চন্দনা সেনগুপ্ত
ডাঃ কল্যাণী প্রসাদের পরশে অণুবীক্ষণের যন্ত্র যখন তার আত্মাকে খুঁজে পেল
১৯৪২ সাল, ভারতছাড়ো আন্দোলনে দেশের তরুণ যুবকেরা স্কুল, কলেজ কাজ কর্ম, অফিস আদালত ছেড়ে পথে নেমেছে – চারিদিকে একটা হৈ হৈ ব্যাপার চলছে ঠিক সেই সময় এক ২৪ বছরের যুবক আমায় নিয়ে এলেন কলকাতার এক দোকান থেকে কিনে। ধুলো ধূসরিত বাঁকুড়ার বাজারে, ছোট্ট ওষুধের দোকানের এক কোনে। এক টেবিলে জায়গা পেলাম আমি। আমার লেন্সের কাঁচটি বার বার মোছেন সেই যুবক, পাশে সিরিঞ্জ, স্পিরিট, কয়েকটা লোশনের শিশি, ও তুলোর প্যাকেট। অতি নগন্য সাজ সরঞ্জাম, কিন্তু লোকেদের রক্তের ভেতরে শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকাদের দেখার, মূল মূত্র পরীক্ষা করে কৃমি বা জিয়াডিয়া, আমাশয়ের কলেরা, জন্ডিসের জীবাণুদের চেনার জন্য যথেষ্ট আয়োজন।
গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। আমার সাহায্য নিয়ে এই যুবক ডাক্তার আজ নতুন জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন ইংরেজকে ভারতছাড়ো বলে হুঙ্কার তিনি হয়তো দিতে যাননি কিন্তু মানুষের শরীর থেকে রোগের কীটাণু বিষাক্ত জীবাণুদের দূর করার সাধনায় যুক্ত হয়েছেন। আমাকেও সেই মহান কাজে নিযুক্ত করেছেন, এজন্য আমি ধন্য।
কোনো মন্দিরে মাটি, পাথর, তামা বা অষ্টধাতুর মূর্তি বানিয়ে রাখা হলেই তাকে কেউ ভক্তি করে না। কিন্তু সংস্কৃত মন্ত্র জানা সদাচারী শুদ্ধ আত্মা পন্ডিত পুরোহিত এসে যখন তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেই মৃন্ময়ী বা ধাতুময় প্রতিমা হয়ে ওঠে ‘চিন্ময়ী’ – একেবারে দেবতার রূপধারী জীবন্ত। ভক্তেরা এসে তখন তাঁর পুজো করেন। আমিও এবার যেন প্রাণ পেলাম কল্যাণী ডাক্তারের সাধনায়। এতদিন এক সামান্য যন্ত্র ছিলাম। এখন হলাম জীবন্ত। ১৬১৯ সালে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেন ‘দূরবীক্ষণ যন্ত্র’ – আকাশের নক্ষত্রদের অতি কাছে দেখার জন্য। আর আমাদের অতি ক্ষুদ্রকে বৃহৎ করে দেখার জন্য তৈরী করলেন। আমার আবিষ্কার কর্তা Antone van Leeenwenhoek Armsterdom। এই ডাচ বিজ্ঞানীর চারশ বছর কেটে গেছে, কত পাতলা লেন্স দিয়ে কত সুন্দর সুন্দর দূরবীক্ষণ যন্ত্র এখন বেড়িয়েছি, ২০১৬ তে Google ৩৮৪তম এনিভার্সারি ঘোষণা করলো আমাদের জন্ম লগনের। কিন্তু এ সবই তো হলো যন্ত্রের ইতিহাস। এই ক্ষুদ্র অণুবীক্ষণকে যাঁরা কাজে লাগাতে পারেন মানবহিতের জন্য ব্যবহার করেন তাঁরাই আসল দেবতা।
তরুণ ডাক্তার কল্যাণী প্রসাদ গুপ্ত আমাকে সেদিন অত্যন্ত অতি নিষ্ঠার সঙ্গে যেন প্রাণ দিয়ে সজীব করে তুললেন। কত শত সহস্র জীবাণুদের ছোট একটি স্লাইডে বন্দী করে আমার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলে ধরা পড়লো তাদের প্রকৃতির দোষ গুন। জীবন্ত সেই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের বীক্ষণ করা এবং দেখার জন্য অত্যন্ত দক্ষতা চাই। আমার মালিক তথা ডাক্তারবাবু আমাকে ব্যবহার করে সেই দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ঠ হলেন, কারো কোনো সাহায্য না নিয়ে।
আমি সেদিন থেকেই তাঁর সুখ দুঃখের সাথী। আমায় রোজ এসে তিনি আদর করে তাঁর স্নেহ পরশ বুলিয়ে দিতেন। তাঁর জীবনের ছোটবড় সব সুখ দুঃখের ঘটনার গল্প আমি জানি। যেদিন কোন রোগীর শরীরে বড় রকমের কোন অসুখের সন্ধান পেতেন যার ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু সেই রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক তাই রোগীকে বাড়িতে আর রাখা যাবে না, তখন তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়তো আমার লেন্সের ওপর। একবার তাঁর এক তরুণ আত্মীয় এলেন কলকতা থেকে তাঁর বড় ভাইদের সঙ্গে নিয়ে। কি হয়েছে তার সঠিক রোগ নির্ণয় করাতে। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে জানতে পারলেন তা দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগ। এই অপ্রিয় সত্যটি ব্যক্ত করতে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিলো বারবার আমার কাঁচ মুছে দ্বিতীয়বার – তৃতীয়বার নিরীক্ষায় ক্ষান্ত হতে হল তাঁকে। ছেলেটিকে “গৌরীপুরে” কুষ্ঠাশ্রমে পাঠানো হল। পড়াশুনোয় অত্যন্ত মেধাবী হাস্যময় সতেজ যুবকটি সেখানে গেলেন, কিন্তু কয়েকদিন পরেই আত্মঘাতী হলেন। ডাক্তারবাবু সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। মনে হল সত্য ভাষণে তিনি যেন ছেলেটিকে ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন। কখনো কখনো আবার দেখেছি অন্যত্র পরীক্ষা করে খুব খারাপ রিপোর্ট দিলে সেই রোগীকে কলকাতা থেকে “ডাঃ মনি চত্রির” মতন বড় হার্টের বিশেষজ্ঞ বাঁকুড়ায় এই কল্যাণী বাবুর কাছে পাঠিয়েছেন – সেকেন্ড ওপিনিয়ন অর্থাৎ দ্বিতীয় রায় নেবার জন্য। আমার ডাক্তারবাবু অনেক্ষন ধরে সব রকম পরীক্ষা করে হাস্যমুখে তাকে জানালেন – “কে বলেছে যে তোমার রক্তে এ সব দোষ আছে? কিচ্ছু নেই। কোন ভয় নেই, নির্ভিগ্নে তুমি বাড়ি চলে যাও।”
আমার কাঁচে তাঁর সুন্দর শুভ্র দাঁতের হাসি প্রতিবিম্ব দেখে আমিও খুশি হলাম। ছোট্ট সেই দোকান থেকে একটি বড় ভাড়া বাড়িতে দুই কামরার চেম্বারে এর পর উঠে এসেছি, আমরা। দুজন তরুণ ডাক্তারবাবুর সহচর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। গোবর্দ্ধন ও সুশীল। কত যত্ন করে তাদের তিনি সুদক্ষ কম্পাউন্ডার করে তুলেছেন, ট্রেনিং দিয়ে, সাহস জুগিয়ে, তা আমি জানি। আমার অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জন্য রক্ত নেওয়া, মূল, মূত্রকে ঘেন্না না করে, স্লাইডে রাখা সবই তিনি হাতে ধরে শেখাতেন তাদের। পরে এই চেম্বার চলে যায় “পূর্ণভবনে” জেল খানার পিছনের – বিরাট বাড়িটায়। সেখানে এসে আমার মনে হল কি সুন্দর প্রাসাদে এলাম আমি।
ধোন, দৌলত, গৃহ সুখ সমৃদ্ধি সবই বৃদ্ধি পেল। স্ত্রী ছেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর নিজের বয়স-ও ধীরে ধীরে বেড়ে চলল চোখের সামনে। নতুন নতুন জামাই বৌমার আসছেন, মনে হল এতো সুন্দর পরিবেশে আমার মর্য্যাদাও বেড়ে গেল। রুগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল, আমার চারপাশে লাইন দিয়ে সাজানো কত কত মানুষের শরীরের বর্জ্য পদার্থ। ঘরের বড় বড় জানলা দিয়ে আলো হাওয়া এসে স্নিগ্ধ করে দিয়েছে ল্যাবরেটরী ঘরটি। মধ্য বয়সী ডাক্তারবাবু এখন পাঁচজন সন্তানের পিতা। তাঁর সু-গৃহিনী স্ত্রী চিন্ময়ী দেবী প্রতিদিন সকাল থেকে কাজের লোকদের দিয়ে সমস্ত বাড়িটি ধোয়া মোছা করিয়ে দেন। কত রুগীদের গাড়ি, রিক্সা এসে ভিড় করে বাড়ির সামনে। আমার গর্ব হয় মনে মনে। আমাকে ঘিরেই তো এতসব। আমি এখন সেই সাধারণ যন্ত্র নই। ধনদৌলত নাম যশ সবই বৃদ্ধি পেয়েছে ডাক্তারের কিন্তু মনে তাঁর অহংকার আসেনি বিন্দুমাত্র। বয়স বেড়েছে যত, ছেলে মেয়ে, বৌমা জামাই নাতি নাতনীতে ভরে উঠেছে বাড়িখানি। তাদের কলকাকলিতে ভরে পূর্ণভবন। ভবনের অন্দর বাহির। বাগানের মাধবীলতা, জবা, স্থল পদ্ম গাছগুলি কত বড় হয়ে ফুলের গন্ধে ভরিয়ে রেখেছে সেই বাড়ির পরিবেশ। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি আমার। অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে ১৯৯২ হয়ে গেছে, তবু কখনো তিনি আমাকে বদল করার কথা ভাবেননি।
একবার কাউকে বলতেও শুনেছি এখন কত সুন্দর নতুন ধরনের “মাইক্রোস্কোপ” বেরিয়েছে একটা আনতে পারলে আর এর ওপরে ঘাড় কাত করতে হয় না। কিন্তু নিজের সামর্থ থাকলেও তিনি তা করেননি।
আমাকে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্যাথলজির কাজ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর স্বর্গারোহনে আমার আর কদর নেই। জলের দরে বিকিয়ে গিয়েছি আমি, আমার কান্না কেউই তো শুনতে পায়নি। হটাৎ একদিন দেখি আমার অজ্ঞাতবাসের দিন শেষ হল। সেই অজ্ঞাত পরিচয় মানুষটিকে খুঁজে বের করে ২০ বছর পরে তাঁর “নাতি” আমাকে আবার নিয়ে এসেছে প্রাপ্য মৰ্য্যাদার সঙ্গে।