Sei Meye ti , a story of an unknown girl.
চন্দনা সেনগুপ্ত
মেয়েটিকে প্রথম দেখলাম সেদিন হাসপাতালের বারান্দায়। ভীষণ প্রাণবন্ত। সুঠাম সুন্দর চেহারা। মাথায় ছেলেদের মতন করে ছাঁটা খুব ছোট ছোট চুল, ফর্সা রঙ, ভাসা-ভাসা দুটো বড়বড় চোখ আর মুখে ঝরঝরে হাসি। একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলার আজ ছুটি হল, তাঁর দুটো ব্যাগ দুই কাঁধে ঝুলিয়ে, হাতে একটা সুটকেশ নিয়ে সাবধানে ঐ রোগীটির পাশে পাশে হাঁটছে। তাঁকে see off করতে আমি নিজের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। - আপনার মেয়ে, নাকি বোন? বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে আপনাকে? প্রশ্ন করলাম তাঁকে। - না না ও তো আমার বেড-এ আজকেই ভর্তি হল। ও এখানে চিকিৎসা করতে এসেছে। উত্তরটা শুনে ভীষণ অবাক হলাম আমি। যদিও এটা আয়ুর্বেদ হাসপাতাল, খুব কঠিন অপারেশন বা হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া রোগী এখানে ভর্তি হন না, তবুও যারাই আসেন কেউ তো সুস্থ নন। হয় আর্থারাইটিস নয়তো ডায়াবেটিসে পা চলছে না, কিম্বা আমার মতন হাঁপানির রুগী, স্টেরয়েড নিয়ে নিয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, এখন নেবুলাইজার, অক্সিজেন ও ইনহেলার ছেড়ে আয়ুর্বেদের সাহায্য নিতে ভর্তি হয়েছি। এই বাগান ঘেরা সুন্দর হাসপাতালে। অতএব একজন রোগী আর একজন অচেনা রোগীকে এইভাবে সাহায্য করে - গেট পার হয়ে তাঁর গাড়িতে সব মালপত্র তুলে দিয়ে আসতে ও হাসিমুখে হাত নেড়ে টা টা বাই বাই করতে দেখে সত্যিই আশ্চর্য্য হবারই কথা। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, ওর ফেরার অপেক্ষায়। আমার পাশের রুমেই আসতে হবে। কত আর বয়স হবে ওর ৪০/৪২, বারান্দার কোণে গিয়ে রেলিং ধরে ঝুকলাম নিচে। দেখলাম লনে, একজন অস্বাভাবিক রকমের স্বাস্থবতী মহিলাকে। হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে বাগানের বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে গেছেন নার্স, কিন্তু বোধহয় এবার ওখান থেকে উঠে আসতে চান। চেষ্টা করছেন নিজে নিজে লাঠি ধরে উঠে দাঁড়াতে। গেট দিয়ে ঢুকছিল সেই মেয়েটি, ওনাকে দেখতে পেয়ে এক ছুটে এলো তাঁর কাছে। প্রায় পড়ে যেতে যেতে মেয়েটিকে ধরে ফেলে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। মেয়েটি ধমক দিল তাঁকে। চুপচাপ বসে থাকুন আমি নার্সকে ডেকে আনছি। তারপর নার্স এলে দুজনে মিলে ধরে বসালেন, সেই মহিলাকে সাবধান হয়ে। এবার বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়ালো, বেড়াল ছানার সঙ্গে কিছুক্ষন খেলা করল সে। তারপর উদাস হয়ে কিছুক্ষন বসে রইলো দূরের আকাশের দিকে চেয়ে। এবার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল সে। তিনি আস্তে আস্তে থেরাপি রুমের দিকে বোধহয় ম্যাসাজ করতে যাচ্ছিলেন, হাতে একটা ফাইল নিয়ে। হটাৎ সেটা পড়ে গিয়ে ভেতর থেকে এক্স-রে প্লেট, ওষুধের প্রেস্ক্রিপশন ও অন্যান্য কিছু কাগজ ছড়িয়ে পড়ে গেল চারিদিকে। আবার সেই মেয়েটি এলো ছুটে। নিচু হয়ে বসে একে একে সব তুলে, গুছিয়ে ফাইল ভরে ভদ্রলোকের হাত ধরে নিয়ে গেল সে রিসেপশন এর দিকে। ওর এইসব ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। মেয়েটি ফিরে এসে দাঁড়ালো, আমার সামনে। একমুখ হাসি নিয়ে। বড় ভালো লাগল। প্রশ্ন না করে পারলাম না। - কি প্রবলেম তোমার মা? - এই একটু ঘারে পিঠে ব্যাথা, বিশেষ কিছু না। ক'দিন কেরালার মেয়েদের হাতের মালিশ খাওয়ার আশায় ভর্তি হয়েছি। আপনার কি হয়েছে? - শ্বাসকষ্ট। অনেকদিন এলোপ্যাথি খেয়ে জ্বালাতন হয়ে গেছি, তাই – - ভালো হয়ে যাবেন। আপনাকে দেখলে তো রুগী মনেই হচ্ছে না। কতদিন হল এখানে? কি সুন্দর মিষ্টি করে কথা বলেন আপনি। একসঙ্গে কথাগুলো বলে পাশের বেঞ্চে বসে পড়লো সে, মনেহয় এতগুলো ব্যাগ, সুটকেশ বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। - এখানে পিওন গুলো কেমন, ব্যাগগুলো একটাও নামিয়ে দিতে পারলো না? - না না, ওরা এদিকে ওদিকে আছে হয়তো। পাওয়া গেল না, আর ঐ আন্টিও খুব অস্থির হচ্ছিলেন, ট্যাক্সিওয়ালা বেশিক্ষন তো দাঁড়াবে না, ওলা ক্যাব করেছেন। - তুমি তো খুব পরপোকারী মেয়ে। আজকালকার দিনে এমন একটা দেখা যায় না, আমি বললাম। - মানুষ মানুষের জন্য করবে না তো কি করে চলবে? - সবাই তো সেটা ভাবে না, ভগবান তোমার মঙ্গল করবেন। এই রকম বড় মন পেয়েছো তুমি, আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম, কেন জানি না, ভীষণ মায়া মাখা মুখখানা। - আমি না করলে আর কেউ করে দিত, আমি তো উপকার করবার সুযোগ পেলাম, এটাই আনন্দের কথা। রোজ সকালে যোগব্যায়ামের ক্লাশে আমরা একসঙ্গে যায়, মেডিটেশন ক্লাশে অনেক্ষন নিস্তব্ধে একসঙ্গে বসে থাকি। সবসময় সে চায় আমার পাশে বসতে। তখন কিন্তু সে অন্যরকম মানুষ হয়ে যায়। কোন উশৃঙ্খলতা নেই, প্রগলভতা হাসি-মজাক নয়, একটা ধ্যান গম্ভীর ভাব নিয়ে অনেক্ষন চোখ বুজে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। ক্লাশ শেষ হয়ে গেলেও অনেকক্ষণ একা-একা বসে থাকে সেই বিশান ওঁ লেখাটার সামনে। সেদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম - "কি গো মা এতক্ষন ধরে কার ধ্যান করলে?" - পরমাত্মার। কোন বিশেষ দেবদেবী বা রিলিজিওন আমি মানি না। স্পিরিচুয়ালিটি তে বিশ্বাস করি। আসন করে শরীরটা হালকা হয়, তারপর অনুলোম-বিলোমে অনুভব করি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে জীবন দেবতার লীলা খেলা। আর তারপর "হৃদয়েতে পথ" কাটি মনের মধ্যে আসন পাতি, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে যে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর জন্য। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে রইলাম সেই মেয়েটির দিকে। মাঝে মাঝে এমনি জীবনবোধ নিয়ে কোন এক সাধিকার মতন কথা বলে সে। একদিন আবার আমাদের গানও শোনাল। মীরার ভজন, রজনীকান্তের "তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো।" এই প্রথম মনে হয় সত্যিই মেয়েটির মধ্যে কোন মলিনতা নেই, সে যেন সহজ সরল পুন্যস্রোতা নদীর মতন। একদিন আমার ঘরে এসে গল্প করতে করতে মা বাবার সঙ্গে অনেক ছবি দেখালো সে নিজেদের পরিবারের। তাতে দেখা গেল খুব বড় বেণী ঝুলিয়ে বা পিঠে খোলা চুল এলিয়ে ফটো তুলেছে সে। ভারী মিষ্টি লাগছে। বললাম : - কিছু মনে করো না মা, একটা প্রশ্ন করছি, যদিও অবান্তর তবু নিজের বুড়ি বান্ধবী ভেবে মাফ করে দিও। কৌতহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করছি, - এতো সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেললে কার পরামর্শে? - খুব ঝড় ঝড় করে হেসে ফেলল সে। উত্তর দিল - মাথায় পোকা হয়েছিল তাই ন্যাড়া হতে হয়েছে। - বুঝলাম, উকুনের কথা বলছে। একটু লজ্জায় পরে গেলাম - বললাম কিছু মনে করলে না তো মা, আমার বোধহয় জিজ্ঞেস করা এটা উচিত হয়নি। - না না তাতে কি হয়েছে? সত্যি কথাটা বলতে বা জানাতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। এত ভালো লাগল ওর সপ্রতিভ ভাব দেখে, সহজভাবে সব জিনিষকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা দেখে। ভাবলাম আহা ও যদি আমার নিজের মেয়ে হত। ভগবান আমায় মেয়ে দেননি বলে দুঃখ ছিল না। আজ ষাট বছর পরে ওকে দেখে মেয়ে সন্তান না পাওয়ার জন্য প্রথম কষ্ট পেলাম। কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের সকলের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠলো ঐ প্রাণবন্ত মেয়েটি। কাছে এসে বসলেই মনে হত এক উজ্জ্বল আলোয় যেন ভোরে গেল ঐ জায়গাটা। নানান ধরনের গল্প করে যেত সে। ফোন থেকে বের করত হাসির হাসির দৃশ্য - কৌতুকপ্রিয় স্বভাব, তার কাছে বসলেই যেন সব দুঃখ, রোগের যন্ত্রনা পালিয়ে যেত আমাদের। শীতকাল, রোদে বসতাম সবাই গোল হয়ে, আর হাসি মজাকে সময় যে কখন পার হয়ে যেত কেমন করে, বুঝতেই পারতাম না। সবসময় মুখে তার সাকারাত্মক কথা, কোনো নেগেটিভ ফীলিং সে আনতে দিত না আমাদের। কেউ মুখ ভার করে থাকলে বা যন্ত্রনায় কাতরালে, ছুটে যেত তার পাশে, আমার ঘরে চায়ের কেটলি ও সরঞ্জাম ছিল, যখন তখন বিনা সঙ্কোচে ঘরে ঢুকে চা বানিয়ে দিত আমাদের, নিজের মেয়ের মতন। সেদিন ওর পাশের বেডের মোবাইল ফোনটা পাওয়া যাচ্ছে না, খুব নাকি দামী ফোন সেটি। যে মেয়েটি ঘর ঝাড়ু পোছা করতে এসেছিলো প্রথমে সন্দেহটা তার ওপরই পড়ল। হাসপাতালের সুপারভাইজার, নার্স, রিসেপশনিষ্ট, থেরাপিস্ট মেয়েগুলি সবাই ভীষণ অস্থির হয়ে সব রুম সার্চ করছেন। কাজের মেয়েটিতো প্রথমে ভীষণ রেগে গেল - 'আমরা কি এখানে চুরি করতে এসেছি নাকি' পরে জেরার চোটে কাঁদতে লাগল। ঐ মেয়েটি তখন ফিজিওথেরাপি করতে গিয়েছিলো, ফিরে এসে নিজের রুমে এত হৈ চৈ দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেল, পরে বিছানা, বালিশ ঝেড়ে, বাথরুম খুলে সব জামাকাপড়গুলো বিছানায় ফেলে মোবাইল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হটাৎ তার বমি পেতে লাগল। ডাক্তারবাবুকে বললেন তার বাড়িতে খবর দিতে, শরীর খারাপ লাগছে, সে বাড়ি যাবে। এক ঘন্টার মধ্যে তার বাবা ও দাদা এসে পড়লেন, গাড়ি করে মেয়েটি বাড়ি চলে গেল। যাবার আগে আমার ফোন নম্বরটা নিতে কিন্তু ভোলেনি। আমার ১৫ দিনের প্যাকেজ শেষ হতেই বাড়ি ফিরে এলাম। ক'দিন পরেই ফোন এল সেই মেয়েটির। - কেমন আছো আন্টি? - ভালো, তুমি কেমন? সেদিন হটাৎ চলে গেলে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার। তোমার নাম্বারও আমার কাছে ছিল না, তাই খবর নিতে পারিনি। - আমিও তো ক'দিন যোগাযোগ করতে পারিনি ব্যস্ততার কারনে। ভাবছি একদিন আসব আপনার কাছে। - হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়, আমার বাড়ি তো এই হাসপাতালের কাছেই। ঠিকানাটা এখুনি মেসেজ করে দিচ্ছি। পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমার স্বামী। চোখ কটমট করে ফোন রাখতে ইশারা করছেন তিনি। বললাম - আচ্ছা মা, কেউ ডাকছে, এখন ফোন রাখছি, পরে কথা বলবো। লাইনটা কাটতেই স্বামীর বকুনি খেলাম। সবাইকার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আসো, কাউকে বাড়িতে ডাকবে না। কার মনে কি আছে তুমি জানো? আজকাল কাউকে বিশ্বাস নেই। এটা কার ফোন ছিল, সেই মেয়েটা কি? যাকে নিয়ে হাসপাতালের লোকেরা আলোচনা করছিল। একদম বাড়ীর ঠিকানা দেবে না বলে দিলাম। এরপর যখনই ওর ফোন আসে, স্বামী কাছে থাকেন বলে আর রিসিভ করতে পারি না, কথা বলা হয় না। মনটা খারাপ লাগে। আরও দিন ১৫ পরে ওর ফোন এল, মিষ্টি গলায় সে বললে - - আন্টি, তোমাকে ভীষণ মিস করছি। আসলে আমার মা নেই তো, তোমাকে দেখতে, ব্যবহারে আমার মায়ের মতন মমতাময়ী লেগেছিল, তাই দাদা আর বাবা বাড়ি না থাকলে ফোন করি। ওরা কারো সঙ্গে বেশি কথা বলা পছন্দ করেন না। কেন জানো? - কেন মা? - হাসপাতালের লোকেরাও খুব বিরক্ত করত। জানেন ওরা আমাকে চোর বলে সন্দেহ করেছে। তারপর হেসে উঠলো সে। - মনে হলো হাসিটার মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা বিদ্রুপ মাখা। মুখে বললাম, সে কী তাই নাকি? - হ্যাঁ, কিন্তু আন্টি তোমার কাছে আমি জানতে চাই - 'তুমিও কি সেদিন আমার হটাৎ শরীর খারাপ হয়ে চলে যাওয়াটা এক্টিং মনে করেছো? - অরে না না, মাথা খারাপ। তোমার মতন শুদ্ধ আত্মাকে ভগবান আমায় প্রথমদিন থেকেই চিনিয়ে দিয়েছেন। যার পাঁচটা আঙুলে হীরে, নীলা, দামী গোমেদ, প্রবাল হাতে এত দামী মোবাইল, গলায় দেখে রুপো মনে হলেও আমি জানি হোয়াইট গোল্ড-এর মোটা চেন - সে যে কতবড় বাড়ির মেয়ে তা কি বুঝিনি আমি, তুমি কেন নিতে যাবে অন্যের জিনিষ? - ওগুলো আমার ঠাম্মা সব ধারন করিয়েছেন তাড়াতাড়ি রোগমুক্তি-ভোগান্তি কম হবে বলে। আর মোবাইলটা দাদা আমায় আমার জন্মদিনের শেষ উপহার দিয়েছে। - কথাটা খট করে কানে লাগলো। শেষ উপহার মানে? প্রশ্নটা মনে মনে করলেও আবার সেই পরিচিত ঝরঝরে হাসিতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কোনো কথা সরলো না মুখে। - আমার তো ক্যান্সার, লিউকোমিয়া। অ্যাডভান্স স্টেজ, অলরেডি ১২টা কেমো হয়ে গেছে গত ফেব্রূয়ারি থেকে, সব চুল পড়ে গিয়েছিল, আবার বেরুচ্ছে। তাই বলেছিলাম পোকার জ্বালাতনে ন্যাড়া হতে হয়েছিল। are you listening aunty? - আমার মুখে ভাষা নেই তাই শুধু হুঁ বেরুলো। - সাইড এফেক্ট দূর করতে Naturecure Hospitalএ ভর্তি হয়েছিলাম, তাই তোমায় পেয়ে গেলাম। - আমিও তোমার মতন একটা মেয়ে খুঁজে পেলাম। একটা গানের কলি এসে বুকের দুয়ারে আঘাত করল, আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যারে... ভগবানকে দেখা যায় না, এইসব পবিত্র মানুষের মাধ্যমেই বোধহয় তিনি একটু সময়ের জন্য ধরা দেন। তাই কবি বলেন, "মাঝে মাঝে তব দেখা পাই... চিরদিন কেন..."। সে বলে চলেছে – - আয়ুর্বেদ-এর ট্রিটমেন্ট ও Nature Cure ডিপার্টমেন্ট-এর ম্যাসেজ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ফিজিও থেরাপীর পর খুব কষ্ট হল, বমি পেল, তাই চলে আসতে হল, ক'দিন আর আছি এই পৃথিবীতে সম্ভবতঃ কয়েকটা মাস, মোবাইল চুরি করে কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখব বলো তো? যমরাজের কাপবোর্ড-এ? বলার সাথে সাথে আবার হাসি। আমি আর কথা বলতে পারছি না। চোখ দুটো থেকে জল ঝরে পড়ছে অঝোর ঝরে। - কি হল আন্টি তুমি কথা বলছো না যে? আমি ঠিক করেছি বাকী ক'টা দিন শুধু যাদের খুব ভালো লেগেছে, পজিটিভ থিংকিং-এর লোক মনে হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলব। আর অজানা অচেনা লোকের উপকার করবার চেষ্টা করব। নিজের আত্মীয়-স্বজনেরা বড্ড এক ঘেয়ে হয়ে গেছে, ওরা আমাকে এমন সহানুভূতির চোখে দেখে যেন ক্যান্সারের জীবাণুগুলো দেখতে পাচ্ছে। বাবাকে তো তারা ইস, আহা, কেন হল গো - শুনিয়ে শুনিয়ে আধমরা করে রেখেছে। আস্তে আস্তে একটু নিজেকে সামলে আমি এবারে বললাম - তোমার মতন সুন্দর স্বভাবের প্রকৃত আধ্যাত্মিক মনোভাবের একজন তরুণ বন্ধু পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। জন্ম-মৃত্যু তো আমাদের হাতে নেই। এই আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি এখুনি হার্ট এট্যাক হতে পারে, রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে চলে যেতে পারি। তুমি কোয়ালিটি লাইফ স্পেন্ড করছো, কারো প্রতি অভিমান নেই, আনন্দময়ী মেয়ে ভগবান তোমাকে যে সাহস ও সহ্যশক্তি দিয়েছেন ক'জন তা পায়। আরে এই জন্যই তো তোমাকে আমার এত ভালো লেগেছে। দেখো আমাদের বয়সের কত পার্থক্য কিন্তু মনের কত মিল। কাশির ধমক এল মেয়েটির, তাই আমার ফোনটা হটাৎ কেটে গেল। প্রথমদিনের ঐ বাক্স ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার। মোবাইলটা আবার বাজছে। ভাবলাম আবার ওই করছে - না হাসপাতাল থেকে, ওখানের সুপারভাইজার। - দিদি কেমন আছেন আপনি? হাঁপানি কমেছে একটু? ইউক্যালিপ্টাসের পাতা দিয়ে স্টিম ভাপটা নিচ্ছেন তো? ফুট বাত নিতে রাতে ভুলবেন না কিন্তু। ওকে হটাৎ কৌতূহল ভরে প্রশ্ন করলাম, সেই ভদ্রমহিলার মোবাইলটির হদিশ মিলেছিল কি? হ্যাঁ তো। জানেন না আপনি? উনি ওটি যোগা ক্লাশে ম্যাট-এর তলায় রেখে ব্যায়াম করছিলেন, তারপর ভুলে চলে গিয়ে এত হাঙ্গামা করলেন। রবিবার সব ম্যাট তুলে রুম ওয়াশ করতে গিয়ে কাজের লোকেরা ওটি পায় এবং আমাকে জমা দিয়ে যায়। শুধু শুধু এতগুলো মানুষকে চোর সন্দেহ করে দুঃখ দিলেন। আমি সেই মেয়েটির মুখটা মনে করে আবার চোখের জল ফেলতে লাগলাম, একা একা বসে।