Khola Chithi ( Srijato ke Ma) , An open letter to a NRI son in USA by his old ma

চন্দনা সেনগুপ্ত

'ফেইসবুক' – নাম মানে "বদন পুস্তকে" -
তোর কবিতা পড়ে
খুশি হলাম রে খোকা।
আজকাল যে কি হ'ল,
পোস্টাপিস গুলো, -
বিলি করে না, চিঠিপত্র আগের মত।
'ডাকিয়া' কেই আসতে দেখি না রোজ,
পথ চেয়ে থাকি, -
কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে -
কেউ আর কাগজে এখন -
চিঠি লেখে না গো জেঠিমা,
কম্পুটার শেখো,-
'ফেজ বুকে' ছেলেকে দেখো।
শিখেছি রে হতভাগা,
ছেলের সোনামুখ দেখতে
সব শিখে নিলাম ধীরে ধীরে।
শ্রীকৃষ্ণ যেমন মুখ হাঁ করে অর্জুনকে
ব্রহ্মান্ড দর্শন করিয়েছেন,-
তেমনি এক একটা জানলা খুলে
বিশ্ব দর্শন করায় কোলে ধরে
রাখা ল্যাপটপ - ছোট যন্ত্র-টা।
আমরা ভারতীয় 'মা' রা
অনেক পরিবর্তন দেখলাম -
এই একশ বছরে -
নিজেরাও পাল্টে গেলাম
একটু একটু করে।
তোর ঠাকুরদার সময়ে -
এক গলা ঘোমটা টেনে,
হেঁশেল ঠেলতে ঠেলতে,
গোয়ালে গরুর গোবর তুলে
ঘুঁটে লেপ্তে লেপ্তে ও
"আশাপূর্ণার" মতন পড়া করেছি।
'সুবর্ণলতা' হয়ে তোর দিদিকে
বেথুনে পড়তে পাঠিয়েছি।
শুনেছিলাম সেখানে এক কালে
বিবেকানন্দ - রবীন্দ্রনাথের দিদিরা -
পড়েছেন।
মেয়ে আমার মুখ রেখেছে।
স্কুল পাশ করে - ডাক্তারি -
তারপর বিয়ের পরেও
লন্ডনে গিয়ে FRCS পড়েছে।
গ্রাম তো অনেকদিনই ছেড়ে এসেছিলাম, -
এবার কলকাতা পিছে ফেলে -
দিল্লী চলে এলাম, -
তোর বাবার চাকরীর সুবাদে।
তুই পড়া করলি নাম করা
বড় ইংরাজি স্কুলে।
তারপর আই আই টি,
আই এ এমের গন্ডি পেরিয়েও
থামলি না, তাই -
'স্টানফোর্ডই, ওয়ারটেন।
অনেক দূরে সেই সুদূরে
নিউ ইয়র্ক শহরে - তোকে
টেনে নিয়ে গেল তোর দ্রুতগামী
"কেরিয়ার" ট্রেন।
তোদের ব্যাস্ত ছড়ানো জীবন,
এখন -
অন্য খাতে - অন্য জগতে, - বয়ে চলে।
অন্য ধাতে, রকম মারি
খেলনা, বাড়ি, গাড়ি -
নিয়ম - অনিয়মের বেড়া জালে ঘেরা,
ভিন্ন ঘাটে, অচেনা মাঠে, হাটে,
বাঁধে নতুন ডেরা। -
নানা সমস্যা, -
আশা, নিরাশা, -
নিরাপত্তার অভাবে ঘেরা।
নিত্য নতুন সম্পর্কের ভাঙাগড়া -
উত্তেজনা, উন্মাদনা আবার
কখনও কখনও উন্নাসিকতায় ভরা।
যৌবন শেষ হয়ে এলো, তোর
খোকা, তুই এখন পঞ্চাশ উর্ধের প্রৌঢ় -
'বানপ্রস্থের' প্রস্তুতিতে চঞ্চল।
আমি তোকে আমেরিকায় পাঠাতে
পেরেছি, - তুই কেন
পারবি না রে চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহের
দিকে এগিয়ে দিতে!
তোর সন্তানকে।
"চরৈবেতি - চরৈবেতি -"
এই মন্ত্রই তো তোকে
শিখিয়েছি বাবা।
এগিয়ে চলাটাই তো
'পরিবর্তনশীল' জগতের নীতি।
জীবনের স্রোতে তীব্র বেগে বয়ে চলা -
সন্তান সন্ততিদের মধ্যে -
যে সব মা ঘুরে বেড়ান, -
কন্যা ও পুত্রবধূর প্রসব বেদনায়
যিনি পাশে থাকেন,
পুত্র ও জামাইকে সদ্যজাত -
নাতি বা নাতনিটি হাসপাতালের
ঘরে হস্তান্তরিত করেন,
তাদের দুঃখে সুখে কাঁদেন, হাসেন,
সমানভাবে ভাগ করে নেন,
তাদের চাকরীর উত্তরণ বা
অবতরণের টেনশন,
সেই সব মায়েদের দলে আছি -
আমি।
জাতকের উন্নতি - শ্রী বৃদ্ধির জন্য
তোমার নাম রেখেছিলাম শ্রীজাত
আজ তোমার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে আমি গর্বিত।
ওরে খোকা, সোনা আমার -
গাঁটের ব্যাথাটা কেমন আছে -
রোজ খবর নিতে না পারলেও
আমি জানি, তোর মন এখনও
এই বুড়ি মায়ের কথা ভেবে কাঁদে।
কবিতার প্রতিটি শব্দ প্রস্তরে
সময় পেলেই কালো অক্ষরে
লিখতে থাকিস বাবা মায়ের কথা।
তাই শুধু নয়, হাঁটু জলে ভরা -
সাদা বালির কিনারায় মোড়া
দারকেশ্বর নদী ধারে সেই
'বাঁশি' গাঁয়ের নামও
শুনি তোর গদ্য কবিতায়।
যেখান থেকে একদিন তোর
বাবা বেরিয়ে এসেছিলেন,
পড়া, চাকরি ও ছেলে মেয়ে মানুষ
করার তাগিদে, -
আর ফিরে তো
যেতে পারেননি, কোনোদিনও।
অথবা তাঁকে যেতে দেয়নি, -
আমার উচ্চাকাঙ্খী মাতৃ মনও।
হ্যাঁরে, বাবু, আজ মনে পড়ে -
কতবার কেমন করে আমি
আটকে ছিলাম, -
স্বামীর ক্ষুব্ধ - গ্লানি, বিধ্বস্ত -
ক্লান্ত সত্তাকে।
এখন বুঝতে পারছি তোর মতন
তাঁর হৃদয়ও রক্তাক্ত হয়েছিল।
বুকে মাথায় হাত বোলালেও
স্বস্তি পেতেন না তিনি।
পায়ের নখ কাটতে কাটতে বলতেন -
ছোটবেলায় মা আমার পা টা
কোলে নিয়ে নখ কেটে দিতেন।
বেল কাঁটা ফুটলে -
প্রদীপের আলোটা
কাছে ধরে সেপ্টিপিন দিয়ে
ধীরে ধীরে বের করে দিতেন সেটা।
এখন মা কে একবার . . .।
থামিয়ে দিতাম আমি।
"কি করে যাবে? খোকার জয়েন্ট
এন্ট্রাস-এর পরীক্ষা এসে গেল,
বিভিন্ন স্কুলে সময়মতো কে
তাকে পৌঁছে দেবে?"
তারপর একদিন তোর কাকার চিঠিতে
জানতে পারলাম 'মা' অসুস্থ।
আর যে সে রোগ নয়, -
নাকের ডগাটা ফুলে লাল,
হয়েছিল, শরীরে একটা অস্বস্তি
থাকায় রক্ত পরীক্ষা করেন -
"বাঁকুড়ার কল্যাণ ডাক্তার,"
এই ব্যাপারে ভীষণ
অভিজ্ঞতা তাঁর, এসব রোগের
ধ্বন্বন্তরী তিনি।
স্নিগ্ধ স্বরে বলেছিলেন, -
ওনার ছেলেকে একবার আসতে বলতে হবে
রোগটা আজকাল সেরে
যায়, ভয় পাবার কিছু নেই,
তবে সামাজিক কুসংস্কারে, -
লোকের মানসিকতা তো এখনও
বদলাই, নি তাই -
তোমার কাকা বুঝে গেছিলেন,
আর একদিনও দেরী না করেই
ঠাকুমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন
গৌরীপুর "কুষ্ঠাশ্রমে"।
তোর বাবা খবরটা শুনেই ছুটে চলে
যেতে চেয়েছিলেন,
তাঁর মায়ের কাছে, -
আমি সাহস পাইনি।
রোগীকে নয় রোগকে
আমার ভীষণ ভয়।
এমনকি, আজ তোর কাছে
স্বীকার করতে লজ্জা নেই
মায়ের পোস্টকার্ড এলেও
পড়েই পুড়িয়ে দিতাম।
পাছে তোদের ঐ রোগের জীবাণুরা কখনও
আক্রমণ করে।
তোর ঠাকুমা কিন্তু কখনও দুঃখ অভিমান
রাগ করে পত্র লেখেননি।
সর্বদা জানাতেন, -
"আমি ভালো আছিরে মনু -
এখানে নার্সদের বাচ্চাগুলোর
ভার নিয়ে নিয়েছি, -
ওদের পড়াই, গান শেখায়।
আর যারা খুব অসুস্থ চলৎশক্তিহীন
সেইসব দুস্থ রোগীদের পাশে বসে
গল্প শোনাই, খুব ভালো লাগে।"
থাক ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা
আদরের খোকন, বাবা,
বুকের যন্ত্রনাটা আর
বাড়তে দিস না যেন,
ডাক্তার দেখা, আর কিছুদিন
বৌ বাচ্চাদের নিয়ে -
"হাওয়াই" কিংবা "বালি"
বেড়িয়ে আয়, - মনটা ভাল হয়ে যাবে
আমার কাছে না আসতে
পারার জন্য কোন -
'গিলটি' মানে - অনুশোচনা,
অনুতাপ - পরিতাপ - দুঃখ বা
ক্লেশ রাখিস না মনে।
নিজেকে দোষারোপ -
করিস না সোনা -
ডিপ্রেশন হয়ে যাবে, ফুরিয়ে
যাবে তোর নিত্য নতুন -
টেকনোলজি - 'প্রোগ্রাম'
বানাবার ক্ষমতা, একাগ্রতা কমে গেলে
নিজেকে হারিয়ে ফেলবি ধীরে ধীরে।
আমি তো সব সময়ই -
তোর পাশে আছি রে।
'সময়' বড় নিষ্ঠূর আর
কঠোর শিক্ষক।
তার নিয়ম নিষ্ঠা, রীতি
নীতিকে মেনে চলাটাই
তো জীবনকে স্রোতস্বিনী -
রাখা, তবেই তো আসে -
সাফল্য।
শুধু কেরিয়ার নয়, জীবিকাকে
আঁকড়ে সোপানে চড়া নয় -
আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশী
সকলের সঙ্গে সম্পর্ক
বাঁচিয়ে রাখার জন্যে
প্রতি মুহূর্তে ছিঁড়ে
যাওয়া তার জোড়া দিতে
গিয়ে তোদের এ যুগের
ছেলেমেয়েদের অনেক চাপ সহ্য
করতে হয়, এই অজানা প্রবাসে।
নানান সমস্যা ও মানুষের
দাবী মেটাতে গিয়ে অহরহ
তোদের এই ছুটে চলা -
অবিশ্রাম ফোনে কথা বলা
আমাকে ব্যথিত করে, কাঁদায়,
ভাবায়। তোদের অবস্থা যারা -
অনুভব করতে পারে না -
তারা তোদের অনেকরকম
সমালোচনা করেন। না রে খোকা
আমি কিন্তু তাদের দলে নেই।
অকারণে আবেগপ্রবন হতে গিয়ে
তোর কাছে যেন ভুল
না হয়ে যায় বাবা।
আমার জন্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে
কোন চিড় না ধরে।
ঘরে ঘরে এখন সানাই এর
চেয়েও ডিভোর্সের বাঁশি বেশি বাজে।
ছোট ছোট শিশুরা
হাঁ করে মা বাবার ঝগড়া
শোনে, আর সারাদিন
ঢুকে যায় "আই প্যাড" এর আড়ালে,
নেটের জগতে - অন্য এক
স্বপ্নময় রহস্যপূর্ণ গুহায়।
তাই তোর মায়ের মাথায়
সব সময় চিন্তা -
সন্তানের সুখের নীড় যেন
ভেঙে না যায়। তারা যেন
শান্তিতে আনন্দে সময় কাটায়।
আর আমার খোকার যদি
ভুলভ্রান্তিও হয়েই থাকে কোন
কর্তব্যবোধ, আদর্শ, মূল্যবোধে যেন
ভাঁটা না পড়ে -
এই আমাদের কাম্য।
মা মানেই তো 'ক্ষমা'
উদারতার আকাশে বিচরণ করা।
তোর মতন প্রবাসী বিদেশী
ছেলে মেয়েদের জন্য আমি আজ
গর্বিত রে খোকা।
নিজেদের চেষ্টায়, সাধনায়,
পরিশ্রমে তোরা বড় হয়েছিস,
দুর্নীতি পরায়ন নেতাদের
পায়ে ধরে, খোশামোদের
জোর দিয়ে নয়।
মানুষ ঠকানোর ব্যবসা
তোরা করিস না
তোরা চোরা গলির পথ দিয়ে
উচ্চতার শিখরে পৌছোসনি,
লোভী, স্বার্থপর দানব হয়ে
দেশপ্রেমের মুখোশ পড়ে বেড়াসনি কখনও
দয়া, মায়া, স্নেহ, ভালোবাসায় -
তোদের মন, বাপ-ঠাকুরদার মতন
এখনো কোমল আছে।
জাত পাতের গন্ডি ছাড়িয়ে
ধনী নির্ধনের ভেদাভেদ ভুলে
সাদা কালো, ইহুদি মুসলমান
সবাইকে বুকে জড়িয়ে
ধরতে পারিস তোরা।
মানুষের মতন মানুষ হবার -
শিক্ষা গ্রহণ করে
জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিস ঘরে
এটাই আমাদের সবচেয়ে
বড় আনন্দ ও শান্তি।
তোকে আমি আশীর্বাদ করি তাই
বারে বারে জানাই, স্নেহাদর প্রানভরে।
হাতের স্পর্শ দিয়ে বুকের যন্ত্রনা
যদি দূর করতে নাও পারি, -
তবু জানবি - আমার আত্মা
সর্বদা ছুঁয়ে যেতে চায় -
তোর অমলিন সত্তা।
স্নিগ্ধ হাওয়ায় বার্তা পাঠায়,
আমার বাস্প হয়ে যাওয়া অশ্রু।
আর মেঘদূতের মতন এই মন
সর্বদাই তোর কাছে ধায়।
তোর মা তোর কাছে
কৃতজ্ঞ রে খোকা,
তোর পাঠানো টাকা
আমার দক্ষিণেশ্বরে ফ্ল্যাট
কিনে দেয়,
বাবার গ্রামের বাড়ি সারায়।
দুঃখী বিধবা পিসির -
মেয়ের বিয়ের গয়না গড়তে
আমার সাহায্য করে।
তোর পাঠানো স্কলারশিপের টাকায়
বিদেশের পাঠরত অসহায় ছেলেটির
উচ্চ শিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়।
ছোটবেলাকার গৃহ শিক্ষকের ক্যান্সার শুনে
কেমো বা রেডিয়েশন এর খরচ পাঠাতে
বিন্দুমাত্র দেরী করিস নে তুই।
এমনকি কাজের মাসির পাগল ছেলের
চিকিৎসা করাতে পারি আমি প্রতিমাসে,
কেননা - 'ডলারে' আমার হাত খরচা আসে।
তোর মতন আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি কিম্বা
অস্ট্রেলিয়া বাসী এরকম আরও অনেক
ছেলে মেয়েরা যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে
বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, সুনামি বা
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে
দেশবাসীর পাশে এসে দাঁড়ায়
তাদের দান ও টান আবেগে আপ্লুতো
করে দেয় মা বাবাদের,
এখনকার সমাজে মোদের সম্মান বাড়ায়।
যত "চোখে আঙ্গুল দাদা" বিদেশে কর্মরত
দু চার জন ব্যতিক্রমী স্বার্থান্বেসীকে ধরে
উদাহরণ দেয়, পত্রপত্রিকায়, গল্পে, নাটকে
শুধু লিখে যান 'ন-কারাত্মক' খবর।
কিন্তু আমি জানি তোরা এখনো হারিয়ে ফেলিসনি
তোদের ভাষা সাহিত্য বা ঐতিহ্যকে।
সর্বদায় তোরা মুক্ত মন নিয়ে যুক্ত আছিস
দেশবাসীর সুখে দুঃখে।
আর সেকথা বোঝাতেই তো শ্রীজাত
বাবা- তোকে লিখছি এই খোলা চিঠি।
ডাক্তার জ্যেঠুকে মনে আছে তোর?
তিনি কি বলেন জানিস?
"এরাই তো তোমার রবিঠাকুরের সেই
বীরপুরুষের দল।"
তারপর সেই অসাধারণ লাইন জুড়ে দেন
তোর সম্বন্ধে -
"পাড়ার লোকে সবাই বলতো শুনে,
ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের সনে।"
আজ আমার অকপটে স্বীকার করতে
ইচ্ছে হয়, জীবনে তুই পাশে না থাকলে,
আমি হতাম নেহাৎই এক দুঃখিনী
মা - অতি নগন্য।
সুজাতা ও শ্রীকান্তের পুত্র
বাবা শ্রীজাত, তোদের মতন
ছেলে মেয়েরাই তো মায়েদের জীবনকে
করেছে ধন্য।
ইতি টানার আগে বুকভরা
স্নেহাশীষ ও ঠাকুরের কাছে
কুশল প্রার্থনা জানাই
তোমার জন্য।
মা