কুলের দুস্থ ছাত্রদের জন্যই ব্যয় করা হবে, তবু অনেকের কাছেই এটাতো একটা ভিক্ষাবৃত্তি। তবুও কেউ কেউ এক দু ডলার ফেলে যাচ্ছেন আমাদের কৌটোতে এবং আমি ওদের বুকে লাগিয়ে দিচ্ছি ছোট্ট একটা 'পতাকা'। স্মিত হাসি দিয়ে মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের। ধীরে ধীরে ছেলেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে সে বলল - হাই, কিন্তু দানপাত্র সামনে তুলে ধরতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিছুই না দিয়ে। চাঁদা না দেওয়ার জন্যে নয়, একজন তরতাজা যুবকের কাছ থেকে উপেক্ষা পেয়ে মনটা ভীষণ কুঁকড়ে গেল। মনে হল বোবা বলেই বোধহয় এমন ব্যবহার পেলাম। বাড়ি এসে মাকে বললাম ঐ অভদ্র ছেলেটার কথা - ইশারাতে। মাও তার হাত মুখ নেড়ে শব্দহীন ভাষায় বোঝাবার চেষ্টা করলেন, অত অল্প সময়ে কাউকে দেখেই বিচার করা ঠিক নয়, হয়তো ওর পকেটে খুচরো ছিল না, তাই লজ্জাই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। - সত্যিই! এই কথাটা তো মাথায় আসেনি আমার। অযথা এমন রাগ করা উচিত হয়নি আমার। পরেরদিন আবার বেশ সেজে গুজে বেড়াতে গেলাম সমুদ্রের ধারে। পড়ন্ত সূর্য্যের আলোয় সাগরের ঢেউগুলি মাথায় পড়েছে লাল, বেগুনি রঙিন মুকুট। সাদা সাদা সীগল বলাকা আর হাঁসেরা ভিড় জমিয়েছে, সাগর তটের "ম্যাক্সিকান" মাছ বিক্রেতার সামনে। ফুটপাতের ধারে কেউ বিক্রি করছে মুক্ত মালা, কেউ বা হাতে বোনা দস্তানা, টুপি। আমি অন্য দিনের মতন লোকের মেলা দেখতে বসেছি, চোখ কিন্তু খুঁজে চলছে অন্য একজনকে। হ্যাঁ, ঐ তো, ঐ তো সে ওখানে দাঁড়িয়ে। জেটির পাশে, যেখানে দুটি "ল্যাটিন আমেরিকান" ছেলে বাঁশি আর গিটারের তালে নাচ, গান অভিনয় দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে - সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন ঐ পথ শিশুদের। আর তারপর পকেট থেকে নোট বের করে মেলে ধরলেন তাদের সামনে। আবার রাগ ধরলো আমার। 'বা, বা এদের বেলায় তো বেশ উন্মুক্ত হস্ত, মূক বধিরদের প্রতি তোমার যত অবহেলা। অচেনা অজানা যুবকের প্রতি এমন অভিমানের কারন খুঁজে পাচ্ছি না, কিন্তু মন টানছে বারে বারে ওঁরই দিকে। ভিড়ের সঙ্গে মিশে একেবারে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ঠিক সেদিনের মতো বললেন - "হাই" কিন্তু অন্য যুবকদের মত আলাপ করতে চাইলেন না। বাড়ি ফিরে এসে মনে হল, আমার এই নিঃস্তব্ধ জগতে আমি তো নীরব নই - কত কাজে ব্যস্ত থাকি, বই পড়ি, সাঁতার কাটি, শান্তির জন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে পুরুস্কার পাই। ছোট থেকেই মা আমাকে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সেই ওয়াশিংটনের "গ্যালন্ডট" (Gallandet) থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাবার জন্য ভর্ত্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে শিখেছি (Gestuno) 'গেসটুনো' ইঙ্গিত ভাষা। বিশ্ব সম্মেলনে জ্ঞানী-গুণীদের সমারোহতে মূক বোধির বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিম্বা শিল্পীরা তাদের বিভিন্ন কাজ বা জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। (Lixicalize design) লেক্সিকালাইজ সেই চিহ্ন ভাষাতেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করায়, "আঙ্গুলের" মাধ্যমে অনেক অব্যক্ত শব্দহীন বাণীতে অর্থাৎ অভিব্যক্তির সাহায্যে আমি তো কথা বোঝাতেও পারি, কিন্তু এইসব আমার মূক বধিরদের সঙ্গে communicate অর্থাৎ যোগাযোগ করবার জন্য।
যে আমার দিকে তাকাচ্ছেই না, আজ তাকে কেমন করে ডাকব আমি, ভিড় পাতলা হলে ছেলেটি একটু এগিয়ে হটাৎ থামলো, পকেট থেকে বার করলো তার "সাদা ছড়িটি" আর পাথরের ওপরে লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে গেল, রাস্তা পার হবার জন্য। চমকে উঠল আমার সমস্ত সত্তা। ছেলেটি অন্ধ। অনেক্ষন একা বসে রইলাম, সাগরের নীল জল আর আকাশ যেখানে এক হয়ে গেছে সেই দিগন্তের পানে তাকিয়ে। এতো সুন্দর পৃথিবী - এই সফেগ্ন উর্মিমালা, পাথরের পায়ে মাথা কুটছে। সদাই - ছোট ছোট তরঙ্গের খেলা। এই "সূর্য্যাস্তের" আলোয় রক্তিম, বর্ণালী ছটা - শ্যামল সবুজ শ্যাওলা কিম্বা নানা ধরণের হাজার পোষাক পরা মানুষের মিছিল - কিছুই তো দেখতে পায় না উনি। পরদিন থেকে রোজ আগে ভাগে এসে বসে থাকি, ওঁর প্রিয় জায়গাটাতে। বিকেল ৬টা বাজলেই হয়, তাঁর আগমন - আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে, ছড়ি খুলে ধীর পায়ে উঠে যান, হাসি মুখে এবং যাবার আগে বলেন 'বাই'। আমি তো যথারীতি নিরুত্তর। কিন্তু বাড়ি এসে শুরু হয়, আমার অদম্য প্রচেষ্টা নতুন এক 'সাধনা'। যুবকটির প্রতি গভীর ভালোবাসা। দিনে দিনে আমার আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে বাড়িয়ে, ওঁর কাছে - আপন মনের অব্যক্ত ভাবনাকে একদিন প্রকাশ করতেই হবে আমায়, তাই আমি শিখতে শুরু করেছি - "ব্রেল লিপি"। কম্পিউটার খুলে বসে গেছি - আমি নতুন রকমের পড়াশুনোয়। নিঃস্তব্ধ জগৎ আমার হয়ে উঠেছে, আরও বাঙময়। আর জ্ঞান সাধনার সঙ্গে সঙ্গে চলছে আমার "নীরব অভিসার"। সে দিনটা ছিল রবিবার। মা ও আমি বেড়াতে এসেছি বন্দরের ধারে। 'আল্যাস্কা' থেকে আগত এক বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ এসে দাঁড়ালো জেটিতে। সেখান থেকে এবার নানা পোষাক পরা নানা ধরণের বিচিত্র সব মানুষ নেমে আসছে, সারিবদ্ধভাবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তাদের দিকে। বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ চোখ পড়ল ভিড় ঠেলে অতি সন্তর্পনে সাদা ছড়ি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁকে দেখতেই অদ্ভুত একটা যেন বিদ্যুতের প্রবাহ ছুটে গেল, দেহে মনে। 'মা'কে ইশারায় দেখলাম মানুষটিকে, আমার রক্তিম লজ্জা জড়ানো মুখের চেহারা লক্ষ্য করে প্রথমে স্মিত হাসিতে ভরে গেল তাঁর মুখ কিন্তু ওঁর হাতের "সাদা ছড়ি"-টির দিকে তাকিয়ে কুঞ্চিত কপালে চিন্তার ছাপ পড়ে গেল এক নিমেষে। ঝলমলে সূর্য্যকে এক চিলতে কালো মেঘ যেমন করে ঢেকে দেয়, তেমনি বিষাদময় হয়ে উঠল মায়ের দৃষ্টি। ভীষণ অসহায় লাগলো আমার। বাবাকে অকালেই হারিয়েছি। আমার মতন বোবা কালা মেয়েকে নিয়ে অনেক দুঃখে অনেক কষ্ট সহ্য করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে সংসারে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাঁর মন সর্বদায় চাইছে, আমার কোনো প্রকৃত বন্ধু বা জীবন সঙ্গীকে দেখতে - সে ইচ্ছেটা এবার হয়তো পূর্ণ হবে ভেবেছিলেন কিন্তু এখন ভীষণ হতাশ লাগলো তাঁকে। জীবনের কোন সমস্যা আঘাতেও তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি কিন্তু দৃষ্টিহীন প্রেমিকের প্রতি আমার এই একতরফা প্রেমের উচ্ছাস আবেগ তাঁকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্থ করে দিল। কি ভাবে এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াবো ভাবছি, ঠিক সেই সময় উল্টো দিক থেকে একটি তরুণ ছেলে পায়ে স্কেটিং এর চাকা পরে এগিয়ে এল দ্রুতবেগে। সামনে আগত ভিড় দেখে আস্তে করার চেষ্টা করলো হটাৎ, আর ঠিক তখনই নিজেকে সামলাতে না পেরে সজোরে ধাক্কা মারলো সাদা ছড়ির ভদ্রলোককে। দু'জন দুদিকে ছিটকে পড়ল তারা। হৈ হৈ করে ছুটে গেল অনেক লোক একসঙ্গে। আমি চিৎকার করে কিছু বলতে গেলাম, মুখ দিয়ে শুধু আওয়াজ বেরোলো আ...। আমি ছুটে গেলাম তাঁর দিকে। এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়তে চাইলেন তিনি, এবং প্রথমেই খোঁজ নিলেন অন্য ছেলেটির। সেও উঠে পড়ে হাতের ছড়িটা ধরিয়ে দিয়ে 'সরি' বলল তাঁকে এবং বোধহয় জিজ্ঞেস করল লেগেছে কিনা। তিনি হেসে কিছু উত্তর দিলেন, ঠোঁটের ভাষা পড়ে আশ্বস্ত হলাম আমি। না বেশি লাগেনি তবে ডান হাতের তালুটা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। এবার মা গিয়ে তাঁকে বাঁ হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। অন্য দু একজন ঝেড়ে দিল তাঁর জামা প্যান্ট, আমি ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলাম। ডান হাতের তালুটা কেটে রক্ত পড়ছে দেখে। মা তখন ওর বাঁ হাতটা ধরে ফুটপাতের কফি শপে বসালেন। হাসি মুখে বারে বারে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন তিনি। এবারে আমার দিকে ফিরে কোন প্রশ্ন করলেন, আমার হয়ে মা উত্তর দিতে লাগলেন ধীরে ধীরে। শব্দগুলো শুনতে না পারলেও বুঝতে পারলাম, কথা হচ্ছে আমাকে নিয়ে। টেবিলের ওপর অসার হয়ে পড়ে থাকা আমার হাতের "দশটা আঙ্গুল" যেন অবাধ্য হয়ে উঠতে চাইল। একবার তাদের দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, একবার কোলে রাখছি, আর কেঁপে কেঁপে উঠছে তারা অসংযতভাবে। কেমন একটা আবেগের উচ্ছাসে চোখের পাতা নত হয়ে আসছে, তিনি আমার চোখে চোখ মেলাতে অসমর্থ জেনেও সোজাসুজি তাকাতে পারছিনা আমি। অনর্গলভাবে কথা বলে যাওয়ার সুযোগে মা হয়তো শুনিয়ে যাচ্ছেন আমাদের জীবন কাহিনী। এই কয়মাস ধরে রোজ এসে বসেছি, তাঁর পাশে। কিন্তু ব্যক্ত করতে পারিনি নিজের মনের ভাব। বুঝতে পেরেছি, "ভালোবাসা কারে কয়"। আর সে যে কেবলি যাতনাময় - তা আমার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ অনুভব করতে পারেনি কোনোদিন। 'বোবা' মেয়ের ভালো লেগেছে অন্ধ ছেলেকে। সহানুভূতি দেখানোর জন্য নয়, অদ্ভুত একটা আকর্ষণে সে ক্রমশঃ তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভালোলাগা - ভালোবাসা জানবার অদম্য ইচ্ছেটাকে চাপতে চাপতে বুকের ভেতরে যেন এতদিনে একটা ব্যাথার পাহাড় জমা হয়ে গেছে তাই আজ সেই সৌম্যকান্তি রূপ আমারই আলোচনায় মগ্ন অদ্ভুত একটা আনন্দবীণা ঝংকৃত হল সমস্ত সত্তা জুড়ে, কফি শেষ হলে এবার আমার হাতের ওপর হাত রাখলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে শিরা উপশিরা ধমনীতে ধমনীতে বয়ে গেল যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ। মা তাঁর ব্যাগ খুলে ছোট্ট নোটবুকটা বের করে লিখলেন, ওনার ফোন এবং ইমেল নম্বর। উনি মন দিয়ে শুনলেন আমাদের ইমেল ঠিকানা, ধন্যবাদ জানালেন। হাসিমুখে হাঁসতে হাঁসতে একসঙ্গে তিনজনে রাস্তা পার হলাম আমরা। রাস্তার ওপারেই ওনার এপার্টমেন্ট, সেখানে গেটের পাশে বাঁধা ছিল এক সুন্দর শুভ্র কুকুর। কাছে যেতেই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাত চাটতে ল্যাজ নাড়তে লাগল, তার সেই প্রিয় সঙ্গী। সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে এলাম আমরা অসম্ভম ভালো লাগার আবেশ নিয়ে। মাকে জড়িয়ে ধরলাম গদ গদ হয়ে, মা তো আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন আমার মনের অবস্থাটা। আমাকে দুই গালে চুমু খেয়ে ইশারায় ঠোঁট নেড়ে বললেন - তোকে চিনতে পেরেছেন উনি, তুই যে ওর পাশে রোজ এসে বসতিস নিঃশব্দে তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ওনার। আমি অবাক হয়ে মাথা নাড়লাম - না না তা কি করে সম্ভব। বিস্ময় প্রকাশ পায় আমার চোখে মুখে। মা হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের দিকে। সেখানে রাখা "সুগন্ধি শিশিটা" অর্থাৎ আমার নিত্য ব্যবহার্য্য "পারফিউমটা" তুলে এনে দেখালেন উনি হেসে - 'এটার গন্ধে', এবার পরিচয় দিলেন ছেলেটির। সুদূর ভারত থেকে ছেলেটির নাম কৃষ্ণ রাও। "গুগল" কোম্পানীতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তিনি, বয়স ৩৫, মনের মতন গার্ল ফ্রেন্ড না পাওয়ায় বিয়ে করেননি এখনও। সবদিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। কেউ তাকে সহানুভূতি দেখাতে এলে তার কাছ থেকে সরে যান তিনি। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরও মন চঞ্চল হয়েছে। বিশেষতঃ আমার 'নীরবতা' ভীষণভাবে তাঁকে বিচলিত করেছে, একথাও জানাতে দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানের অতুলনীয় সংমিশ্রণ, আন্তরিক কথাবার্তা এক ঘন্টার মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছে, মায়ের সব ভাবনা চিন্তা ও ভয়ের মেঘ, আমি তো আনন্দের সাগরে যেন ডুব দিয়ে উঠেছি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সকালে উঠেই প্রথম ইমেল পেলাম কৃষ্ণ রাও-এর কাছ থেকে - আমি তোমার জুঁই ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা পাগল। বন্ধু হবে নাকি আমার, একটু সময় দিলে শিখে নিতে পারি, তোমার "ইশারার ভাষা"। আমার হাতের মুদ্রা তখন কথা বলবে তোমার সঙ্গে। মধুর পরশ ধন্য করেছে আমায় - জবাব দিলাম আমি - শুধু বন্ধু নয়, জীবন সাথী হতে চাই - সুযোগ দেবে কি তুমি? সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট-এ আমার উত্তর এল তার কাছ থেকে। "ভীষণ ভাল লাগছে তোমার ছোট্ট ইমেল পেয়ে, কেমন করে "হ্যাঁ" বললে, তুমি শুনতে সরি বুঝতে পারবে বলো তো আমার "জেসমিন"? এবার ব্রেল লিপিতে বড় চিঠি লিখে ফেললাম আমি। প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেলাম দুজনে।
হাতে "ডোনেশন" বাক্স নিয়ে ঘুরছিলাম সমুদ্রের ধারে। দেখা হল, সেই ছেলেটির সঙ্গে। শান্ত স্নিগ্ধ চেহারা, একটু তামাটে রঙ, মাথায় কোঁকড়ানো থাক থাক চুল। পশ্চিমে মুখ করে স্থির হয়ে বসে সে, বোধহয় সূর্য্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্যে। সমুদ্রের নীল জলে তখন আলোর আল্পনা। রোদের তেজ কমে এলেও চোখের গগলসটা খোলেননি তিনি। কী যেন একটা আকর্ষণ আছে ঐ বুদ্ধিদ্বীপ্ত চেহারার মধ্যে, বারবার চোখ চলে যায় তার দিকে, "বন্দর" পাহারারত "নৌ সেনাদের" একটি হেলিকপ্টার মাথার ওপর ঘুরতে ঘুরতে খুব কাছে চলে এল, বোধহয় তার শব্দ শুনেই ওপরে তাকালেন, মুখ তুলে। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ্য করলেন, ঐ যন্ত্র পাখিটার ওড়বার গতিপথ।
একটু পরে বিশাল এক মালবাহী জাহাজ ধীর গতিতে এগিয়ে এল, এই "সানফ্রান্সিসকো" বন্দরের ঘাটে, নোঙর ফেলবার জন্যে। তার ধাক্কায় বিরাট কয়েকটা দানবী ঢেউ আছড়ে পড়ল পাথরের বাঁধানো - দেওয়ালটার ওপর। জানি না, শব্দ করে উঠল কিনা 'ছলাৎ ছলাৎ ছল' - কিন্তু আমার মনে হল হাস্য মধুর সুরে ওরা যেন ডাক দিল. - 'বল, বল না কথা বল'। এটা অবশ্য আমার অনুমান, কারন ঐ তরঙ্গ বা হাওয়ার শনশনানি কোনোটাই তো আমি শুনতে পাই না। ওরা যতই আমায় ওদের সভায় গাইতে বলুক, আমি তো গাইতে পারিনে এক কলিও। কারন আমি যে বধির মূক। অবশ্য বোবা কালা হওয়ার জন্য দুঃখ নেই আমার কোনো। মা বলেন, এটা নাকি শব্দ দূষণের যুগ। বাস, ট্রেন, প্লেন বা মোটর বাইকের শব্দে নাকি তাঁদের কান ঝালা পালা হয়ে গেছে।
সব চেয়ে অবাক লাগে যখন লাল আলোর ঝলকানি তুলে পুলিশের গাড়ি কিম্বা অ্যাম্বুলেন্সগুলো যায় তখন অনেক বুড়ো বুড়িকে দেখি কানে হাত চাপা দিতে। ওদের 'সাইরেন' ভীষণ কান ফাটানো আওয়াজ তোলে। আমি কিন্তু ওদের কাজের 'গুরুত্ব' অনুভব করে তীব্র বেগে ছুটে চলার গতি দেখে খুব উৎসাহ অনুভব করি।
'ডোনেশন বাক্স'তে চাঁদা সংগ্রহ করতে বেরিয়ে আজ কেমন যেন একটা লজ্জা ভাব আসছে মনে। আমাদের চেয়েও তো কত অসহায় দুঃখী মানুষ আছেন, এ সংসারে তাদের কথাই মনে পড়ছে। যদিও এ চাঁদার অর্থ আমাদের বোবা-কালা স্কুলের দুস্থ ছাত্রদের জন্যই ব্যয় করা হবে, তবু অনেকের কাছেই এটাতো একটা ভিক্ষাবৃত্তি। তবুও কেউ কেউ এক দু ডলার ফেলে যাচ্ছেন আমাদের কৌটোতে এবং আমি ওদের বুকে লাগিয়ে দিচ্ছি ছোট্ট একটা 'পতাকা'। স্মিত হাসি দিয়ে মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের।
ধীরে ধীরে ছেলেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে সে বলল - হাই, কিন্তু দানপাত্র সামনে তুলে ধরতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিছুই না দিয়ে। চাঁদা না দেওয়ার জন্যে নয়, একজন তরতাজা যুবকের কাছ থেকে উপেক্ষা পেয়ে মনটা ভীষণ কুঁকড়ে গেল। মনে হল বোবা বলেই বোধহয় এমন ব্যবহার পেলাম।
বাড়ি এসে মাকে বললাম ঐ অভদ্র ছেলেটার কথা - ইশারাতে। মাও তার হাত মুখ নেড়ে শব্দহীন ভাষায় বোঝাবার চেষ্টা করলেন, অত অল্প সময়ে কাউকে দেখেই বিচার করা ঠিক নয়, হয়তো ওর পকেটে খুচরো ছিল না, তাই লজ্জাই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। - সত্যিই! এই কথাটা তো মাথায় আসেনি আমার। অযথা এমন রাগ করা উচিত হয়নি আমার।
পরেরদিন আবার বেশ সেজে গুজে বেড়াতে গেলাম সমুদ্রের ধারে। পড়ন্ত সূর্য্যের আলোয় সাগরের ঢেউগুলি মাথায় পড়েছে লাল, বেগুনি রঙিন মুকুট। সাদা সাদা সীগল বলাকা আর হাঁসেরা ভিড় জমিয়েছে, সাগর তটের "ম্যাক্সিকান" মাছ বিক্রেতার সামনে। ফুটপাতের ধারে কেউ বিক্রি করছে মুক্ত মালা, কেউ বা হাতে বোনা দস্তানা, টুপি। আমি অন্য দিনের মতন লোকের মেলা দেখতে বসেছি, চোখ কিন্তু খুঁজে চলছে অন্য একজনকে।
হ্যাঁ, ঐ তো, ঐ তো সে ওখানে দাঁড়িয়ে। জেটির পাশে, যেখানে দুটি "ল্যাটিন আমেরিকান" ছেলে বাঁশি আর গিটারের তালে নাচ, গান অভিনয় দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে - সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন ঐ পথ শিশুদের। আর তারপর পকেট থেকে নোট বের করে মেলে ধরলেন তাদের সামনে। আবার রাগ ধরলো আমার। 'বা, বা এদের বেলায় তো বেশ উন্মুক্ত হস্ত, মূক বধিরদের প্রতি তোমার যত অবহেলা।
অচেনা অজানা যুবকের প্রতি এমন অভিমানের কারন খুঁজে পাচ্ছি না, কিন্তু মন টানছে বারে বারে ওঁরই দিকে। ভিড়ের সঙ্গে মিশে একেবারে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ঠিক সেদিনের মতো বললেন - "হাই" কিন্তু অন্য যুবকদের মত আলাপ করতে চাইলেন না। বাড়ি ফিরে এসে মনে হল, আমার এই নিঃস্তব্ধ জগতে আমি তো নীরব নই - কত কাজে ব্যস্ত থাকি, বই পড়ি, সাঁতার কাটি, শান্তির জন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে পুরুস্কার পাই। ছোট থেকেই মা আমাকে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সেই ওয়াশিংটনের "গ্যালন্ডট" (Gallandet) থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাবার জন্য ভর্ত্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে শিখেছি (Gestuno) 'গেসটুনো' ইঙ্গিত ভাষা। বিশ্ব সম্মেলনে জ্ঞানী-গুণীদের সমারোহতে মূক বোধির বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিম্বা শিল্পীরা তাদের বিভিন্ন কাজ বা জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। (Lixicalize design) লেক্সিকালাইজ সেই চিহ্ন ভাষাতেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করায়, "আঙ্গুলের" মাধ্যমে অনেক অব্যক্ত শব্দহীন বাণীতে অর্থাৎ অভিব্যক্তির সাহায্যে আমি তো কথা বোঝাতেও পারি, কিন্তু এইসব আমার মূক বধিরদের সঙ্গে communicate অর্থাৎ যোগাযোগ করবার জন্য।
যে আমার দিকে তাকাচ্ছেই না, আজ তাকে কেমন করে ডাকব আমি, ভিড় পাতলা হলে ছেলেটি একটু এগিয়ে হটাৎ থামলো, পকেট থেকে বার করলো তার "সাদা ছড়িটি" আর পাথরের ওপরে লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে গেল, রাস্তা পার হবার জন্য। চমকে উঠল আমার সমস্ত সত্তা। ছেলেটি অন্ধ। অনেক্ষন একা বসে রইলাম, সাগরের নীল জল আর আকাশ যেখানে এক হয়ে গেছে সেই দিগন্তের পানে তাকিয়ে। এতো সুন্দর পৃথিবী - এই সফেগ্ন উর্মিমালা, পাথরের পায়ে মাথা কুটছে। সদাই - ছোট ছোট তরঙ্গের খেলা। এই "সূর্য্যাস্তের" আলোয় রক্তিম, বর্ণালী ছটা - শ্যামল সবুজ শ্যাওলা কিম্বা নানা ধরণের হাজার পোষাক পরা মানুষের মিছিল - কিছুই তো দেখতে পায় না উনি।
পরদিন থেকে রোজ আগে ভাগে এসে বসে থাকি, ওঁর প্রিয় জায়গাটাতে। বিকেল ৬টা বাজলেই হয়, তাঁর আগমন - আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে, ছড়ি খুলে ধীর পায়ে উঠে যান, হাসি মুখে এবং যাবার আগে বলেন 'বাই'। আমি তো যথারীতি নিরুত্তর।
কিন্তু বাড়ি এসে শুরু হয়, আমার অদম্য প্রচেষ্টা নতুন এক 'সাধনা'। যুবকটির প্রতি গভীর ভালোবাসা।
দিনে দিনে আমার আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে বাড়িয়ে, ওঁর কাছে - আপন মনের অব্যক্ত ভাবনাকে একদিন প্রকাশ করতেই হবে আমায়, তাই আমি শিখতে শুরু করেছি - "ব্রেল লিপি"। কম্পিউটার খুলে বসে গেছি - আমি নতুন রকমের পড়াশুনোয়। নিঃস্তব্ধ জগৎ আমার হয়ে উঠেছে, আরও বাঙময়। আর জ্ঞান সাধনার সঙ্গে সঙ্গে চলছে আমার "নীরব অভিসার"। সে দিনটা ছিল রবিবার। মা ও আমি বেড়াতে এসেছি বন্দরের ধারে। 'আল্যাস্কা' থেকে আগত এক বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ এসে দাঁড়ালো জেটিতে। সেখান থেকে এবার নানা পোষাক পরা নানা ধরণের বিচিত্র সব মানুষ নেমে আসছে, সারিবদ্ধভাবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তাদের দিকে। বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ চোখ পড়ল ভিড় ঠেলে অতি সন্তর্পনে সাদা ছড়ি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁকে দেখতেই অদ্ভুত একটা যেন বিদ্যুতের প্রবাহ ছুটে গেল, দেহে মনে।
'মা'কে ইশারায় দেখলাম মানুষটিকে, আমার রক্তিম লজ্জা জড়ানো মুখের চেহারা লক্ষ্য করে প্রথমে স্মিত হাসিতে ভরে গেল তাঁর মুখ কিন্তু ওঁর হাতের "সাদা ছড়ি"-টির দিকে তাকিয়ে কুঞ্চিত কপালে চিন্তার ছাপ পড়ে গেল এক নিমেষে। ঝলমলে সূর্য্যকে এক চিলতে কালো মেঘ যেমন করে ঢেকে দেয়, তেমনি বিষাদময় হয়ে উঠল মায়ের দৃষ্টি। ভীষণ অসহায় লাগলো আমার। বাবাকে অকালেই হারিয়েছি। আমার মতন বোবা কালা মেয়েকে নিয়ে অনেক দুঃখে অনেক কষ্ট সহ্য করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে সংসারে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাঁর মন সর্বদায় চাইছে, আমার কোনো প্রকৃত বন্ধু বা জীবন সঙ্গীকে দেখতে - সে ইচ্ছেটা এবার হয়তো পূর্ণ হবে ভেবেছিলেন কিন্তু এখন ভীষণ হতাশ লাগলো তাঁকে। জীবনের কোন সমস্যা আঘাতেও তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি কিন্তু দৃষ্টিহীন প্রেমিকের প্রতি আমার এই একতরফা প্রেমের উচ্ছাস আবেগ তাঁকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্থ করে দিল। কি ভাবে এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াবো ভাবছি, ঠিক সেই সময় উল্টো দিক থেকে একটি তরুণ ছেলে পায়ে স্কেটিং এর চাকা পরে এগিয়ে এল দ্রুতবেগে। সামনে আগত ভিড় দেখে আস্তে করার চেষ্টা করলো হটাৎ, আর ঠিক তখনই নিজেকে সামলাতে না পেরে সজোরে ধাক্কা মারলো সাদা ছড়ির ভদ্রলোককে। দু'জন দুদিকে ছিটকে পড়ল তারা। হৈ হৈ করে ছুটে গেল অনেক লোক একসঙ্গে। আমি চিৎকার করে কিছু বলতে গেলাম, মুখ দিয়ে শুধু আওয়াজ বেরোলো আ...। আমি ছুটে গেলাম তাঁর দিকে। এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়তে চাইলেন তিনি, এবং প্রথমেই খোঁজ নিলেন অন্য ছেলেটির। সেও উঠে পড়ে হাতের ছড়িটা ধরিয়ে দিয়ে 'সরি' বলল তাঁকে এবং বোধহয় জিজ্ঞেস করল লেগেছে কিনা। তিনি হেসে কিছু উত্তর দিলেন, ঠোঁটের ভাষা পড়ে আশ্বস্ত হলাম আমি। না বেশি লাগেনি তবে ডান হাতের তালুটা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। এবার মা গিয়ে তাঁকে বাঁ হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। অন্য দু একজন ঝেড়ে দিল তাঁর জামা প্যান্ট, আমি ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলাম। ডান হাতের তালুটা কেটে রক্ত পড়ছে দেখে। মা তখন ওর বাঁ হাতটা ধরে ফুটপাতের কফি শপে বসালেন। হাসি মুখে বারে বারে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন তিনি। এবারে আমার দিকে ফিরে কোন প্রশ্ন করলেন, আমার হয়ে মা উত্তর দিতে লাগলেন ধীরে ধীরে। শব্দগুলো শুনতে না পারলেও বুঝতে পারলাম, কথা হচ্ছে আমাকে নিয়ে। টেবিলের ওপর অসার হয়ে পড়ে থাকা আমার হাতের "দশটা আঙ্গুল" যেন অবাধ্য হয়ে উঠতে চাইল। একবার তাদের দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, একবার কোলে রাখছি, আর কেঁপে কেঁপে উঠছে তারা অসংযতভাবে। কেমন একটা আবেগের উচ্ছাসে চোখের পাতা নত হয়ে আসছে, তিনি আমার চোখে চোখ মেলাতে অসমর্থ জেনেও সোজাসুজি তাকাতে পারছিনা আমি। অনর্গলভাবে কথা বলে যাওয়ার সুযোগে মা হয়তো শুনিয়ে যাচ্ছেন আমাদের জীবন কাহিনী।
এই কয়মাস ধরে রোজ এসে বসেছি, তাঁর পাশে। কিন্তু ব্যক্ত করতে পারিনি নিজের মনের ভাব। বুঝতে পেরেছি, "ভালোবাসা কারে কয়"। আর সে যে কেবলি যাতনাময় - তা আমার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ অনুভব করতে পারেনি কোনোদিন। 'বোবা' মেয়ের ভালো লেগেছে অন্ধ ছেলেকে। সহানুভূতি দেখানোর জন্য নয়, অদ্ভুত একটা আকর্ষণে সে ক্রমশঃ তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভালোলাগা - ভালোবাসা জানবার অদম্য ইচ্ছেটাকে চাপতে চাপতে বুকের ভেতরে যেন এতদিনে একটা ব্যাথার পাহাড় জমা হয়ে গেছে তাই আজ সেই সৌম্যকান্তি রূপ আমারই আলোচনায় মগ্ন অদ্ভুত একটা আনন্দবীণা ঝংকৃত হল সমস্ত সত্তা জুড়ে, কফি শেষ হলে এবার আমার হাতের ওপর হাত রাখলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে শিরা উপশিরা ধমনীতে ধমনীতে বয়ে গেল যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ। মা তাঁর ব্যাগ খুলে ছোট্ট নোটবুকটা বের করে লিখলেন, ওনার ফোন এবং ইমেল নম্বর। উনি মন দিয়ে শুনলেন আমাদের ইমেল ঠিকানা, ধন্যবাদ জানালেন। হাসিমুখে হাঁসতে হাঁসতে একসঙ্গে তিনজনে রাস্তা পার হলাম আমরা। রাস্তার ওপারেই ওনার এপার্টমেন্ট, সেখানে গেটের পাশে বাঁধা ছিল এক সুন্দর শুভ্র কুকুর। কাছে যেতেই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাত চাটতে ল্যাজ নাড়তে লাগল, তার সেই প্রিয় সঙ্গী।
সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে এলাম আমরা অসম্ভম ভালো লাগার আবেশ নিয়ে। মাকে জড়িয়ে ধরলাম গদ গদ হয়ে, মা তো আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন আমার মনের অবস্থাটা। আমাকে দুই গালে চুমু খেয়ে ইশারায় ঠোঁট নেড়ে বললেন - তোকে চিনতে পেরেছেন উনি, তুই যে ওর পাশে রোজ এসে বসতিস নিঃশব্দে তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ওনার। আমি অবাক হয়ে মাথা নাড়লাম - না না তা কি করে সম্ভব। বিস্ময় প্রকাশ পায় আমার চোখে মুখে। মা হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের দিকে। সেখানে রাখা "সুগন্ধি শিশিটা" অর্থাৎ আমার নিত্য ব্যবহার্য্য "পারফিউমটা" তুলে এনে দেখালেন উনি হেসে - 'এটার গন্ধে', এবার পরিচয় দিলেন ছেলেটির।
সুদূর ভারত থেকে ছেলেটির নাম কৃষ্ণ রাও। "গুগল" কোম্পানীতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তিনি, বয়স ৩৫, মনের মতন গার্ল ফ্রেন্ড না পাওয়ায় বিয়ে করেননি এখনও। সবদিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। কেউ তাকে সহানুভূতি দেখাতে এলে তার কাছ থেকে সরে যান তিনি। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরও মন চঞ্চল হয়েছে। বিশেষতঃ আমার 'নীরবতা' ভীষণভাবে তাঁকে বিচলিত করেছে, একথাও জানাতে দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানের অতুলনীয় সংমিশ্রণ, আন্তরিক কথাবার্তা এক ঘন্টার মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছে, মায়ের সব ভাবনা চিন্তা ও ভয়ের মেঘ, আমি তো আনন্দের সাগরে যেন ডুব দিয়ে উঠেছি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সকালে উঠেই প্রথম ইমেল পেলাম কৃষ্ণ রাও-এর কাছ থেকে - আমি তোমার জুঁই ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা পাগল। বন্ধু হবে নাকি আমার, একটু সময় দিলে শিখে নিতে পারি, তোমার "ইশারার ভাষা"। আমার হাতের মুদ্রা তখন কথা বলবে তোমার সঙ্গে। মধুর পরশ ধন্য করেছে আমায় - জবাব দিলাম আমি - শুধু বন্ধু নয়, জীবন সাথী হতে চাই - সুযোগ দেবে কি তুমি?
সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট-এ আমার উত্তর এল তার কাছ থেকে। "ভীষণ ভাল লাগছে তোমার ছোট্ট ইমেল পেয়ে, কেমন করে "হ্যাঁ" বললে, তুমি শুনতে সরি বুঝতে পারবে বলো তো আমার "জেসমিন"?
এবার ব্রেল লিপিতে বড় চিঠি লিখে ফেললাম আমি। প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেলাম দুজনে।