চন্দনা সেনগুপ্ত
সারা পৃথিবী জুড়ে তখন চলছে ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভারতের রাজনীতি ১৯৪২ সালের "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে আলোচিত, উদ্বেলিত। গান্ধীজীর ডাকে হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে এসেছে ইংরেজের তৈরী কারাগারে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি বানাতে বানাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রুজি রুটি কামানোর আশায় গ্রাম ত্যাগ করে আসা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের ভিড় বাড়াতে শুরু করেছে, দিল্লী শহরের অলিতে গলিতে। আকাশ ছোঁয়া জিনিষের দাম, দৈনন্দিন জীবন যাত্রার মানকে করে দিয়েছে নিম্নগামী। দিন আনা দিন খাওয়া শুধু নয়, 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয়' - এই কথাটির সত্যতা যাচাই করতে করতে ক্লান্ত গৃহকর্তা 'বাসুদেব' বাবু যখন তিন মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে "বেল সাহেবের" গলিতে এসে বাসা বাঁধলেন, তাঁর স্ত্রী তখন অন্তস্বত্তা। "কাশ্মীরি গেটের" বাস আড্ডাতে তখন 'বাস' নয়, ঘোড়া গাড়িরা আড্ডা দেয়। যমুনার তীরে এখনকার মতন চওড়া "রিং" রোড নেই, দুপাশে গাছের সারি। "নিকলসন রোড" পেরিয়ে কুর্সিয়া গার্ডেন। সাহেবদের মালিরা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। বড় বড় কয়েকটি তালগাছও এখনো সাক্ষী দিচ্ছে, রাজধানীর পরিবর্তনশীল সেই ইতিহাসের। শীতকাল, পৌষ মাসের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, "গোবিন্দ" তখন সাত বছরের। তাকে ধরলো জ্বরে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই - চিকিৎসা করার সুযোগ না দিয়েই প্রচন্ড মাথার যন্ত্রনায় অর্থাৎ "ম্যানেঞ্জাইটিসে" সে মারা গেলো। দিল্লীতে বোমা পড়তে পারে। চাঁদনী চকের দোকান বাজার বন্ধ হয়ে গেলো, বিনা নোটিসে। লাহোর থেকে মেডিকেল স্কুল পাস করে "বাসুবাবু" তখন "সেন" কোম্পানীর বড় ডাক্তারবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট। পয়সার অভাব, সংসার চালাবার দায়িত্বে হতবুদ্ধি মানুষটাকে পুত্রশোকে যখন কাতর করে দিয়েছে, ভাবছেন, আবার মুর্শিদাবাদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে - তখন একদিন আবার শাঁখ বেজে উঠল, তাঁর ছোট্ট ঘরে - জন্ম নিলো আর একটি পুত্র সন্তান "মঙ্গল"। "বাসুবাবুর" মা একা গ্রামে থাকতে পারেন না, মাঝে মাঝে জমির ধান বিক্রি করতে যান এবং ফিরে আসেন শাড়ির আঁচলে কিছু টাকার পুটলি বেঁধে। বৌমা 'পোয়াতি' জেনে এবারেও পুজোর পরেই চলে এসেছেন, যদিও সাতবছরের তরতাজা নাতি হারানোর বেদনা তাঁর বুকে তীরের মতন বিঁধতে থাকে, তবু তিনি বৌমাকে স্বান্তনা দেন - ভগবানের ধন ভগবানই নিয়েছেন, দেখো আবার ঠিক তিনিই ফিরিয়ে দেবেন। কাজেই নতুন নাতির জন্মে সবচেয়ে খুশি তিনি। মুড়ির মোওয়া, নারকেল নাড়ু - দেশ থেকে যা বানিয়ে এনেছিলেন সব বিলি করে দিলেন পাড়া প্রতিবেশীর মধ্যে। সকালে উঠে বাসি কাজ সেরে বৌমাকে সাবু সেদ্ধ খাইয়ে আসেন। চান করে সেই পুরোনো মটকার কাপড়খানা পরে বড় হাঁড়িতে ভাত বসান। চাপ চাপ অড়হরের ডাল ভাতে মেখে সব বাচ্চাদের একসঙ্গে বসিয়ে একই থালা থেকে গরম গরম ভাত তুলে দেন, ছোট ছোট হাঁ গুলিতে। এবার ধান খুব ভালো হয়েছে দেশে দেখে এসেছেন তিনি। তাই মনটা খুব খুশী। বাসুদেবও সারাদিন লোকের বাড়ি বাড়ি ইনজেকশন দিয়ে আপাতত দু টাকা আনছে ঘরে, আর আঁতুড়ের কোণে 'মঙ্গল' বাড়ছে পূর্ণ চন্দ্রের মতন। "সুশীলা বালা" দেবীর গায়ের রঙ সোনার মতন, অন্যান্য নাতি নাতনিরা বেশ ফর্সাই হয়েছে, কিন্তু এ ছেলেটা যেন বৃন্দাবনের কেষ্ট ঠাকুর। শ্যামলা রঙের মোটা মোটা গড়ন, এক মাথা কালো চুল বড় সুন্দর উজ্জ্বল দুটি চোখ। ১৯৪৭ এ স্বাধীনতা এবং দেশভাগ। দলে দলে মুসলমান প্রতিবেশী চলে যাচ্ছে ওপারে নতুন জন্মানো দেশ পাকিস্তানে, পাকিস্তান মানে নাকি পবিত্র স্থান কিন্তু একি হানাহানি, কাটাকাটি, রক্তপাতে স্নাত দুই দেশের তিন ধর্মের মানুষ - হিন্দু, মুসলমান, শিখ একে আরেকজনের পরিবারের বৃদ্ধ তরুণ শিশুকে কচুকাটা করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করছে না। একি স্বাধীনতা? বন্ধু আত্মীয় সম প্রতিবেশীদের হারানোর দুঃখ, অহরহ নিরাপত্তার অভাব - রাজধানী দিল্লীর সব সম্প্রদায়ের মানুষকেই ভয় ভীত করে রেখেছে। কিন্তু কাশ্মীরি গেটের ভেতরে মৌরী গেট, তার ভেতরে গন্ধ নালা এবং তার পাশেই ছোট্ট সরু হলেও পরিচ্ছন্ন এক রাস্তা। যার মোড়ে এক সাহেবের বাংলো বাড়ি, ইংরেজ সরকারের এক বড় অফিসার বেল সাহেবের বাড়ি। তাই ঐ রাস্তাটার নামও হয়ে গেছে বেল সাহেবের গলি, স্বাধীনতার আগে সেখানে কত সাহেব মেমের আসা যাওয়া ছিল, ঘোড়া ছুটিয়ে বাচ্চাদের কুর্সিয়া গার্ডেন-এ ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হত। গলির ভারতীয় বাচ্চারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত তাদের দিকে, অবাক বিস্ময় ছিল তাদের ঐ বাড়ির মালিকের প্রতি। বৌমা বলেন - "বার বার বার্লি সাগু তো আর খেতে পারছি না মা" শাশুড়ির চোখে জল আসে। "কি করবো বলো বাছা, গ্রামে তো আমার গরু ছিল, নারকেল গাছে অত ডাব, পুকুরের মাছ - তোমাদের তো সেখানে থাকার ইচ্ছে নেই, এখানে কচি বাচ্চার মাকে আমি কি খেতে দেব? - না না ওটুকু সাগু খেয়ে নাও, বুকের দুধ নামবে কি করে বাছা।" ছেলের লক্ষণ বড় ভালো, দু এক বছর যেতে না যেতেই আর একটি ভাই ডেকে আনলো সে। যুদ্ধ থামলো। ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। বেল সাহেবের অনেক পুরোনো লোকই চলে গেল, আর বাসুবাবুর পরিবারও বৃদ্ধি হল। ঠাকুমা বললেন, "মঙ্গলের পয়ে বাপের উন্নতি হয়েছে, দেখবে ও ছেলে বড় হলেও খুব নাম কামাবে।" কিন্তু ওপরে চারজন এবং পরে আরও তিনজন ভাই বোন হয়ে যাওয়ায় 'মধ্যম' কুমারের দিকে মা বাবা, ঠাকুমার নজর দেওয়ার সময় হয় না, আর সাত আট বছর থেকেই সে তাই সর্বদা একটা নিজের জগতে বাস করে। বড় দিদিরা তখন কিশোরী। ঘরের রান্না, কাপড় কাঁচা, স্কুলে যাওয়া, সেলাই ফোঁড়ায়, উল বোনা, বান্ধবীদের সঙ্গ ও মায়ের সদ্য প্রসব করা ভাই বোনদের দিকে লক্ষ্য করতেই তাদের সময় কেটে যায়। বড় ছেলে খুব সাদাসিদে, পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলো ও গল্প শোনায় তার মন বেশি। একটু পেট ভরে খাওয়া আর পরিপাটি করে তেল চুকচুক চুল আঁচড়ে দিদিদের পায়ে পায়ে বাধ্য ভাইটি হয়ে ফায় ফরমাশ খাটতে তার খুব ভাল লাগে। ঝগড়াঝাটি মারামারিতে সে নেই, একা একা বাড়ির বাইরে ঘুরে বেড়াতেও তার ভয় লাগে। মঙ্গল হয়েছে সম্পূর্ণ নিজের মত, হাট্টাকাট্টা চেহারা, দুষ্টু দুষ্টু চাহুনি, ভয়ডরহীন স্বভাব। কারও সঙ্গে তার ভাব নেই, আবার কারও কথা শুনতেও সে রাজী নয়। বাড়িতে যতক্ষণ সে থাকে কারোর সঙ্গে কোনো তর্কাতর্কি গল্প আড্ডায় কিম্বা কোনায় বসে লুডো, তাস, কেরাম খেলায়ও বেশি বসতে দেখা যায়নি তাকে। একা একাই ঘুরে বেড়াই সে বেল সাহেবের গলির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। অনেক পরিবার, অনেক জীবন কাহিনী জড়ানো ভাঙা পুরোনো দালানের ছাদেই বেল সাহেবকে নিয়ে কিশোর বয়সে অনেক কল্পনার জাল বোনে মঙ্গল। তাঁর বেশভূষা, আচার ব্যবহার, শিক্ষা দীক্ষা, ঘোড়ার গাড়িতে মেমসাহেবকে ও গোড়া শিশুদেরকে নিয়ে 'কন্যাট' প্লেসে ঘুরতে যাওয়া - সবই তার মনকে আকৃষ্ট করে। এরাও তো তাদের মত মানুষ কিন্তু এদের জীবন যেন পরীর দেশের গল্পের মত। আর এ পাড়ার অন্যেরা বাস করে কত দুঃখ কষ্ট, অসহায়তার মধ্যে দিয়ে। কে জানে মঙ্গল কবে এই বেল সাহেবের গলির বাইরে গিয়ে থাকতে পারবে, এই সব ভাবতে ভাবতে সময় কাটে আকাশকুসুম কল্পনাতে। তার জগৎ। মানুষের জীবনের চলমান ছবি দেখে আর জানবার চেষ্টা করে সে। প্রকৃত অর্থে তারা কে কেমন ভাবে বেঁচে আছে। বাঙালীরা তখন খুব বেশী দিল্লী আসেননি এবং যারা এসেছেন, তারা প্রায় সবাই সরকারী কাজ পেয়ে জীবিকার তাগিদে। রেলের কর্মচারীরা যারা স্টেশনের কাছে থাকতে চান তারা অনেকেই বাসা বেঁধেছেন ঐ কাশ্মীরি গেটের অলি গলিতে। 'মঙ্গল' ভাবে যার নামে এই গলিটা সেই বেল সাহেব এখন কোথায়? কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? যে বাড়িতে থাকতেন, সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোন দেশে তাঁর বাড়ি? কোনদিন সে সেখানে দেবে পাড়ি - কে জানে কখনও ঐ গলির বাইরেও সে যেতে পারবে কি না। গলির মাঝখানে এই বাড়িটাতে পাঁচটা পরিবারে মোট একত্রিশ জন লোক। ছাদের এক কোনায় শুধু একটা মাত্র বাথরুম। পায়খানার বিবরণ গল্প গাথায় লেখাটা অশোভনীয় হলেও আজ সেকথা জানাবারও একটা প্রয়োজন আছে। কারন এযুগের ছেলে মেয়েরা তা ভাবতেও পারবে না। শুধু ঐ সাহেবের বাড়িটা ছাড়া আর সব জায়গাতেই অন্যরকম বাথরুম। বেল সাহেবের বাড়ির ভেতরটা সে কোনোদিন দেখতে পায়নি। দুটো পাথরের পাদানির নীচে বিরাট গর্ত্তে রাশি রাশি মলমূত্র জমা হয় রোজ সারাদিন ধরে। পরদিন ভোরবেলায় হরিজনদের একজন, যাকে বলা হয় ‘মেথর’ আসেন বিনা ক্লেশে, বিনা দ্বিধায় নাকে কাপড় না দিয়েই বড় বড় টিনের মধ্যে সেই ময়লা তোলেন এবং মাথায় করে নিয়ে যান। খুব কষ্ট হয় মঙ্গলের। এরাও তো মানুষ, তবে কেন এই অত্যাচার তাদের ওপর। অনেকদিন পরে গান্ধীজীর আপ্রাণ চেষ্টায় ঐ "হরিজনদের" মুক্তি দেওয়া হয় ঐ নোংরা কাজের দুর্বিসহ যন্ত্রনা থেকে। মঙ্গলের ছোটবেলায় সবচেয়ে জরুরী কাজটি হল, সকালে পায়খানা ধুয়ে দেওয়া হলেই প্রথমে ছুটে গিয়ে সে ঢুকে যায়, পরিষ্কার বাথরুমটা কে আগে দখল করতে পারে, সে নিয়ে রোজই প্রতিযোগিতা চলে তাদের মধ্যে। বাড়িতে প্রায়দিনই তরকারি কম হলে, ডাল না পেলে সব ভাইবোনেরা নালিশ জানায়, কান্নাকাটি করে। মঙ্গলের বাড়িতে যখন ডাল তরকারি হয় না, রুটি, তেল, নুন ও লঙ্কা পেঁয়াজ খেয়ে চুপচাপ সে উঠে যায় বিনা দ্বিধায়। কারও প্রতি কখনও কোনও অভিযোগ সে করে না। স্কুলে যাবার জামা প্যান্ট একখানা, রোজ কাচলে শুকোবে না, তাই রুমালে একটু সাবান লাগিয়ে নিয়ে পকেটের আর কলারের ময়লাটা ঘষে ঘষে উঠিয়ে দেয় সে। রান্নার পরে নিবু নিবু উনোনের আঁচে ঘটিটা গরম করে কুঁচকানো ভিজে পকেটের ওপর ধরে, রাত্রে বিছানার নীচে ভাঁজ করে রেখে দিলেই ইস্ত্রি করা 'ইউনিফর্ম' হয়ে যায় তার। বাড়িতে গদী, তোষক নেই সবার জন্য, মাদুর শতরঞ্জি পেতে, ঠাকুমার হাতের তৈরী কাঁথা গায়ে দিয়ে শুতেই তারা অভ্যস্থ। বেল সাহেবের গলির মাথায় বেশ কয়েকজন বড়লোক 'মুসলমান' পরিবার ছিলেন, স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত, সেখানে এখন যাদের বাস তারাও সব বড় বড় ব্যবসাদার। ছোটবেলা থেকেই ঐ বাড়িগুলির লোকজনদের একটু অন্য জগতের মনে হয় গলির অন্য সব বাচ্চাদের। সেখান থেকে ভেসে আসা বিরিয়ানির গন্ধ নাকে লেগে থাকে, চোখ ঝলসানো জামা কাপড়, ঘোড়া গাড়ির অদ্ভুত আওয়াজ 'মঙ্গলের' মনকে টানে, ভাবে সে - কবে যে তাদের বাড়িতেও ঐ রকম রান্নাবান্না জাঁকজমক হবে। কখনও কখনও আবার উল্টোটাও মনে হয় তার, - "ওদের পোলাও মাংসের গন্ধ যেমন আমাদের ভালো লাগে, আমাদের ঠাম্মার হাতের হিং দেওয়া অড়হরের ডালের গন্ধে নিশ্চয় ওদের জিভে জল আনে।" রবিবারের দিনটা আসে আনন্দের আমেজ নিয়ে। গ্রাম থেকে আগত মামা কাকা বা দাদাবৌদি বিশেষতঃ বাচ্চাদের "লজেঞ্চুস" বিলি করা "পিসেমশাই" আসবেন স্নেহময়ী পিসিমাকে সঙ্গে নিয়ে, বাবা, ঠাম্মাকে ঘিরে বসবেন সবাই। চা পকোড়া মুড়ি খেতে খেতে কত ধরনের গল্প হত। মুর্শিদাবাদের কোন কোন গ্রাম "পূর্ব পাকিস্তানে" চলে গেলো, কোন খানে মহামারী কী বন্যা হয়েছে, "গান্ধী" হত্যার মামলায় আর কার কার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল, জাপানের অবস্থা এখন কেমন, নিউক্লিয়ার বোমে হিরোশিমা নাগাসাকির পর আর কোন দেশ কে ধ্বংস করতে পারে তার ভীতিপ্রদ কল্পনা। তখন টিভি ছিল না, রেডিও সকলে কিনতে পারতো না, মঙ্গলদের বাড়িতে নিত্য খবরের কাগজ আসত না, খবরের একমাত্র উৎস ছিল মানুষের মুখ নিঃসৃত সত্য কাহিনী, তারপর তার সঙ্গে রং চড়িয়ে কত কল্পনার পাহাড় করে দিয়ে ঘরে বা পথে, ঘাটে, চায়ের দোকানে, রেলের স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডে ছড়িয়ে যেত রকমারি গল্প। তাই এক শহরের কোন অবাঞ্চিত ঘটনা ঘটলে তার রেশ পৌঁছে যেত অন্য গ্রামে গঞ্জে। বেল সাহেবের গলির মোড়ে যারা থাকতেন, বিহারীলাল কাটরার লোকেরা কেউই হয়তো বেল সাহেবকে দেখেনি কিন্তু তার সম্বন্ধে নানান প্রচলিত কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলতে ছাড়ত না তারা। তিনি নাকি ৬ ফুটের বেশি লম্বা ছিলেন, তাঁর বাড়িতে আয়া খানসামাদের খুব ভালোবাসতেন। ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াতে যেতেন। ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল মঙ্গল ও তার সব ভাই বোনেরা। মেয়ের বিয়ের পাত্র দেখতে গিয়ে অন্যের বাড়িতে হার্ট অ্যাটাক হল তার পিতার, গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই ঐ পুত্র মঙ্গলের কোলেই তিনি ঢলে পড়লেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সমস্ত সংসারের দ্বায়িত্ব এসে পড়লো এবার এই মঙ্গলের ওপর। একটা সিগরেট ফ্যাক্টরিতে সে চাকরি করে, প্রাইভেট কোম্পানি, তারপর নানা রকম চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে হটাৎই সে চাকরি পেয়ে গেল, ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসে নিজের চেষ্টায়। টাকা পয়সার অভাব দূর হল তার মায়ের। এবার তারা বেরিয়ে এল ঐ বেল সাহেবের গলি থেকে লক্ষী নগরে নিজেদের বাড়ি করে। দুটি ভাই শঙ্কর ও শিবুও পড়াশোনা শেষ করে সরকারী চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। বড়দা আগেই চাকরি পেয়েছিলেন অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। এবার তিন বোনের বিয়ে দিয়ে সংসার পাতল সে। ছেলেরা তার পড়াশোনায় খুব ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং করে সোজা পাড়ি দিল আমেরিকায়। মঙ্গলবাবু এখন পঞ্চাশোর্ধের মধ্য বয়স্ক বড় ম্যানেজার, ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে ঐ মৌরি গেটের গন্ধ নালায় তাঁর শৈশব কেটেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্রি টিকিট নিয়ে বিজনেস ক্লাসে চড়ে তিনি স্বস্ত্রীক পাড়ি দিলেন ইউএসএ। আমেরিকা, গ্রাম, শহর ন্যাশনাল পার্কগুলি চষে বেড়াতে লাগলেন ছেলেদের দৌলতে। ভ্রমণের আনন্দে যেন মশগুল হয়ে গেলেন প্রৌঢ় মঙ্গলবাবু। ছেলে নতুন গাড়ি কিনেছে তাতে বসে তাঁরা চললেন, ওদেশের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে। খরস্রোতা নদীতে পাহাড় কেটে কেটে, হাওয়ায় ক্ষয় হয়ে যাওয়া পাথরের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে আছে নানা রহস্য। সূর্য্যের আলোয় তার রং বদলাচ্ছে পাথরের ওপর প্রতিবিম্বিত হয়ে। ভারী সুন্দর দৃশ্য। ছেলে বলল - বাবা হেলিকপ্টারে চড়ে সফর করো, একেবারে ঐ ক্যানিয়নের নীচে ওপরে ভেতরে বাইরে - সব ঘুরিয়ে আনবে তোমাদের। আনন্দে বিগলিত হয়ে হেলিকপ্টারে পাইলটের পাশে গিয়ে বসলেন তিনি। স্ত্রী পুত্র পিছনে অন্য যাত্রীর সঙ্গে। পাইলট আমেরিকান ভদ্রলোকটি ছিলেন ভীষণ রসিক। চালাতে চালাতেই গল্প শুরু করলেন, - কোথা থেকে এসেছেন - ভারতবর্ষ - দিল্লী শুনেই লাফিয়ে উঠল তার মন। বললেন আরে আমি তো আমার শৈশবের দশবছর ঐখানে কাশ্মীরি গেটের একটা গলিতে কাটিয়েছি। গলিটার নাম দেওয়া হয়েছিল - 'বেল সাহেবের গলি'। আমার দাদুর নামে। চমকে উঠল মঙ্গলবাবুর সমস্ত সত্তা, এরকম একজন লোকের সাক্ষাৎ পেয়ে। যাদের দরজার সামনে তিনি ছোট বয়সে কখনও যাওয়ার সাহস পাননি, আজ তার পাশে বসে যাচ্ছেন তিনি। পাইলট বললেন - তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু, তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী শিক্ষিত ইংরেজ আর্মি অফিসার। কিন্তু ১৯১৯ সালে যখন তাঁকে জেনারেল ডায়ার অমৃতসরে নিয়ে যেতে চান নিরীহ ভারতবাসীকে হত্যার উদ্দেশ্যে, তখন তিনি তাঁর কথা শুনতে চাননি, তর্ক করেন তাঁর বসের সঙ্গে - এটা অন্যায়, এটা পাপ, কিন্তু তিনি আজ্ঞাবাহী না হলেও তোমাদের দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক সরকারের খোসামুদে সিপাই প্রোমোশনের লোভে পড়ে চলে যায় অমৃতসরে এবং তাদের গুলিতে মারা যায় নিরপরাধ অসহায় জনতা। আমার দাদু তখন চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসে আমেরিকায়। এই দেশটাও কম যায় না ১৯৪৫ সালে বোমা ফেলে জাপানীদের দুই শহরে। মারা যায় কত লক্ষ নিরীহ মানুষ। ২০ মিনিট ঘুরে যখন ফিরে আসে হেলিকপ্টার তখন সম্বিত ফিরে পান তিনি। সুদূর ভারতবর্ষের সঙ্গে এই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বেল সাহেবের নাতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি মাটিতে পা দেন। বেল সাহেবের গলির মালিকের সঙ্গে তাঁর ভাগ্য যে এমন জড়িয়ে যাবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। চলমান জীবনের স্রোত মানুষকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়। কোন মোড়ে যে আবার কার দেখা মেলে সে কথা কেউ জানতে পারে না। সবই ওপরওয়ালার অদৃশ্য লীলাখেলা - যার অর্থ খুঁজে পাওয়া ভীষণ দুষ্কর মানুষের পক্ষে। এবারে ঐ পাইলটের সঙ্গে তিনি পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক বললেন - আমার এখনও ঐ বেল সাহেবের গলিতে ছুটে চলে যেতে মন চাই। ওখানকার কাজের লোকগুলোর সঙ্গে কুর্সিয়া গার্ডেনে যেতে ইচ্ছে করে। পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে কিন্তু আর যাওয়া হয়ে উঠল না। মঙ্গলবাবু অনুরোধ করলেন, - "এসো না একবার দিল্লী, যদিও এখন সেখানে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হবে তোমার। সব পাল্টে গেছে। কাশ্মীরি গেটের বাগান মাঠ কিছুই নেই, সেখানে এক বিরাট বাস আড্ডা।" তাই না কি? একবার শৈশবের খেলাঘরে দাদুর নামের ঐ গলিতে নিজের ছেলেদের নিয়ে যেতে ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ছেলেরা সব অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার সঙ্গে আমার ইচ্ছায় তাঁরা তো কোথাও যাবে না। তুমি তো খুব লাকি, তোমার ছেলে এতো টাকা টিকিট কেটে দেশ থেকে ইউএসএ আনিয়েছে, হেলিকপ্টারে চড়িয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ঘোরাচ্ছে, নিশ্চয় এই রাস্তায় লস ভাগ্যাসও দেখিয়ে আনল। আর আমার ছেলে আজ কথা শোনে না। মঙ্গল বললেন - হ্যাঁ, সত্যি ভগবানের অশেষ কৃপা যে বেল সাহেবের গলিতে ওয়ান রুম সেট ঘরে জন্ম নিয়েও আজ ছেলেদের দৌলতে সারা আমেরিকা চষে বেড়াচ্ছি। আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে মঙ্গলবাবু বলে যাচ্ছেন - জানো আমরা ইয়েলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কও ঘুরে এলাম। সেই প্রৌঢ় পাইলট কিন্তু মঙ্গলের কথা শুনতে পাচ্ছেন না, সূর্য্যাস্তের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে মুখে বিড় বিড় করে বলছেন - "বেল সাহেবের গলি" কি সুন্দর নাম। আমার যে ঐ সরু রাস্তাটার জন্য বড় মন কেমন করছে। চোখের কোনায় জল চিক চিক করছে তাঁর। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। হস্তমর্দন করতে করতে তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, - তোমার ছেলে তোমাকে কত ভালোবাসে। আমার ছেলে আমায় ছেড়ে চলে গেছে। এখন শুনছি সে gun নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ড্রাগস্ মাফিয়াদের সঙ্গে জীবন কাটায়। বেল সাহেবের গলিতে থেকে তুমি ছেলেকে কত সুন্দর মানুষ করেছো আর এত ধনী সমৃদ্ধ দেশে এতো সব সুযোগ সুবিধা পেয়েও আমাদের সন্তানেরা কেন এমন বিপথে চলে গেল, বলতে পারো? You are lucky man you are fortunate - বৃদ্ধ আমেরিকান পাইলটের আবেগে আপ্লুত কণ্ঠস্বরে ভারতীয় মঙ্গলবাবুরও চোখে জল এসে গেল। এ অশ্রু দুঃখের, আনন্দের না জয়লাভের তিনি বুঝতে পারলেন না।