চন্দনা সেনগুপ্ত
শ্রী শ্রী মা যে ছিলেন মোদের গুঞ্জিভাঙ্গা মা - কোন বাঁধা, গণ্ডি, নিষেধ কিছুই তিনি মানতেন না। তার এক বিশেষ উদাহরণ স্বামীর মৃত্যুর চারদিন পরে দক্ষিনেশ্বর দর্শন। লক্ষীমণি ভাইজি তাঁহার যখন তাঁকে বলেন - "তোমার এখন চলছে অশৌচ কাল" 'মা' মানতে নারাজ ছিলেন তাহা, তাঁর মতে তো শুচি অশুচি মনেরই জঞ্জাল। ঠাকুর তাঁকে থান পরতে দেন নি খুলতে দেননি হাতের বালা-চুড়ি - লাল নরুন পার শাড়িতে ঘোমটা টেনে, লজ্জা পটাবৃতা মা - চলেন, রীতি মেনে। কিন্তু শরীরে বা মনে, হননি তিনি বুড়ি। মা-সারদা - স্বরস্বতী, চোখে মুখে জ্ঞানের জ্যোতি, ছিলেন যিনি অতিসাধারণ 'রামলালের' ঐ খুড়ি। "গুঞ্জিভাঙ্গা" কথার মানে, বোঝার মতন লোক সেকালে ছিলেন না তো কোনখানে। মুসলমানের এঁটো তোলেন, মাতাল ডাকাত জাত না মেনে। মা বলে যে ডাকেন তাঁকে - তারেই তিনি নেন যে টেনে। গিরীশ, রাখাল, শরৎ, নরেন মা বলে তো তাঁকেই চেনে। আদেশ পালন করেন তাঁহার ভক্তি করেন, মনে প্রাণে। স্বর্গলোকের পরপারে দেবী মা তো নন তিনি। নিজের ঘরের আপন মা যে সহজ সরল গৃহিনী। মোদের ঠাকুর হন অবতার দেবতা মোরা তাঁরে মানি, সারদা মা ও নিত্যশুদ্ধা ছিলেন স্বামীর পূজারিণী সেবার ব্রতে ব্রতী হয়েও ছিলেন গ্রাম্য রমণী সংসারেতে সফল হতে প্রচার করেন সহজ বাণী। দূর-দূরান্ত হতে আসতো কতই ভক্তদল, সঙ্গে থাকতো পুত্রকন্যা, করতো কোলাহল, মায়ের হাতের রান্না প্রসাদ পেয়ে বাড়ত তাদের সুখ শান্তি, জাগত মনে বল। বিদায় দিতে গিয়ে মায়ের ঝরতো অশ্রুজল। মুখে থাকতো বুলি, - "আহা বাচ্চাগুলি, কত কষ্ট পেল হেথায় আসতে গিয়ে বল"? মা যে ছিলেন দয়াময়ী, দীক্ষা নিয়ে ভক্ত পেত তাই তো পুণ্যফল। নারীমুক্তি সাধন তরে, শিক্ষা দানের লাগি, 'নিবেদিতা' কে মেয়েদের স্কুল করতে, দিলেন উৎসাহ, - শ্বেত পদ্মের মতন খুকী পেলেন তাঁহার অপার স্নেহ। বিদেশ হতে হেথায় এসে ধন্য হল তাঁহার গেহ। মায়ের আশীষ মাথায় নিয়ে সামর্পিল মন ও দেহ। "বেলুড় মঠে"র সংঘমাতা, কিন্তু তো নন সন্যাসী তবু লোকে ছুটে যে যায়, তাঁর দর্শন প্রত্যাশী। সহজ সরল জীবন কাটান আপন হাতে ঝেঁটিয়ে উঠান, কুটনো কোটেন, পানও সাজেন মুখে নিয়ে মধুর হাসি। ধনী নির্ধন সুখী-দুঃখী জন, জড়ো হ'ল তাঁর গৃহে আসি, গুরু রূপে চুপে চুপে, পুজেঁ মাকে ভালোবাসি। ঠাকুর তাঁকে রেখে গেলেন, মোদের তরে এই জগতে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন গৃহীর ধর্ম, শরণাগত থাকার কথা বুঝিয়ে দিতে মা শেখালেন নাম জপেরই মর্ম। দোষ দেখো না অন্য কারোর করে যে যায় কর্ম সব অবস্থায় মানিয়ে নিতে পরো নামের বর্ম। 'সা' মানে সান্নিধ্য আর 'র' মানে রক্ষাকর্ত্তি 'দা' মানে দান করে যাও স্বরস্বতী জ্ঞানদাত্রী। "সারদা" মা অপার দয়া, আমরা তোমার কৃপা পাত্রী, নিজের আসল রূপ লুকায়ে, রাখো মাগো জগদ্ধাত্রী গণ্ডি ভেঙ্গে এগিয়ে গেলে ভক্ত তোমার পথের যাত্রী তাই তো নিত্য প্রণাম জানাই স্মরণ করি দিবারাত্রি।