Protidan , a children story on two tribal boys and an elephant.

মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করতে ভিন্দু আর ভিসা দুই ভাই জঙ্গলের একেবারে গভীরে পৌঁছে গেল সেদিন। ভিন্দু ১৬ বছরেই খুব তাড়াতাড়ি গাছে চড়তে পারে, তাই ভিসা কে ঠিক নিচে দাঁড় করিয়ে পৌঁছে গেল গাছের একেবারে মগডালে। মৌচাকটা নিচে থেকে খুব ভালো দেখা যাচ্ছিলো – এখন পাতার আড়ালে ডালের পেছনে ঠিক ঠাওর করতে পারছে না সে। হটাৎ দেখলো দূরে গাছপালা ডাল কাটতে কাটতে কিছু বন্দুকধারী লোক এই জঙ্গলে ঢুকছে। নিশ্চয় এরা পশুচোর, মৌচাক পাড়া ছেড়ে সে এবার বেশ উঁচু থেকে দেখবার চেষ্টা করল, কোন দিকে যাচ্ছে তারা। ওই তো ওদের লক্ষ্য ঐ হাতিদের দিকে। সুন্দর সুন্দর সাদা সাদা দাঁতের দিকে তাদের নজর। ভয়ে বিস্ময়ে প্রথমটা সে কিংকর্ত্ত্যব বিমূঢ় হয়ে পড়ল। তারপর ভিসাকে নিচে চিৎকার করে বলল – ভাই তাড়াতাড়ি ছুটে যা, বাবা, কাকা আর বনরক্ষী দাদাদের ডেকে আন। জঙ্গলে পশুচোর এসেছে। বন্ধুকধারী লোকগুলো ধীরে ধীরে এই বড় গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালো। বন্দুক বাগিয়ে ধরে আর একটু এগোলেই তারা ঐ হাতির দলকে পেয়ে যাবে। আপন মনে ওরা গায়ে ধুলো কাদা মাখছে। যতই দেহ ওদের বড় হোক, যতই শক্তিশালী হোক ওরা ভিন্দু জানে বন্দুকের ঐ গুলি ঢুকলে মৃত্যু অবধারিত। একটা কিছু তাকে করতেই হবে। সে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে এবার মৌচাকটা দেখতে পেল। এক নিমেষে একটা বুদ্ধি খেলে গেল, সে তার হাতের লাঠিটা দিয়ে মৌচাকটাতে একটা খোঁচা মারল। ফেলে দিল সেটি ঐ লোকগুলোর মাথায়। আর সঙ্গে সঙ্গে মৌমাছিদের তীব্র দংশনে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল তারা। ততক্ষনে ভিসা তার ছোট ভাই এক ছুটে গিয়ে তার বাবা, দাদু, কাকা, জ্যাঠা ও বনরক্ষক বাহিনীকে ডেকে এনেছে। সবাই মিলে ধরে ফেলল পশুচোরদের। ওদিকে হাতির দলটি বেঁচে গেল সেবারের মতন।

পরদিন আবার নতুন মৌচাকের সন্ধানে জঙ্গলে গিয়ে হাজির হল। ঠিক যখন চাক ভেঙে মধু নিচ্ছে তখন মধুর গন্ধে সেখানে হাজির হল এক বিরাট কালো ভালুক তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে। গাছের ওপর থেকে দাদা চিৎকার করে বলে – “ভাই ভালুক পালিয়ে যা।” কিন্তু তখন আর পালাবার সময় নেই, ভিসা লুকিয়ে গেলো ঝোপের মধ্যে। ভালুকটি তার বাচ্চাদের চাকভাঙা মধু পেট ভরে খাওয়ালো, তারপর কি ভেবে ঝোপের আশেপাশে গন্ধ শুঁকতে লাগল। ছোট ভাই ভিসা ভাবছে “আজ বুঝি আমার শেষ দিন, ভালুকের পেটেই যাব এবার।” ঠিক তখনই একটা হাতির চিৎকার শোনা গেল গাছের পিছন দিকটায়। ভালুকটা ভয় পেয়ে বাচ্চাদের নিয়ে পালালো সেখান থেকে। ভিন্দু নেমে এলো গাছ থেকে, ভিসাও ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে চেপে ধরলো দাদাকে। ঠিক তখনই গাছের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলো এক হাতি। প্রথমে দুজনে খুব ভয় পেল, বন্য হাতির পাল পেছনেই আছে ভেবে। কিন্তু না এটি তো নেহাৎই ছোট্ট এক হাতির বাচ্চা। জোরে জোরে আওয়াজ করে মাকে খুঁজছে সে। দল ছাড়া হয়ে গেছে। চোখে তার জল দেখে দুই ভাইয়ের খুব দুঃখ হল। তারা তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে শুঁড় ধরে আদর করতে লাগল, গায়ে পিঠে হাত বোলাতে লাগল। গতকাল পশুচোরদের তাড়া খেয়ে এই বাচ্চাটা দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বনরক্ষী ও জঙ্গলের আদিবাসীদের শোরগোলে বড় হাতিরা অন্য বনে চলে গেছে। এ যেতে পারেনি। ভিসা আর তার দাদা সেই বাচ্চা হাতিটিকে বাড়ি নিয়ে এল। যত্ন করে বোতলে ভরে ভেড়ার দুধ খাওয়ালো। নিজেদের কাছে খড়ের ঘরের ভেতরেই একপাশে আশ্রয় দিল তাকে। বাবা মাও খুব খুশি হলেন হাতিটির জীবন বাঁচানোর জন্য। ঘরের চারিদিকে শক্ত করে বেড়া দেওয়া হল। দুই ভাইয়ের সাথে হাতি পরম আনন্দে বাস করতে লাগল তাদের বাড়িতে।
একটু বড় হতেই মাঝে মাঝে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় তাকে, যদি সে নিজের জাতের কোনো বন্ধু খুঁজে পায়। একদিন সকালে গিয়ে আর সে ফিরে আসে না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তাদের।
বেশ কয়েকবছর কেটে গেছে, দুই ভাই এখন বড় হয়ে জঙ্গল রক্ষকদের কাজে নিযুক্ত হয়েছে। সরকার থেকে মাইনে পায় তারা। খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ পত্র কিছু জামা কাপড় সবই আছে তাদের। ঘরে ছাউনি, মাটির দেওয়াল অনেক পোক্ত হয়েছে। আদিবাসী সবাই এখন আগেরমতন একসঙ্গেই থাকে। গান-বাজনা, পুজো অর্চনা সবই আগের মতন করে, তাদের আর শুধু মৌচাক ভেঙে, কাঠ কুড়িয়ে জীবন কাটাতে হয় না।

সেদিন ভীষণ গরম, সকাল থেকেই গায়ে জামা কাপড় রাখা যাচ্ছে না। রিজার্ভ ফরেস্টে এখন তাদের অনেক রকম কাজে লেগে থাকতে হয়। কখনো নতুন গাছের চারা লাগায়, কখনো ঝড়ে পরে যাওয়া গাছ কেটে কাঠগুলো পাঠাতে হয় সরকারের গুদামে। দুই ভাই একসঙ্গে থাকে সবসময়। হটাৎ শুনতে পেল জঙ্গলে আগুন লেগেছে, পালাও সবাই। কোথায় কোনদিকে আগুন লাগল? কেমন করে পালাবে এই সুন্দর শান্তিপ্রিয় পরিবেশ ছেড়ে? ঘরে বুড়ি ঠাকুমা, একেবারেই চলতে পারে না। বাবা মায়েরও বয়স হয়েছে। তবু ছুটে গিয়ে সবাইকে কুটির থেকে বের করে পালাবার রাস্তা খোঁজে। জানোয়ারদের চিৎকার। বাঁদর পাখিদের গাছ পালা ডাল ভেঙে এধার থেকে ওধারে ঝাঁপানো – চারিদিকে এক বিশৃঙ্খলা, ভয়াবহ দৃশ্য।
আগুন ক্রমশ এগিয়ে এসে গ্রাস করে নিচ্ছে তাদের জঙ্গল, ঘরবাড়ি। মুরগি, ভেড়াগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, তারা যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।

ঠাকুমাকে ভিন্দু পিঠেতে বেঁধে নিয়েছে। মা বাবার সঙ্গে কিছুটা এগিয়ে গেছে ভিসা, হাতে তার একটা কুঠার। ডাল পালা কাটতে কাটতে পথ করতে হচ্ছে তাকে। হটাৎ পিছনে ভীষণ একটা হুঙ্কার। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। ওরাও ভীত, কিন্তু পেছন ফিরে ওদের দেখবার আগেই ঠাকুমাকে কে যেন তার পিঠ থেকে টেনে তুলে নিল। শুঁড়ে পেঁচিয়ে রাখা ঠাকুমার ঝুলন্ত চেহারা দেখে ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠলো ভিন্দু। কিন্তু কি আশ্চর্য হাতিটা অত্যন্ত সাবধানে যত্নের সঙ্গে তাকে পিঠে বসালো। এরপর ভিন্দুকে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরতেই সে বুঝতে পারলো এতো তার সেই পুরোনো বন্ধু। তাকে আদর করতে করতে চোখে জল এসে গেল তার। পিঠে বসিয়ে অন্য একদিকে ছুটতে লাগল ঐ হাতিটি। ওরা জানে জঙ্গলের কোন দিক থেকে আগুনের ঝলক আসছে। বাইরে একেবারে গ্রামের কাছে যখন দাঁড়ালো তারা, তখন সমস্ত বনটা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ভিন্দুকে হাতির পিঠে চড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে আদিবাসীদের পরিবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। জঙ্গলের আশ্রয় হারিয়ে হাতিও এসে গেল তাদের গ্রামের বাড়িতে।