চন্দনা সেনগুপ্ত
শ্যামল সবুজ ধরার মাঝে ছোট্ট একটা গ্রাম। তার মাঝে বেশ জায়গা জুড়ে শাল বন। সেখানেই সুন্দর পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর। 'লাটুয়া' তার বৌ, ছেলে, মেয়ে, বুড়ো বাপ্-মাকে নিয়ে সেইখানেই থাকে। মাঝে মাঝে জঙ্গলে হাতির উৎপাত হয়। কিন্তু অরণ্যের প্রাণী এই বনের মানুষের গায়ের গন্ধ চেনে। এদের ক্ষতি করতে তারা বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নয়। শুধু খাবারের খোঁজে, জলের মধ্যে গা ডুবিয়ে থাকার আশায় নদী নালার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। গরমকাল তাই এই বাঁকুড়ার সব নদী পুকুর প্রায় শুকিয়ে গেছে। ধুলোর ঝড়ে শুকনো গাছপালাগুলো ধূসরিত হয়ে গেছে। বৃষ্টি যে কবে নামবে কে জানে। লাটুয়ার ছেলে ও বাবা শুকনো দ্বারকেশ্বর-এর বালু খুঁড়ে একটু পরিষ্কার জল বের করছে। মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাটির ঘড়াটা ভরবে বলে। হটাৎ ভীষণ শব্দ মড়মড়, কড়কড় - বুঝি কালবৈশাখী এল। দাদু ও নাতি নাতনি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বাড়ীর রাস্তা ধরল অর্ধেক কলসী ভরেই। দেখলো ছোট্ট একটি বাচ্চা হাতিকে ধাওয়া করেছে একদল লোক। খুব সম্ভব ওকে একা পেয়ে নিজেদের ট্রাকে তুলে নেবে। সে ছুটছে চিৎকার করতে করতে প্রানপনে। গাছের ঝোপে তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়লো লাটুয়ার বাপ্ ও ছেলে মেয়ে। কিন্তু ঠিক এই সময়ে ভীষণ গর্জন করতে করতে ছুটে এল বড় বড় হাতিরা বাচ্ছাকে বাঁচাতে। একটি লোকের হাতে বোধহয় বন্দুক ছিল সে তাদের দিকে তাক করতেই বৃহৎ চেহারার দলনেতা হাতিটি এসে তাকে একনিমেষে শুঁড়ে ধরে ছুড়ে দিল, অন্য একজনকে পায়ে দলতে শুরু করেছে, এমন সময় লাটুয়া ছুটে এল ঠিক উল্টো দিক থেকে। ভাবলে বোধহয় তার বাবা বা বাচ্চারা আক্রান্ত হয়েছে। হাতিদের কাছে চলে গিয়ে কোনোরকমে পায়ের তলার লোকটিকে টেনে নিয়ে বাঁচালো। কিন্তু ওদের রাগ পড়লো তার ওপরে। তাকে পায়ের নিচে ফেলে একেবারে পিশে দিল সেই হাতিটি। ততক্ষনে তার বাচ্ছাটি ফিরে এসেছে। জয় ঘোষণা করতে করতে অন্য পথে এগিয়ে গেলো তারা। কয়েকটি বন্দুকধারী মানুষের ভুলের মাশুল দিতে আমাদের লাটুয়ার তরতাজা প্রাণটি চলে গেলো।