চন্দনা সেনগুপ্ত

সেজ কাকীমার ন'দির দেওর খুব একটা দামী সুন্দর বিদেশী ঘড়ি উপহার দিয়েছেন নিজের বৌদিকে। তিনি আবার সেটি তাঁর আদরের বোনঝি অর্থাৎ সেজকাকীমার মেয়ে 'ঝর্ণা' কে জন্মদিনে দিয়ে দিলেন, কারণ তাঁর কাছে ওইরকম আরো একটি ঘড়ি আছে। বোনঝি বললো - আজকাল রিস্টওয়াচ পড়ার ফ্যাশন নেই আমরা মোবাইলেইতো সময় দেখে নিই। ক্যালেন্ডারও বাড়িতে টাঙায় না কেউ, সেটাও ফোনেই পাওয়া যায়। আবহাওয়ার খবর, কারো ঠিকানা, দোকানের হদিশ কিছুই আর গুগল-এর দৌলতে না পাওয়া নয়। অতএব অত কথায় কাজ নেয় ভেবে, মেয়ের মা অতি যত্ন করে আলমারীতে তুলে রাখলেন, কাউকে গিফট করবেন বলে। আমার মেয়ের বিয়ে। অতএব সুন্দর প্যাকেটে ওটি চালান হলো এরপর আমার বাড়ীতে। ব্যাপারটা আমার বাড়ীতে কেউ জানে না, ওটি ঠাঁই পেলো আমার ড্রয়ারে। প্রাণের বন্ধু সুনীলের বিবাহবার্ষিকী। সেদিন অফিস থেকে এসে মনে পড়লো, আরে কিছুই তো কেনা হয়নি। ঘড়ি বের হ'ল আমার সংগৃহিত উপহারের পেটি থেকে। বৌ একবার বললো - এতো দামী জিনিষটা বন্ধুকে দেবে?

– তাতে কি হয়েছে, কিনতে তো আর হয়নি গো, পড়েইতো আছে। ও তো আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে রুপোর সেট দিয়েছে।

– হুম, ওটাতো মণিদার ছেলের বৌভাতে দিয়ে দিয়েছি।

– এটাও হয়তো ওরা আবার কাউকে দিয়ে দেবে।

মাঝে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। হটাৎ খবর পেলাম সেজকাকীমার ন'দির সেই দেওর আমেরিকার থেকে এখানে আসছেন ছেলের বিয়ে দিতে। মেয়ে বাঙালি নয়, রাজস্থানী। উদয়পুরের কোনো হোটেল প্যালেস ভাড়া করে তারা বিয়ে দেবে।

একে বলে নাকি destination  wedding, মেয়ের বাবা বিরাট বড় বিজনেস ম্যান, পলিটিক্যাল লিডার, অতএব পুরো বাঙালি গুষ্টিকে নেমন্তন্ন করে বসেছেন সেই বিখ্যাত দেওর সাহেব। কারণ খরচ তাঁর কোনো হচ্ছে না। মেয়ের বাবায় সব arrangement  করবেন। আমেরিকান সিটিজেন জামাই। কোনো পণ নেবে না তাঁর বাবা মা, ঘর, গাড়ী, আসবাব, ফার্নিচার কিছুই দিতে হবে না, তাই আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে আছেন, ডাকা হচ্ছে, মেয়ের বাবার শান ও সৌকত দেখানোর জন্য। আমি যেহেতু দিল্লিতে থাকি, সুখে-দুঃখে সেজকাকীমা ও তাঁর দিদিদের দেখাশুনো করি তাই আমারও সুযোগ এসে গেলো। স্ত্রী বললেন, এতদিন পরে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে তো ছিঁড়লো। একটা বড়োলোকের বাড়ি ফিল্ম এক্টরদের মতন বিয়েতে তো যেতে পারব। শুরু হল নতুন জামাকাপড় জুতো কেনা। কিন্তু উপহার? আমি দেখলাম আলমারীর ওপর তাকে সুন্দর করে যত্ন সহকারে রাখা আছে একটি সুন্দর চামড়ার ব্যাগ। অবশ্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নামটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। একটা ভালো কাগজের ব্যাগে সেটা ভরে ফেললাম। দোকানে নিয়ে গিয়ে প্যাকেট করবো ভাবলাম কিন্তু সময় হল না। উদয়পুরে গিফট প্যাক হয়ে যাবে। এখন সুটকেসে ভরে ফেলো, বললাম স্ত্রীকে।

বিয়ের দিন সকালে ওখানে পৌঁছেই সব আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। হটাৎ পেছন থেকে কে যেন এসে জড়িয়ে ধরলো আমায়, চমকে উঠলাম -

– আরে সুনীল তুই? কতদিন তোর সঙ্গে দেখা নেই, তুই তো উদয়পুরে ট্রান্সফার হয়েছিলি, মনে ছিল না। কি খবর বল।

– এই হোটেলে আমার বস-এর মেয়ের বিয়ে, তাই আমরা অফিসের ক'জন বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছি। আর তুই?

– আমার এক দাদার ছেলের বিয়ে ওরা ইউ এস থেকে এসেছে।

– আরে এখানেই তো হচ্ছে সেই বিয়ে। খুব হৈ চৈ করে। গল্প-গুজব, খাওয়া দাওয়া চলতে লাগলো, হটাৎ সে বললে - একটু বাজারে যাব রে একটা গিফট প্যাক করতে। চল না আমার সঙ্গে, গাড়ীতে যাবি আর আসবি।

– স্ত্রী আমার হাতে একটা চিমটি কেটে বললেন, আমাদেরটাও প্যাক করিয়ে আনো, ঐরকম ভাবে দেওয়া যায় নাকি এতো বড় লোকের বাড়ীতে। যখন হাতে নিয়ে ঢুকবো তখন তো ভিডিও তুলবে।

– হাঁ হাঁ ঠিক বলেছো, আমাদেরটাও নিয়ে এসো। দুই বন্ধুতে একটা বড় দোকানে গেলাম। নানা ধরণের  কাগজ ও সোনালী রুপোলী ফিতে কাপড় দেখাতে লাগলো তারা। ব্যাগটা বেশ বড়, সেটি আমার হাত থেকে নিয়ে ওরা ভেতরে চলে গেলো। বন্ধুর গিফটটা ছোট একটা বাক্স। মনে হয় ঘড়ি। আরে হ্যাঁ, আমার দেওয়া সেই রিস্ট ওয়াচটা। সুন্দর সোনালী মোড়োকে আরও সুন্দর হয়ে গেল সেটি। কিন্তু ততক্ষনে আমার চক্ষু চড়ক গাছ। আরে এটা তো সেই বিদেশী তোফা ন'দির অনাবাসিক ইউ এস এ নাগরিক-এর দেওর থেকে সেজকাকার মেয়ে সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমার গৃহে এবং পরে সুনীলের বৌয়ের হাত ঘুরে আবার খোদ মালিকের ছেলের বৌ-এর কাছে পৌঁছে গেল। বাহ্ রে ভাই ঘড়ির ভাগ্য।

গিফট প্যাক নিয়ে যখন নিজের স্ত্রীর হাতে দিলাম তিনি কনুইয়ে এবার জোরে চিমটি কেটে বললেন - ওই ব্যাগটা সুনীল দেখতে পায়নি তো  গো? আরে ওটা তো ওরই দেওয়া উপহার মনে নেই তোমার। প্রচন্ড হাঁসির দমক থামাতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম আমি।