(১) ছটফটে সেই ছেলেটা, যার নাম হ'ল তুফান, বাবা মায়ের সঙ্গে যাবে ঘুরতে আন্দামান। দেখার আশায় সাগর ঘেরা, অপূর্ব এক স্থান খিদিরপুরের ডকে গিয়ে চাপলো জলযান। জাহাজ ভাসে, ফেনা হাসে বালুর সূর্যস্থান, ঢেউ এর তালে শরীর দোলে জুড়িয়ে গেল প্রাণ। নীল সবুজের গভীর জলে শোনে সে আহ্বান, - তুফান চলে, দুলকি চালে, সুদূর আন্দামান। (২) দূরের থেকে দ্বীপের আলো ভরালো দু নয়ান, আস্তে কাছে উত্তেজনায় দাঁড়ালো টান-টান, আনন্দেতে হয় আটখান, তুফান ধরে তান। ভীস্মলোচন শর্মা তখন, চেঁচিয়ে করে গান। আশে পাশে বন্ধ হাসে, ধরলো চেপে কান, _ জাহাজ হতে ঝাঁপ দিতে তার প্রাণ করে আনচান। পাহাড় ঘেরা, মুক্ত ঝরা সবুজ আন্দামান, তুফান ভাবে, পালিয়ে যাবে, করবে অভিযান। (৩) জমির পরে থরে থরে নারিকেলের সারি - দারুচিনি গাছের পাশে লবঙ্গ সুপারি। পেঁপের পাতা দোলায় ছাতা তাল তমালের ঝাড়ি। জলের ধারে চার কিনারে - শুভ্র বালিয়াড়ি। শোর গোল বা হল্লা সাথে হেথায় সবার আড়ি। আঁকা-বাঁকা রাস্তা ফাঁকা, নেই কো প্রাসাদ বাড়ি। ছুটিয়ে নিয়ে যাবে সেথায়, ভ্রমণ যাত্রি গাড়ী। শান্তি পেতে দাও ছুটিতে, আন্দামানে পাড়ি। (৪) সাগর পারে প্রাচীর ধারে বানানো উদ্যান, “পোর্ট-ব্লেয়ারে" ইতিহাসের কাহিনী অম্লান। “বৃদ্ধ বট বৃক্ষ” শোনায় অত্যাচারের গান। বন্দি ছিল “সৈলুলরে” সংগ্রামী সন্তান। ভারতমাতার মুক্তি লাগি জীবন বলিদান। কালাপাণির কারাগারে "শহীদ" হারায় প্রাণ। কত ফাঁসির সাক্ষি ছিল, নীরব আন্দামান। “স্বাধীনতার বীর" কে তুফান জানালো সম্মান। (৫) “জলী বয়ের” দ্বীপ বিচিত্র, শুনেছে সে আগে, কাচের নৌকা চেপে যেতে বিস্ময়ে যে জাগে, - ডুবুরিদের কাছে সে তাই মুখোশ চশমা মাগে, প্রবাল দ্বীপের অভিযানে স্টীমার চলে আগে। “সজীব-কোরাল" দেখার আশায় পরম অনুরাগে । উৎসাহ আর কৌতুহল তো মনে কামান দাগে। হাজার রঙের বাহার দেখে, চোখে চমক লাগে। নরম প্রবাল ছুঁতে সে চায়, সুতীব্র আবেগে। (৬) ডুব সাঁতারে গিয়ে দেখে নীল সাগরের তল, সুন্দরতায় বিভোর শিশুর মন হ'ল বিকল, অপরূপা ময়ূর পাখা করছে যে ঝলমল, স্থল পদ্ম ফুটল বুঝি, আসল না নকল। কোথাও প্রবাল রামধনু রঙ, কোথাও সে অনল, তারই পাশে করছে খেলা, রঙিন মাছের দল। ঝিনুক শাঁখের ছড়াছড়ি স্ফটিক স্বচ্ছ জল, ঢেউ-এর সাথে মিতালীতে তুফান কাটায় পল। (৭) নতুন জগৎ দেখার নেশায় পাগল যে মন প্রাণ, - হঠাৎ জলের ঘূর্ণি টানে, ঘুরতে থাকে তুফান। অক্সিজেনের মুখোশ ঢিলে, ধরলো বুকে টান। রহস্যময় জলের নীচে প্রায় হ'ল অজ্ঞান। তীরে ফেরার তরে সাতার কাটে সে আপ্রাণ, মৃত কোরাল কাঁটায় আটকে বেঘোরে যায় জান। ঠিক সে সময় উদয় হ'ল করতে পরিত্রাণ, _ জলের দেবতা কূর্মাবতার, করলো জীবন দান। (৮) প্রবাল দ্বীপের বালুর বুকে ওদের সবার বাস,- 'কচ্ছপ'দের দলটি সেথায় থাকে বারোমাস। জলের ভেতর খেলায় মাতে, পেলেই অবকাশ। ভালোবাসে আন্দামানের অসীম নীলাকাশ। তুফান যখন ডুবছে জলে, ফুরিয়ে এল শ্বাস, “কাছিম বন্ধু" দলটি গেল, সাঁতরে তারই পাশ। ধাক্কা দিয়ে তুললো ডাঙায় ভয় করলো নাশ। তুফান বাবুর মিটলো তখন রোমাঞ্চকর-আশ। (৯) নীল সাগরের তীরে বসে, স্নিগ্ধ সবার মন, - সাদা ফেনায় সফেন হল, বেতের উপবন। “জারোয়াদের”" বন্য জীবন দেখবে সে কখন! ভাবছে যখন, করছে তখন, সবাই লঞ্চে ভ্রমণ। “কার-নিকোবর” সবুজ দ্বীপে আছেন পরিজন, - এয়ার ফোর্সে কর্মরত কাকুর বন্ধুগণ। শ্যাওলা জলে, রৌদ্রছায়ায়, মেঘের মায়ায় মগন, পৌছে গেল, সেথায়, যখন, তারায় ভরা গগন। (১০) রাত বারোটায় “ সান্টাক্লজের হঠাৎ আগমনে, নৃত্যগীতে মাতলো সবাই মাদল, বাঁশির সনে। “খৃষ্টমাসের" এই উৎসবেতে ভীষণ খুশী মনে, কেউ বা আবার চার্চে গিয়ে যীশুর গান যে শোনে। বাবা, কাকা 'বড়দিনে' ভোজের নিমন্ত্রণে, - মা কাকীরা গল্প করেন, তাকিয়ে টিভির পানে। তুফান খেলে, লুডো, ক্যারাম, পাশের ঘরের কোনে, সাগর তটে জেলেরা সব হাত সেঁকে আগুনে। (১১) পরের দিনে প্রভাত বেলায়, সাগর কিনারায়, - অদ্ভত এক দৃশ্য দেখে, তুফান ছুটে যায়; সমুদ্র জল যাচ্ছে সরে, পিছন পানে হায় ! সাগর গর্ভ শূন্য একী ! ঘর বাড়ীকে দোলায় ! ভূমিকম্পে কাঁপছে ভুবন, সবাই কোথায় ধায়? হঠাৎ দূরে, ভীষণ জোরে আসছে পাহাড় প্রায়। "সুনামি" ঢেউ দানব যেন হাওয়াতে গর্জায়। দিশাহারা ভীত মানব পালায় ছুটে ডাঙায়। (১২) এক নিমেষে সবাই ভাসে, প্রবল সে ধাক্কায়। গাড়ী বাড়ী রাস্তা দোকান ডুবলো যে বন্যায়। লোনা জলের স্বাদে অবশ বিবশ দেহটায় - প্রাণ আছে, তাই তুফান গাছের ডালটিকে আঁকড়ায়, একটি ছোটো কচ্ছপ সে হাতের কাছে পায়, - জড়িয়ে ধরে বুকে তারে আবার ধাক্কা খায়। ঢেউ-এর দাপট একটু কমে, মাঝিরা সাতরায়, আবার আসে, ভয়ানক সে, কে কাকে বাঁচায় ! (১৩) সেই সে ক্ষণে, তাহার সনে ঝুলছে ডালে সাপ, মরা বিড়াল মাছ ধরা জাল, নতুন চশমা খাপ। গ্যাসের উনুন, স্টীলের বাসন, নেই তাতে উত্তাপ, সেলাই মেশিন, ভাঙা বেসিন, কাঠের সিঁড়ির ধাপ, শাড়ি হাড়ি উল্টো গাড়ী চা দোকানের ঝাঁপ। মুরগি খাচা, বাঁশের মাচা, ফুলদানী, প্লেট, কাপ। ভাসছে জলে, সবাই মিলে, দিলে, মরণ ঝাঁপ, ভাবছে, মানুষ, পাপের ফানুস, ঝরছে অভিশাপ। (১৪) বিপদ মাঝেও শান্ত ছেলে, জ্বাললো আশার আলো, গাছের মাথায় তেষ্টা ক্ষুধায়, দিন রাত কাটালো। স্মরণ করে ঈশ্বর সে ভয় যে তাড়ালো। বুদ্ধিবলে, সুকৌশলে সাহস জাগালো। ছোট্ট ভীরু কাছিম সঙ্গে বন্ধু পাতালো, ভাসমান এক কুকুর ছানার প্রাণটি বাঁচালো; “আমার ঘরে রাখবো তোরে “আদর জানালো। দশ বছরের মাথাটি তার শান্ত সে রাখলো। (১৫) তৃতীয়দিন, শরীর যে ক্ষীন, হাত পা অচল প্রায়, তবু তুফান বলছে কথা, উৎসাহ না হারায়, নারকেল ডাব যাচ্ছে ভেসে আনলো টেনে তায়। তারই জলে, তখন তুফান পিপাসা মেটায়। প্রলয় এখন থেমে গেছে, কিন্তু ডাঙা কোথায় ? মায়ের মুখটি পড়ছে মনে, ফিরবে কবে হায় ! ঠিক তখনই “হেলিকপ্টার” দেখতে তাকে পায়। উদ্ধার হয় বীর বাহাদুর, ফিরলো কলকাতায়।