চন্দনা সেনগুপ্ত

ছেলেটাকে নিয়ে বাড়িসুদ্ধ লোক একেবারে ব্যাতিব্যস্থ - অস্থির। একেবারে সেই ছোট্ট থেকেই সে অসম্ভব চঞ্চল। সবসময় দেখ দেখ ধর ধর। চার থেকে ছয়ে যখন এল, তখন স্কুলে নিয়ে যাওয়া এক বিরাট সমস্যা। তার ইচ্ছেমতো সে থাকতে ভালোবাসে, কোনোদিন যদি যায়ও অন্য বাচ্চাদের মেরে ধরে, মাস্টারমশাই দিদিমনিদের জ্বালাতন করে অতিষ্ঠ করে দেয়। মা কাঁদে, বাবা মারে, দাদু লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে, ঠাকুমা হৈ হৈ করে চেঁচিয়ে ওঠেন, - ওরে আমার তেলের শিশিটা ভেঙ্গে দিল, কাকিমা সারা বাড়ি ছুটে বেড়ান ওর পেছনে পেছনে - এক হাঁড়ি রসগোল্লা একাই শেষ করে দিচ্ছে, কি রাক্ষস ছেলেরে বাবা খেতেও পারে। কাকুতি, মিনতি, বকুনি, গালাগাল, মার - সবই ওর কাছে তুচ্ছ - অবান্তর বলে মনে হয়। রসগোল্লাগুলো খেয়ে রসের হাঁড়িটা বারান্দায় দুম করে ফেলে ভেঙ্গে দিয়ে এক ছুটে পালালো বাড়ির বাইরে।
ছেলেটা যখন বারোতে পড়লো। 



হটাৎ তার দাদু মারা গেলেন গাড়ি চাপা পড়ে। দাদুর মুখে আগুন লাগানো ব্যাপারটা একদম ভালো লাগলো না ওর। ছেলেটার বাবা শ্মশানে মুখাগ্নি করতে গেলে রেগে উঠলো সবাইকার ওপরে। কেন এমনি করে পুড়িয়ে দেবে দাদুকে। সেই জ্বলন্ত কাঠটা নিয়ে তেড়ে গেল অন্যান্য লোকজনদের দিকে। তারা বলে উঠলেন, "এই পাগল ছেলেকে কেন এনেছেন, ভাইকে ডাকুন," - "কী আমি পাগল? তোমরা পাগল, তোমরা ছাগল - যাও ঘাস খাও বসে বসে," হন হন করে বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।



সেখানেও তো তখন বীভৎস সব দৃশ্য। নাটক চলছে - ঠাকুমার চুড়ি খোলা, সিঁদুর মোছা, বুক চাপড়ানো কান্না, প্রতিবেশী মাসী-পিসিদের ভিড়। ছেলেটার দিকে লক্ষ্য নেই কারো। রান্নাঘরে ঢুকে এক থালা পান্তাভাত নুন লঙ্কা মেখে হপ হপ করে খেয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল ছেলেটা।
চলছে তো চলছেই কোথায় কোন দিকে তা সে নিজেই জানে না। গ্রামের বাইরে একবারই শহরে গেছে তার বাবার সঙ্গে, আজ একাই চলেছে যেন কিসের ঘোরে। বেশ অনেকটা পথ চলে সে একটা রেল স্টেশন দেখতে পেল। সেখানে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল। একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামল এসে, কিছু না ভেবেই উঠে পড়ল তাতে। চলন্ত ট্রেনের খোলা জানলার হাওয়ায় একটু পরেই ঘুমিয়েও পড়ল সে।
পরদিন সকালে একটা বড় স্টেশনে বহু লোকজনের ওঠা নামা দেখে তারও নামতে ইচ্ছে হল। পেটে ভীষণ খিদে, ক্লান্ত দেহ, পকেটে পয়সা নেই। কি করবে সে ভেবে পাচ্ছে না কিছুই। হটাৎ নজর পড়ল কয়েকজন ভিখারী হাতে একটা করে শাল পাতার ঠোঙায় লুচি ও আলুর তরকারী নিয়ে আসছে। তাদের অনুসরণ করে দেখল স্টেশনের পিছনেই একটা মন্দির। সেখানেই খাওয়ার দেওয়া হচ্ছে, কোনো পুজো আছে। সকলের সাথে সেও খাওয়ার খেতে বসে পড়ল একটা বড় পাথরের ওপরে। দোকানদার বললে - এই ছেলেটা কাজ করবি? এই বাসনগুলো ধুয়ে ফেল তাহলে আরও খেতে দেব।



জীবনে কখনও কিছু কাজ করেনি সে। মা কাকিমাদের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। কতরকম ভাবে তারা তার অত্যাচার সহ্য করেছেন, এখন মা হয়ত তাকে দেখতে না পেয়ে খুব কান্নাকাটি করছেন। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল তার। আর কি ফিরে যেতে পারবে সে নিজের বাড়িতে?
অন্যমনস্ক হয়ে হাতে ধরে থাকা বাসনগুলো পড়ে গেল ঝনঝন করে মাটিতে। ভেঙ্গে গেল বেশ কয়েকটা কাঁচের গেলাস। দোকানদার উঠে এসে এলোপাথাড়ি চড় চাপড় মারতে লাগলো তাকে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রাস্তায়। ভীষণ রাগ এসে গেল তার, কিন্তু অচেনা অজানা জায়গায় সাহস হল না তার, ঘুরে গিয়ে তাকে মারতে।
জীবনে বার টা বছর পরে এই প্রথম সে অনুভব করলো যে, এটা বাড়ি নয়। সবাই তার অত্যাচার সহ্য করবে না। এবার থেকে ডানপিটে স্বভাব, অকারণে জ্বালাতন করা, অন্যকে উত্তক্ত করা আর চলবে না। ধুলো ঝেড়ে উঠে সে মন্দিরের সিঁড়িতে এসে বসে পড়ল।
মন্দিরের পেছনে একটা বড় ঘরে পাথর ভাঙ্গার আওয়াজ হচ্ছে, বেশ কয়েকজন লোক হাতে হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে পাথর কেটে মূর্ত্তি বানাচ্ছেন। হাঁ করে তাদের শিল্প কর্ম দেখতে লাগল ছেলেটা। একজন বৃদ্ধ শিল্পী অনেক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলেন তাকে। ইশারায় কাছে ডাকলেন। ধীরে ধীরে উঠে তাঁর কাছে এল সে। - "আমায় একটু সাহায্য করবে সোনা বাবু"? বেশ গম্ভীর কিন্তু মায়াময় গলায় তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। সে বুঝতে পারল না, সে কেমন করে ওনাকে সাহায্য করবে।
এই দেখো না আঙুলে হাতুড়ির ঘা লেগে আমার বুড়ো আঙ্গুলটা কেমন থেঁতলে গেছে। এই পাথরটাকে এইভাবে ছেনি দিয়ে একটু একটু করে ঘষতে আর কাটতে হবে। পারবে তো?
অদ্ভুত একটা আকর্ষণ অনুভব করল হটাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া সেদিনের সেই দুষ্ট ছেলেটা, হাতুড়ি ও ছেনি নিয়ে কাজ শুরু করে দিল তার। কয়েকদিন ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে সে। অদ্ভুত নেশায় যেন পেয়ে বসেছে তাকে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীও অবাক হয়ে গেছেন তার নিষ্ঠা ও মূর্ত্তি তৈরির আগ্রহ দেখে। মূর্ত্তিটা ছিল শিবের। জটাজুট ধারী দেবাদিদেবের সাপটা গলায় জড়ানো থাকে। বেশ গভীর মনোযোগ দিয়ে সে সেটা বানাবার চেষ্টা করছে। এমন সময় কয়েকজন ক্রেতা এলেন সেখানে। এরা মূর্ত্তি তৈরির অর্ডার দিয়ে যান এদের। তারাও ছেলেটির প্রশংসাতে পঞ্চমুখ হয়ে গেলেন। "আরে ভাস্কর জী, এই বাচ্চাটা আপনার নাতি নাকি? কি দারুন হাত এর"। শিল্পী বললেন, হ্যাঁ, এই কিশোরের হাতে জাদু আছে, কোনো উপযুক্ত ট্রেনিং ছাড়াই সে যে ভাবে কাজ করছে আমি তো তাজ্জব বোনে গেছি।



ডানপিটে দুষ্টু ছেলেটাকে কেউ কোনোদিন কোনো ব্যাপারে ভালো বলেনি। আজ সে নিজের পাঁচ পাঁচ দশ আঙ্গুলকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে শুধু কাজ ভণ্ডুল করতে ওস্তাদ, আজ সেই যে এমন মূর্ত্তি তৈরির কাজে দক্ষতা দেখাবে তা সে সত্যি ভাবতেই পারছে না।
একজন ভদ্রলোক দু-চার মাস পরে আবার এলেন কিছু মূর্ত্তির অর্ডার নিয়ে। সেই বৃদ্ধ শিল্পীকে বললেন, "এই ছেলেটিকে উড়িষ্যায় ভাস্কর মেলায় নিয়ে যাব? সমুদ্রের ধারে পাথর আর ছেনি নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হবে ১২ থেকে ১৮ বছরের উৎসাহী ছেলেদের। স্কুল থেকেও আসবে বিভিন্ন সব জায়গার বাচ্চারা। যে প্রথম হবে সে অনেক টাকা পুরস্কার পাবে। শিল্পী বললেন, "নিয়ে যাবেন? আবার এনে দেবেন তো? বড্ড মায়া পরে গেছে আমার ওর ওপরে।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। কিন্তু এর মা বাবা কোথায়? বাড়ি যায় না?
কিছুই বলতে চায় না ও। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে বলে, "মা দেখো আমি কেমন মূর্ত্তি গড়ি, আর আমায় ডানপিটে, পাগল, দুষ্টু ছেলে বলবে না তো"? মনে হয় কোন অভিমানে এ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন গ্রাম শহরের নাম কিছুই মনে করতে পারছে না।
পরদিন ছোট একটা টিনের বাক্স গুছিয়ে বৃদ্ধশিল্পী ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিলেন উড়িষ্যার কোনার্কে।
সেখানে প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান পেল। 



তার বিশেষ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন বিচারক ও দর্শক বৃন্দ। যে মূর্ত্তিটি সে বানিয়েছে তার রূপ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সবাই। এক অপূর্ব মাতৃ মূর্ত্তি।
বিচারক প্রাইজ দেবার সময় তাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, "কার মূর্ত্তি বানিয়েছো গো খোকা? কোন দেবী"। সে মুখ নিচু করে জবাব দিল, "আমার মায়ের"।
টেলিভিশনে এই খুদে শিল্পী ভাস্কর নিজের পরিচয় দিতে পারছে না অনেকেই তাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ছেলেটি যেন তার ঐ বানানো মূর্ত্তির মতন নির্বাক। কেন যে সে নিজের বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারে না, সে বুঝতে পারে না।
আরও সাত বছর কেটে গেল তার জীবনের। ২১ বছরের ছেলেটা ভীষণ গম্ভীর ও শান্ত। দিল্লীতে অক্ষরধাম মন্দির তৈরী হচ্ছে, শিল্পীরা কাজ করে সেখানে। অনেক সুন্দর সুন্দর মূর্ত্তি, হাতি, সিংহ, বাঘ ও দেব দেবতাদের কাহিনী পাথরে খোদাই করে বানানো হচ্ছে। অনেক বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের সেই ছেলেটা যে এখন এক সুন্দর সুঠাম ধীর স্থির যুবক সে কাজ করছে এক মনে।
একদল তীর্থযাত্রী বাসে করে হরিদ্বার বৃন্দাবন ঘুরে এসেছেন, দিল্লী ভ্রমণ করতে। তারা ঐ মূর্তিগুলির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন প্রৌঢ় মহিলাকে দেখে ঐ ছেলেটি কেমন যেন টান অনুভব করল। দলটির পিছন পিছন যেতে লাগল সে। তারা কোথা থেকে এসেছে জানতে চাইলে, তারা বললেন পূর্ব মেদিনীপুর। পশ্চিমবঙ্গের "পাউশী গ্রাম" থেকে। এক মুহূর্তে বিদ্যুতের যেন ঝলক এনে দিল ছেলেটির মনে। সে এক ছুটে প্রথমে মন্দিরের পিছনে তাদের ঘরে গেল। সেখানে নিজের সেই প্রথম প্রাইজ পাওয়া মায়ের মূর্ত্তিটি বের করে আনল। ঐ ভ্রমণ যাত্রী দলের লোকদের দেখিয়ে বলল - "দেখুন তো আমার এই মূর্ত্তির মতন দেখতে কেউ কি এই দলে আছেন"? তখন একজন চিৎকার করে বলে উঠলো, "হ্যাঁ, এই তো সেই দুষ্টুর মা"।
এক মিনিট ও আর দেরী না করে সে তখন তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রণাম করল পায়ে হাত দিয়ে। ভদ্রমহিলা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর "ওরে আমার দুষ্টু রে, তুই এতদিন কোথায় ছিলি" বলে কেঁদে ফেললেন ঝর ঝর করে করে। এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না তীর্থ যাত্রীর দল। পাড়ার লোকেরা যারা তার সঙ্গে ছিলেন তারা ঐ ডানপিটেটার গুনের খবরে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। অত দুষ্টুমীর মধ্যেও যে এতোবড় প্রতিভা লুকিয়ে থাকতে পারে তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল।

Leave a comment