আমার নাম গিরগিটি। ইংরেজিতে বলে "চ্যামেলিয়ন", অনেকটা তোমাদের লিজার্ড - টিকটিকির মতোই দেখতে। হিন্দিতে ওদের বেশ সুন্দর একটা নাম আছে "ছিপকলী"। আমার এতো সুন্দর চেহারা, কিন্তু আমি তো জঙ্গলে থাকি, তাই হয়তো আমার কথা বড় একটা ঠিক জানে না। তবে আমার একটা বিশেষ গুণ আছে, যা ভগবানেরই সৃষ্টি, তার জন্য আমার নাম দেওয়া হয়েছে 'বহুরূপী'। কেননা আমি রং বদলাতে পারি যখন ইচ্ছে। আমার যারা খাদ্য তারা এই জন্য একদম পছন্দ করে না।
আমি যখন যেখানে থাকি ঠিক তার মতন রং এসে যায় আমার চামড়ায়। ঘন সবুজ ঝোপে লতা পাতার আড়ালে, যখন পোকা ধরতে যাই তখন একেবারে সবুজ হয়ে যাই। আবার শুকনো পাতার মাঝে শুকনো বাদামী, হলদে রঙের ঘাসে বা ধান ক্ষেতে গিয়ে যখন লুকাই, তখন ঠিক তারই মতন রং এসে যায় শরীরে। পোকা মাকড়েরা দেখতেই পায় না আমায়। তাই ওদের খুবই রাগ আমার ওপরে।
আবার আমায় যদি কেউ ঝাপ্টা মারে, ধরতে আসে, ইঁদুর, ছুঁচো, সাপ আমি একলাফে পালিয়ে গাছের মধ্যে একদম লেপ্টে থাকি। রং বদলে যায় আমার। কেউ দেখতেই পায় না আর। সুতরাং ওদের পেটে যাওয়ার সুযোগও কম থাকে তখন। আমি বেঁচে যাই। রক্ষা পাই অপমৃত্যুর হাত থেকে।
একলা একলা ঘুরে বেড়ালে খুব একটা বন্ধু পাওয়া যায় না। কিন্তু বিশেষ দল বানিয়ে আমরা ঘুরে বেড়ায় না। আলাদা আলাদা গাছে অনেক রকমের পোকা পতঙ্গ পাওয়া যায়, তাই খেয়ে বেড়ায়।
কয়েকদিন ধরেই ভাবছি, শুধু নিজের পেট ভরার জন্য, বেঁচে থাকা, - এটা কি রকম হচ্ছে! অন্যের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা হঠাৎ খুব প্রবল হয়ে উঠল।
সামনেই চোখে পড়ল একটা মেঠো ইঁদুরের গর্ত্ত। চার পাঁচটা ছোট ছোট বাচ্চা ইঁদুর সেখানে খেলা করছে। হঠাৎ একটা বিরাট সাপ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। আমার মনে হল কিছু একটা করা দরকার। মেঠো ইঁদুরগুলোর মা বাবা একটু দূরে চলে গিয়েছিল। তাদের খুঁজে বের করে সাবধান করে দিলাম। তারা তাড়াতাড়ি করে গর্ত্তে ঢুকেই তার মুখটা বন্ধ করে দিল মাটি দিয়ে। সাপের মুখ থেকে বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে পেরে মনে বড়োই আনন্দ হল।
সাপটি এবার গাছে চড়ছে কাঠবিড়ালির বাসা থেকে ডিম ও ছোট বাচ্চা খাওয়ার জন্য। এক সেকেন্ড দেরী করে ফেললে সে পৌঁছে যাবে ওই বাসায়। আমি সর সর করে গাছের ছালের মতন বাদামী রঙের দেহ নিয়ে ঐ হিংস্র সাপটার একেবারে পাশ দিয়ে উঠে গেলাম ওপরে। আমার সরু ল্যাজটা দিয়ে এক ঝাপ্টা মারলাম ঐ সাপটার চোখে। সে তো অবাক, কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, অথচ ক্রমশঃ খোঁচা মারছে চোখের ওপরে, কে হতে পারে। সাপ ঘাবড়ে গিয়ে নেমে আসতে লাগল গাছ থেকে। কাঠবিড়ালির দল ততক্ষনে চি চি আওয়াজে শোর গোল তুলে সচকিত করে দিয়েছে - তার সব জ্ঞাতি ভাইকে। অনেক কাঠবিড়ালী একত্রিত হয়ে গেছে ডালে ডালে। সাপটা পালিয়ে গেল সেখান থেকে।
আমাকে একবারে দেখতে না পেলেও ওরা আমার গন্ধ পেয়েছে। একজন চিৎকার করে বলল, "ধন্যবাদ বহুরূপী"। তুমি নিশ্চয় ঐ সাপটাকে পালতে বাধ্য করেছ। ভগবানের প্রদত্ত তোমার রং বদলের গুনের জন্য সবচেয়ে আগে তাঁকে প্রণাম জানাই। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। আমার মনে বড় খুশি ও সন্তুষ্টি হল। ভাবলাম বুড়ো হয়ে গেছি, এখন থেকে যতদিন বাচঁব, এইভাবে পরের উপকার করে যাব।
কয়েকমাস সুযোগ পাইনি, কারো কোন ভালো কিছু করবার। একদিন বট গাছের প্রায় মগডালে চড়ে দূরে উড়ন্ত চিলের ডানা মেলা দেখছি চুপ করে বসে। বড় বড় - বটের পাতার মাঝে আমার ঘন সবুজ রঙের শরীরটা আড়াল করে রেখেছি। একটা বিশাল বড় ঈগল এসে বসল, আমার পাশের ডালে। ওরে বাবা, কী বিশাল তার চেহারা। ধারালো ঠোঁট। একবার বুঝতে পারলে খপ করে খেয়ে ফেলবে আমায়। না, আমার দিকে ওর নজর নেই। ও একটা বিরাট বড় পোকাকে ধরেছে আর আমাকে সেই সঙ্গে টান মেরেছে বেশ জোরে। পোকাটা তো গেল ওর মুখে আর আমি পাতা সহ আটকে গেলাম ওর বিশাল ডানার পালকে। ঈগলটা এবার গাছ থেকে মারল ঝাঁপ, আর উড়তে শুরু করল আমাকে নিয়ে।
সব সময় মাটিতে আর গাছে গাছে ঘুরেছি, এমন আকাশে ভ্রমণ এই প্রথম। আমাদের বহুরূপী বংশের কেউ এরকম ভাবে কখনও ওড়ার আনন্দ নিতে পারেনি।
যাই হোক একটা বিরাট জলাশয় দেখা যাচ্ছে নিচে। তারপাশে সাদা বালির উঁচু ঢিপি। সেখানে অনেক নারকেল গাছের সারি। সেখানে সবচেয়ে লম্বা ডালে গিয়ে বসল সে। তাড়াতাড়ি ঐ গাছে কচি কচি ডাবের সবুজ রঙের সঙ্গে মিশে চুপ করে বসে রইলাম। ধড়ে যেন প্রাণ এল।
ধীরে ধীরে সেখান থেকে নেমে এসে দেখি এত এক নতুন দেশ। সমুদ্রের ধারে সাদা বালির মধ্যে ধপ করে পড়লাম। কত রকমের পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। টপাটপ ধরে মুখে দিচ্ছি। এমন সময় একটা রাগী ক্যাকড়া তাড়া করল আমায়। বালির মধ্যে ঢুকে পড়লাম আমি, সাদা রং হয়ে গেল আমার। বুঝলাম এটা ওদের জায়গা এখান থেকে মানে মানে পালানোয় ভালো।
বেশ আনন্দেই দিন কাটিয়ে দিলাম পাশের ঝোপে। একজন সঙ্গিনীও জুটে গেল। কিন্তু বয়স তো কমে না ক্রমশঃ বাড়ে। তাই একদিন বুড়ো হয়ে চুপচাপ বসে আছি, হঠাৎ মনে হল কে যেন যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠলাম। জঙ্গলের ভেতর দিকে চলে এলাম। দেখলাম একজন বৃদ্ধ শেয়াল, একটা পা তার কেউ কেটে নিয়েছে। একটা কাঠের ওপর বসেছি, আমার রংটাও ঠিক শুকনো কাঠের মতন বাদামী তাই সে দেখতে পাচ্ছে না আমায়। জিজ্ঞাসা করলাম,
- কী হয়েছে ভাই তোমার?
- কুমিরে পা টা কামড়ে ধরেছিল। বহু কষ্টে জল থেকে উঠে তো এসেছি কিন্তু পা টা চলে গেছে।
এখন সারাক্ষণ এখানে বসে থাকি, যদি কোন শিকার কাছে আসে। কিন্তু তুমি কে ভাই, তোমায় তো আমি দেখতে পাচ্ছি না।
আমি "বহুরূপী" "চ্যামেলিয়ান" গিরগিটি। দাঁড়াও দেখি তোমার জন্যে খাবার পাই কিনা। কিছুদূরে গিয়ে দেখি একটা বিরাট জন্তুকে মেরে বাঘ সিংহ অর্ধেকটা খেয়ে রেখে গেছে, এখন হায়নারা খাচ্ছে। আমি ওখান থেকে কিছুটা মাংস নাড়িভুড়ি তুলে নিয়ে এলাম। আমার রং ঐ লাল রক্তের পাশে লাল হয়ে গেল, ওরা বুঝতেও পারল না। নাড়িভুড়িগুলো টেনে টেনে এনে যখন ঐ পা খোঁড়া শেয়ালটাকে দিলাম, তখন সে কী খুশি। কত যে আশীর্বাদ দিল আমায়। তারপর তার গর্ত্তের ঠিকানা নিয়ে আমি চললাম তার বৌ বাচ্চাদেরকে খবর দিতে। তারা এসে সবাই মিলে আনন্দে গান ধরল -
"হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া -
বহুরূপীর জয় হোক
আমরা দিলাম দুয়া।"