চন্দনা সেনগুপ্ত
ভগবান : আমি আত্মা, তোমার আসল সত্তা। আমার রূপের প্রকাশ - এই প্রকৃতির মধ্যে। আমি আছি, মন মন্দিরে - তোমাদেরই সান্নিধ্যে। সাগর, পাহাড় - নদী - অরণ্যে - ধূ - ধূ - মরুর - প্রান্তে - দূর দূরান্তে, - বন জঙ্গলে. গ্রাম গঞ্জে শহরে, - জেগে থাকি, সদাই দেখি আমায় তোমরা দিচ্ছ ফাঁকি, - বাহির পানে ডাকা ডাকি, - হাঁকা হাঁকি করছ ঘরে। আসল ভুলে নকল তুলে, - দাঁড়িয়ে আছো পথের ধারে। ভক্ত : কেমন করে তোমার দেখা পাই, এবার আমার একটু পরশ চাই - কোথায় গেলে কেমন হলে, তোমার দেখা পাব? প্রভু আমায় কেন ছলো, অকারণে কাঁদাও বলো, জানো না কি সত্যি আমি তোমায় পেতে চাই। দেবালয়ে গির্জা ঘরে, - পীর - দরগার প্রাঙ্গনে, মাথা ঠুকে হতাশ হয়ে - বসে আছি গৃহ কোনে। খুঁজে বেড়াই হেথায় হোথায় - সাধু সন্ত তোমায় কোথায় - বলছো তুমি লুকিয়ে আছো, একান্তে এই - নির্জনে। হৃদ গগনে জ্বললো আলো, তাইতো বড় লাগল ভালো বললে কথা কানে কানে। 'মন্ত্র' দিলে আমার প্রাণে।। কথো-পকথন (ভাগ ২) ভগবান : অর্ধেক ঈশ্বর, অর্ধেক পশুর আকার, দুই মিলে হল মানুষ, নর। কখনও সে মানব কখনও দানব। কভু স্নেহময় ,কভু তান্ডব, যখন তাহার দেবত্ব হয় প্রবল, দয়া, ক্ষমা, প্রেমে স্নিগ্ধ থাকে যদি হৃদি তল, তখনই তো সে অবতার বা দেবাত্ম, মহামানব। ভক্ত : কিন্তু ভগবান -! যাহারা তোমার পেয়েছে - অসীম দান - ভক্ত যাঁহারা সদাই তোমায় চান তোমার নামেতে মাতোয়ারা হয়ে তবে জয়গান গান, - তাঁদেরও তুমি দুঃখের বোঝা দাও, - তাঁহাদের পানে, - কেন যে কে জানে ! তব মন নাহি ধায় ! ভগবান : মানুষেরা যবে হারায় তাদের হুঁশ - ধীরে ধীরে তার পশুত্ব যায় বেড়ে - আমার সৃষ্ট ভালো গুণগুলো কেড়ে - শয়তান নেয়, পিছে ছুটে যায় তবে, তারই তরে তারা, মোর দেয় যবে ছেড়ে, - তখন তাহারা একে অপরকে তেড়ে - হানাহানি করে, হত্যা কান্ড ঘটায়, - আমি নই তার জন্যে যেন দায়ী; আমি চাই, এই পৃথিবীতে মোর মানুষেরা হোক জয়ী। ভক্ত : যাহারা তোমায় ভোলে, দিনরাত শুধু কাম, ক্রোধ, লোভ মোহ লালসায় দোলে - তাহাদের তুমি করো না কেন গো উপায়; তুমি যদি আজ সন্তানে তব, না টান আপন দলে, - দাও না হে ঠাঁই, তব পদ তলে, - তারা ভেসে যাবে জলে - ডুবিবে অতল তলে। পঙ্ক হইতে উদ্ধার করে, নাও না গো কেন কোলে? হে ঠাকুর, আজি প্রার্থনা করি ভক্ত তোমায় বলে, - ক্ষমা করে দাও পাপী তাপি জনে, তব কৃপা যেন ফলে। ভগবান : 'দানব' হইয়া মহান রহে সে মোর আশা করে চুরমার সত্যের পথে চলে না - সে আর কত ডাকি তারে আমি বারবার সব আশা হ'ল ক্ষীণ, - এরা যে অভাগা, দেয় শুধু দাগা, - স্বার্থে দ্বন্দে লীন, আপন অহংকারে? জালেতে বন্দি যে পরাধীন এদের জীবন বড় দুঃখের এরা সন্তোষহীন। এদের সামনে আসিয়া দাঁড়ায়, কত কত ভাবে যুদ্ধ থামায় তুচ্ছ ক্ষুদ্র মিথ্যা লড়াই, ধন ভোগী অতি দীন। ভক্ত : ভুলে যাই প্রভু যত দোষ মোর। আমি যে তোমারই সৃষ্টি, করো আজি কৃপা বৃষ্টি। 'কু' প্রবৃত্তিকে করিয়া ধ্বংস, দাও মোরে প্রেম দৃষ্টি। না হলে জগতে তোমার আঘাতে, হবে যে গো অনাসৃষ্টি। ভগবান : আজ জেনো ওগো, বিগলিত প্রাণ শরণাগত ভক্ত - তোমাদের তরে নিত্য, - সর্বদা থাকি ব্যস্ত। তোমাদের সদা রক্ষা করি যে, সৃষ্টি বাঁচাতে ত্রস্ত - কবে ভেঙ্গে দেবে, চুরমার হবে দানব মানব সব ভুলে যাবে - ধ্বংস করিবে সমস্ত। ভক্ত : জয় জয় প্রভু, জয় গান গাই. নাহি চাহি আর কিছু - তোমার দয়ায় আগে যাব শুধু দেখিব না ফিরে পিছু। "সত্যের আঁট" ধরে থাকি যেন, - তমা রূপ রাখি - চিনে। "মুমুক্ষ জীব" পাইনি তোমাকে একথা ৰাখিব মনে। আমারে লহ হে জীনে। ভগবান : মুখে বলো - "তুমি জগতের প্রভু তুমি ঈশ্বর গুরু -" আমি যে কী চাই, সে কথা বোঝার চেষ্টা করো নি শুরু ! আশীর্বাদের ঝর্ণা ধারায় সিক্ত হবে ভক্ত - ঈশ্বর জেনো, "জীবে প্রেম চান" তিনি তব অনুরক্ত। আসি চুপে চুপে, অবতার রূপে, এ জগতে করি আনাগোনা, শিশুর সরল হাসির মধ্যে - যায় নি কি মোরে চেনা? ফুলের গন্ধে, পাখীর ছন্দে দেহ - মন মেলে ডানা, তোমাদের মাঝে আমি জেগে রই - কারো তরে নেই কোন মানা। "ভক্ত" ও "আমি" এক হয় যবে, - ফুরায় তখন চেনা ও শোনা, ভক্তি - রসের স্রোতে ভেসে যেতে তোমাদের মাঠে ফসল যে বোনা।