চন্দনা সেনগুপ্ত

সেনগুপ্ত বাবুদের গ্রামের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা সমস্ত দায়িত্বই কালুদার ওপর ন্যস্ত। তিনিই একাধারে ম্যানেজার, কৃষিকর্মের সঞ্চালক, পুকুরে মাছের চাষ, জাল ফেলার জেলে, ধবলী শ্যামলী গরুর পরিচালক রাখাল, বাগানের মালী, আবার বাড়ির শিশুদের মনোরঞ্জক। সুঠাম তার চেহারা। মনে হয় যেন দক্ষিণ ভারতের কালো কোষ্ঠি পাথরের কৃষ্ণ মূর্তি। সদা হাস্যময়, কাজ পাগল এক নির্ভেজাল মানুষ।

পূজোর সময় বাড়ি ভরে আত্মীয়স্বজন থাকেন, তাদের সকলের ভুরি ভোজন, শোয়ার ব্যবস্থা, ঘরদোর গোছানো, ধানের মারাই বাঁধা সবই নানান লোক ডেকে তিনি করান। কর্তা মা বা তাঁর ছেলেমেয়েদের কোনো চিন্তাই থাকে না।

এ বাড়ির বড় ছেলে ডাক্তার হয়ে জামুরিয়াতে কোলিয়ারির হাসপাতালে চলে গেছেন, কালুর তত্ত্বাবধানে মা, বৌ ও দুই বাচ্ছা রেখে। কালুদা ভীষণ খুশি। বাড়ির বড় বৌমা খুব ভোরে উঠেছেন।তুলসী তলায় গোবর লেপে, দরজায় আলপনা ঘট বসিয়েছেন তিনি। আজ ষষ্ঠীর দিন সকাল সকাল স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের টিপটা গোল করে আঁকছেন। বাচ্ছারা উঠোনে খেলা করছে। কাকারা কলা বৌ চান করাতে গেছেন ঢাক বাদ্যির সঙ্গে আনন্দ করে নাচতে নাচতে, কেউ গান ধরেছে-

‘আমার উমা এলো গো, চণ্ডীমণ্ডপ

আলো করে উমা এলো গো’।

হটাৎ দরজায় পিয়নদাদা এসে হাজির একটি টেলিগ্রাম নিয়ে। তখনকার দিনে ফোন আসেনি গ্রামে, ইলেক্ট্রিক ও ছিল না। এই “টরে টাক্কাই” ছিল একমাত্র জরুরি খবর পৌঁছানোর মাধ্যম। এতো সকালে কে করতে পারে টেলিগ্রাম। মনে হয় মেজোকাকার পরিবার জামশেদপুর থেকে কোন ট্রেনে আসবেন, তাই জানিয়েছেন। কালু টেলিগ্রামটা পিয়নদাদাকে পড়ে দিতে বলে। তিনি খুলে বললেন, “চান্ডিমন্ডপে গিয়ে এ বাড়ির দাদাদের হাতে দিয়ে এস গে তাড়াতাড়ি। আমার বয়স হয়েছে ভালো করে পড়তে পারছি না”। ওনার মুখটা দেখে ঘাবড়ে যায় কালু, ছুটে যায় বাইরে।

আর তারপর শুধু চিৎকার, হাহাকার, আর্তনাদ করতে করতে একে একে সবাই এসে জড়ো হতে থাকে বাড়ির উঠোনে।

– বড়দা, মানে মাত্র ২৩ বছরের তরুণ ডাক্তার ওই নির্জন কোলিয়ারির হাসপাতালে মাথায় জ্বর উঠে গিয়ে অর্থাৎ “ম্যানেঞ্জাইটিসে” মারা গেছেন, গতকাল রাতে। সমস্ত গ্রাম শোকে দুঃখে কাতর আর তাঁর ঊনিশ বছরের তরুণী স্ত্রী পাথর হয়ে গেছেন।

কর্তা মা তো পাগলের মতন করছেন – তাঁকে সামলানো যাচ্ছে না, দিন পনেরো পেরোলো না বৃদ্ধা মার্ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে গেলো, তিনিও দেহত্যাগ করলেন।

কাকারা সব কলকাতা, বোম্বে বা জামশেদপুর – যে যার কর্মক্ষেত্রে চলে গেলেন। বড় বৌমা, মানে শুদ্ধাচারিনী বিধবা মা ঠাকুরুণ ও তাঁর দুই ছেলে মেয়ে গ্রামেই থেকে গেলেন মতি পিসি, বাউরি বৌ ও কালুদার তত্ত্বাবধানে। শিশু সন্তান দুটিকে সারাক্ষণ বুকে আগলে রাখেন কালুদা। পুকুরে বন-বাদাড়ে যেতে দেন না। বাড়িতে কুঁয়োর জল তুলে চান করান। রোজ পাঠশালায় দিয়ে আসেন ও নিয়ে আসেন। বাগানে সবজি তুলতে, মেলা দেখাতে নিয়ে যান। মা ঠাকুরুণের হনুমান সে, সীতামাতার মতন মনে করেন।

দিন কাটতে থাকে, বছর ঘুরে যায়। কন্যাটি ডাগর হয়ে ওঠে। কাকা কাকিমারা নিয়ে যান তাকে কলকাতায়। অন্যান্য বোনদের সঙ্গে সে বিবাহযোগ্যা হয়ে যায় এবং অল্পবয়সেই সু পাত্রে তাকে পাত্রস্থ করেন তাঁরা। পাঠশালা শেষ করে গ্রামের স্কুলে ভাই পড়াশোনা করতে থাকে। শুদ্ধাচারিনী মায়ের সাথে সেও ওই আতপ চালের ভাত, আলু-কুমড়ো সেদ্ধ একটু গাওয়া ঘি মেখে খেয়ে নেয়। রবিবার দিন কালু দা উঠোনের একপাশে কাঠের উনুনে মাটির হাড়িতে ডিম সেদ্দ বসায়, বলে – “ভাই রে আজ তুমাকে হাঁসের ডিম খাওয়াবেক কালু দা”। বারো তেরো বছরের ভাই আনন্দে একেবারে গলে যায়। কালুদার গা ঘেঁষে বসে ঐ হাঁড়ির জল ফোটা দেখে, আর ভাবে কালুদাটা কত ভালো।

সত্যি এরকম অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে বোধহয় কেউ দিতে পারেনি। তাই সে কালুদাকেই তার জীবনের ‘কান্ডারী’ মনে করে। তার সঙ্গে থাকতে থাকতে কর্মঠ, সহিষ্ণু, নির্লোভ ও স্নেহশীল এক পূর্ণাঙ্গ কিশোর রূপে সে বেড়ে উঠতে থাকে। গরমের দুপুরে নামতা মুখস্ত করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়লে, কালুদা তাকে হাওয়া করে যায়, যতক্ষণ না তার ঘুম ভাঙ্গে।

রাত্রে দুটো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে জোরে জোরে পড়া করে সে। কাকা তাকে একটা গ্লোব উপহার দিয়েছেন। সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কালুদাকে দেশ চেনাতে থাকে। কালুদা অবাক হয়ে যায়। ইতিহাসের যুদ্ধ, বিজ্ঞানের ফোটোসিনথেসিস ব্যাপারগুলো গো গ্রাসে গেলবার সময় ভায়ের জন্যে গর্বে বুকটা ভোরে ওঠে তার। মা ডাকেন – ও কালু চা নিয়ে যা, সে চেঁচিয়ে উত্তর দে – “একটুকুন সবুর করুন গো মা, গাছগুলা অখনও সূয্যি দ্যাবতা থেকে আগুন নিয়ে মাটির রস ফুটায়ে খাবার বানাচ্ছে, সব বেতান্তটা শুনে নিয়ে যাব”।

মায়ের কাছে বসে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে আবার – “হ্যাঁ গো মা জননী – ইটা সত্যি বঠে? পাতার ভিতরে একরকম সবুজ সবুজ মশলা থাকে? আমরা যেমন লুন হলুদ দিই, গাছগুলাও কি উগুলা দিয়ে খাবার বানায়”?

মা ঠাকুরুণ বলেন – “হ্যাঁ রে বাবা ভাই যখন বই থেকে পড়েছে, তখন তো সব সত্যি। ওই থেকেই তো ফল ফুল হয়”। এরপর ভাই ম্যাট্রিক-এ প্রথম বিভাগে পাশ করলো। কালুর তখন সে কি আনন্দ। ধামা ধামা মুড়ি, বাতাসা, বাগানের আম বিলি করে এলো সে গ্রামের লোকেদের।

বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে ভর্তি হওয়ায় ভাই চলে গেল। টিনের বাক্সে জামাকাপড় গুছিয়ে তাকে ছেড়ে আসার পর কালু বলে বেড়ালো – “আমার ভাইয়ের মাথা ট তে কত্ত বুদ্ধি বটে, কত্ত বড় কলেজটাতে পড়ে।” পিতৃহারা সন্তানটির জন্য মা উদাস হয়ে বসে থাকলে তাকে আশ্বাস দেয় সে,- “উয়াকে লিয়ে আর ভাবতে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ, উ একদিন অনেক বড় কাজ করবেক।”

সত্যিই কালুর ভাইকে নিয়ে আর কাউকে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। আই এস সি পাশ করে সে চলে গেছে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং তারপর সেখান থেকে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার্থে। যেদিন সে চলে গেল, মা সেদিন সারাক্ষণ জপ আর পাঠে কাটাতে লাগলেন। তুলসী তলায় প্রদীপ দিতে এসে তাঁর খেয়াল হলো বিকালের চা দেওয়া হয়নি কালুকে। গরুর জন্য বিচালি কাটছিলো সে। কাটছে তো কেটেই যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কাঁধে ফেলে রাখা গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। নিজের দুঃখ হতাশায় কখনো তিনি কাবু হননি। আজ হবেন না সংযমের বাঁধ যেন না ভেঙে যায় তাঁর। তাড়াতাড়ি একটা বড় গেলাসে চা করে বাটিতে মুড়ি নিয়ে ডাক দিলেন কালুকে, –

“মন খারাপ করিস না কালু, ওখানে তো ভাই পড়তে গেছে, কত জ্ঞান অর্জন করে বড় চাকরি নিয়ে ফিরে আসবে সে।”

পরেরদিন দুপুরে কালুর জন্যে রাঁধলেন কলাই ডাল, পোস্ত আর আমড়ার ঝাল চাটনি। কালু হাত চাটতে চাটতে বলল, – তুমার হাতের ব্যাজনটা যে খায় নাই, সেকি বুঝবেক উয়ার স্বাদ কি?” – বাটি থালা সব খালি হয়ে গেল এক নিমেষে। “আর একটুকুন দাও গো মা।”

তিনবছর কেটে গেল। সারা গ্রামে গুঞ্জন শোনা গেল, কালুর বিদ্বান ভাই মেম বিয়ে করেছে। বাড়িতে মায়ের কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ভিড় জমালেন। কেউ বললেন, – কী এই বিধবা মায়ের কাছে ম্লেচ্ছ বৌ আনবে? আমরা থাকতে তা কিছুতেই হতে দেব না। কেউ আবার পরামর্শ দিলেন – আপনি তো অর্ধেক সময় উপোস, পুজো আচ্ছা নিয়ে থাকেন, এবার অনশন ধর্মঘট করুন। আমরা সবাই অবস্থান ধর্মঘট করবো। এয়ারপোর্ট থেকেই ভাগিয়ে দেব ঐ মেমসাহেব কে। কেউ আবার এও বললেন – “এখানে যেমন ছেলেধরা থাকে, ওসব দেশে সেরকম মেয়েগুলো ছেলে ধরবার কাজ করে, এলে একেবারে এমন হেস্তনস্ত করব, পালাবার পথ পাবে না।” একটি ছোট মেয়ে টিপ্পনি কাটল, তার মা ঠাকুমার কথার খেই ধরে – “মেয়ের চোখে লংকার গুঁড়ো ছুড়ে দেব” – হাঁউ মাউ চাউ করে কেটে পড়বে রাক্ষুসীটা। বাঙালি ছেলেকে ধরার মজাটা টের পাবে তখন।”

কালুদা কিন্তু ভীষণ খুশি, তার ভাই বৌ নিয়ে বাড়ি আসছে, এর চেয়ে বেশি আনন্দের কি হতে পারে? বৌ কোন দেশের, কোন জাতের, কোন ভাষার বা কেমন দেখতে অতশত সাত পাঁচ ভেবে লাভ কি তার? ভাই যে ফিরে আসছে সেটাই তার কাছে সবথেকে সুখের কথা। ভাই নিজে যখন পছন্দ করেছে, তখন সেও যে ভাইয়ের মতনই সুন্দর মনের মানুষ হবে এটাই তার বিশ্বাস, তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোই তার প্রধান কর্তব্য।

শুরু হল বাড়িঘর পরিষ্কার করে সাজিয়ে সারিয়ে তোলার কাজ। শহর থেকে মিস্ত্রি আনিয়ে তৈরী হল সেপটিক ট্যাঙ্ক, পায়খানা, বাথরুম। ভাই তাকে এটি করার জন্য আগেও অনেকবার বলেছে কিন্তু মা ঠাকুরুণ সকাল সকাল নদীতে নাইতে যান, পুকুরে গিয়ে গা ধুয়ে আসেন আর পাঁচজন গ্রামের মহিলার সঙ্গে তাই এতো দিন কালুর খেয়াল হয়নি। কলাগাছ কেটে দরজার দুপাশে লাগলো, কুমোর বৌকে ডেকে মাটির ঘটে বসালো, গ্রামের পটুয়াকে দিয়ে ঘটগুলিকে উঠোনের পাশের আঙিনায় রেখে চিত্র অঙ্কন করলো। বামুনদিদির মেয়েদের দিয়ে চারিদিকে দালানে দাওয়াতে আলপনা দেওয়ালো। নাপিত বৌকে আলতা পরানোর বায়না দিয়ে এলো। সে কি ধুম লেগেছে তার। তাঁতির ঘর থেকে এলো নতুন নতুন চাদর। কবেকার পুরোনো বালিশ তোষক বিদায় নিল বাড়ি থেকে। তার হৈ চৈ করা দেখে গ্রামের সহজ সরল চাষী বাসী, জেলে, বাউরি, বাগদী বৌরাও এসে হাজির হল বাড়িতে। কায়েত গিন্নি, রায় বৌদি, সাহা কাকিমাদের বাড়ির এয়োদের ধরে আনলো বৌ বরণের জোগাড় করতে।

আত্মীয় স্বজনের কথা তীক্ষ্ণ বাণে জর্জরিত মা প্রথমে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে বৌকে কিভাবে আপ্যায়ন করবেন, কেউ নেমন্তন্ন খেতে আসবে কি না ভেবে পাচ্ছিলেন না। গ্রামের পন্ডিত, পরিবারের বয়স্ক লোকেদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এবার কালুর উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে তাঁর মনের মেঘ সব যেন দূরে কোথাও উড়ে পালিয়ে গেলো। ঘরে এলেন সেই বিদেশিনী। বৌকে ছেলে আগেই কাজ চালাবার মতো একটু আধটু বাংলা শিখিয়ে এনেছে। ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় বিদ্যাশিক্ষার আলোকে মেয়েটির মুখ জ্বল জ্বল করছে। মাকে পায়ে হাত দিতে নিচু হতেই বামুন দিদি ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন – “ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা বাছা, মাকে আবার এই অবেলায় চান করতে হবে।”

কালুদা রেগে উঠলো – “হলে হবেক। মা চান করবেক আর একবার, তা বলে বৌ এর পেন্নামটা লিবেক আবার নাই?”

ভাই বৌ নিয়ে চলে গেল তার কর্মক্ষেত্রে, একবছর পরেই ওদের কোল আলো করে এলো ফুটফুটে দেবশিশুর মতন এক কন্যা। বাবার মতন মুখ, মায়ের গায়ের রং। এখন বাড়িতে এলেই তার জায়গা হয় কালুকাকুর কোলে কাঁধে।

মেয়ে যখন তিন বছরের তখন ছয় মাসের জন্য ভাইকে আবার বিদেশ যেতে হলো কোনো ট্রেনিং এর জন্য। বৌ এবং মেয়েকে সে রেখে গেল, গ্রামের বাড়িতে কালুদার জিম্মায়। ঠাম্মার সঙ্গে ভালো ভাব জমবে বলে। সেই ছয় মাস বোধহয় কালুর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

মা তার বিদেশিনী বৌমা ও নাতনিকে কোনোদিনই অনাদর করেননি, কিন্তু পুজো পাঠ, বার ব্রত, একাদশী, নির্জলা উপবাস ভুলে গিয়ে সর্বদা বুকে টেনে আদর করতেও পারতেন না। তাই তাদের সবকিছু প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত ছিল ওই কালু। ছোট্ট সরস্বতীর মতন গৌরাঙ্গী তখন আদো আদো স্বরে কাকু কাকু বলে ডাকতে শুরু করেছে, কাকু তাকে কাঁধে নিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে সারা গ্রাম। পুকুরপাড়ে ছাগলের সঙ্গে খেলা করতে, বাগানে কাঠবেড়ালি তাড়াতে, জাল ফেলে মাছ ধরা দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগে। সকাল বিকেল গরুর দুধ দোওয়ানো দেখে তার শিশু মন অপার আনন্দে ভরে যায়। ধান ক্ষেতের আল ধরে কালুকাকু তাকে কাঁধে নিয়ে চলে। চাষী বন্ধুরা জমির কলাইশুটি, কুমড়ো, লাউ এনে হাতে দেয়। কালু এনে ঢেলে দেয় মা ঠাকুরুণের সামনে।

সহজ সরল, নির্ভেজাল এই মানুষটির সান্নিধ্যে ওই ছোট্ট কন্যাকে ছাড়তে তার ওই মা বা বৌদিমনি কারুর মনেই কোনো দ্বিধা আসে না। বিদেশিনী বৌমা ভাবেন, – নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন কত শহরে কতধরনের লোকের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন, কিন্তু এমন একজন নিখাদ সোনার মতন অতি স্বাভাবিক অথচ উচ্চ মানসিকতার মানুষ তিনি আর দুটি দেখেনি। যে কোনো বিষয়ে তার থ্যাংক ইউ বলা অভ্যেস। কালু জেনেছে মা ঠাকুরুণের কাছে তার মানে। একদিন হাসতে হাসতে বলে – “তুমার অতগুলা থ্যাংক্যু এই কালুর প্যাটে হজম হবেক লাই গো বৌ মনি। সন্ধ্যেবেলায় যখন যাব একেবারে বলে দিও। এতো মিষ্টি কথা শুনলে কালুর মনটা কেমন যেন আটুপাটু করে।” সেই থেকে ছোট মেয়েটাও শিখেছে – “আমার ও মনটা আটুপাটু করছে মা কালু কাকুর মতন। সবাই হেসে ওঠে তার কথা শুনে।

কিছুদিন পরে ভাই ফিরে এলো এবং কয়েকদিন খুব হৈ চৈ আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়ে ফিরে গেল রাঁচিতে তাঁর কর্মস্থলে। যাওয়ার আগে কালু দাদার জন্যে নিয়ে আসা একটি দামী ঘড়ি বেঁধে দিল তাঁর হাতে। প্রথমে সে তো লজ্জায় আবেগে গলায় নতুন কলার পড়া পোষা প্রাণীটির মতন হেঁসে নেচে গ্রামের সবাইকে দেখিয়ে এলো, তারপর আবার সেটি ভালো করে বাক্সে বন্দি করে বললে, – “হাতটা কনকনায় গেলরে ভাই, ইটা আমার কলাই রাখতে লারবেক (অর্থাৎ পারবেক নেই)। সূয্যির আলো ঐ উঠানে মারাইতে, পিয়ারা গাছে পড়লে উয়ার ছায়াতেই বুঝা যাই দণ্ড কত হল। ইটা অন্য কাউকে দিয়ে দাও ভাই।

ছোট্ট সরস্বতী তার কালো কেষ্ট ঠাকুরের কোল থেকে কিছুতেই নামবে না। জোর করে তাকে গাড়িতে বসিয়ে কালু দা বলল – “পরীর মতন মেয়েটাকে একটুকুন, সাবধানে রাখবে গো বৌরানী।” ভাই এবার তার হাতটা ধরে তাতে একটু চাপ দিয়ে বলল – “এবার খুব বড় বাংলো কোয়াটার পেয়েছি গো কালুদা, তোমাকে আর মাকে নিয়ে গিয়ে রাখব। বাগান করার মেলা জায়গা, তুমি লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে যা ইচ্ছে লাগবে।

– বটে বটে? ক্যানে যাবো নাই ভাই তুমি যিখানটায় লিয়ে যাবে শিখানকেই যাবো। মাঠাকুরুণ এই কালুকে ছাড়া থাকতে পারবেক নাই। লিচ্ছই যাবেক তুমার কালুদা।” সরস্বতী মাকে নিয়ে সে এই কয়মাস কুমীর কুমীর খেলত। কালু উঠোনে কুমীর হয়ে বসত তার ঐ শ্বেত পরী সিঁড়ি থেকে একটু নেমে তার আদো আদো সুরে বলল – “কুমীর তোর জলকে লেবেচি।” আধবুড়ো কুমিরটা তাকে ধরতে গেলে সে ছুটে সিঁড়ির উপর চড়ে যেত এক লাফে। আর তার সঙ্গে খলখলিয়ে হাততালি দিয়ে হাসি। বড় ভালো লাগতো কালুর।

ক’দিন ধরেই দেখছে বামুনপাড়ার কিছু মুরুব্বি আসছেন মায়ের কাছে। তারা দশজন মহিলাকে তীর্থ করতে নিয়ে যাবেন কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী। তারই তোর জোর চলছে। ভাই কে পোস্ট কার্ড লিখে অনুমতি আনিয়েছেন মা ঠাকুরুণ। কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করার কথাটা কেউ ভাবেনি। যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই হাঁউমাঁউ করে কেঁদে পায়ের কাছে বসে পড়লো কালু – “যেথ্যে হবেক নাই গো মা ঠাকুরুণ। অতদূরে।”

মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন – তাঁর প্রৌঢ় শিশুটির দিকে। সত্যিই তো তার খুব ভুল হয়ে গেছে কালুকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

“তুমি তো ঘরকে বস্যে বস্যে সারাক্ষণ পূজা পাঠে ল্যাগ্যে থাক্ক্য, উয়ারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বুলে, হাঁটা চলার অভ্যাস আছে। দোকানে বাজারে খাবার খাবেক, তুমি তো – ” কালুর কান্না দেখে মনে হচ্ছে যেন পিতা পুত্রী কে দূরে শ্বশুর বাড়ি পাঠাচ্ছে। কিন্তু এতো টাকা দেওয়া হয়ে গেছে – এতজনের সঙ্গে ট্রেন গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলেছে, গ্রামের অন্যান্য সব মহিলাও রাজি হবেন না মাকে ছাড়া যেতে। অতএব তীর্থ যাত্রায় বেরিয়ে পড়লো যাত্রীরা দলবল বেঁধে।

বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে। হরিদ্বার থেকে একটা পত্র এসেছে শুধু। কালু সেদিন বাগানে কাজ করছে। হটাৎ একজন এসে বললে – “ও কালুয়া তু এখনও ঘর যাস নাই রে? – দ্যাখ গা যা তোদের ঘরকে কত লোক আইছে।”

– “আরে অমন ভ্যাল ভ্যালায়ে তাকাই আছুস ক্যানে রে, খারাপ কিছু ঘটে নাই। গাঁয়ের মায়েরা তীর্থ করে ফিরত আইছে। তোদের উঠোনেই তো সব জড়ো হইচ্যে গো। বৌ বিটিরা উনাদের পেন্নাম করত্যে যাবেক নাই? তীর্থের ধূলা উনাদের পায়ে, ঘটিতে গঙ্গাজল। চল চল কালু জলদি চল। মোচ্ছব লেগ্যে যাবেক উখানে।”

কালু হন্তদন্ত হয়ে ঘরের কপাট গোড়ায় পৌঁছেই হতভম্ব একেবারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কিছুক্ষণের জন্য। এ কী চেহারা হয়েছে মা ঠাকুরুণের, অতসুন্দর সোনার প্রতিমা যেন শীর্ণকায় তামাটে আর সবচেয়ে দুঃখের বা কালুর কাছে আশ্চর্যের বিষয় মাথা ন্যাড়া। বামুনঠাকুররা ও তাঁদের আত্মীয় স্বজন খোল কর্ত্তাল বাজাচ্ছে, এতগুলি বিধবাকে চারধাম যাত্রা করানোর পুণ্যফল তাঁদের কোন খাতায় লেখা হচ্ছে কে জানে। কিন্তু কালুর ছায়া এরা মাড়ান না, তাই ভিজে গামছাটা কাঁধে থেকে কোমরে বেঁধে আবার ছুট লাগলো মাটি কোপাতে। বিকেল গড়িয়ে গেছে – কালু মাটিতে কোদাল চালাচ্ছে আর বলছে – “ইয়াকে আবার ধম্ম বলে? কচি বৌ টা বেধবা হতেই তার সব চুড়ি হার খুলে নিয়ে সাদা থান পরায়ে দিলেক। ইয়ারা ভদ্দর নোক বটে। ইয়াদের চ্যায়ে আমাদের ছোট জাতেই ভালো বিধবার বিয়াও হয়, তারা সব খায়ও। ধুস শালা তোদের অমন ধম্মের নিকুচি করেছে কালু।”

কদিন থেকেই শ্রাবনের জলধারা থামছে না। ভাই তো আসতেই পারছে না ট্রেন বাস ভালোমত চলছে না বলে। কালু হাটে গেছে। কিছুক্ষণ ধরে গরু দুটো বড় চেঁচাচ্ছে। মা তাড়াতাড়ি করে গোয়ালের পেছনে শুকনো খড় বের করতে গেলেন। হটাৎ কিসে যেন পা টা আঘাত পেয়ে কেটে গেল। ঘরে এসে খানিকটা গাঁদাপাতা লাগিয়ে দিলেন, একটা কাপড়ের ফালি ছিঁড়ে বেঁধে দিতেই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু পরদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না, পা ফুলে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। জ্বর এসেছে তাঁর।

কালু কবিরাজ মশাইকে নিয়ে এল, তিনি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, – “পা টা যে সেপটিক করে ফেললে বৌমা। কিসে কেটেছে নিশ্চয় লোহায়। তারপর তাঁর মধ্যে মাটি গোবর সব ঢুকেছে। এখানে তো ফেলে রাখা যাবে না, শহরে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ির ব্যবস্থা করো কালু।” কালু ছুটলো দিকবিদিক শূন্য হয়ে।

গ্রামে সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না। একটা বাসে চড়ে দুর্গাপুরে গিয়ে বোস বাবুদের ছোট বেটা যখন গাড়ি নিয়ে এল, তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে।

মায়ের শরীরে ‘ধনুষ্টঙ্কার’ রোগ গোটা দেহটাকে বেঁকিয়ে দিচ্ছে। পাশের গ্রামের ডাক্তারবাবু এসে ইনজেকশন দিয়েছেন। জীবনের এতগুলো বছর যে কালু মাকে ছুঁয়ে প্রণাম করেনি, আজ সে মাকে চেপে ধরে বসে আছে। যন্ত্রনায় শরীরটা দুমড়ে যাচ্ছে, কাতরাচ্ছেন তিনি। কালু বলছে – “ভাইকে তার করে দিয়েছে, সে চলে আসবেক বাঁকুড়া হাসপাতালে।”

ঠিক গাড়ি ছাড়বার আগে মা একবার কোনওরকমে চোখ খুলে কালুর দিকে তাকালেন। অতি কষ্টে বলতে পারলেন, “গরুটার বাচ্চা হবে কালু ওকে ছেড়ে…” – কথাটা শেষ হবার আগেই তাঁর শিরদাঁড়ায় যন্ত্রনা শুরু হলো, শরীর আবার বেঁকে যেতে লাগলো তাঁর। দুজন দুদিক দিয়ে ধরে আছে তাকে গ্রামের দুই কাকা, ড্রাইভার কে বললেন একজন – “তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও গো ভাই। বর্ষাকাল, রাস্তাঘাটও ভালো নয়। বাঁকুড়া সদর হাসপাতাল তো আর এখানে নয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাবে।”

মায়ের কথা আজ পর্যন্ত কালু অমান্য করেনি, মা তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন না, দুঃখে অভিমানে হতাশায় হতবুদ্ধি হয়ে কালু বসে পড়লো রাস্তার ওপর। পাঁচসিকে মানসিক করলো মা দুর্গার কাছে। ভগবান, ঠাকুর দেবতা কিছুই সে জানে না, মানেও না, কিন্তু তার মনে হল, গাঁয়ের লোকেরা তো মানসিক করে পুজো ও চড়ায় মা ঠাকুরুণ ভালো হলে তাকে সে ও ঘরে একটা বড় রকম “মোচ্ছব” করবে। চারদিন পরেই খবর এল, তার মা ঠাকুরুণ আর এ জগতে নেই।

সারা গ্রামের বিধবা সধবা কচিকাঁচার দল যারা দুপুরবেলায় রোজ আসতো এই ঘরের বড় বারান্দায় মা ঠাকুরুণের রামায়ন বা মহাভারত পাঠ শুনতে, তারা সবাই এসে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে বাড়ির উঠোনে। চন্দনের তিলক কাটা যে বোষ্টম-বোষ্টমী রোজ প্রভাতে এসে “রায় জাগো – রায় জাগো” বলে গান শুনিয়ে যেত তারা ফকির, বাউল, শ্মশান ঘাটের কালী সেবক লাল সিঁদুরে টিপ আঁকা, – কেউ বাকি নেই। ভজা পাগল যখন তখন এসে “খেতে দিবি নাই” বলে ডাক ছাড়তো, সেও হাঁকডাক করতে করতে ঘরে ঢুকেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে গোয়ালে গিয়ে চিৎকার জুড়েছে, “আই শালা কালু বল তোর মা কুথায় পালাইছে, অখন আমায় খ্যাতে কে দিবেক।” পাড়ার আত্মীয় স্বজন ছেলে বুড়ো বৌ ঝি রা কাঁদছে হাউহাউ করে। কালুর চোখে শুধু জল নাই। সে তো বিশ্বাসই করেনি এখনও তার দেবী মা আর কখনো আসবেন না। ওদিকে গরুর প্রসব বেদনা উঠেছে, কালু মন দিয়ে তাকে দেখাশুনা করতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে।

মায়ের শ্রাদ্ধ গ্রামেই হবে। তাই স্বস্ত্রীক কন্যা সহ ভাই এসেছে রাঁচি থেকে। কালুর তো কারুর সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। কাঙালি ভোজনের জোগাড় করা থেকে শুরু করে নিয়ম ভঙ্গের দিন পর্যন্ত জ্ঞাতি গুষ্টির মৎস মুখ করতে পুকুরের মাছ ধরা সবই তার দায়িত্ব। এ সময় একবার ও তার ভায়ের সঙ্গে কথা হয়নি, মনে মনে রাগও পুষেছে সে, “ঘরের নকখী (লক্ষী) চল্ল্যে গেলেক, আর ইয়াদের খাওয়া দাওয়ার ধুম লাগাইছে। পন্ডিতগুলা খাট, বিছানা, ছাতা লিয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে চলছে যেন – শালা ঘরের জামাই বটে। ছ্যা ছ্যা ইটা তুমাদের কোন ধম্ম কেউ বলতে পারবেক এই মুখ্য সুখ্য কালুকে?” আত্মীয় স্বজন সবাই চলে যাবার পর “স্বরস্বতী পরীকে” নিয়ে খেলা করছিলো সে, নতুন বাছুরটাও বড় সুন্দর – মনটা হালকা হল শিশুর সঙ্গে খানিকক্ষণ কাটিয়ে। ভাই ডাকলেন খুব মায়াময় স্বরে।

“কালুদা একটু কাছে বসো।” হাতে তার কতগুলো কাগজ। – “এটা রাখো তোমার কাছে যত্ন করে।” – “কি বটে ভাই ইটা? আমাকে দিতে হবেক নাই, হারাই যাবে, তুমার ঠায়ে লিয়ে যাও।”

– না গো কালুদা, এটা তোমার। আমাদের জমি, পুকুর, বাগান আমি সব তোমার নাম করে দিয়েছি। বসত বাটিটা থাক, কাকার ছেলেরা পূজোর সময় এসে থাকবে।

– “ক্যানে ভাই?”

-“তাহলে তোমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তাই। আর তোমাকে বলার সময় পায়নি, আমরা এ দেশে আর থাকছি না। অনেক বড় চাকরি পেয়েছি, বৌমনিও তোমার ডাক্তারি পড়তে ঢুকবে। আমরা আমেরিকায় চলে যাচ্ছি।” কথাটা শেষ করতে দিলো না কালু। তার চোখে তখন বিদ্যুতের ঝলক। ভীষণ জোরে একটা বাজ পড়ার মতন আওয়াজ করে সে চিৎকার করে উঠল – “আমার চাই নাই গো, তুমরা সবাই আমাকে ফ্যালে চল্যে যাব্যে? কার ল্যাগে ই গুলা আগুলে কালু পড়ে থাকবেক?

কাল বৈশাখীর ঝড়ের মতন ভীষণ শন শন হওয়ার বেগে কালু দরজা খুলে ছুটে পালিয়ে গেল, একবারও তাকালো না পিছনে ফিরে।