চন্দনা সেনগুপ্ত

এই মেয়েটার নাম বুলবুলি। ওকে পাড়ায় সবাই বলে চুলবুলি। কারণ ভীষণ চঞ্চল ও ছটফটে সে। সবসময় তার কিছু না কিছু দুষ্টুমি করা চাই। কাউকে ভয় পায় না, মানে না, কারো কথা শুনতে রাজী নয়। বাবা অধ্যাপক, মা সরকারি হাসপাতালের নার্স। কাকা, কাকিমা, ছোট পিসি, সবাইকে নিয়ে এক বেশ সুখী যৌথ পরিবার। বড় পিসির বিয়ে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়ে তিনিও এসে যোগ দেন এদের সব সুখ দুঃখ ও আনন্দ অনুষ্ঠানে।
বুলবুলির আরও দুই ভাই বোন আছে, তারা ভীষণ শান্ত ও মেধাবী। পড়াশোনা, গানবাজনা, আঁকাজোকা সবকিছুতেই খুব ভালো। ভাই দিগন্ত ও দিদি বনশ্রী খেলাধুলাতেও অনেক প্রাইজ পায়। বুলবুলির দুষ্টুমি ও জ্বালাতনে তারা অতিষ্ট হয়ে যায়। মা বাবা বাইরে সারাদিন কাজ করেন, এসে হয়রান হয়ে যান আর তখন এই ছোট কন্যার নামে সব কাজের লোক, প্রতিবেশীদের থেকে নালিশ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে মেয়েকে বকাবকি করেন। কখনো যদি চড় চাপড় মারেন, ঠাকুমা ছুটে আসেন, কিছু বলতে দেন না, তিনি তার সাধের নাতনিটিকে। কাকা-কাকী, মামা-মাসীরা কেউ বেড়াতে এলে বিরক্ত হয়ে যান এই বুলবুলির অত্যাচারে। পিসিমনি ঠাকুমার সঙ্গে ঝগড়া করেন, বলেন “এই ঠাকুমার প্রশ্রয়েই মেয়েটা এতো বদমায়েশ হয়ে গেছে।”
পিসিমার ছোট ছেলে বুদ্ধুকে সেদিন চকলেট বলে মাটি খাইয়ে দিয়েছিলো। মামার মেয়ে সুমনার চুলে আঠা লাগিয়ে দিয়েছে। জ্যেঠিমার পানের বাটাতে পানের খয়ের সরিয়ে ইটের গুঁড়ো ভরে দিয়েছে। তারপর তারা যখন হৈ হৈ করে ওঠে, ওয়াক থু ওয়াক থু করে বমি করে তখন বুলবুলির কি হাসি।
মা এসে রাগের চোটে দু ঘা বসিয়ে দেন, চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখে দেন। আধঘন্টা যেতে না যেতেই তাদের ঠাকুমার গলা শোনা যায় – “ওরে তোরা কি মেরে ফেলবি নাকি মেয়েটাকে? ও সারাদিন কিছু খায়নি। খুলে দে দরজাটা শিগগিরি।”
সেদিন রবিবার। এবার বাড়ির সবাই একসঙ্গে আলোচনা করতে বসেন, - “এই মেয়েকে নিয়ে কি করা যায়!”
বুলবুলির মা বলেন, - “আমি আমার হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের সাথে কথা বলেছি, একজন ওকে মনোবিজ্ঞানী মানে সাইক্রিয়াটিস্ট কে দেখাতে পরামর্শ দিয়েছেন।”
তাই দেখাও না কেন, মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে বিয়ে থাওয়া কি করে দেবে? আমাদের মতন শিক্ষিত পরিবারে মুখ্যু হয়ে শুধু দুষ্টুমি করলেই চলবে? আজ না হয় ঠাকুমা আস্কারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলে রাখছেন, কাল বড় হবে, তখন কে ওকে সামলাবে?
- পিসিমার কথায় সায় দিলেন সকলেই।
অধ্যাপক বাবা বড় হাসপাতালের একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মেয়েটা কি তাঁর সত্যি সত্যি পাগলামি করেই কাটাবে সারাজীবন। কেন এমন হলো। এত বকুনি খায় স্কুলে, ক্লাশ - IV এ সে এই নিয়ে দুবার ফেল করে গেল। এবার তাকে স্কুলও চেঞ্জ করতে হবে। পড়াশোনাতে মন দিতে পারে না।
প্রথম প্রথম পাঁচ বছর বয়স অবধি যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। এখনো সবাই ভালোবাসে তার ওই চঞ্চল স্বভাবের মেয়েটিকে কারণ হাজার বকুনি খেয়েও ও হাসে হিহি করে। ভীষণ মায়াদয়া ওর প্রাণে।
নিজে না খেয়ে কুকুর, বেড়াল, পাখিদের খাওয়ায়। ঠাকুমা, কাকিমা ও রান্না ঘরের মাসীর কাছে বসে মশলা বাটতে, আটা মাখতে, সেগুলো দুহাতে মেখে আপন মনে খেলা করতে খুব উৎসাহ তার। কেউ অসুস্থ হলে তাকে সেবা করতে যায় মায়ের মতন। মা নার্স বলে বাড়ির কারো অসুখ হলে তিনিই ওষুধ খাওয়ান, ইনজেকশন দেন, জ্বর হলে গা স্পঞ্জ করে দেন। ঠাকুমার পায়ে তেল মালিশ করে গরম সেক দিতে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত বা বিরক্ত হন না।
বুলবুলির এসব করতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু তাকে কেউ কোন কাজ করতে দেয় না। কেউ যেন ওকে বিশ্বাসই করে না। খালি চিৎকার করে ওকে দেখলেই -  “ওরে ছাড় ছাড় তুই পারবি না।”
খুব অবাক লাগে তার। বড়রা এমন কেন? একদিন একটা ওষুধের শিশি গ্লাস ভেঙ্গে ফেলেছে বলে রোজই সে ঐরকম করবে - এটা কেমন কথা। ভাবে সে একা বসে। কিন্তু চুপ করে বসে থাকবার তো উপায় নেয় তার। বিড়ালটাকে দুধ খাওয়াতে হবে। কুকুরটাকে বাবার পাতের পাশে রাখা মাংসের এঁটো হাড়গুলো দিতে হবে। উঠোনে কাকেরা এসে জড়ো হয়েছে। ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে এক খাবলা ভাত এনে ছড়িয়ে দিতে না পারলে কি ওর শান্তি আছে। কিন্তু ততক্ষনে মাসীর চিৎকার শুরু হয়ে গেছে, - “ওরে বাবা কি দস্যি মেয়েরে তুই, ঐ এঁটো হাড়টা কুকুরের মুখে দিলি, আবার ঐ হাতেই আমার ভাতের হাড়ি থেকে ভাত নিলি, আবার আমাকে ভাত রাঁধতে হবে।” একটা ভেংচি কেটে সেখান থেকে ছুট দেয় বুলি।
কলকাতার বড় মনোবিজ্ঞানী রায় দিলেন – “আপনার মেয়ের তো ADHD আছে।”
বুলবুলির বাবা অংকের অধ্যাপক। এইসব ‘সাইকোলজিক্যাল’ নাম কি বুঝতে না পেরে তাকালেন অবাক হয়ে।
- “সেটা কি রোগ ডাক্তারবাবু?”
- “Attention deficit/Hyper Active Disorder”
কাঠবেড়ালী যেমন এক ডাল থেকে আর এক ডালে এক নিমেষের মধ্যে ছুটে যায়, দাপাদাপি করে, এইসব বাচ্চারাও তেমনি এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়।
মা বাবা দুজনেই হতাশ হয়ে বসে পড়লেন। ডাক্তারবাবু কিন্তু আস্বস্ত করলেন তাঁদের। ঘাবড়াবেন না, আজকাল অনেক ওষুধ ও থেরাপি বেরিয়েছে। তা ছাড়া বেশ অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় এইসব শিশুরা কিশোর বয়সে এসে যদি নিজেদের মনমতো কোন ক্ষেত্রে কাজ পায়, তাহলে খুশি হয়ে খুব সফলতা লাভ করে। যেমন ধরুন সাঁতারে, খেলাধুলোয়, দৌড়ে বা অঙ্কনে, ওর কিসে ইন্টারেস্ট সেটা দেখুন।
সেদিন সাইক্রিয়াটিস্ট মানে মনোবিজ্ঞানীর চেম্বারে আরো কয়েকজন বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁরাও তাঁদের ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তিত। নানা ধরনের সব মস্তিষ্ক জনিত ভারসাম্য হীনতা নিয়ে ভুগছে তারা।
একটি ৩৫/৩৬ বছরের যুবক সেখানে চুপ করে বসে বসে বাচ্চাদের বাবা মায়েদের কথা আলোচনা শুনছিলো একজন বয়স্কলোক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, - “তোমার বাচ্চার কি প্রবলেম বাবা?”
যুবক উত্তর  দিলো, “বাচ্চার তো নয়, আমার নিজেরই সমস্যা, যা এতদিন আমি জানতে পারিনি।”
সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকালেন - তার দিকে।
“হ্যাঁ, আমি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, IIT থেকে পাশ করে -  ভালো চাকরি করি। কিন্তু পড়াশুনো ছাড়া আর কোন কাজই ঠিক মতো করতে পারি না। স্কুলে বা কলেজে কোন বন্ধুত্ব পাতাতে পারিনি, আত্মীয় স্বজনের সাথেও মন খুলে কথা বলতে পারি না। বাবা মা জোর করে বিয়ে দিলেন, কিন্তু বৌ মাত্র কয়েক মাস পরেই আমায় ছেড়ে চলে গেল। কিছুদিন আগে আমার বাবা মারা যাবার পর আমি আরও অসহায় বোধ করছি। মা এখন খুব অসুস্থ, বিছানায় শয্যাশায়ী। কিন্তু আমি বাজার দোকান ডাক্তার দেখানো কিছুই করতে পারিনা। মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া-আসা সব আমার মামা করে দেন। সেদিন একজন ডাক্তারবাবু আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন, নিজের ঘরে। আমার জামার ও প্যান্টের বোতামগুলো উল্টোপাল্টা লাগানো দেখে উনি সন্দেহ করেছেন আমার মেন্টাল ডিসর্ডার আছে। মস্তিষ্কের সব দিকটা সম্পূর্ণভাবে পরিণত বা পুষ্ট হয়নি। এটা ADHD না ATISM তাই পরীক্ষা করতে এই মনোবিজ্ঞানীর কাছে এসেছি। এতদিনে আমি বুঝতে পারছি কেন আমি সোশ্যাল নই। সামাজিক ও প্রাকটিক্যাল বোধবুদ্ধি আমার কেন সুপক্ক হয়নি।”
- ছেলেটির কথায় এমন বিষন্নতা ছিল যে চেম্বারে যারা তার কথা শুনছিলেন সবাইকার মন খুব খারাপ হয়ে গেল।
বুলবুলির বাবা মা লক্ষ্য রাখতে লাগলেন মেয়ের দিকে। কিসে তার আগ্রহ বুঝতে পারছে না তারা। কত্থক নাচের স্কুলে ভর্তি করলেন মেয়েকে, ক'দিন পরেই এসে সে বিরক্ত হয়ে বলল – “ধুর ওখানে যাবো না, ওরা ওই পায়ের চারটে তাল শেখাচ্ছে।” ড্রয়িং ক্লাশে এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই শিক্ষকের নালিশ এলো, - “এই মেয়েকে আঁকা শেখাতে কেউ পারবে না, - যা চঞ্চল। সমস্ত মেয়েদের বিরক্ত করে, রং, কাগজ, সময় সব বেকার নষ্ট করা। নিয়ে যান ওকে, শিল্পী করার আশা ছাড়ুন।”
এবার সাঁতার শেখানোর প্রস্তুতি। সেখানেও অসফলতা। নিজে তো শিখবেই না, অন্য কাউকেও ডুবিয়ে দিতে পারে, ভয়ের চোটে জলের খেলা বন্ধ হল।
বাড়ির পুরোনো কাজের মাসী একদিন ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে হাত পোড়ালো। ঠাকুমা রাঁধতে বসে বার বার ডাকাডাকি করেন – “ওরে বুলি সোনা আয়না ভাই, এই গোলমরিচটা পিশে দে না মিক্সিতে, আমি বাপু ওটা চালাতে পারিনা।” বুলবুলি ছুটে আসে। রান্নাঘরে থাকলে বেশ খেতে পাওয়া যায়। এখন তার তেরো বছর বয়স। কে বলবে সে কাজ করে না। সুন্দর করে সবজি কেটে, ধুয়ে, মশলা পিশে, পেঁয়াজ রসুন ছাড়িয়ে ঠাকুমার কাছে কাছে এগিয়ে দেয় সে। মা হাসপাতালে, কাকিমাও স্কুলে কাজ করেন। সব কাজেরই লোক আছে - অতএব এতদিন কেউ বুঝতেই পারেননি, কি করে এই এত বড় পরিবারের সকালের জলখাবার, দুপুরের ভাত, বিকেলের চা, টিফিন বা রাতের রুটি তরকারি তৈরী হচ্ছে এবং মুখের কাছে সব খাবার এসে যাচ্ছে তাঁদের।
পরদিন সকালে কাকার ও বাবার স্যান্ডউইচ - দিদি - ভাইয়ের নুডুলস, ঠাকুমার চিঁড়ে দই কলা মাখা বাটি - সব ঠিক ঠিক সময়ে হাজির করে দিল বুলবুলি। দুপুরে বাড়িতে বড়রা কেউ নেই তাই ঠাকুমা ও সে আলু সেদ্ধ, কুমড়ো সেদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে নিল। বিকেলে ফ্রিজ থেকে মুরগি বের করে নুন লেবু মাখিয়ে রেখে দিল কিছুক্ষন। তারপর সুন্দর করে সব পেঁয়াজ রসুন আদা টমেটো পিশে গরম তেলে ছাড়লো, প্রথমে ছলকে এসে কয়েক ফোঁটা হাতে পড়ল তার। কিন্তু রান্না করার গন্ধটা তাকে ভয় পেতে দিল না। মুরগির টুকরোগুলো দিয়ে নাড়তে নাড়তে ভীষণ আনন্দ পেতে লাগল। খেতে সে বরাবরই ভালোবাসে, তাই আজ প্রথম দায়িত্ব নিয়ে রান্না করতে গিয়ে সে উৎসাহিত হয়ে নিজেকে একজন বড় রাঁধুনি ভাবতে আরম্ভ করল।
বিশেষ করে আজ তার ধারে কাছে বড়রা কেউ নেই, ঠাকুমাও ছাদে বসে রোদে আচার, বড়িগুলো শুকাচ্ছেন। বাসন মাজার বাউরি বৌ এই সময় অন্য বাড়ি যায়। কেউ তার পেছনে রে রে করে তেড়ে আসছে না। একা একা তেরো বছরের বুলবুলির মধ্যে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস জেগে উঠল।
কুকার বন্ধ করে সে আটা মাখতে শুরু করল। প্রথমে কিছুতেই ঠিকমতো পারছে না। এ হাতের আটা ও হাতে লেগে যাচ্ছে। কখনো জল বেশি হয়ে যাচ্ছে, আবার আটা ঢেলে ঠিক করতে হচ্ছে। কিন্তু মোটামুটি মাখা আটার তালটা সে বশে আনতে পারল।
বুলবুলির দিদি ও ভাই ততক্ষনে স্কুল ও টিউশন পড়ে বাড়ি এসে গেছে। তারা রান্না ঘরে বোনের কান্ড দেখে তো প্রথমে হেসে অস্থির, বুঝতেই পারেনি যে সে সত্যি সত্যি একা হাতে আজ রান্না করে এক অসম্ভব কে সম্ভব করেছে। ইতিমধ্যে তার মা কাকিমাও ফিরে এসেছেন, ঠাকুমাও নেমে এসেছেন ছাদ থেকে, বাবা কাকাও একসঙ্গে গাড়ি নিয়ে ঢুকছেন গ্যারেজ - অতএব সবাই মিলে হৈচৈ শুরু করে দিল আজ বুলবুলি রান্না করেছে একা একা। আজকের বিরাট খবর তাঁদের পরিবারে।
বাবা মা খুঁজে পেলেন মেয়ের আগ্রহ প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে তাঁদের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় মেয়েটি বড় হয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্ট এবং ক্যাটারিং করে হয়ে গেল ফাইভ ষ্টার হোটেলের শেফ। নাম করা রাঁধুনি।